‘না ভোট’: একটি ভারতীয় রায় ও আমরা…এম সাখাওয়াত হোসেন

গত শুক্রবার, ২৭ সেপ্টেম্বর প্রায় চার বছর ধরে ঝুলে থাকার পর ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট একটি যুগান্তকারী রায় দিয়েছেন। ওই রায়ের মাধ্যমে নির্বাচনে প্রার্থী প্রত্যাখ্যান করার ভোটারদের ক্ষমতাকে প্রতিষ্ঠিত করে ‘না ভোট’কে ব্যালট এবং ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) যুক্ত করে আগামী নির্বাচন থেকে এ রায় কার্যকর করতে বলা হয়েছে। ইতিপূর্বে ২০০৯ সালে পিপলস ইউনিয়ন ফর সিভিল লিবার্টি (পিইউসিএল) নামের এক এনজিওর জনস্বার্থে করা মামলাটি দিল্লি হাইকোর্ট সুপ্রিম কোর্টের বৃহত্তর বেঞ্চে পাঠান। অবশেষে ভারতের প্রধান বিচারপতি পি সত্যসিভামের নেতৃত্বে বিচারপতি প্রকাশ দেসাই ও বিচারপতি রঞ্জন গোরাই এই ঐতিহাসিক রায় দেন। রায় প্রদানকালে বেঞ্চ বলেছেন, একটি নির্বাচনী এলাকার ভোটারদের অধিকার রয়েছে তাঁর এলাকার কোনো প্রার্থী পছন্দ না হলে ‘না ভোটের’ মাধ্যমে সবাইকে প্রত্যাখ্যান করার। একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনকে ব্যালট পেপারে অথবা ইভিএমের শেষের অংশে ও বোতামে রাখতে হবে ‘ওপরের কাউকে নয়’ ভোটারদের জন্য বিকল্প।
এ রায় দিতে গিয়ে বেঞ্চ বলেছেন, ‘নেতিবাচক ভোট নির্বাচনে বিশুদ্ধতা এবং নতুন উদ্দীপনা জোগাবে।’ আদালত পর্যবেক্ষণে বলেছেন, এ ধরনের ভোটের ব্যবস্থা প্রায় ১৩টি দেশে বিদ্যমান। এমনকি ভারতীয় পার্লামেন্টেও বিদ্যমান। পার্লামেন্টের সদস্যরা যেকোনো ভোটে অনুপস্থিত বোতামে টিপে ভোট দিতে পারলে ভোটাররা পারবেন না কেন। কোর্টের রায়ে নির্বাচন কমিশনকে তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর করতে বলা হয়েছে, যাতে আসন্ন রাজ্যসভার নির্বাচন এবং পরবর্তী সময়ে লোকসভার নির্বাচনে এ ব্যবহার প্রয়োগ করা যায়।
ভারতীয় এই ঐতিহাসিক রায় এখন ‘রিপ্রেজেনটেটিভ অব পিপলস অ্যাক্ট’ (আরপিএ)-এ আইন হিসেবে সংযোজিত হবে। আইন হওয়া পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনের কার্যকরী আদেশে ভারতের সর্বোচ্চ আদালতের রায় কার্যকর হবে।
আমি ভারতের সুপ্রিম কোর্টের যুগান্তকারী এই রায়ের বিশদ এ কারণে উদ্ধৃত করলাম যে, রায়টির সঙ্গে আমাদের দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থা এবং গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের একটি যোগাযোগ ২০০৮ সালের নির্বাচনী ব্যবস্থায় ছিল। নির্বাচিত সরকার এ বিষয়ের সংযোজন আইনে রূপান্তরিত করার সময় বাদ দেয়।
