‘নিশা লাগিল রে, বাঁকা দুনয়নে নিশা লাগিল রে’…ড. মীজানূর রহমান শেলী

বিখ্যাত সাধক ও গীতিকার হাছন রাজার কবিতা ও গানের আবেদন ব্যাপক, বিস্তৃত ও যুগোপযুগী। তাঁরই মনমাতানো গান, ‘নিশা লাগিল রে, বাঁকা দুনয়নে নিশা লাগিল রে’। গানটির সাদামাটা মানে স্পষ্ট ও দৃশ্যত সরল। কারণ এর পরের পঙ্‌ক্তিটিতে বলা হয়েছে, ‘হাছন রাজা পেয়ারীর প্রেমে মজিল রে’। আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় যে রমণীর আকর্ষণে মুগ্ধ এক প্রেমিকপুরুষ তাঁর অন্তরের একান্ত অনুভূতি প্রকাশ করছেন। কিন্তু সমস্যা হলো একটি শব্দ নিয়ে ‘নিশা’। সাধারণ অর্থে নিশা মানে রাত্রি, যাকে নিশি বা নিশীথ বলেও ডাকা হয়। মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের মেঘনাদ বধ কাব্যে যেমন রাবণের বেদনার্ত উক্তি- ‘নিশার স্বপনসম তোর এবারতারে দূত।’
তবে হাছন রাজার গানের ক্ষেত্রে ‘নিশা’ অর্থ যদি রাত হয়, তাহলে তো কোনো সমস্যা থাকে না। কিন্তু সাধক কবি যে অঞ্চলের অধিবাসী, ঐতিহ্যবাহী সেই বৃহত্তর সিলেট জেলায় ‘নেশা’ শব্দটিও এ জাতীয় অন্যান্য অনেক শব্দের মতোই ‘নিশা’ হিসেবে উচ্চারিত হতে পারে। কাব্যে সাহিত্যে প্রায়ই নারীর জন্য পুরুষের প্রেম তাকে নেশাচ্ছন্ন করে বলা হয়। সেদিক থেকে বিচার করলে কবি ‘পেয়ারীর’ প্রেমে আবিষ্ট নায়ক হিসেবে নেশাগ্রস্ত। কিন্তু উচ্চারণের আঞ্চলিক হেরফেরের কথা মনে করে আমি এ বিষয়ে নিশ্চিত হতে চাইলাম। সে জন্যই বৃহত্তর সিলেটের অধিবাসী কয়েকজন বন্ধু ও সাবেক সহকর্মীর শরণাপন্ন হই। সাবেক সচিব আবদুল হামিদ চৌধুরী একটু দ্বিধাগ্রস্ত হয়েও বললেন, শব্দটা নেশাই। সাংবাদিক হাসান শাহরিয়ার অবশ্য বললেন, ‘নিশা’ মানে এখানে রাতই। রাতের অন্ধকার যেমন মানুষের দৃষ্টিকে ঘিরে রাখে, তেমনি পেয়ারীর প্রেম ঘিরে ছিল হাছন রাজাকে। সাবেক সংসদ সদস্য ড. সৈয়দ মকবুল হোসেন বললেন যে নিশা মানে আঁধারের সৃষ্টি করা আচ্ছন্নতা, চলতি ভাষায় যাকে বলা যায় ধাঁধা। সাবেক সংস্কৃতিসচিব ও সাহিত্যানুরাগী জিয়াউল ইসলাম চৌধুরী দিলেন দ্বিধার ব্যাখ্যা। তাঁর মতে, ‘এই নিশা আসলে নেশারই প্রকাশ। তবে এ ক্ষেত্রে এ নেশা নিছক রমণীর প্রেমে আচ্ছন্ন হওয়া নয়, এর একটা আধ্যাত্মিক মাত্রাও রয়েছে।’ এই সূত্রে মনে হতে পারে রাধা-কৃষ্ণের কথা। যেখানে ভক্তদের কাছে রাধা হচ্ছেন ‘জীবাত্মা’, ‘কৃষ্ণ’ পরমাত্মা এবং কুলপ্লাবি যমুনা তাদের মধ্যে দূরত্ব ও বিরহ রচনাকারী প্রবল স্রোতস্বিনী। পরমাত্মার অনিবার আকর্ষণে জীবাত্মা যমুনা পেরিয়ে তাঁর সঙ্গে মিলিত হতে যায়। এই প্রেমের নেশায় রয়েছে কালজয়ী এক আধ্যাত্মিক নির্যাস।
কিন্তু সাধারণভাবে নেশার অর্থ এমন মহত্বের পরশে উজ্জ্বল থাকে না। সুরের নেশা, শিল্পকলার নেশা তথা সাহিত্যের নেশার সঙ্গে মানুষের জীবনের ভালো দিকগুলোর সম্পর্ক থাকে। সমাজসেবার, পরোপকারের আকর্ষণও কখনো কখনো মানুষকে আচ্ছন্ন করে, তাকে নিয়ে যায় অস্তিত্বের উন্নততর স্তরে। কিন্তু মাদকের নেশা, অর্থবিত্তের নেশায় অথবা ক্ষমতার নেশার নেই কোনো শুভ আবেদন অথবা কল্যাণকর মাত্রা।
