নির্বাচনের সময় নিয়ে সরকারের নতুন চিন্তা

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের সময় নিয়ে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে নতুন চিন্তাভাবনা হচ্ছে। বর্তমান সংবিধানের আওতায় জাতীয় সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরবর্তী তিন মাসের মধ্যে জাতীয় নির্বাচন করার সম্ভাবনা নিয়ে সরকারের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা চলছে। এ ক্ষেত্রে সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন হবে কি না, তা-ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।নির্বাচন অনুষ্ঠানের সময় সম্পর্কে সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদের ৩(ক) তে বলা হয়েছে, ‘সংসদ সদস্যদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে মেয়াদ অবসানের কারণে সংসদ ভাঙিয়া যাইবার ক্ষেত্রে ভাঙিয়া যাইবার পূর্ববর্তী নব্বই দিনের মধ্যে।’ একই অনুচ্ছেদের ৩(খ) তে বলা হয়েছে, ‘মেয়াদ অবসান ব্যতীত অন্য কোনো কারণে সংসদ ভাঙিয়া যাইবার ক্ষেত্রে ভাঙিয়া যাইবার পরবর্তী নব্বই দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে।’সংবিধান অনুযায়ী জাতীয় সংসদের মেয়াদ পাঁচ বছর। বর্তমান সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম কার্যদিবস ছিল ২৫ জানুয়ারি। সে হিসাবে ২০১৪ সালের ২৪ জানুয়ারি পর্যন্ত বর্তমান সংসদের মেয়াদ। কোনো কারণে সংসদ ভেঙে দেওয়া না হলে ২৪ জানুয়ারির মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা আছে। সরকারের উচ্চপর্যায়ের একাধিক সূত্রে জানা গেছে, গত শুক্রবার রাতে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী শফিক আহমেদের ইন্দিরা রোডের বাসভবনে সরকার ও আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নীতিনির্ধারকদের কয়েকজন এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেছেন। রাত আটটা থেকে সাড়ে ১১টা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে অংশ নেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ, প্রধানমন্ত্রীর সংস্থাপনবিষয়ক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম, অর্থনীতিবিষয়ক উপদেষ্টা মসিউর রহমান, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আব্দুল মান্নান খান, এ বি এম রিয়াজুল কবীর কাওছার ও আইন মন্ত্রণালয়ের সচিব (চলতি দায়িত্বে) আবু সালেহ শেখ মো. জহিরুল হক।

বৈঠকে সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরবর্তী তিন মাসের মধ্যে নির্বাচন করা সম্ভব কি না, তা নিয়ে আলোচনা হয়। মেয়াদ শেষের পরবর্তী তিন মাসের মধ্যে নির্বাচন করলে সংবিধান সংশোধন করতে হবে কি না, তা নিয়েও আলোচনা হয়। সংবিধান অনুসারে সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগের তিন মাসের মধ্যে নির্বাচন হলে দল বা সরকারের জন্য কতটুকু ভালো হবে, তা নিয়েও বৈঠকে পর্যালোচনা করা হয় বলে জানা গেছে। এ ছাড়া বর্তমান সংবিধানে সংসদ বহাল রেখেই নির্বাচনের বিধান আছে। বৈঠকে সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্বাচন করা যায় কি না, সে ব্যাপারেও দীর্ঘ আলোচনা হয় বলে জানা গেছে।

তবে নির্বাচন নিয়ে বৈঠক করার কথা অস্বীকার করে আইনমন্ত্রী প্রথম আলোকে বলেন, ‘ওনারা আমার সঙ্গে বাসায় সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে এসেছিলেন।’

সরকারের নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্র জানায়, আইনমন্ত্রীর বাসভবনে শুক্রবার রাতের বৈঠকে নির্বাচনের সময় নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়। বৈঠকে কেউ মত দেন, সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরবর্তী তিন মাসের মধ্যে নির্বাচন দিতে হলে সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন হবে। আবার কেউ বলেন, সংবিধান সংশোধন করতে হবে না। তবে একটি বিষয়ে তাঁরা একমত পোষণ করেন যে, যা কিছুই করা হোক না কেন, সংবিধান সংশোধন করা যাবে না। কারণ, এতে করে নানা প্রশ্ন উত্থাপিত হবে।

