নির্বাচনে আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংশয়

আরপিওতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সংজ্ঞায় নেই সেনাবাহিনী।

 নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য বিদ্যমান আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী পর্যাপ্ত নয়।

 সকল জাতীয় নির্বাচনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সেনাবাহিনী ছিল।

 সর্বশেষ দুই নির্বাচনে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সংজ্ঞায় ছিল সেনাবাহিনী

বর্তমান ব্যবস্থায় আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে কি না—তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যদি একদিনে নির্বাচন হয়, সে ক্ষেত্রে পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও আনসারের বর্তমান জনবল দিয়ে সুষ্ঠুভাবে দায়িত্ব পালন করা কঠিন হবে। গত পাঁচ বছরে পুলিশের সদস্য ৩০ হাজার বাড়লেও বিজিবির সদস্য প্রায় ৯ হাজার কমেছে। কিন্তু আগামী নির্বাচনে ভোট কেন্দ্র বাড়ছে প্রায় ৯ হাজার। অন্যদিকে সংশোধিত গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে (আরপিও) আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সংজ্ঞা থেকে সেনাবাহিনীকে বাদ দেয়া হয়েছে। যদিও সর্বশেষ দু’টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য হিসেবে সেনাবাহিনী দায়িত্ব পালন করেছে। বর্তমান সরকারের সময়ে বেশ কয়েকটি সিটি কর্পোরেশনসহ ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। কোন নির্বাচনেই সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়নি। ফলে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও সেনাবাহিনী রাখা না রাখা নিয়ে নানা আলোচনা চলছে।

সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. সাখাওয়াত হোসেন ইত্তেফাককে বলেন, ৩০০ সংসদীয় আসনে একসঙ্গে নির্বাচন পরিচালনা করতে গেলে বিদ্যমান আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর যে সদস্য আছে তা অপ্রতুল। রিজার্ভ ফোর্স হিসেবে সেনাবাহিনী লাগবে। জাতীয় নির্বাচনে মূলত ভোটারদের আস্থা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনীর বিকল্প নেই।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার রাকিব উদ্দিন আহমেদ নির্বাচনে সেনাবাহিনী রাখা না রাখা নিয়ে সম্প্রতি এক লিখিত বক্তব্যে বলেছেন, ‘এ পর্যন্ত সম্পন্ন নির্বাচনগুলোর প্রতিটির তফসিল ঘোষণার সময় কমিশনকে সার্বিকভাবে যে প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছে তা হলো—সেনা মোতায়েন করা হবে কি না। প্রকৃতপক্ষে সেনা মোতায়েন সংক্রান্ত কোন বিধান আরপিওতে ২০০১ সালের আগে ছিল না। তারপরও ১৯৭৩ সাল থেকে এ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত প্রত্যেক সাধারণ নির্বাচনেই আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে বেসামরিক শক্তির সহায়তার জন্য প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যদের জেলা/থানা/উপজেলা পর্যায়ে পাঠানো হয়েছে। একই দিনে ৩০০ আসনে নির্বাচনের জন্য বাস্তবতা বিবেচনায় প্রয়োজনের তাগিদেই এই ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। ২০০১ সালের ১ নম্বর অধ্যাদেশ মূলে ল’ এনফোর্সিং এজেন্সির সংজ্ঞায় ডিফেন্স সার্ভিস অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কিন্তু ২০০৯ সালের ১৩ নম্বর আইনে তা বাদ দেয়া হয়। তারপর অনুষ্ঠিত নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে প্রতিরক্ষা বাহিনী ব্যবহার করা হয়নি। এভাবে তদানীন্তন কমিশন প্রতিরক্ষা বাহিনী ব্যতিরেকে উল্লেখিত ২টি বড় সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন করে উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন। অধিকন্তু উক্ত কমিশন বিদায় লগ্নে আরপিও সংশোধনের যেসব প্রস্তাব আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর নির্দেশ দিয়ে গেছেন তাতেও ল’ এনফোর্সিং এজেন্সির সংজ্ঞায় ডিফেন্স সার্ভিস অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। তারা দু’দফায় সকল স্টেক হোল্ডারদের সাথে আলোচনা করেই তাদের সুপারিশ করেন। এ ক্ষেত্রে বর্তমান কমিশন পূর্ববর্তী কমিশনের ধারাবাহিকতাই অনুসরণ করেছে।’

