নির্বাচন :থেমে নেই জামায়াত

রাজীব আহাম্মদ
নির্বাচনে অযোগ্য হলেও প্রস্তুতি থেমে নেই জামায়াতে ইসলামীর। দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন না করার ঘোষণা দিলেও আগেই নির্বাচনী প্রস্তুতি শুরু করেছে দলটি। গত নির্বাচনে ৩৯টি আসনে নির্বাচন করলেও আগামী নির্বাচনে অন্তত ৫৫ থেকে ৬০টি আসনে ১৮ দলীয় জোটের মনোনয়ন চাইবে দলটি। তবে জামায়াত সূত্র নিশ্চিত করেছে, ৪৩ আসনে প্রার্থী চূড়ান্ত। জামায়াতের কর্মপরিষদ সদস্য ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের সমকালকে নিশ্চিত করেন, অন্তত ৬০ আসনে জোটের মনোনয়নে চাইবেন তারা। দলের প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় সারির নেতাদের বেশিরভাগই কারাগারে। বাকিরা পলাতক। দলীয় নিবন্ধন আদালতের রায়ে অবৈধ ঘোষিত হয়েছে। জামায়াতকে রাজনীতিতে নিষিদ্ধ করতে সর্বোচ্চ
আদালতে আবেদন করেছে রাষ্ট্রপক্ষ। এর পরও বিএনপি তাদের এতগুলো আসনে ছাড় দেবে কি না_ এ প্রশ্নের জবাবে ডা. তাহের বলেন, ‘আন্দোলনে জামায়াত সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছে। জান ও মাল দিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। নির্দলীয় সরকারের দাবিতে আগামী দিনের আন্দোলনেও জামায়াত সর্বোচ্চ ভূমিকা পালন করবে। ত্যাগের বিবেচনায় ৬০ আসন কিছুই নয়।’
সর্বশেষ ২০০৮ সালের নির্বাচনে ৩৯টি আসনে নির্বাচন করে জামায়াত। এর মধ্যে ৩৪টিতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটের মনোনয়ন পান জামায়াত প্রার্থীরা। চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩, রাজশাহী-৩, সিরাজগঞ্জ-৪ ও মেহেরপুর-১ আসনে বিএনপি-জামায়াত দু’দলই প্রার্থী দেয়। বরগুনা-২ আসনে প্রার্থী দিয়েও নির্বাচনের চার দিন আগে বিএনপির সঙ্গে সমঝোতায় সরে দাঁড়ায়। ২০০১ সালের নির্বাচনে ৩০টি আসনে জোটের মনোনয়ন পায় জামায়াত। আর চট্টগ্রাম-১৪ আসনে বিএনপি-জামায়াত দু’দলেরই প্রার্থী ছিল। এবারও দাবি করা আসনে জোটের মনোনয়ন না পেলে ছাড় দেবে না জামায়াত।
গত ১৫ সেপ্টেম্বর জামায়াত প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক শেষে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ জানান, জামায়াত এখনও নির্বাচনে অযোগ্য। সুপ্রিম কোর্ট হাইকোর্টের রায় স্থগিত করলে কিংবা জামায়াতের নিবন্ধন ফিরিয়ে দিতে বললে তবেই দলটি নির্বাচনে নিজ প্রতীকে অংশ নিতে পারবে। সম্প্রতি বরগুনা-২ আসনের উপনির্বাচনে তফসিল ঘোষণাকালে নির্বাচন কমিশন ঘোষণা করেছিল, দলীয়ভাবে এ নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না জামায়াত।
তবে এর সঙ্গে একমত নন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও দলীয় আইনজীবী ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক। তিনি সমকালকে বলেন, ‘জামায়াতের নিবন্ধনের বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন। হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে জামায়াত সংবিধানের ১০৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আপিলের অধিকার পেয়েছে। সুপ্রিম কোর্টে আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত জামায়াতের নির্বাচনে অংশ নিতে কোনো বাধা নেই।’
