নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারল না দুদক

হকিকত জাহান হকি
মেরুদণ্ডহীন একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবেই থেকে গেল দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। পাঁচ বছরেও নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারল না। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর এ প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে নিয়োগ পান সাবেক আমলা গোলাম রহমান। দায়িত্ব নিয়েই তিনি বলেছিলেন, এটি নখদন্তহীন একটি ব্যাঘ্র। সম্প্রতি গোলাম রহমান মেয়াদ শেষে বিদায় নিয়েছেন। বিদায়কালেও তিনি ওই একই উক্তি করেছেন। বলেছেন, দুদক এখনও নখদন্তহীন একটি ব্যাঘ্র। অর্থাৎ কঠোরভাবে দুর্নীতি দমনে এ সংস্থাকে যতটুকু ক্ষমতা দেওয়ার দরকার ছিল তা হয়নি। ফলে দুদক কার্যকরভাবে দুর্নীতি দমনে ভূমিকা পালন করতে পারেনি। দুদককে শক্তিশালী করতে বহু আগে একটি আইনের খসড়া করা হয়। সেটি এখন সংসদে। এ সরকারের আমলে এটি পাস হবে কি-না তা নিয়ে সংশয় রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
বিগত সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দুদক ছিল সত্যিকার অর্থেই একটি বাঘ। দুর্নীতিবাজদের কাছে ছিল রীতিমতো আতঙ্ক। এই দুদকের ভয়ে অভিযুক্ত বহু দুর্নীতিবাজ দেশ ছেড়ে পালিয়েছিল। অনেককে জেলে যেতে হয়েছে। তখন দুদক সাধারণ মহলে ব্যাপক প্রশংসা কুড়ায়। যদিও দুদকের বেশ কিছু বাড়াবাড়ি নিয়ে সমালোচনাও ছিল। তবে এ কথা সবাই স্বীকার করেন, ওই আমলে দুদক দুর্নীতি দমনে সত্যিকার অর্থেই সাড়া জাগানো একটি অভিযান চালায়। 
বর্তমান মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার আগে আওয়ামী লীগ তার নির্বাচনী ইশতেহারে কঠোর হাতে দুর্নীতি দমনের কথা বলেছিল। দুদককে কার্যকর একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। বর্তমান সরকারের পাঁচ বছর শেষ হচ্ছে। দুদক এখনও একটি মেরুদণ্ডহীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে রয়েছে বলে দেশের সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা মন্তব্য করেছেন। 
সরকারের বহু ক্ষেত্রে সফলতা থাকলেও দুর্নীতি দমনে
উল্লেখযোগ্য কোনো ভূমিকা পালন করতে পারেনি বলেই সাধারণ মানুষ মনে করে। 
দুর্নীতি দমন নিয়ে কাজ করেন এমন অনেকেই বলেছেন, শুধু সরকারের দোষ দিয়ে লাভ নেই। বিদ্যমান দুর্নীতি দমন আইনেও যথেষ্ট ক্ষমতা রয়েছে দুদকের। কিন্তু সেই ক্ষমতা প্রয়োগের জন্য দৃঢ় চরিত্রের ব্যক্তিত্ব প্রয়োজন। সংস্থার বিদ্যমান আইন অনুযায়ী প্রভাবশালী দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান পরিচালনা করার ক্ষেত্রে সরকারের ওপর মহলের কোনো চাপ আছে কি-না জানতে চাইলে দুদক চেয়ারম্যান মো. বদিউজ্জামান সমকালকে বলেন, সরকার বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষের কমিশনের প্রতি কোনো চাপ নেই। কমিশন আইন ও বিধি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছে। চেয়ারম্যান অস্বীকার করলেও দুদকের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা সমকালকে জানান, সরকারের ওপর মহলের চাপে দুদক সক্রিয় হতে পারছে না। ওপরের চাপে মন্ত্রী, এমপি, আমলাসহ প্রভাবশালীদের দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান করা যাচ্ছে না। অনুসন্ধান ও তদন্ত পর্যায়ে বাদ দিতে হচ্ছে গডফাদারদের নাম। সার্বিকভাবে চুনোপুঁটিদের দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে কাজ করছে দুদক। 
