২৫ অক্টোবর ঢাকায় পাল্টাপাল্টি সমাবেশ

নির্বাচন পর্যন্ত সংসদ বহাল রাখার চিন্তা

সরকারি দল আওয়ামী লীগ ২৫ অক্টোবর ঢাকায় সমাবেশ ডেকেছে। একই দিন বিরোধী দল বিএনপিও ঢাকায় সমাবেশ করার পরিকল্পনা নিয়েছে। এদিকে বিরোধী দল সংসদ ভেঙে দেওয়ার দাবি জানালেও সরকার নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা পর্যন্ত সংসদ অধিবেশন চালাতে চাইছে।

দুই দলের এই পাল্টাপাল্টি অবস্থানের কারণে অক্টোবরের শেষে দেশে নতুন করে রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার মহানগর আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভায় সমাবেশের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। এতে বলা হয়, সংবিধান অনুসারে সরকারের মেয়াদ পূর্তির শেষ দিন ২৫ অক্টোবর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ের দলীয় কার্যালয়ের সামনে সমাবেশ করবে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ।

বিএনপিও একই দিন রাজধানীতে সমাবেশের অনুমতি চেয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের কাছে আবেদন করেছে। বিএনপির পক্ষ থেকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, পল্টন ময়দান অথবা নয়াপল্টনে দলীয় কার্যালয়ের সামনে সমাবেশের অনুমতি চাওয়া হয়েছে। বিএনপির নির্ভরযোগ্য সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ২৫ অক্টোবর সমাবেশ করা নিয়ে দলে আলোচনা হচ্ছে। তবে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে তারিখ ঘোষণা করা হয়নি।

বিএনপির একটি সূত্র জানিয়েছে, ঢাকার সমাবেশে সারা দেশ থেকে নেতা-কর্মীরা এসে যোগ দেবেন। দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এতে বক্তব্য দেবেন। সূত্র জানায়, বরিশালে খালেদা জিয়ার জনসভা হবে ২২ অক্টোবর। সেখান থেকে ২৪ অক্টোবরের মধ্যে দাবি আদায়ের জন্য শেষবারের মতো সরকারকে সময় বেঁধে দেওয়া হতে পারে। মূলত ২৪ অক্টোবর সংসদ অধিবেশন শেষ হবে—এমনটা ধরে নিয়েই এই কর্মসূচি দেওয়া হয়েছে। দাবি মানা না হলে ২৫ অক্টোবরের সমাবেশ থেকে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করবেন তিনি।

গতকালের বর্ধিত সভায় মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘ওরা (বিএনপি-জামায়াত) যে কর্মসূচি দেবে, আমরা তার পাল্টা কর্মসূচি দেব। ঈদের পর ধারাবাহিকভাবে আরও কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।’

তফসিলের আগ পর্যন্ত অধিবেশন: সরকার ও আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী সূত্রে জানা গেছে, অনেকটা কৌশলগত কারণে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগ পর্যন্ত সংসদ অধিবেশন চালাতে চায় সরকার। ২৪ অক্টোবর বা এর পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবিলা করা এই কৌশলের অংশ।

সংসদের কার্য উপদেষ্টা কমিটির বৈঠকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত সংসদ অধিবেশন চালানোর সিদ্ধান্ত হয়েছিল। এ সিদ্ধান্তের পর বিরোধী দল ২৪ অক্টোবর সরকারের শেষ দিন বলে প্রচার চালায়। তারা ২৪ অক্টোবরের পর সরকারবিরোধী কঠোর আন্দোলনেরও হুমকি দেয়। সংসদ অধিবেশন ২৩ অক্টোবর পর্যন্ত মূলতবি আছে।

সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে কথা বলে জানা যায়, ২৪ অক্টোবর নিয়ে প্রচারণা বন্ধ করতে এবং সরকারের কর্তৃত্ব ধরে রাখতেই অধিবেশন দীর্ঘ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ ছাড়া বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনার দরজা খোলা রাখাও অধিবেশন চালানোর আরেকটি কারণ।

২৪ অক্টোবরের পর সংসদ অধিবেশন চলবে কি না, জানতে চাইলে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়কমন্ত্রী শফিক আহমেদ বলেন, তফসিল ঘোষণার আগ পর্যন্ত অধিবেশন চালানোর ব্যাপারে কোনো বাধা নেই। বর্তমান সংসদ ২৪ অক্টোবরের পরও চলতে পারে। তবে তফসিল ঘোষণা হলে অধিবেশন চালানো যাবে না। এ ক্ষেত্রে ৬০ দিনের মধ্যে সংসদ অধিবেশন আহ্বানের যে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা আছে তা অকার্যকর হয়ে যাবে।

জানতে চাইলে বিশিষ্ট আইনজীবী রফিক-উল হকও বলেন, ২৪ অক্টোবরের পর সংসদ অধিবেশন চালাতে আইনগত বাধা নেই।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, আইনগতভাবে তফসিল ঘোষণা পর্যন্ত সংসদ অধিবেশন চালানো গেলেও সংসদ বহাল রেখে নির্বাচন করা ঠিক না। এতে সব পক্ষের জন্য সমান সুযোগ থাকবে না। আমাদের দেশের যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং পরস্পরের প্রতি যে আস্থাহীনতা তাতে নির্বাচনে সমান প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে একটা প্রশ্ন থেকে যাবে।

আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ সাংসদ তোফায়েল আহমেদ গত বুধবার জাতীয় সংসদে বক্তব্য দেওয়ার সময় ২৪ অক্টোবরের পরও অধিবেশন চালানোর দাবি জানান। দপ্তরবিহীন মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত জানান, ২৪ অক্টোবর অধিবেশন শেষ হবে না, চলবে।

বিএনপির আপত্তি: সংসদের শেষ ৯০ দিন অর্থাৎ নির্বাচনকালীন অধিবেশন চালানোর ব্যাপারে বিএনপির আপত্তি আছে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন এ বিষয়ে বলেন, সরকার একতরফা নির্বাচন করতে চায়। এত দিন তারা সংসদ অকার্যকর রেখে নির্বাচনের কথা বলেছে। এখন বলছে, সংসদ অধিবেশন শেষ ৯০ দিনের মধ্যেও চলবে। সরকার খামখেয়ালি করছে। রাষ্ট্র পরিচালনা ও নির্বাচন করার জন্য যে একটা পদ্ধতি আছে, তা মানছে না।

অধিবেশন কেন দীর্ঘ করা হচ্ছে, জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী বলেন, অনেকগুলো আইন পাসের অপেক্ষায় আছে। কিছু আইন স্থায়ী কমিটিতে আছে। এগুলো পাস করানোর জন্য অধিবেশন দীর্ঘ করা প্রয়োজন।

বর্তমান সংসদের প্রথম কার্যদিবস ছিল ২০০৯ সালের ২৫ জানুয়ারি। সে হিসাবে সংসদের মেয়াদ ২০১৪ সালের ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী অনুযায়ী, সংসদের মেয়াদ পূর্তির আগের তিন মাস অর্থাৎ ২৪ অক্টোবর থেকে ২৫ জানুয়ারির মধ্যে সাধারণ নির্বাচন হতে হবে।