জামায়াত সূত্রগুলো নিশ্চিত করে, ৪৩টি আসনে তাদের প্রার্থী চূড়ান্ত। তারা হলেন_ এম এ হাকিম ঠাকুরগাঁও-২, মোহাম্মদ হানিফ দিনাজপুর-১, আনোয়ারুল ইসলাম দিনাজপুর-৬, মনিরুজ্জামান মন্টু নীলফামারী-২, আজিজুল ইসলাম নীলফামারী-৩, হাবিবুর রহমান লালমনিরহাট-১, শাহ হাফিজুর রহমান রংপুর-৫, নূর আলম মুকুল কুড়িগ্রাম-৪, আবদুল আজিজ গাইবান্ধা-১, নজরুল ইসলাম গাইবান্ধা-৩, আবদুর রহিম সরকার গাইবান্ধা-৪, নুরুল ইসলাম বুলবুল চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২, মো. লতিফুর রহমান চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩, আতাউর রহমান রাজশাহী-৩, রফিকুল ইসলাম খান সিরাজগঞ্জ-৪, আলী আলম সিরাজগঞ্জ-৫, মতিউর রহমান নিজামী পাবনা-১, মাওলানা আবদুস সোবহান পাবনা-৫, ছমিরউদ্দিন মেহেরপুর-১, মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান চুয়াডাঙ্গা-২, মতিয়ার রহমান ঝিনাইদহ-৩, আজিজুর রহমান যশোর-১, আবু সাইদ মুহাম্মদ সাদাত হোসাইন যশোর-২, অ্যাডভোকেট আবদুল ওয়াদুদ বাগেরহাট-৩, শহীদুল ইসলাম বাগেরহাট-৪, মিয়া গোলাম পরওয়ার খুলনা-৫, শাহ মুহাম্মদ রুহুল কুদ্দুছ খুলনা-৬, ইজ্জতউল্লাহ সাতক্ষীরা-১, আবদুল খালেক মণ্ডল সাতক্ষীরা-২, মুফতি রবিউল বাশার সাতক্ষীরা-৩, গাজী নজরুল ইসলাম সাতক্ষীরা-৪, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী অথবা তার দুই ছেলে পিরোজপুর-১ ও ২, শফিকুল ইসলাম মাসুদ পটুয়াখালী-২, মুহাম্মদ কামারুজ্জামান অথবা তার ছেলে শেরপুর-১, অধ্যাপক জসিমউদ্দিন ময়মনসিংহ-৬, ফরীদউদ্দিন সিলেট-৫, মাওলানা হাবিবুর রহমান সিলেট-৬, ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের কুমিল্লা-১১, শামসুল ইসলাম চট্টগ্রাম-১৪, হামিদুর রহমান আযাদ কক্সবাজার-২ ও শাহজালাল চৌধুরী কক্সবাজার-৪।
এ আসনগুলোর মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২, সিরাজগঞ্জ-৫, ময়মনসিংহ-৬, সাতক্ষীরা-১, পটুয়াখালী-২, কক্সবাজার-৪_ এই ছয়টি আসনে জামায়াত নতুন করে লড়তে যাচ্ছে। গত নির্বাচনে এ আসনগুলোতে জামায়াতের প্রার্থী ছিল না। তবে ময়মনসিংহ-৬ আসনে ২০০১ সালে জামায়াত প্রার্থী জোটের মনোনয়ন পেয়েও পরাজিত হন। সিরাজগঞ্জ-৫ ও কক্সবাজার-৪ আসনে জামায়াতের সম্ভাব্য প্রার্থীরা বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান। এ কারণেই আসন দুটিতে ছাড় দিতে নারাজ তারা।
২০০৮ সালে রংপুর-১ ও ২ আসনে জোটের মনোনয়ন পেলেও এ আসনগুলোয় আর নির্বাচনে আগ্রহী নয় জামায়াত। এ আসনগুলো মূলত জাতীয় পার্টির ঘাঁটি। গত দুটি নির্বাচনেই এ আসন দুটিতে জামানত বাজেয়াপ্ত হয় দলটির প্রার্থীদের। গত নির্বাচনে ফরিদপুর-৩ আসন থেকে নির্বাচনে অংশ নিয়ে মাত্র ৩০ হাজার ভোট পান জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ। একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে তার মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে। এ আসনে বিএনপির শক্তিশালী প্রার্থী দলের ভাইস চেয়ারম্যান চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ রয়েছেন। গত নির্বাচনে বরগুনা-২ আসনে প্রার্থী দিয়ে সরে দাঁড়ায় জামায়াত। এবারও এ আসনে দলটির প্রার্থী থাকার সম্ভাবনা কম। রাজশাহী-২ অথবা ৫ এবং চট্টগ্রাম জেলায় আরও একটি আসন চায় জামায়াত। রাজশাহী-২ অথবা ৫ আসনে জোটের মনোনয়ন দেওয়ার শর্তে গত রাজশাহী সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জামায়াত প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলম সরে দাঁড়ান।