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঢাকায় সংস্থার প্রধান কার্যালয়ের অতি গুরুত্বপূর্ণ ডেস্ক থেকে দক্ষ ও মেধাবী কর্মকর্তাদের বদলি করা হচ্ছে জেলা কার্যালয়গুলোতে। অন্যদিকে অসততার জন্য শাস্তিপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের জেলা কার্যালয় থেকে বদলি করা হচ্ছে প্রধান কার্যালয়ে। 
এ বিষয় নিয়ে আলাপকালে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান সমকালকে বলেন, দুদক প্রচলিত আইন অনুযায়ী দুর্নীতিপরায়ণ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারে। এ ক্ষেত্রে দুদকের সক্রিয় কোনো ভূমিকা নেই। দুর্নীতির বিরুদ্ধে স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে কাজ করার ক্ষেত্রে যে ধরনের মনোবল থাকা দরকার বর্তমানে দুদক কর্তৃপক্ষের সে ধরনের সাহস নেই। তিনি বলেন, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকার নীতিগতভাবেই দুর্নীতিবিরোধী ছিল। এজন্য সে সময় দুদক শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পেরেছে। এখানে শুধু সরকারকে দোষ দিয়ে দায়িত্ব এড়ানো বুদ্ধিমানের কাজ নয়। 
জানা গেছে, প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি পর্যায়ে দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান করা হচ্ছে। মামলা দায়ের করা হচ্ছে। তদন্ত শেষে আদালতে মামলার চার্জশিটও পেশ করা হচ্ছে। তদবির ও নানা ক্ষেত্রে আপসকামিতার কারণে রেহাই পেয়ে যান নেপথ্য গডফাদাররা। সরকারের ১১টি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান থেকে দুর্নীতি সমূলে উৎপাটন করার ঘোষণা দিয়ে কাজ শুরু করা হলেও এ কার্যক্রম এখন আর চোখে পড়ে না। 
একাধিক সূত্রে জানা গেছে, কর্তৃপক্ষের অবহেলা, উদাসীনতার কারণে দুদকের এক শ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তা দুর্নীতি দমনের কাজ করতে গিয়ে নিজেরাই অনিয়ম, দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছেন। কেউ কেউ অভিযুক্ত ব্যক্তির কাছ থেকে সুবিধা নিয়ে অভিযুক্তদের তালিকা থেকে নাম বাদ দিচ্ছেন। অন্যদিকে সৎ, নিষ্ঠাবান কর্মকর্তারা অভিযুক্তদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনছেন। অনেক সময় ওইসব সৎ কর্মকর্তার অনুসন্ধানে প্রভাবশালীদের দুর্নীতি ধরা পড়লে ওপরের নির্দেশে তাদের নাম বাদ দিতে হয়। নিষ্ঠাবান কর্মকর্তাদের কাজের স্বাধীনতার পরিধি ক্রমে কমে আসছে। 
দুর্নীতি দমনে সরকারের সদিচ্ছা যেমন প্রশ্নের সম্মুখীন তেমনি দুদকের সদিচ্ছাও এখন সন্দেহের ঊধর্ে্ব নয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ওপর মহলের চাপেই বহুল আলোচিত হলমার্ক কেলেঙ্কারির অভিযোগ থেকে নেপথ্যের গডফাদারদের রেহাই দেওয়া হয়েছে। মামলা ও চার্জশিটে তাদের নাম নেই। বলা হচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে আমলযোগ্য তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি। পদ্মা সেতু দুর্নীতির ষড়যন্ত্র মামলায় আবুল হাসান চৌধুরীকে সন্দেহভাজন হিসেবে গণ্য করা হয়। তাকে অভিযুক্ত করা হয়নি। কিন্তু কানাডা পুলিশের তদন্তে এখন তিনি ঠিকই অভিযুক্ত হয়েছেন। 
