নিজ দলেই বিতর্কিত মন্ত্রী রমেশ

পানিসম্পদমন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেনের বিরুদ্ধে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ তুলেছেন নিজ জেলা ঠাকুরগাঁওয়ের দলীয় নেতা-কর্মীরা। মন্ত্রী জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও ঠাকুরগাঁও-১ আসনের সাংসদ। তিনি সাড়ে চার বছরে নিজ দল আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের কাছেই বিতর্কিত হয়ে পড়েছেন।স্থানীয় নেতা-কর্মীরা অভিযোগ করেন, এলাকার উন্নয়নের কোনো প্রস্তাব নিয়ে কিংবা অন্য কোনো কাজে মন্ত্রীর কাছে গেলে তিনি গ্রাহ্য করেন না। উল্টো দুর্ব্যবহার ও তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেন। এ ছাড়া টিআর (টেস্ট রিলিফ) ও কাবিখার (কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচি) প্রকল্প বরাদ্দ ও উন্নয়নকাজের ঠিকাদারি পাওয়ার ক্ষেত্রেও কতিপয় নেতার প্রতি তাঁর পক্ষপাতিত্ব রয়েছে।এসব কারণে জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে মন্ত্রীর দূরত্ব তৈরি হয়েছে। অনেকে ক্ষুব্ধ হয়ে দলীয় কর্মকাণ্ড থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছেন বলে মন্ত্রীর নিজ সংসদীয় আসনের দলীয় বেশ কয়েকজন নেতা-কর্মী জানিয়েছেন।সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের কৃষি ও সমবায় সম্পাদক মো. ফরিদ সরকার প্রথম আলোকে বলেন, ‘রমেশ সেন ধান-চালের ব্যবসায়ী থেকে মন্ত্রী হয়েছেন। তিনি হয়তো ধরেই নিয়েছেন, এটাই তাঁর সর্বোচ্চ পাওয়া। সেই বিবেচনা থেকে হয়তো তিনি নেতা-কর্মীসহ সাধারণ মানুষের সঙ্গে খারাপ আচরণ করে যাচ্ছেন।’আওয়ামী লীগের এই নেতা জানান, গত নির্বাচনে ইসলামনগর (খানকা শরিফ) এলাকার দুটি কেন্দ্রে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পেয়েছিলেন ১১৪ ভোট। আর রমেশ সেন পান দুই হাজার ৪০৮ ভোট। ইসলামনগর উচ্চবিদ্যালয়ের এক শিক্ষক সম্প্রতি বিদ্যালয়ের চত্বরে একটি নতুন কক্ষ নির্মাণের প্রস্তাব নিয়ে গেলে রমেশ সেন চরম দুর্ব্যবহার করেন। তখন ওই শিক্ষক তাঁর এলাকায় গত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বেশি ভোট পাওয়ার কথা স্মরণ করিয়ে দিলে তাঁকে মন্ত্রী তাচ্ছিল্য করে বলেন, খানকা শরিফের তিনটা ভোট না পেলেও তাঁর চলবে।এ ঘটনা ওই শিক্ষকও প্রথমআলোকে নিশ্চিত করেছেন।জেলা কৃষক লীগের সম্পাদকমণ্ডলীর একজন সদস্য বলেন, সম্প্রতি সদর উপজেলার রহিমানপুরের বাসিন্দা আওয়ামী লীগের কর্মী সলেমান আলী পায়ের চিকিৎসার জন্য আর্থিক সহায়তা চাইতে যান রমেশ সেনের কাছে। তিনি সাহায্য না করে উল্টো তাচ্ছিল্য করে ওই কর্মীকে পা দুটি কেটে ফেলতে বলেন। ওই কর্মী কাঁদতে কাঁদতে ফিরে যান।নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক নেতা জানান, গত ঈদুল ফিতরের পর ঠাকুরগাঁও স্বাস্থ্যসেবা হাসপাতালের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা বকেয়া বেতন পরিশোধের দাবি জানাতে গেলে মন্ত্রী তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে কথা বলেন এবং তাঁদের গলায় দড়ি দিতে বলেন।ঢাকায় পানিসম্পদমন্ত্রীর সরকারি বাসায় দেখা করতে গিয়ে অপদস্থ হয়েছেন ঠাকুরগাঁওয়ের ছাত্রলীগের কর্মী শফিকুল ইসলাম। একইভাবে নাজেহাল হয়েছেন ছাত্রলীগের সাবেক নেতা ও স্থানীয় একটি কলেজের প্রভাষক এবং বড়গাঁও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের একটি ওয়ার্ড কমিটির সভাপতি। মন্ত্রী তাঁদের অপমানজনকভাবে বাড়ি থেকে বের দেন বলে অভিযোগ রয়েছে।সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. নুরুজ্জামান বলেন, ‘মন্ত্রীর আচরণ দেখে মনে হয়, তাঁর আর ভোট করার কোনো ইচ্ছা নেই। এসব আচরণ করে তিনি নিজেও ডুবছেন, দলটাকেও ডোবাচ্ছেন।’ অবশ্য পানিসম্পদমন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেন নেতা-কর্মীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করার কথা অস্বীকার করেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি শুধু ঠাকুরগাঁওয়ের মন্ত্রী নই। সারা দেশ দেখতে হয়। দলীয় নেতা-কর্মীদের উচ্চাভিলাষী প্রত্যাশা পূরণ করা সব সময় সম্ভব নয়। এ কারণে তাঁরা এসব অভিযোগ তুলছেন। তবে দল আমার সঙ্গে আছে।’

