মা ন ব তা বি রো ধী অ প রা ধে র বি চা র

নিষ্ঠুর আলীমের মানবিক সাজা

হিসাব কষে কয়েক শ মানুষকে নিষ্ঠুর-ভাবে হত্যার ঘটনা ছাড়িয়ে গিয়েছিল মানবিকতার সব সীমা। কিন্তু সেই নিষ্ঠুরতার বিচারেও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল মানবিকতার ধ্বজাকেই সামনে তুলে ধরলেন। আর তাতে ফাঁসির দড়ি গলায় পরা থেকে বেঁচে গেলেন আবদুল আলীম। আমৃত্যু কারাবাসের সাজা দেওয়া হয়েছে তাঁকে।
ট্রাইব্যুনাল-২ রায়ে বলেন, ‘রাষ্ট্রপক্ষ বলেছে, আবদুল আলীম জয়পুরহাটের একজন অভিজাত ও উচ্চশিক্ষিত মানুষ। স্বাভাবিকভাবে মানবসভ্যতা ও মানবমর্যাদা সম্পর্কে তিনি ওয়াকিবহাল। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ-কালে স্থানীয়ভাবে তিনি অপরাধের দিকনির্দেশক হিসেবে কাজ করেছেন। শান্তি কমিটি ও রাজাকার বাহিনীকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করেছেন। রক্ষা পায়নি মানসিক রোগী, ৯০ বছরের বৃদ্ধও।’ তবে ৮৩ বছর বয়সী আলীমের জন্য অনুকম্পা নিয়ে এসেছে অসুস্থতা ও বার্ধক্য।
ট্রাইব্যুনাল বলেন, ‘অপরাধীর সাজা এমন হওয়া উচিত, যাতে অপরাধের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ শিকার ব্যক্তিরা ন্যায়বিচার পান। সেই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত নৃশংস অপরাধ ও ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচারহীনতা থেকে জাতি মুক্তি পায়। অপরাধের গুরুত্ব, অংশগ্রহণের ধরন এবং দায়ের মাত্রা—এ তিন বিবেচনায় আলীমের প্রাপ্য সাজা মৃত্যুদণ্ড। আলীমের মতো উচ্চপদস্থ ও শিক্ষিত অপরাধীকে সর্বোচ্চ সাজা দেওয়া উচিত। রাষ্ট্রপক্ষের এ বক্তব্যের সঙ্গে আমরা দ্বিমত করি না।’
আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন, ১৯৭৩-এর উল্লেখ করে ট্রাইব্যুনাল বলেন, ‘কোন অপরাধে কী সাজা দিতে হবে—আইন বা বিধির কোথাও তা সুনির্দিষ্ট বলা নেই। ৮৩ বছর বয়সী আলীম শারীরিকভাবে দুর্বল। তিনি অন্যের সাহায্য ছাড়া চলাফেরা করতে পারেন না এবং বার্ধক্যজনিত সমস্যায় ভুগছেন। মানসিক বা শারীরিকভাবে অক্ষম ব্যক্তিকে ফাঁসিতে ঝোলানো হয় না। আলীম হিসাব কষে শত শত মানুষকে মৃত্যুর মুখে দাঁড় করিয়েছেন, বর্বরতম পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু আইনের অক্ষর তাঁর বর্তমান শারীরিক অবস্থা উপেক্ষা করে নির্দয় হতে পারে না। এ জন্য মৃত্যুদণ্ড পাওয়ার যোগ্য অপরাধ করার পরও তাঁর সাজা লাঘব করা হলো।’
তবে ট্রাইব্যুনাল বলেন, ‘আলীমকে দেওয়া লাঘবকৃত সাজা কোনোভাবেই তাঁর কৃত অপরাধের গুরুত্বকে কমিয়ে দেবে না। সাজা লাঘব করা হয়েছে, অপরাধ নয়।’

চূড়ান্ত আদেশে ট্রাইব্যুনাল বলেন, প্রথম অভিযোগে দেশান্তরে বাধ্য করার দায়ে আবদুল আলীমকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হলো। ৬, ৭, ৯ ও ১২ নম্বর অভিযোগে হত্যার উদ্যোগ ও সহযোগিতার দায়ে তাঁকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হলো। ২, ৮, ১০ ও ১৪ নম্বর অভিযোগে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে হত্যার দায়ে জীবনের বাকি সময় তাঁকে কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে। অর্থাৎ স্বাভাবিকভাবে মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত আলীমকে কারাগারে থাকতে হবে। আমৃত্যু কারাদণ্ডের সাজা দেওয়ায় এর সঙ্গে ২০ বছর ও ১০ বছর কারাদণ্ডের সাজা একীভূত হয়ে যাবে।

প্রমাণিত না হওয়ায় ৩, ৪, ৫, ১১, ১৩, ১৫, ১৬ ও ১৭ নম্বর অভিযোগ থেকে আসামিকে খালাস দেওয়া হলো।