আজকের উৎক্রান্তির অশান্ত বিশ্বে এবং আমাদের দেশে এই নেশাই বিস্তার করেছে তার প্রবল প্রতাপ, ঘাতক থাবা। বিশ্বজোড়া ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের লড়াই অঞ্চলে অঞ্চলে, দেশে দেশে সৃষ্টি করেছে দ্বন্দ্ব, সংঘাত ও সশস্ত্র সংঘর্ষ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর অভূতপূর্ব উগ্রপন্থী হামলার পর সেই পরাশক্তি শত্রুর সন্ধানে এবং শত্রুর দমনে যে যুদ্ধের সূচনা করে, তার জের এখনো চলছে। বিশেষ করে ২০০১ সাল থেকে আফগানিস্তান এবং ২০০৩ সাল থেকে ইরাক সেই অসমাপ্ত যুদ্ধের দুরন্ত আগুনে পুড়ছে। গণতন্ত্র পুনরুজ্জীবনের প্রয়াসে সূচিত আরব বসন্ত তিউনিসিয়া, লিবিয়া, মিসরসহ মধ্যপ্রাচ্যের ও উত্তর আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে যে সশস্ত্র গণ-অভ্যুত্থান সৃষ্টি করেছিল তারও কাঙ্ক্ষিত উপসংহার আসেনি। বরং এ বছর মিসরে সেনা অভ্যুত্থানের সমর্থনে যে বিপ্লব নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে, তার প্রকৃতি নিয়েও সন্দেহ দেখা দিয়েছে। সিরিয়ায় চলছে একনায়ক আসাদবিরোধী রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ। হাজার হাজার মানুষ হারিয়েছে প্রাণ। লাখ লাখ সিরীয় নাগরিক উদ্বাস্তু হয়ে আশ্রয় নিয়েছে জর্দান, লেবাননসহ প্রতিবেশী দেশগুলোতে। সেখানে সৃষ্টি হয়েছে দারুণ অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপের। সিরিয়াকে ঘিরে পরাশক্তি ও বৃহৎ শক্তির আধিপত্য বিস্তারের যে লড়াই চলছে, তাতে করে আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতি হচ্ছে বিপর্যস্ত। অনিশ্চিত ও অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে লাখ লাখ মানুষের জীবন। রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের পাশাপাশি চলছে দুনিয়াজোড়া অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা। ২০০৮ সাল থেকে যে বিশ্বমন্দা উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোকে প্রবল চাপের মুখে জিম্মি রেখেছে, তা ঈষৎ কমলেও পুরোপুরি উপশমের লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না। খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বেকারত্বের হার সন্তোষজনকভাবে কমছে না। অর্থনীতির অন্যান্য সুযোগও কাঙ্ক্ষিত স্তরে ফিরে আসতে পারেনি। ইউরোপীয় ইউনিয়নে একমাত্র জার্মানি ছাড়া অন্য কোনো দেশই মন্দা ও আর্থিক সংকটের জাল থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি। স্পেনে বেকারত্বের হার পৌঁছেছে সর্বোচ্চ পর্যায়ে প্রায় ২৬ শতাংশে। গ্রিস শত শত বিলিয়ন ইউরোর আর্থিক সাহায্য পাওয়ার পরও দেউলিয়াপনার দ্বারপ্রান্তে হাজির হয়েছে। সে দেশে সাহায্যকারীদের শর্ত অনুযায়ী আরোপিত কৃচ্ছ্রসাধন নাগরিকদের জীবনকে করেছে পর্যুদস্ত। সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা বিপুলভাবে কমানো হয়েছে, চাকরিচ্যুত হতে চলছে আরো ২৬ হাজার সরকারি কর্মচারী। ফলে দেশটির রাজনীতি হয়ে উঠেছে অস্থির। ইতিমধ্যে কয়েকবার সরকার পরিবর্তনও ঘটেছে। ইউরো জোনের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি ইতালিও সংকটের প্রান্তসীমায়। অতি সম্প্র্রতি কোয়ালিশন সরকারের মধ্যে চির দেখা দিলে দেশটি আবার রাজনৈতিক সংকটের কবলে পড়ছে বলে মনে হয় এবং এর ফলে হয়তো তার অর্থনীতি আবার হয়ে উঠবে অস্থির ও বিপদগ্রস্ত।
স্বাভাবিকভাবে স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলো রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার করাল গ্রাস থেকে মুক্ত নয়। সাম্প্র্রতিককালে দ্রুত উন্নয়নশীল দুটি আঞ্চলিক শক্তি চীন ও ভারত এই দ্বিমাত্রিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছে।