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল, বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান ইত্তেফাককে বলেন, একদিনে ৩০০ আসনে ভোট হলে বিদ্যমান আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষে নির্বাচন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হবে। কারণ দিন দিন জনসংখ্যা, ভোটার, ভোটকেন্দ্র ও ভোটকক্ষ বাড়ছে। এজন্য আগামীতে একাধিক দিনে জাতীয় নির্বাচন আয়োজন করা যায় কি-না তা বিবেচনা আনতে হবে। তিনি বলেন, বিদ্যমান আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলো দলীয় দৃষ্টিকোণের বাইরে দায়িত্ব পালন করতে পারবে কি-না তা যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে তারা দলীয়ভাবে প্রভাবিত হবে। এ জন্য নির্বাচনকালীন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের বদলি/পদায়ন ও দায়িত্ব বন্টন নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তে হলে ভালো হয়। তবে নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়নের বিষয়টি নির্বাচন কমিশনের উপর ছেড়ে দেয়া উচিত। সব আসনে সেনা মোতায়েন না করে যেসব আসন ঝুঁকিপূর্ণ সেগুলোতে মোতায়েন করা যেতে পারে বলে মত দেন তিনি।

তবে পুলিশের মহাপরিদর্শক হাসান মাহমুদ খন্দকার এসব বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন। তিনি ইত্তেফাককে বলেন, বর্তমান সরকারের সময়ে সারাদেশে ৬ হাজারের মত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে ৫০ থেকে ৬০ হাজার জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছেন। এসব নির্বাচনে আপত্তি বা সমালোচনা করার মতো কিছু হয়নি। পুলিশের উপর অর্পিত দায়িত্ব সব সময় যথাযথভাবে পালন করা হয়ে আসছে। অন্যান্য সংস্থা ও সদস্যের সহযোগিতা পেলে আগামী নির্বাচনেও পুলিশ সদস্যরা যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারবে বলেই বিশ্বাস করেন তিনি।

অবশ্য স্থানীয় পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করা পুলিশ সদস্যরা বললেন অন্য রকম কথা। তাদের মতে, রাজনীতিবিদরা সহযোগিতা করলে সবই সম্ভব। রাজশাহীর একটি থানার ওসি ইত্তেফাককে বলেন, সব রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নিলে এবং সবাই সহযোগিতা করলে পুলিশের পক্ষে অর্পিত দায়িত্ব পালন করা সম্ভব। চাঁপাইনবাবগঞ্জের একটি থানার ওসিও ইত্তেফাকের কাছে একই রকম মন্তব্য করেন।

সর্বশেষ ২০০৮ সালের নির্বাচনে মেট্রোপলিটন এলাকার বাইরে প্রতিটি ভোট কেন্দ্রে একজন অস্ত্রধারী পুলিশ সদস্যের নেতৃত্বে অস্ত্রসহ একজন অঙ্গীভূত আনসার (পিসি), অস্ত্র বা লাঠিসহ আরেকজন অঙ্গীভূত আনসার, এর বাইরে লাঠিসহ ১০ জন অঙ্গীভূত আনসার (নারী ও পুরুষ) ও একজন গ্রাম পুলিশ দায়িত্ব পালন করবেন। আর মেট্রোপলিটন এলাকায় অস্ত্রধারী তিন জন পুলিশের নেতৃত্বে একই সংখ্যক পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করেছে। এর বাইরে স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছে সেনাবাহিনী, র্যাব, তত্কালীন বিডিআর, পুলিশ ও আনসার সদস্যরা। ম্যাজিস্ট্রেটদের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালতেও পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও আনসার সদস্য ছিল।

২০০৮ সালে ভোটার ছিল ৮ কোটি ১০ লাখ ৮৭ হাজার। আর ভোট কেন্দ্র ছিল ৩৫ হাজার ২৬৩টি। এবার ভোটার বেড়েছে ১ কোটি ১১ লাখ ১১ হাজার ২৬ জন। আর ভোট কেন্দ্র বাড়ছে ৮ হাজার ৭৫৮টি। ফলে বিদ্যমান আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য দায়িত্ব পালন আরো কঠিন হয়ে পড়বে।

গত প্রায় ৫ বছরে বিজিবি সদস্য কমেছে প্রায় ৯ হাজার। বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনায় জড়িতদের বিচার করার কারণে এই সংখ্যা অনেক কমেছে। আগে বিজিবি সদস্য ছিল ৫৩ হাজারের মতো। এখন আছে ৪৪ হাজারের মতো। র্যাব ও আনসারের সংখ্যা বাড়েনি।

জানা গেছে, ২০০১ সালের ৮ আগস্ট ১ নম্বর অধ্যাদেশের মাধ্যমে প্রতিরক্ষা বিভাগকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত করে। পরে সরকার ২০০৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধন করে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সংজ্ঞা থেকে সশস্ত্র বাহিনীর নাম বাদ দেয়। বর্তমানে নির্বাচনকালীন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তালিকায় আছে পুলিশ, আর্মড পুলিশ ব্যাটলিয়ন, র্যাব, আনসার, বিজিবি ও কোস্টগার্ড।