একাত্তরে কনভেনশন মুসলিম লীগের প্রভাবশালী নেতা আবদুল আলীম মুক্তিযুদ্ধকালে জয়পুরহাটে শান্তি কমিটি গড়ে তোলেন। তিনি ছিলেন ওই কমিটির সভাপতি। স্থানীয় পাট ব্যবসায়ী শাওনলাল বাজলার গদিঘর (বাণিজ্যিক দপ্তর) দখল করে সেখানে তিনি পাকিস্তানি সেনাদের ক্যাম্প, শান্তি কমিটির কার্যালয়, রাজাকারদের প্রশিক্ষণকেন্দ্র প্রভৃতি গড়ে তোলেন। ১৯৭৯ সালে তিনি বিএনপিতে যোগ দিয়ে সাংসদ নির্বাচিত হন। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান তাঁকে মন্ত্রী করেন।

২০১১ সালের ২৭ মার্চ মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে গ্রেপ্তার হওয়া আলীমকে ৩১ মার্চ শারীরিক অবস্থার কারণে জামিন দেওয়া হয়। বিচারের পুরোটা সময় জামিনে ছিলেন তিনি। যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে ২২ সেপ্টেম্বর ট্রাইব্যুনাল রায় অপেক্ষমাণ রেখে আদেশ দেওয়ার পাশাপাশি জামিন বাতিল করে তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

গতকাল সকাল পৌনে ১০টার দিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) কারাকক্ষ থেকে আলীমকে ট্রাইব্যুনালের হাজতখানায় নিয়ে রাখা হয়। সকাল ১০টা ৩৫ মিনিটের দিকে হুইলচেয়ারে করে তাঁকে এজলাসে আনা হয়। আসামির কাঠগড়ায় বসা লুঙ্গি ও ফতুয়া পরা আলীমকে নির্বিকার দেখাচ্ছিল। ১০টা ৫০ মিনিটে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান এবং দুই সদস্য বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি মো. শাহিনুর ইসলাম আসন গ্রহণ করেন।

বিচারপতি ওবায়দুল হাসান বলেন, ‘১৯১ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়ে ৬৮৮টি অনুচ্ছেদ আছে। এখানে সংক্ষিপ্ত রায় ঘোষণা করা হবে। তবে এর আগে সবাইকে একটা অনুরোধ করতে চাই। রায়ের বিষয়ে মন্তব্য করার আগে পূর্ণাঙ্গ রায় পড়বেন। রায়ের বিষয়বস্তু ও সাক্ষীদের বক্তব্য ভালো করে না জেনে যেনতেন বক্তব্য দিলে বিচারের ক্ষতি হয়।’

দুপুর ১২টা ৪০ মিনিটে ট্রাইব্যুনাল-২-এর পঞ্চম রায় ঘোষণা শেষ করে আসন ত্যাগ করেন তিন বিচারক।

ট্রাইব্যুনাল-২ এর আগে আরও চারটি মামলার রায় দিয়েছেন। বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে চৌধুরী মুঈনুদ্দীন ও আশরাফুজ্জামান খানের বিরুদ্ধে মামলাটিও এই ট্রাইব্যুনালে রায়ের অপেক্ষায় আছে। আর ট্রাইব্যুনাল-১ এ পর্যন্ত তিনটি মামলার রায় দিয়েছেন।

চার অভিযোগে আমৃত্যু কারাদণ্ড: তিনটি গণহত্যা ও একটি হত্যার দায়ে জীবনের বাকি সময় কারাভোগের সাজা পেয়েছেন আবদুল আলীম। ২, ৮, ১০ ও ১৪ নম্বর অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় আলীম এ সাজা পান।

দ্বিতীয় অভিযোগ অনুসারে, ১৯৭১ সালের ২৬ এপ্রিল পাকিস্তানি সেনারা জয়পুরহাট সদর থানার কড়ই কাঁদিপুর, চকপাড়া, সোনারপাড়া, পালপাড়া, মুন্সিপাড়া গ্রামে সশস্ত্র হামলা চালিয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনের বাড়িঘর লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে। পরে পাকিস্তানি সেনারা হিন্দু সম্প্রদায়ের ৩৭০ জন নিরস্ত্র ব্যক্তিকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে হত্যা করে, যার সঙ্গে আলীম সংশ্লিষ্ট ছিলেন।

এ অভিযোগের পক্ষে আনা রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণ করে ট্রাইব্যুনাল রায়ে বলেন, আলীম ও শান্তি কমিটির অন্য সদস্যরা ওই গণহত্যায় পাকিস্তানি সেনাদের সহযোগিতা করেছিলেন।