পাঠকদের মনে থাকার কথা, ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশের ইতিহাসে ভোটাররা প্রথমবারের মতো ‘না ভোট’ প্রয়োগ করেছিলেন। যদিও ওই সময়ে ভোটারদের এই গুরুত্বপূর্ণ অধিকার ব্যাপক প্রচারণা পায়নি, তবু সারা দেশে মোট প্রদত্ত ছয় কোটি ৯৭ লাখ ৫৯ হাজার ২১০ ভোটের মধ্যে তিন লাখ ৮২ হাজার ৪৩৭টি ‘না ভোট’ দেওয়া হয়েছিল। আরও উল্লেখ্য যে, ওই নির্বাচনে ৩৮টি দল অংশগ্রহণ করলেও মাত্র ছয়টি দল ‘না ভোটের’ শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছিল। তার মানে এই যে, ‘না ভোট’ সপ্তম স্থানে ছিল।
আমি বিষয়টি এ জন্য তুলে ধরলাম যে, বাংলাদেশের বিগত হুদা নির্বাচন কমিশনের অন্যতম কমিশনার হিসেবে ২০০৭-০৮ সালের নির্বাচনী প্রক্রিয়ার সংস্কারের সময়ে আমি আমাদের নির্বাচনী ব্যবস্থায় ‘না ভোট’ বা ‘ওপরের কাউকে নয়’ বিষয়টি সংযোজন করার প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলাম। কারণ, বহুদিন থেকে আমাদের নাগরিক সমাজের একটি দাবি ছিল ভোটারদের এই গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত করার। কমিশনে অন্তর্ভুক্তির আগে ‘সুজন’-এর সঙ্গে আমার কিছুটা সম্পৃক্ততায় নির্বাচনী সংস্কারের বিষয় নিয়ে ব্যাপক আলোচনায় এ বিষয়টিও উঠে আসে। সময়টি ছিল ২০০৫-০৬ সাল। ওই সময়ে নাগরিক সমাজের যুক্তি ছিল অনেকটা ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের আলোচিত রায়ের পর্যবেক্ষণের মতো। এরই আলোকে হুদা কমিশনে সর্বসম্মতিক্রমে ‘না ভোটের’ বিষয়টি গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের সংস্কারের খসড়ায় রাখা হয়।
‘না ভোট’ বা ‘ওপরের কাউকে নয়’ এমন একটি মৌলিক বিষয়ের সংযোজনে যথেষ্ট চিন্তাভাবনা এবং মেধা-শ্রম দিতে হয়েছিল, যেটা ভারতের সুপ্রিম কোর্টের হালের আদেশে ঊহ্য রয়েছে। ২০০৭-০৮-এর সংস্করণে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে সেটাও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। বিষয়টি ছিল ‘না ভোট’ যদি প্রার্থীদের ভোটের সমষ্টিগত ভোটের বেশি হয়, সে ক্ষেত্রে এর কার্যকারিতা কী হবে? পরে হুদা কমিশন সংযোজন করে, যেকোনো আসনে প্রদত্ত ভোটের ৫০ শতাংশ ‘না ভোট’ হলে ওই স্থানে ওই প্রার্থীদের বাদ দিয়ে নতুনভাবে নির্বাচন হবে। অনেক রাজনীতিবিদ বিষয়টি বাদ দিতে চাপও দিয়েছিলেন, কিন্তু কমিশনের শক্ত অবস্থানের কারণে ওই সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার অধ্যাদেশ জারি করলে ‘না ভোট’ স্থান পায়। ওই অধ্যাদেশের ধারা ৩১(৫) (বিবি)-তে অন্তর্ভুক্ত করা হয়, যাতে ব্যালট পেপারের সবশেষের প্রার্থীর স্থানে লেখা থাকবে ‘ওপরের কাউকে নয়’ এবং ভোটারদের সহজ পরিচিতির জন্য মার্কা রাখা হয় ‘ক্রস’ (X)। শুধু ওই ধারাতেই নয়, এ প্রক্রিয়ায় কোনো সংসদীয় এলাকায় ৫০ শতাংশের ওপরে ভোট প্রদান করা হলে পুনরায় নির্বাচন করার বিষয়টি নতুন ধারা ৪০এ-তে সংযুক্ত করা হয়েছিল।
