নির্বাচন হওয়া না-হওয়া…সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি ঘোষণা দিয়েছেন, সংসদ ও মন্ত্রিসভা বহাল রেখেই ২৪ জানুয়ারি ২০১৪ সালের মধ্যে দশম সংসদের নির্বাচন হবে। এক নির্বাচন কমিশনার বলেছেন, এটি প্রধানমন্ত্রীর শেষ কথা কি না, তা তিনি জানেন না। তবে নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য কমিশন প্রস্তুত। বিএনপি ও অন্যান্য বিরোধী দল এমনকি মহাজোটের শরিক এরশাদের জাতীয় পার্টি জানিয়ে দিয়েছে, এ ধরনের নির্বাচনে তারা অংশ নেবে না এবং একে প্রতিহত করা হবে। প্রতিহত করার জন্য রাজপথ, রেলপথ অবরোধ করাসহ কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে।
সম্প্রতি যুবদলের সমাবেশে বিএনপির নেতারা বলেছেন, বর্তমান সংসদে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারের বিল না আনলে আওয়ামী লীগের কেউ ‘পালাতেও পারবেন না’। অবশ্য প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা নির্বাচন নিয়ে তাঁর শেষ কথা কি না—এ নিয়েও অনেকের মধ্যে সন্দেহ রয়েছে। যুগান্তর-এর ৬ সেপ্টেম্বরের প্রধান শিরোনাম ‘সংসদ বহাল রেখে নির্বাচনে পুরো মত নেই আ.লীগে’; অর্থাৎ দলটির ভেতরেই কেউ কেউ সংসদ ও মন্ত্রিসভা বহাল রেখে নির্বাচনের ঔচিত্য ও সম্ভাব্যতা নিয়ে ভিন্নমত পোষণ করছেন। অর্থমন্ত্রী ৫ সেপ্টেম্বর জানিয়েছেন, সংসদীয় ব্যবস্থায় যে নির্বাচন হয়, তা এখনো আমরা রপ্ত করতে পারিনি। এবং বলেছেন, ‘সংলাপের সম্ভাবনা এখনো শেষ হয়ে যায়নি। রাজনৈতিক সংকট নিরসনে সংলাপ হবে এবং তা যেকোনো সময়ই হতে পারে।’ (সমকাল) এদিকে সংলাপের জন্য আমাদের দাতা সংস্থা ও ত্রাতা দেশগুলো থেকে চাপ অব্যাহত আছে। ৭ সেপ্টেম্বর ইউরোপীয় ইউনিয়নের একটি উচ্চপর্যায়ের নির্বাচন পর্যবেক্ষক দল বাংলাদেশে আসছে। দলটি থাকবে ২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। এই দীর্ঘ সফরে দলটি নির্বাচন নিয়ে সৃষ্ট সংকট যাতে কাটানো যায়, সে লক্ষ্যে নিশ্চয়ই চেষ্টা করবে।
সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মধ্য দিয়েই বর্তমান সরকার ও সরকারি দল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান বিলোপ করে। উচ্চ আদালতের যে রায়ের ওপর ভিত্তি করে সরকারি দল এই সংশোধনীর উদ্যোগ নেয়, তাতে অবশ্য আদালতের সুপারিশ ছিল আরও দুটি নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে করার। কিন্তু সেই সুপারিশ সরকারি দল গ্রহণ করেনি, যেহেতু গ্রহণের বাধ্যবাধকতা ছিল না। তার পরও গণতন্ত্রের স্বার্থে এ নিয়ে বিরোধী দলের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার প্রয়োজন ছিল। নির্বাচনে কখনো একটি পক্ষ থাকে না, তাই অন্যান্য পক্ষের মতামত জানা এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া, নিদেনপক্ষে এ নিয়ে একটি সমঝোতায় পৌঁছানো উচিত ছিল। আলোচনার সেই বাসটি অনেক আগেই ছেড়ে গেছে। কিন্তু সেটি শেষ বাস ছিল না। আলোচনার সুযোগ এখনো আছে, যে বিষয়টি অর্থমন্ত্রী ঠিকই অনুধাবন করেছেন। সেদিকেই যে যাওয়া উচিত, সে ব্যাপারে দেশের মানুষের মধ্যে ব্যাপক মতৈক্য আছে। এখন সবার মধ্যেই যে উদ্বেগটি কাজ করছে, তা হচ্ছে আলোচনা অথবা সংলাপ হবে তো? এর ওপর নির্ভর করছে নির্বাচন হওয়া না-হওয়ার। স্থিতিশীল গণতন্ত্রের। দেশের ভবিষ্যতের।
নির্বাচন যদি বহুদলীয় না হয়, প্রধান বিরোধী দল যদি নির্বাচন বর্জন করে, তাহলে কী হতে পারে, সে উদাহরণ তো আমাদের ২৩ বছরের নব্য গণতন্ত্রের ইতিহাসেই আছে। ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচন বর্জন করেছিল আওয়ামী লীগ। তখন দাবি ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের। তাতে ক্ষমতাসীন বিএনপিকে সম্মত হতে হয়েছিল। ২০১৩-১৪ সালের নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে বিএনপি, যদি নির্বাচন বহুদলীয় না হয়। এবারও দাবি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের। বলা হয়ে থাকে, ইতিহাস নিজের পুনরাবৃত্তি করে। তাই বলে এত শিগগিরই?