বৈঠকসংশ্লিষ্ট সূত্র আরও জানায়, সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগের তিন মাস, অর্থাৎ আগামী ২৪ জানুয়ারির মধ্যেই নির্বাচন অনুষ্ঠানের পক্ষে বৈঠকে মত প্রকাশ করা হয়। সংবিধান সংশোধন করে মেয়াদ শেষের পরবর্তী তিন মাসের মধ্যে নির্বাচন করার পক্ষে মত দেননি উপস্থিত নেতারা। এ প্রসঙ্গে বৈঠকে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী সংবিধান সংশোধনের বিপক্ষে অনড় অবস্থান নিয়েছেন। নির্বাচন অনুষ্ঠানের সময় নির্ধারণ নিয়ে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হলে বিরোধী দল নানা প্রশ্ন তুলে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করতে পারে। নির্বাচন অনুষ্ঠানের সময় নিয়ে আলোচনার জন্য প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এ বিষয়ে আরও বৈঠক করা হবে বলে জানা গেছে।

আইনমন্ত্রীর বাসায় বৈঠকে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) এবং নির্বাচনী বিধিমালার সংশোধনী নিয়েও আলোচনা হয়। নির্বাচনের সময়সীমা নির্ধারণ নিয়ে প্রয়োজনে আরপিও এবং বিধিমালায় সংশোধনী আনার বিষয়েও আলোচনা হয় বলে জানা গেছে।

সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরবর্তী তিন মাসের মধ্যে নির্বাচন করতে হলে সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন আছে কি না, জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী প্রথম আলোকে বলেন, সংবিধান সংশোধন লাগবে না।

সরকারের মেয়াদ শেষের পরবর্তী তিন মাসের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের সম্ভাবনা আছে কি না, এ প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘আমি কিছু জানি না। এটা নীতিনির্ধারকেরা ঠিক করবেন।’

সরকারের নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন অনুষ্ঠানের সময় নিয়ে সাংবিধানিক ও আইনগত দিক খতিয়ে দেখার জন্য আইনমন্ত্রীকে নির্দেশ দেন। এ বিষয়ে আইনমন্ত্রীর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এইচ টি ইমাম, মসিউর রহমানসহ কয়েকজন বিশেষজ্ঞ। তাঁরা এ ব্যাপারে একটি প্রস্তাব তৈরি করেন। প্রধানমন্ত্রীর কাছে এরই মধ্যে প্রস্তাবটি উপস্থাপন করা হয়েছে। পরে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতাদের নিয়ে আইনমন্ত্রীর বাসভবনে শুক্রবার রাতে বৈঠক হয়।

সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কিছু প্রকল্প বাস্তবায়ন শেষ পর্যায়ে থাকায় সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরবর্তী তিন মাসে নির্বাচন দেওয়ার ব্যাপারে কথাবার্তা হয়। তা ছাড়া দলীয় সাংসদেরাও এলাকায় তাঁদের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়নের জন্য পরবর্তী তিন মাসের মধ্যে নির্বাচন দেওয়ার কথা বলেছেন।

সংবিধান সংশোধন ছাড়া ২৪ জানুয়ারির পর নির্বাচন সম্ভব কি না, জানতে চাইলে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী রফিক-উল হক প্রথম আলোকে বলেন, সংবিধান অনুসারে সংসদ ভেঙে দিলে পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করতে হবে। সরকার যদি চালাক হয়, আর সংসদের মেয়াদের শেষ পর্যায়ে, যেমন ২০ জানুয়ারি সংসদ ভেঙে দেয়, তবে পরবর্তী তিন মাসের মধ্যে নির্বাচন করতে পারবে। এ জন্য সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন হবে না।