আগেই বলেছি, এই ধারা নিয়ে বেশির ভাগ রাজনৈতিক দল এবং রাজনীতিবিদেরা মোটেও সন্তুষ্ট ছিলেন না। ওই সময়কার নির্বাচন কমিশনের যুক্তি হালের ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণের কাছাকাছি ছিল। নির্বাচন কমিশনের শক্ত যুক্তির ভেতরে ছিল ভোটারদের সম্পূর্ণভাবে গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করার ক্ষমতা দেওয়া, রাজনৈতিক দলগুলোকে প্রার্থিতা নির্বাচনে আরও সংবেদনশীল হওয়া এবং ভারতীয় সংবিধানের মতো আমাদের সংবিধানের ধারা ৩৯(১) ও (১) (ক) প্রদত্ত চিন্তা এবং মতামত প্রকাশের মতো মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত করা-বিষয়ক বিবেচনা। এবং নেতিবাচক কারণে ভোটকেন্দ্রে না যাওয়া অথবা ব্যালট পেপার নষ্ট করার মতো ক্রমবর্ধমান ধারাকে ইতিবাচক বিষয়ে পরিণত করা।
যা-ই হোক, ওই অধ্যাদেশের আওতায় ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথমবারের মতো ভোটারদের সামনে বিকল্প ব্যবস্থা উত্থাপন করা হয়েছিল। ওই সময়ে ‘না ভোট’ বা ‘ওপরের কাউকে নয়’ বিষয়টি সময়ের অভাবে যথেষ্টভাবে প্রচারিত হয়নি। তবু বহু তরুণ ভোটারের মধ্যে বিষয়টি যথেষ্ট চর্চিত হয়েছিল। ঢাকার একটি আসনে সবচেয়ে বেশি ‘না ভোট’ পড়েছিল, তবে তা পুনর্নির্বাচনের পর্যায়ে যায়নি। এই নতুনত্ব ভোটারদের মধ্যে ক্রমেই যথেষ্ট আলোড়ন সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়। অনেক ভোটার শুধু তাঁদের গণতান্ত্রিক অধিকারের বিষয়টি যুক্ত করার কারণেই ভোটকেন্দ্রে গিয়েছিলেন। আজও অনেক ভোটার জানেন না, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের এই ধারাগুলো ফেব্রুয়ারি ২০০৯ সালে সংসদ কর্তৃক পাসকৃত আইনের ধারা ৩১-এর সংশোধনী (খ) ও (গ) দ্বারা বিলুপ্ত করা হয়, কাজেই ৪০ (এ)-এর কার্যকারিতা আর থাকল না।
শুধু আমাদের দেশের রাজনীতিবিদেরাই নন, আলোচিত ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পরও ভারতীয় রাজনীতিবিদ তথা দলের প্রতিক্রিয়াতে নানা মত দেখা যায়। বিজেপি এবং ভারতের ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী বলে কথিত নরেন্দ্র মোদি এ রায়কে স্বাগত জানালেও সিপিআই (এম) কিছুটা দ্বিমত প্রকাশ করেছে। তবে শাসকগোষ্ঠী কংগ্রেসের জোট নিশ্চুপ। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, নির্বাচন কমিশনের এক দশকের সুপারিশ আমলে না নিলেও ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের এ রায় মানতে বাধ্য হবে, কারণ অতীতে সুপ্রিম কোর্টের রায় পাস কাটানোর অভিজ্ঞতা সুখকর হয়নি।