জামায়াতের প্রার্থী তালিকার মধ্যে পাবনা-১ আসনের প্রার্থী দলের আমির মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, পাবনা-৫ আসনের প্রার্থী দলের নায়েবে আমির মাওলানা আবদুস সোবহান মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে কারাগারে আছেন। তাদের বিচার চলছে। মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে পিরোজপুর-১ আসনের প্রার্থী নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ও শেরপুর-১ আসনে দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের। তারা উচ্চ আদালতে রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছেন। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ (আরপিও) এবং ভোটার তালিকা আইন, ২০১৩ সংসদে পাস হলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাজাপ্রাপ্ত হওয়ায় সাঈদী ও কামারুজ্জামান নির্বাচনে অযোগ্য হবেন। তাদের আপিল নিষ্পত্তি না হলেও তারা নির্বাচন করতে পারবেন না।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আদালত অবমাননার দায়ে তিন মাসের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন সিরাজগঞ্জ-৪ আসনের প্রার্থী দলের ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান ও কক্সবাজার-২ আসনের এমপি হামিদুর রহমান আযাদ। দু’জনই ‘পলাতক’ রয়েছেন; রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেননি। তবে তাদের নির্বাচনে অংশ নিতে বাধা নেই বলে জানান ডা. তাহের। তিনি বলেন, এ দুই নেতা মানবতাবিরোধী অপরাধে নয়, আদালত অবমাননার দায়ে দণ্ডিত হয়েছেন। তাই তারা নির্বাচনে অযোগ্য হবেন না।
দণ্ডপ্রাপ্ত নেতারা নির্বাচন করতে না পারলে তাদের পরিবার থেকে ওই সব আসনে প্রার্থী দেবে জামায়াত। সাঈদী পিরোজপুর-১ আসন থেকে দু’বার এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। আসনটির সীমানা এবার পরিবর্তন হয়েছে। সাঈদীর বাড়ি জিয়ানগর উপজেলা পিরোজপুর-২ আসনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। সাঈদী শেষ পর্যন্ত নির্বাচন করতে না পারলে তার মেজ ছেলে শামীম সাঈদী পিরোজপুর-১ ও ছোট ছেলে মাসুদ সাঈদী পিরোজপুর-২ আসন থেকে প্রার্থী হতে চান। ইতিমধ্যে দু’জনই প্রচার শুরু করেছেন। কামারুজ্জামানের আসনে প্রার্থী হতে পারেন তার ছেলে হাসান ইকবাল। নিজামী ও সোবহানের বিরুদ্ধে মামলা চলমান। সাজা না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচনে অযোগ্য হবেন না তারা। তবে শেষ পর্যন্ত তারাও নির্বাচনে অংশ নিতে না পারলে পাবনা-১-এ নিজামীর ছেলে ব্যারিস্টার নাজীব মোমিন ও পাবনা-৫ আসনে সোবহানের ছেলে আহমেদ নেসার প্রার্থী হতে পারেন বলে স্থানীয় জামায়াতের পক্ষে প্রচারণা চালানো হচ্ছে।
জামায়াতের প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় সারির সব নেতাই কারাগারে। প্রার্থীদেরও অধিকাংশ কারাগারে। তবে তাদের অবর্তমানেই চলছে প্রচার। সরকারের কঠোর মনোভাবের কারণে দলীয়ভাবে না পারলেও বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের ব্যানারে প্রচার চলছে। ২০১২ সালের ঈদুল ফিতর থেকেই প্রার্থীদের পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা বিনিময়ের মাধ্যমে নির্বাচনী প্রচার শুরু করে জামায়াত।