সারা দুনিয়ার এই অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা যে মাদক নেশার বিপুল বিস্তারে ইন্ধন জোগাচ্ছে, তাতে সংশয় নেই। অবশ্য মাদক নেশার প্রভাব সব দেশের জনগোষ্ঠীর অংশবিশেষকে প্রতি শতাব্দীতে এবং প্রতিটি যুগেই আচ্ছন্ন রেখেছে, এ কথা সত্য। কিন্তু বর্তমানকালের মতো এত আশা-নিরাশার, এত সুযোগ ও বঞ্চনার, এত সম্ভাবনার ও সংকটের বিপুল ও পরস্পরবিরোধী সমাহার আগে বুঝি কখনো দেখা যায়নি। একদিকে প্রাচুর্য, একদিকে অভাব-অনটন, একদিকে স্থায়ী শান্তি ও স্বস্তির হাজারো সম্ভাবনা; অন্যদিকে ক্ষমতালিপ্সু আধিপত্যবিস্তারী শক্তির নগ্ন লড়াইয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত সংঘর্ষ ও সংকটের বাস্তবতা। চাওয়া-পাওয়া এই বৈষম্য অনুন্নত দেশেই শুধু নয়, উন্নত দেশগুলোতেও সৃষ্টি করেছে মাদকাসক্তি ও নেশাগ্রস্ততার ব্যাপক বিস্তার। প্রায় দুই দশক আগে প্রকাশিত হয়েছিল এক অভিনব সংবাদ : মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকার সে দেশের মাদকাসক্ত তরুণ-তরুণীদের নেশা থেকে রক্ষা করার জন্য সেনাবাহিনীকে নামানোর প্রস্তাব দেয়। এই প্রস্তাব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর প্রধানরা এক হয়ে বলেন যে এ কাজ সেনাবাহিনীর পক্ষে করা সম্ভব নয়। বরং এ কাজে সম্পৃক্ত হলে সামরিক বাহিনীরও সমূহ বিপদের আশঙ্কা রয়েছে। কারণ তার সদস্যরাও মোহগ্রস্ত হয়ে নেশায় আসক্ত হয়ে পড়তে পারে। এ অবস্থায় সরকারকেই চিন্তা করতে হবে কোন আদর্শ, নৈতিকতা বা ধর্মীয় ভাবাদর্শ সমাজকে উদ্বুদ্ধ করতে পারে; উৎসাহ দিতে পারে সর্বনাশী মাদক নেশার পথ থেকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে আসতে।
কথাটি এখনকার পরিবেশে আরো সত্য ও প্রাসঙ্গিক। নেশাগ্রস্ত থেকে মানুষকে মুক্ত করতে পারে তার পরিপার্শ্ব, তার সার্বিক পরিবেশের শান্তি, স্থিতি ও ইতিবাচক সম্ভাবনার আশা। অবশ্য এতে তার অন্তরেরও অবদান থাকতে হবে। ইতিবাচক ও আশাবাদী মনোভাব এবং অপরাজেয় শুভ ইচ্ছাশক্তি তাকে মাদক নেশার মারাত্মক জাল থেকে মুক্ত করে আনতে পারে।
অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অস্থিতিশীলতা ও অস্থিরতা তরুণ সমাজকে করেছে সংশয়াকুল, দিক-দিশাহীন ও চরমভাবে হতাশ। তাই তাদের একাংশ তা তারা উচ্চবিত্তই হোক অথবা স্বল্পবিত্ত আবিষ্ট হয়েছে মারাত্মক নেশার আবেশে। তাদের এই নেশায় নেই কোনো আধ্যাত্মিক বা আদর্শিক আবেশের ছোঁয়া, আছে শুধু ভয়াবহ মাদকের মোহাচ্ছন্ন অন্ধকার। ক্ষমতালিপ্সু একশ্রেণীর রাজনৈতিক নেতা, অর্থলোভী এবং দুর্নীতিগ্রস্ত আমলা ও ব্যবসায়ী শ্রেণীর অংশবিশেষ ক্ষমতা ও অর্থবৃত্তের নেশায় অন্ধ। তাই তারা মেতে আছে ক্ষমতা ও অর্থ-সম্পদ কবজায় রাখার বা কুক্ষিগত করার সর্বগ্রাসী সংগ্রামে। দেশের কথা, দশের কথা মোহাচ্ছন্ন, নেশাচ্ছন্ন তরুণ-তরুণীদের রক্ষা করার, মুক্ত করার সময় তাদের কোথায়?
লেখক : চিন্তাবিদ, সমাজবিজ্ঞানী ও সাহিত্যিক, সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ, বাংলাদেশের (সিডিআরবি) প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান এবং আর্থসামাজিক ত্রৈমাসিক ‘এশিয়ান অ্যাফেয়ার্সের’ সম্পাদক
mrshelley43@gmail.com