ভারতীয় নির্বাচন কমিশন এবং ভোটারদের স্বার্থরক্ষা করার অন্যতম শক্তি ভারতের বিচারব্যবস্থা। ২০০৯ সালে ১৫তম লোকসভা নির্বাচন পর্যবেক্ষণকালে ভারতীয় নির্বাচন কমিশন ওই সময়ে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের সংস্কারের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছিল আমার এবং ছহুল হোসাইনের কাছে। আলোচিত হয় ‘না ভোটের’ বিষয়টি। তখন আইন হতে বাদ পড়েছিল। তবু ভারতীয় নির্বাচন কমিশন আশাবাদী ছিল, ভারতে ওই সময়ে বিষয়টি মাত্র কোর্টে উত্থাপিত হয়েছিল, আদালত ভোটারদের পক্ষে রায় দেবেন এবং ওই রায়ের মাধ্যমে ভারতীয় নির্বাচন কমিশনের বহু সুপারিশের একটি রাজনৈতিক দলের অনীহা সত্ত্বেও কার্যকর হবে। ভারতের ভোটারদের বেশি দিন অপেক্ষা করতে হয়নি। এ বিষয়ে আমরা কিছু সময়ের জন্য এগিয়ে থাকলেও পিছিয়ে পড়েছি। আমরা ১৩তম দেশ ছিলাম, এখন ভারত ১৩তম দেশ হবে, যেখানে ভোটাররা তাঁদের মৌলিক অধিকারের একটিকে প্রয়োগ করে রাজনৈতিক দলগুলোকে প্রার্থী বাছাইয়ের ওপরে সতর্ক করবেন।
আমরা দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থায় যে পরিবর্তন এনেছিলাম, তা ভারতের চেয়ে এক ধাপ এগিয়ে থাকলেও পরবর্তী সময়ে পেছানো শুরু হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থায় কোনো নতুন কিছু সংযোজন হয়নি। বিয়োজন হয়েছে ‘না ভোট’, বিয়োজন হয়েছে ইভিএম। হালের সুপারিশকৃত, গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশের সুপারিশকৃত কোনো ধারাতেই নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করার মতো উপাদান নেই। তবে নিরাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই। ভারতের উদাহরণ আমাদের সামনে রয়েছে। আমরাও আশা করি, ভারতীয় বিচার বিভাগের মতোই আমাদের বিচার বিভাগ ভোটারদের মৌলিক অধিকার রক্ষার্থে নির্বাচন কমিশনকে শক্তি জোগাবে। ভারতের উচ্চ আদালতের সূত্র ধরে আমাদের দেশেও এ ধরনের অধিকার আদায়ের প্রচেষ্টায় অনেকেই সফল হয়েছিলেন, হয়তো ‘না ভোট’ পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য এমন কোনো সংগঠন উদ্যোগী হবে। এ ক্ষেত্রে আমাদের দেশে প্রত্যেক প্রার্থীর একটি তথ্য প্রদান বাধ্যতামূলক করার উচ্চতর আদালতের রায়টি প্রণিধানযোগ্য।
পরিশেষে উল্লেখ করতে চাই, আমাদের দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির উন্নয়ন এবং বিশেষ করে, রাজনৈতিক দলের মনোনয়নে আরও স্বচ্ছতা ও সচেতনতা আনতে হলে ‘না ভোটের’ মতো বিধান আবশ্যকীয়। আমি মনে করি, এ ধরনের ব্যবস্থা আমাদের রাজনীতিকে আরও উৎকর্ষ করবে। আমি এ প্রবন্ধের উপসংহার টানব ভারতীয় উচ্চ আদালতের একটি পর্যবেক্ষণের উদ্ধৃতি দিয়ে। উচ্চতর আদালত বলেছেন, The Right to reject candidates is also a fundamental right of speach and expression under the constitution. এই পর্যবেক্ষণ আমাদের জন্য প্রযোজ্য, কারণ আমাদের সংবিধানেও এ বিষয়টি মৌলিক অধিকার হিসেবে চিহ্নিত। তাই ‘না ভোট’ও জনগণের মৌলিক অধিকার হিসেবে বিবেচিত হোক এবং আদালত এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের হাত শক্তিশালী করবেন বলে বিশ্বাস রাখি।
এম সাখাওয়াত হোসেন: কলাম লেখক ও সাবেক নির্বাচন কমিশনার।