এসব অভিযোগের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে দুদক চেয়ারম্যান মো. বদিউজ্জামান সমকালকে বলেন, দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান ও তদন্ত হচ্ছে। মামলা দায়ের করা হচ্ছে, চার্জশিট পেশ করা হচ্ছে। তবে মামলা, চার্জশিটে অভিযুক্ত হিসেবে সে রকম নামকরা কোনো লোকের নাম নেই। আইন অনুযায়ী দুদক স্বপ্রণোদিতভাবে দুর্নীতিপরায়ণ প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ধরতে পারে। কিন্তু ধরা হচ্ছে না কেন_ এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রভাবশালী দুর্নীতিপরায়ণদের স্বপ্রণোদিতভাবে ধরা যায়, তবে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ পেলে ভালো হয়। তিনি বলেন, প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে ভাসা ভাসা নয়, দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ চাই। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানের প্রধান ব্যক্তিদের দুর্নীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে প্রচুর তথ্য-প্রমাণ দরকার। সেভাবে তথ্য পাওয়া যায় না বলে তাদের অভিযুক্ত করা হয় না। তিনি আরও বলেন, প্রকৃতপক্ষে যারা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত তাদেরই অভিযুক্ত করা হচ্ছে। 
সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম রহমান দায়িত্ব পালনকালে নানা সমালোচনার মুখেও পদ্মা সেতু, হলমার্ক, ডেসটিনির মতো বড় দুর্নীতি আইনের আওতায় এনেছিলেন। তিনি বিদায় নেওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটির কাজ চলছে অত্যন্ত মন্থরগতিতে। ঢাকায় দুদকের সদর দফতরে তদবিরবাজদের ভিড় বেড়েছে। দুদকের খাতা থেকে অভিযুক্ত দুর্নীতিপরায়ণদের নাম কাটাতে সরকারি-বেসরকারি খাতের বিভিন্ন পর্যায় থেকে চলছে তদবির। 
দুদক সূত্র জানায়, চলতি বছরের জানুয়ারিতে দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান শেষে ৪০টি মামলা দায়ের করা হয়। একই মাসে তদন্ত শেষে ৭৫টি মামলার চার্জশিট পেশ করা হয় আদালতে। সম্পদের হিসাব চেয়ে এ মাসে ১১ ব্যক্তির কাছে নোটিশ পাঠানো হয়। এদিকে গত আগস্টে অনুসন্ধান শেষে ২২টি মামলা দায়ের করা হয়। একই মাসে ৩৭টি মামলার চার্জশিট পেশ করা হয়। সম্পদের হিসাব চেয়ে এ মাসে নোটিশ পাঠানো হয় আট ব্যক্তির কাছে। 
বিভিন্ন সময়ে টিআইবির জরিপে বিচার, পুলিশ ও রাজস্ব বিভাগ দুর্নীতির শীর্ষে বলে চিহ্নিত করা হলেও দুদক এসব প্রতিষ্ঠানের দুর্র্নীতিবাজদের চিহ্নিত করা ও তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেয়নি। সরকারের অতি গুরুত্বপূর্ণ ওই তিনটি প্রতিষ্ঠানের কোনো কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর নামে বিচ্ছিন্নভাবে পাওয়া কিছু অভিযোগ অনুসন্ধান করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলেও ওইসব প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতিবিরোধী শক্তিশালী অভিযান পরিচালনা করা হয়নি।
সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, দুর্নীতিবাজদের বিচার না হওয়া, দুর্নীতি দমনের ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা। দুর্নীতি করলে বিচার হয়_ মানুষের মাঝে এ উদাহরণ সৃষ্টি করতে হবে। আদালত থেকে জামিন ও বিচারকার্যে স্থগিতাদেশ নিয়ে বছরের পর বছর দুর্নীতিবাজরা নিরাপদে আছেন। এতে সমাজে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।