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে অনেক প্রশ্ন আছে, অনেক সন্দেহও আছে। এবং এ জন্য একটা বড় দায় কি বিএনপির নয়? যে দলটি এখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জন্য আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছে, সে দলটিই তো ২০০৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মূল চেতনাকে ধ্বংস করেছিল। সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতির তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হওয়ার যে বিধান ছিল, তাকে নিজেদের অনুকূলে আনার জন্য বিচারপতিদের অবসরে যাওয়ার বয়স তারা দুই বছর বাড়িয়েছিল। বেশ অঙ্ক করে, পরিকল্পনা করে। প্রবল প্রতিবাদের মুখে বিচারপতি কে এম হাসান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হওয়ার ব্যাপারে তাঁর অপারগতা প্রকাশ করে প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছিলেন। বিএনপি অবশ্য তাতে দমে না গিয়ে দ্বিতীয় চালাকি করেছিল এবং তা ছিল রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিনকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করা। বিএনপি চেয়েছিল এই তত্ত্বাবধায়ক-আয়োজনে নির্বাচনে বাজিমাত করা। এই অপকৌশলের কারণেই কিছুদিনের মধ্যে সেনা-সমর্থিত একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার দেশের ঘাড়ে চেপে বসে। এবং সেই সরকারের দুই বছর রাজনৈতিক নেতা-নেত্রী থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-ছাত্র থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের যে নাভিশ্বাস উঠেছিল, তা নিশ্চয়ই আমরা ভুলে যাইনি। ওই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলা ও ‘কিংস পার্টি’ তৈরির পরিকল্পনা নিয়ে যেভাবে এগোচ্ছিল, তাতে যে দেশটি লাটে না উঠে আবার বহুদলীয় গণতন্ত্র ফিরে এল, সেটাই তো আশ্চর্য। তবে এই আশ্চর্য বিষয়টি নিশ্চিত করেছে জনগণ। মানুষ গণতন্ত্র চেয়েছে, এ জন্য দেশটি গণতন্ত্রে ফিরেছে। এখন এই গণতন্ত্র যাতে আবার বিপন্ন না হয়, তা নিশ্চিত করা সব রাজনৈতিক দলের প্রধান কর্তব্য। মানুষ তা চায়।
বর্তমান সংকটের পেছনে সর্বশেষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অন্তর্নিহিত দুর্বলতা ও নিরপেক্ষ না থাকতে পারার উদাহরণ একটি প্রভাব রেখেছে। এ জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। আমরাও বিশ্বাস করি, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা উন্নত গণতান্ত্রিক পদ্ধতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়, এটি একটি সাময়িক ব্যবস্থা। এবং এ জন্য ভবিষ্যতে ক্ষমতাসীন সরকারের অধীনেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া উচিত। এ রকম নির্বাচন উন্নত প্রতিটি গণতন্ত্রেই হয়। এমনকি ভারত, মালয়েশিয়াসহ প্রতিবেশী অনেক দেশেই হয়। একটি বিদ্যমান সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে যদি বিরোধী দল জয়ী হয়, তখন শুধু বিরোধী দল নয়, সরকারও জয়ী হয় এবং জয়ের পাল্লাটা সবচেয়ে ভারী হয় গণতন্ত্রের পক্ষে। সে রকম একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা আমরা যেদিন কায়েম করতে পারব, সেদিন বলতে পারব, একাত্তরের একটি আকাঙ্ক্ষা আমরা পূরণ করেছি। আওয়ামী লীগ থেকে দাবি করা হচ্ছে, পাঁচটি সিটি করপোরেশনের সাম্প্রতিক নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোটের জয়লাভ প্রমাণ করে যে এই সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন হলে তা সুষ্ঠু হবে। সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সরকারি দল পরাজিত হয়েছে, কিন্তু ক্ষমতার পালাবদলে এর কোনো প্রভাব পড়েনি। নির্বাচিত মেয়রদের শপথ পাঠ করান প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যরা একই ছাদের নিচে একই কামরায় পাশাপাশি বসেছেন। তাতে আকাশ ভেঙে পড়েনি। বরং সবাই সৌজন্য বজায় রেখে কথাবার্তা বলেছেন, হয়তো স্থানীয় সমস্যা নিয়ে সলাপরামর্শ করেছেন। রাজশাহী ও সিলেটের পরাজিত মেয়ররা বিজয়ী মেয়রদের সংবর্ধিত করেছেন, মিষ্টিমুখ করিয়েছেন। এ সবই এ দেশে গণতন্ত্রের ভবিষ্যতের জন্য প্রয়োজনীয় ছিল। এ সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন হলে যে এ রকম দৃশ্যের অবতারণা হবে না, তা আগে থেকেই বলে দেওয়া যায় না। হয়তো হবে। হয়তো বিরোধী দল নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করবে, মসৃণভাবে ক্ষমতার পালাবদল হবে, বিজয়ী-বিজিত প্রার্থীরা একে অপরকে মিষ্টিমুখ করাবেন। এ রকম একট দৃশ্য যদি জাতি দেখত ২০১৪ সালের শুরুতে, তাহলে নিশ্চিতভাবে বলা যেত, ২০২১ সালের মধ্যে এক অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে বিশ্বের মঞ্চে বাংলাদেশ বসবে মাথা উঁচু করে। সেদিকেই তো আমাদের যাওয়া উচিত। কিন্তু মাঝখানে যে বিষয়টি নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে, তা হচ্ছে মতৈক্য। পাঁচ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোট অংশ নিয়েছে, সরকারি দল অংশ নিয়েছে। অর্থাৎ এখানে অংশগ্রহণ নিয়ে মতৈক্য ছিল। আগামী নির্বাচনে যদি সবাই মতৈক্যের ভিত্তিতে অংশ নেয়, একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হয় এবং ফলাফল সবাই মেনে নেয়, তাহলেই শুধু ২০২১ সালের পথে আমরা পা রাখতে পারব। ফলে মূল কথাটিই দাঁড়াচ্ছে মতৈক্য।
সরকারি দল চাইছে তার অধীনে নির্বাচন, বিরোধী দল চাইছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার। এখন নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে প্রয়োজন মতৈক্য। আর এর জন্য প্রয়োজন সংলাপ। সেই সংলাপের ডাক প্রধানমন্ত্রী একবার দিয়েছিলেন। ডাকটি আবার তাঁকেই দিতে হবে। সংলাপ শুরু হলে একটা সমাধান আসবে। আমাদের বিশ্বাস, সেই রাজনৈতিক পরিপক্বতা আমাদের রয়েছে, সেই স্পৃহাও রয়েছে। সংলাপের মধ্য দিয়ে নির্ধারিত হবে সরকার কোন ধরনের হবে, কী তার কাঠামো হবে, কী নামে তাকে ডাকা হবে। এবং এবার এবং আগামীবার—এই দুবার এ ধরনের নির্বাচনকালীন সরকারের অধীনে নির্বাচনের পর বিশ্বের সর্বত্র স্বীকৃত নির্বাচনকালীন বিদ্যমান সরকারের অধীনেই যেন ভবিষ্যতে সব নির্বাচন হয়, সে ব্যাপারেও মতৈক্য হতে হবে।
সময় বেশি নেই। যদি সেপ্টেম্বরের মধ্যে সংলাপ শুরু না হয়, তাহলে এই শীতে দেশটি শুধু সংঘাত দেখবে, ধ্বংস দেখবে, রক্তপাত দেখবে। বিএনপি-জামায়াত জোট এখন হেফাজতের সমর্থন পাচ্ছে। এই জোট বিধ্বংসী আন্দোলনে গেলে দেশের পরিণতি হবে ভয়াবহ। কারণ, ক্ষমতাই যখন প্রধান বিবেচনা হয়ে দাঁড়ায়, তখন দেশের স্বার্থ গৌণ হয়ে যায়।
রোজার ঈদের পর থেকে দেশটি এক আশ্চর্যজনক শান্তি উপভোগ করছে। এই শান্তি নির্বাচন পর্যন্ত থাকলে ভোটের দিন আবার উৎসব হবে। এই উৎসবটাই আমরা চিরস্থায়ী রূপে চাই। আমরা সংঘাতের রক্ত চাই না, উৎসবের রং চাই। এবং তা নিশ্চিত করতে পারে বড় দুটি দল।
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম: কথাসাহিত্যিক। অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।