অষ্টম অভিযোগে বলা হয়েছে, একাত্তরের মে মাসের শেষ দিকে ক্ষেতলাল উপজেলার হিন্দুপল্লি, উত্তরহাট শহর, হারুনজাহাট ও তৎসংলগ্ন এলাকায় লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের পর হিন্দু সম্প্রদায়ের ১০ ব্যক্তিকে আলীমের নির্দেশে হত্যা করা হয়। এ অভিযোগটিও সাক্ষ্য-প্রমাণ দিয়ে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে পেরেছে রাষ্ট্রপক্ষ।

দশম অভিযোগ হলো, ১৯৭১ সালের জুনের শেষ দিকে ২৬ জন নিরস্ত্র মুক্তিযোদ্ধা জয়পুরহাটে পাকিস্তানি সেনাদের গণহত্যার শিকার হন, যার সঙ্গে আলীম সংশ্লিষ্ট ছিলেন।

রায়ে বলা হয়, ওই গণহত্যায় আলীম পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে থেকে শুধু কার্যকরভাবে অংশগ্রহণই করেননি, গণহত্যায় পরামর্শ ও মানসিক সমর্থন দিয়েছেন।

১৪তম অভিযোগ ছিল, একাত্তরের অক্টোবরে আলীমের নির্দেশে আহত মুক্তিযোদ্ধা ফজলুল করিমসহ তিনজন নিরস্ত্র মানুষকে পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকাররা হত্যা করে। রায়ে বলা হয়, আলীমের উসকানিমূলক বক্তব্যের জের ধরে ওই তিনজন হত্যাকাণ্ডের শিকার হন।

চার অভিযোগে ২০ বছর: ষষ্ঠ অভিযোগ ছিল, একাত্তরের মে মাসের প্রথম দিকে ক্ষেতলাল উপজেলার কোকতারা গ্রামের নয়জন নিরস্ত্র মানুষকে হত্যায় শান্তি কমিটির সদস্য ও রাজাকারদের নির্দেশ দেন আবদুল আলীম।

সপ্তম অভিযোগ অনুসারে, একাত্তরের ২৬ মে আলীম পাঁচবিবি উপজেলার নওদা গ্রামের চারজন নিরস্ত্র মানুষকে হত্যার জন্য পাকিস্তানি সেনা, রাজাকার ও স্থানীয় শান্তি কমিটির সদস্যদের উসকানি দেন।

নবম ও দ্বাদশ অভিযোগে আলীমের বিরুদ্ধে একাত্তরের ১৪ জুন ১৫ নিরস্ত্র মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যা ও ২৬ জুলাই জয়পুরহাটের স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ডা. আবুল কাশেমকে হত্যার অভিযোগ রয়েছে।

সাক্ষ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণে ৬, ৭, ৯ ও ১২ নম্বর অভিযোগে আলীমের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে হত্যার উদ্যোগ, সহযোগিতা ও উসকানির দায় প্রমাণিত হওয়ায় তাঁকে ২০ বছর কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

এক অভিযোগে ১০ বছর: আলীমের বিরুদ্ধে প্রথম অভিযোগ ছিল, একাত্তরের ২০ এপ্রিল বিকেলে তিনি পাকিস্তানি সেনাদের নিয়ে পাঁচবিবি উপজেলার দমদমা গ্রামের মেহের উদ্দিন চৌধুরীর বাড়িতে লুটপাট করে আগুন ধরিয়ে দেন। এ ঘটনায় মেহের উদ্দিন সপরিবারে দেশ ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হন।

রায়ে বলা হয়, রাষ্ট্রপক্ষের আনা সাক্ষ্য বিশ্লেষণ করে এটা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত যে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ফল হিসেবে মেহের উদ্দিন সপরিবারে দেশান্তরে বাধ্য হন, যাতে পাকিস্তানি সেনাদের পাশাপাশি আসামি সমানভাবে দায়ী। এ জন্য আলীমকে দোষী সাব্যস্ত করে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হলো।

প্রতিক্রিয়া: রায়ের পর অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম সাংবাদিকদের বলেন, ‘রায়ে সন্তুষ্ট কি না, এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করব না। আপিল করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে পূর্ণাঙ্গ রায় দেখে।’

রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি তুরিন আফরোজ বলেন, ‘আলীম একাত্তরে যেসব অপরাধ করেছেন, তাতে তিনি বয়স বিবেচনা করেননি। তাঁরও বয়স বিবেচনা না করে শুধু অপরাধ বিবেচনায় নিয়ে রায় দিলে আক্ষেপ থাকত না।’

আসামিপক্ষের আইনজীবী আহসানুল হক ও আবদুল আলীমের ছেলে সাজ্জাদ বিন আলীম বলেন, এ রায়ে তাঁরা সন্তুষ্ট নন। রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবেন তাঁরা।

আলীম মানবতাবিরোধী অপরাধী হিসেবে দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম, মুক্তিযুদ্ধ ’৭১ সন্তুষ্টি প্রকাশ করছে। তবে তাঁর সর্বোচ্চ শাস্তি না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছে তারা।