নিবন্ধন পাওয়ার পথে বিএনএফ!

* ৫৯টি উপজেলা বা মেট্রোপলিটন থানার মধ্যে মাত্র ১২টিতে কার্যালয়-কমিটির অস্তিত্ব প্রমাণ করতে হবে

জিয়ার আদর্শের অনুসারী দাবিদার বহুল আলোচিত নতুন রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্টের (বিএনএফ) নিবন্ধন পাওয়ার পথ প্রশস্ত করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। কমিশনের প্রথম ও দ্বিতীয় যাচাইয়ে বিএনএফ নিবন্ধনের শর্ত অনুযায়ী কমপক্ষে ২১টি জেলা ও ১০০টি উপজেলা বা মেট্রোপলিটন থানা কার্যালয় ও কমিটির সবগুলোর অস্তিত্ব প্রমাণে ব্যর্থ হয়। তৃতীয়বারের যাচাইয়ে নির্বাচন কমিশনারদের মধ্যে প্রথমে ভিন্নমত থাকলেও সম্প্রতি সবাই একমত হয়ে সাত দিনের মধ্যে এ তদন্ত সম্পন্ন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
তবে এবারের যাচাইয়ের জন্য নির্বাচন কর্মকর্তাদের পুরোপুরি দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। সংশ্লিষ্ট জেলাগুলোর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক বা এডিসিকে (সার্বিক) আহ্বায়ক এবং জেলা তথ্য কর্মকর্তা ও জেলা নির্বাচন কর্মকর্তাকে সদস্য করে যাচাই কমিটি গঠন করা হয়েছে। মোট ২২ জেলায় এ কমিটি গঠন করে বিএনএফের দেওয়া ঠিকানা অনুসারে ওই সব জেলার ৫৯টি উপজেলা/মেট্রোপলিটন থানা এলাকায় দলটির কার্যালয় ও কমিটির অস্তিত্ব রয়েছে কি না তা যাচাই করতে বলা হয়েছে। গতকাল বুধবারই এ-সংক্রান্ত চিঠি ২২টি জেলায় যাচাই কমিটির আহ্বায়ক ও সদস্যদের কাছে পাঠানো হয়েছে।
ইসি সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বিএনএফকে ওই ৫৯টি উপজেলা/মেট্রোপলিটন থানার মধ্যে মাত্র ১২টিতে তাদের কার্যালয় ও কমিটির অস্তিত্ব প্রমাণ করতে হবে। এরপর তাদের নিবন্ধন পেতে তেমন কোনো বাধা থাকবে না।
ইসি সচিবালয় সূত্র জানায়, প্রথম তদন্তে বিএনএফের জেলা ও উপজেলা কার্যালয় ও কমিটি সম্পর্কে সরেজমিনে খবর নিয়ে নির্বাচন কর্মকর্তারা তাঁদের যাচাই প্রতিবেদনে জানিয়েছিলেন, দলটির কার্যক্রম সম্পর্কে কমিশনে দেওয়া তথ্যের সঙ্গে বাস্তবতার মিল নেই। বিএনএফের পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশনকে জানানো হয়েছিল, দেশের ৩৬টি জেলা ও ১৩৪টি উপজেলায় তাদের অফিস ও কার্যক্রম রয়েছে। কিন্তু নির্বাচন কর্মকর্তারা তাঁদের যাচাই প্রতিবেদনে কমিশনকে জানিয়েছিলেন, ১৫টি জেলা ও ৩২টি উপজেলায় বিএনএফের অফিসের সন্ধান মিলেছে। এ ছাড়া পাঁচটি উপজেলায় অফিসের অস্তিত্ব রয়েছে, কিন্তু ওই অফিসগুলো কার্যকর অবস্থায় নেই। বিএনএফের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচন কমিশন গত ১৭ জুলাই মাঠ পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট নির্বাচন কর্মকর্তাদের আরো ১৫ দিনের সময় দিয়ে এ দলের কার্যালয় ও কমিটির অস্তিত্ব যাচাইয়ের নির্দেশ দেয়। দ্বিতীয়বারের ওই যাচাইয়ে দলটির ৮৮ উপজেলা/মেট্রোপলিটন থানায় কার্যালয় ও কমিটির অস্তিত্ব মেলে। বাকি থাকে আরো ১২টি।
