নির্বাচনী আচরণবিধি কঠোর গোপনীয়তায়

নির্বাচন কমিশন (ইসি) আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের জন্য নির্বাচনী আচরণবিধি প্রণয়নের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে কঠোর গোপনীয়তার সঙ্গে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্য চারজন নির্বাচন কমিশনার ছাড়া কমিশন সচিবালয়ের কর্মকর্তারা এ বিষয়ে অন্ধকারে রয়েছেন। নতুন এই আচরণবিধির মাধ্যমে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে সবার জন্য সমান সুযোগ কিভাবে নিশ্চিত করা হবে, তা নিয়ে তাঁদের যেমন কৌতূহলের শেষ নেই; তেমনই সন্দেহেরও কমতি নেই। শুধু তাই নয়, এত বড় একটি সিদ্ধান্তের ব্যাপারে নির্বাচন কমিশন প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো বা সুধীসমাজের কোনো প্রতিনিধির সঙ্গেও আলোচনার প্রয়োজন বোধ করছে না।
নির্বাচন কমিশনারদের বক্তব্য, ঈদুল আজহার পর নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার আগেই নতুন আচরণবিধি প্রণয়নের বিষয়টি চূড়ান্ত করে প্রকাশ করা হবে।
নতুন নির্বাচন বিধিমালা প্রণয়ন বা এ জাতীয় বড় কোনো সিদ্ধান্তের কাজে নির্বাচন কমিশন সাধারণত তাদের সচিবালয়সহ বড় বড় রাজনৈতিক দল, বিশেষজ্ঞ ও সুধীসমাজের প্রতিনিধিদের মতামত নিয়ে থাকে। আরপিও সংশোধনের সময়ও সেই প্রস্তাব ইসি থেকে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু এবার নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা নিয়ে সৃষ্ট জটিল পরিস্থিতির মধ্যে ইসি নতুন নির্বাচনী আচরণবিধি প্রণয়ন করতে যাচ্ছে, অথচ কারো সঙ্গে আলোচনা বা মতামত সংগ্রহ করছে না বলে জানা গেছে।
নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে জানান, গত জুলাইয়ে সংবিধান অনুসারে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন উপযোগী আচরণবিধির একটি প্রস্তাব কমিশনের কাছে উপস্থাপন করা হয়। ওই প্রস্তাবের বিষয়টি কয়েকটি সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয় এবং তা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে কমিশন। ওই প্রস্তাবে প্রকারান্তরে এই বিধান রাখা হয় যে বর্তমান সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে অন্য মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরাও নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিতে পারবেন, তবে সব মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী নন। দলীয় প্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রীকে এ বিষয়ে অনধিক ২০ জনকে মনোনয়ন দিতে হবে। সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণবিধিমালায় এ ধরনের একটি প্রস্তাব নির্বাচন কমিশনের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
অথচ বিদ্যমান আচরণবিধিমালায় বলা আছে, জাতীয় সংসদের উপনির্বাচনের ক্ষেত্রে সরকারের কোনো মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী বা তাঁদের সমমর্যাদাসম্পন্ন সরকারি সুবিধাভোগী কোনো ব্যক্তি নির্বাচনী প্রচারণায় বা নির্বাচনী কার্যক্রমে অংশ নিতে পারবেন না।
জুলাইয়ে দেওয়া প্রস্তাব নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার পর নির্বাচন কমিশন ভারতসহ কয়েকটি দেশের নির্বাচনী আচরণবিধি খতিয়ে দেখার উদ্যোগ নেয়। কমিশন সচিবালয় নির্বাচন কমিশনকে ওই সব দেশের নির্বাচনী আচরণবিধি ইন্টারনেট থেকে ডাউনলোড করে দেওয়া ছাড়া এ বিষয়ে হালনাগাদ কোনো অগ্রগতির তথ্য তারা জানে না। তবে তাদের ধারণা, নির্বাচন কমিশনাররা নিজেরাই এ আচরণবিধি প্রণয়নের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন এবং এ আচরণবিধি সব পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য করা সম্ভব হবে না জেনেই কঠোর গোপনীয়তা রক্ষা করে চলেছেন।
এ গোপনীয়তা বিষয়ে কমিশন সচিবালয়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তার মন্তব্য, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন যদি ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বা ১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালের মতো নির্বাচন হয়, তাহলে তথ্য প্রদানের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের গোপনীয়তা আরো বাড়ানো ছাড়া উপায় থাকবে না।
উল্লেখ্য, ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি প্রায় সব দল বয়কট করা সত্ত্বেও বিএনপি সরকার এককভাবে জাতীয় নির্বাচন করে। আর ১৯৮৬ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ছাড়াই এরশাদের জাতীয় পার্টির সঙ্গে আওয়ামী লীগ ও জামায়াত নির্বাচন করে। ১৯৮৮ সালে আবার আওয়ামী লীগ ছাড়াই জাতীয় পার্টি কয়েকটি দল নিয়ে নির্বাচন সেরে ফেলে।
নতুন আচরণবিধি কবে নাগাদ প্রস্তুত হচ্ছে- এ প্রশ্নের জবাবে গতকাল সোমবার নির্বাচন কমিশনার মো. শাহ নেওয়াজ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা এ বিষয়ে আমাদের হোমওয়ার্ক প্রায় শেষ করে ফেলেছি। রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থায় কিছু পরিবর্তন এলে সে অনুয়ায়ী আরো কিছু কাজ করতে হবে। তবে আমাদের হাতে বেশি সময় নেই। নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার আগেই এটা আমাদের প্রকাশ করতে হবে।’