দলীয় সূত্রগুলো জানায়, দীর্ঘদিন ধরে মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি নিয়ে চলছে জেলা আওয়ামী লীগ। সর্বশেষ জেলা সম্মেলন হয়েছে ২০০৫ সালে। এমনকি গত সাড়ে চার বছরে জেলা আওয়ামী লীগের কোনো বর্ধিত সভা হয়নি। একই অবস্থা যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, যুব মহিলা লীগ ও মহিলা আওয়ামী লীগেরও। নেতৃত্ব নিয়ে কোন্দলের কারণে ছাত্রলীগ স্থবির হয়ে পড়েছে। কোন্দলের কারণে আড়াই বছর আগে জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ফয়সল আহমেদ পদত্যাগ করেন।

কৃষক লীগের জেলা কমিটির সভাপতি মো. সাইফুল্লাহ অভিযোগ করেন, রমেশ সেন মন্ত্রী হওয়ার পর কৃষক লীগের সাধারণ সম্পাদক ছাড়া আর কোনো নেতা-কর্মীর সঙ্গে বসেননি।

এরই মধ্যে ৮ সেপ্টেম্বর জেলা আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভা ডাকা হয়েছিল। তাতে সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরতে স্থানীয় নেতারা প্রস্তুতিও নিয়েছিলেন। কিন্তু আকস্মিক সিদ্ধান্ত পাল্টে যায়। ওইদিন বর্ধিত সভার পরিবর্তে জনসভার আয়োজন করেন মন্ত্রী। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে নেতা-কর্মীদের অনেকে ওই জনসভায় যাননি।

বর্ধিত সভার পরিবর্তে জনসভা করার কারণ জানতে চাইলে রমেশ চন্দ্র সেন প্রথম আলোকে বলেন, কেন্দ্রীয় নেতাদের পরামর্শে তিনি এটা করেছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী ৭ সেপ্টেম্বর প্রথম আলোকে বলেন, যেখানে ইউনিয়ন ও উপজেলা কমিটি হয়নি, সেখানে বর্ধিত সভা করা হয়েছে। বাকি জেলাগুলোতে জনসভা করা হয়। তিনি বলেন, বর্ধিত সভা ডেকে কর্মীদের ক্ষোভের কথা শোনা কেন্দ্রীয় নেতাদের কাজ নয়।