এ অবস্থায় বিএনএফ নির্বাচন কর্মকর্তাদের ওই যাচাই প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে আবারও যাচাইয়ের আবেদন জানায়। বিএনএফ অভিযোগ করে, প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দল তাদের অনেক অফিস ভেঙে দিয়েছে। এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট নির্বাচন কর্মকর্তারা তাঁদের দলীয় মানসিকতার কারণে যাচাইয়ে পক্ষপাতিত্ব করেছেন।
তৃতীয়বার যাচাইয়ের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে গত রাতে নির্বাচন কমিশনার মো. শাহ নেওয়াজ কালের কণ্ঠকে বলেন, আইনত বিএনএফকে এ সুবিধা দেওয়ার সুযোগ ছিল না। কিন্তু ন্যায়বিচারের স্বার্থে কমিশন আবারও যাচাইয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এদিকে বিএনএফকে নিবন্ধন না দেওয়ার জন্য নির্বাচন কমিশনকে অনুরোধ জানিয়েছে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি। দলটির অভিযোগ, কিছু সংস্থার সহযোগিতায় বিএনপির পাশে বিএনএফ নামের একটি দলকে দাঁড় করানোর অপচেষ্টা চলছে। মানুষকে বিভ্রান্ত করতে দলটি তাদের পোস্টারে বিএনপির প্রতীক, জিয়ার ছবি এবং জিয়ার ১৯ দফা ব্যবহার করেছে। এক-এগারোর পরও বিএনপিকে ভাঙার চেষ্টা করা হয়েছিল। এরই ধারাবাহিকতায় এসব চলছে। গত ২৭ আগস্ট দাতা দেশগুলোর রাষ্ট্রদূতরাও বিএনএফ-সংক্রান্ত অভিযোগ সম্পর্কে নির্বাচন কমিশনের ব্যাখ্যা চান। সম্প্রতি বিভিন্ন জনসভায়ও প্রধান বিরোধীদলীয় নেতা ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বিষয়টি নিয়ে নির্বাচন কমিশনের কঠোর সমালোচনা করেন।
এদিকে তৃতীয়বারের মতো এই যাচাইয়ের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে বিএনএফের প্রধান সমন্বয়ক ও মুখপাত্র এস এম আবুল কালাম আজাদ গত রাতে এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘মোট ১০৪টি উপজেলা/মেট্রোপলিটন থানায় আমাদের দলের অফিস ও কমিটি আছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও বিশেষ একটি রাজনৈতিক দলের সমর্থক হিসেবে পরিচিত নির্বাচন কর্মকর্তারা আমাদের সম্পর্কে নেতিবাচক রিপোর্ট দিয়েছেন। আমরা সে রিপোর্ট প্রত্যাখ্যান করেছি। আশা করছি এবার নিরপেক্ষ যাচাইয়ে আমাদের দাবি সত্য বলে প্রমাণিত হবে এবং আমাদের দল নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধন পাবে।’
এদিকে নিবন্ধন পেতে চলেছে বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট। দল নিবন্ধনের বিধান অনুসারে এ দলটিকে নিবন্ধন দেওয়ার বিষয়ে কারো আপত্তি রয়েছে কি না, তা ২৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে জানতে চেয়ে এরই মধ্যে সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে ইসি। যুক্তিযুক্ত আপত্তি না পেলে দলটিকে নিবন্ধন দেওয়া হবে।
নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধনের জন্য এবার মোট ৪৩টি রাজনৈতিক দল আবেদন করেছিল। এর মধ্যে প্রাথমিক বাছাইয়ে বাদ পড়ে ৪১টি দল। পরে সেগুলোর মধ্যে সাতটি দলকে নিবন্ধনের শর্ত পূরণের সুযোগ দেওয়া হয়। দলগুলো হচ্ছে বাংলাদেশ নিউ সংসদ লীগ (বিএনএসএল), বাংলাদেশ গণসেবা আন্দোলন (বিজিএ), বাংলাদেশ আঞ্জুমানে আল ইসলাহ, বাংলাদেশ পিপল্স লীগ, বাংলাদেশ গণঅধিকার দল, বাংলাদেশ লেবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (বিএলডিসি) ও বাংলাদেশ গণশক্তি দল। এ দলগুলো সম্পর্কে তথ্য যাচাই চলমান।