নির্বাচন কমিশনার আবু হাফিজ গত রাতে কালের কণ্ঠকে বলেন, নতুন নির্বাচনী আচরণবিধি প্রণয়নের ব্যাপারে ইসি কোনো রাজনৈতিক দল বা সুধীসমাজের প্রতিনিধির সঙ্গে আলোচনা করবে না। ‘তাহলে কি গোপনীয়তার সঙ্গে কাজটা করা হচ্ছে’- প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, যখন বিধি প্রকাশ করা হবে তখন আর সেটা গোপন থাকবে না।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ গত রবিবার এ বিষয়ে সাংবাদিকদের বলেন, সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন করতে হলে আচরণবিধিতে বেশ পরিবর্তন আনতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারি দল ও বিরোধী দলের প্রার্থীদের মধ্যে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করতে যা যা করা দরকার তা-ই করা হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারি দলের এমপিদের পলিটিকস ও ডিউটি আলাদাভাবে করতে হবে। এ জন্য ভারত, অস্ট্রেলিয়া ও ব্রিটেন থেকে রেফারেন্স নেওয়া হবে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এম কে আনোয়ার গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের সঙ্গে নির্বাচনী আচরণবিধি নিয়ে ইসির কোনো আলোচনা হয়নি। এই কমিশন কারো সঙ্গেই আলোচনার যোগ্যতা রাখে না। কারণ এই ইসি বর্তমান সরকারের আজ্ঞাবহ। সরকার যা বলে তা-ই করে কমিশন।’ তিনি বলেন, আগের ইসি বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সুধীসমাজ, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন পেশাজীবীর সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আলোচনা করত। কিন্তু এই ইসি কারো সঙ্গে আলোচনা করতে চায় না। রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা না করে ইসি গোপনীয়ভাবে নির্বাচনী আচরণবিধি প্রণয়ন করে থাকলে তার জবাব দেওয়া হবে। নির্বাচন কমিশনের এসব কর্মকাণ্ডের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা জানি, বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীনে কখনো সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়।’
এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্তর কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, নির্বাচনী আচরণবিধি প্রণয়নের এখতিয়ার ইসির আছে। ২৪ অক্টোবরের পর তারা এ ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করবে।
সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন এ বিষয়ে বলেন, “সংবিধান সংশোধনের ফলে এবার নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থায় যে পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে, তাতে বিদ্যমান নির্বাচনী আচরণবিধি ব্যাপকভাবে পাল্টাতে হবে। এই পরিবর্তনের জন্য ইসির উচিত ছিল রাজনৈতিক দল ও সুধীসমাজের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা, মতবিনিময় করা। তা না করে ইসি কী ধরনের আচরণবিধি তৈরি করেছে বা করতে যাচ্ছে, তা নিয়ে জনমনে ব্যাপক সংশয়ের সৃষ্টি হচ্ছে। সরকারের মন্ত্রীদের সঙ্গে এপিএস-পিএস হিসেবে রাজনৈতিক নিয়োগপ্রাপ্তদের, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যে উপদেষ্টারা রয়েছেন নির্বাচনের সময় তাঁদের অবস্থান কী হবে, সে বিষয়টিও আচরণবিধিতে স্পষ্ট হওয়া দরকার। আমার মনে হচ্ছে, এরা (ইসি) প্রতিবেশী কোনো দেশের নির্বাচনী আচরণবিধি কাট অ্যান্ড পেস্ট করছে। কিন্তু আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতের মডেল কোড অব কন্ডাক্ট কোনো আইন নয়। এটি একটি ‘জেন্টলম্যান অ্যাগ্রিমেন্ট’ মাত্র। এটি সে দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির সঙ্গে যায়। কিন্তু বাংলাদেশে এটিকে কঠোর আইনে পরিণত করতে হবে। এ দেশের যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি রয়েছে তাকে সামনে রেখে এটি করতে হবে এবং তা করে দ্রুত প্রকাশ ও প্রচারের ব্যবস্থা নিতে হবে। ভোটার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, নির্বাচন কর্মকর্তা- সবাইকে এ আচরণবিধি সম্পর্কে জানানোর-বোঝানোর ব্যবস্থা করতে হবে খুব দ্রুতই। এখানে যেকোনো ধরনের গোপনীয়তা পরিস্থিতি আরো জটিল করবে।”
জানা গেছে, নির্বাচন কমিশনারদের কাছে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচিত ভারতের ‘মডেল কোড অব কন্ডাক্ট ফর দ্য গাইডেন্স অব পলিটিক্যাল পার্টিস অ্যান্ড ক্যান্ডিডেটস’ অনুসারে নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর মন্ত্রীদের জন্য সরকারি সুবিধা নিয়ে নির্বাচনী প্রচারণার কোনো সুযোগ নেই। মন্ত্রীরা তাঁদের দাপ্তরিক পরিদর্শনের সঙ্গে নির্বাচনী কার্যক্রমকে এক করতে পারবেন না। সরকারি কোনো যানবাহনও নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যবহার করতে পারবেন না। এমনকি তফসিল ঘোষণার পর কোনো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীকে নিয়োগ-বদলিও করতে পারবেন না তাঁরা। আগে বদলির অর্ডার থাকলে তফসিল ঘোষণার পর তা বাস্তবায়ন করা যাবে না। কোনো সরকারি কর্মকর্তাকে তলব করার এখতিয়ারও থাকবে না। রাষ্ট্রীয় কোনো দিবসের অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে নির্বাচন প্রসঙ্গে কোনো কথা বলাও যাবে না।