নিহত, আহতদের ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ, টাকার উৎস অজানা

রানা প্লাজা ধসে নিহত প্রত্যেকের পরিবারকে ১৮ লাখ ৩৮ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। পাশাপাশি তাঁদের নাবালক সন্তানের পড়াশোনার খরচও দেওয়া হবে।

গতকাল সাভার সেনানিবাসে সরকারের উচ্চপর্যায়ের এক সভায় ক্ষতিপূরণের এই হার নির্ধারণ করা হয়। সভায় আঘাতের ধরন ও অবস্থা অনুযায়ী ২২১ জন আহত ব্যক্তির ক্ষতিপূরণের অঙ্কও নির্ধারণ করা হয়।

তিন দিনের মধ্যে ক্ষতিপূরণের এই প্রস্তাব হাইকোর্টে পাঠানো হবে। হাইকোর্টের বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার ও মুহাম্মদ খুরশীদ আলম সরকারের বেঞ্চ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে রানা প্লাজায় হতাহত ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণের বিষয়ে জানতে চেয়ে রুল জারি করেন।

সাভারের নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল চৌধুরী হাসান সারওয়ার্দী সভায় সভাপতিত্ব করেন। সাভার সেনানিবাসে অনুষ্ঠিত সভায় ঢাকা জেলা প্রশাসন, সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা ও পোশাক কারখানার মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন।

এর আগে গত ২৯ আগস্ট কমিটির প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় অর্থনীতিবিদ এম এম আকাশকে প্রধান করে নিহত ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ নির্ধারণের জন্য একটি ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক এ বি এম আবদুল হান্নানকে প্রধান করে আহত ব্যক্তিদের অবস্থা মূল্যায়নের জন্য আরেকটি উপকমিটি করা হয়েছিল।

 এম এম আকাশ প্রথম আলোকে বলেন, প্রত্যেক শ্রমিকের গড় মাসিক আয় ধরা হয়েছে পাঁচ হাজার টাকা, সেই হিসাবে বার্ষিক আয় ৬০ হাজার টাকা। আর তাঁদের গড় কর্মজীবন ধরা হয়েছে ২৫ বছর। মুদ্রাস্ফীতির হার, ব্যাংকের সুদের হার যোগ-বিয়োগ করে ২৫ বছরে তাঁদের ‘হারানো আয়’ দেখানো হয়েছে ১১ লাখ ৩৩ হাজার টাকা। কল্যাণ ভাতা এক লাখ ৮০ হাজার টাকা। সৎকার ভাতা ২৫ হাজার টাকা। আর আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ‘কস্ট ফর পেইন অ্যান্ড সাফারিংস’ পাঁচ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে ধরা হয় ১৮ লাখ ৩৮ হাজার টাকা। এ ছাড়া কোনো শ্রমিকের নাবালক সন্তান থাকলে তাদের স্নাতক শ্রেণী পর্যন্ত পড়ার খরচ অথবা হারানো আয়ের ১০ শতাংশ হিসেবে এক লাখ ৩০ হাজার টাকা এককালীন দিতে হবে। সর্বোপরি তাঁদের পরিবারের উপযুক্ত এক সদস্যের চাকরির ব্যবস্থা করতে হবে।

আহত শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ নির্ধারণের বিষয়ে এম এম আকাশ বলেন, যাঁদের একটি অঙ্গহানি হয়েছে, তাঁদের ১০ লাখ টাকা, দুটি অঙ্গহানি হলে ১৫ লাখ টাকা আর যাঁদের এর বেশি আঘাত বা একেবারেই পঙ্গু হয়ে গেছেন যাঁরা, তাঁদের ২০ লাখ টাকা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

এম এম আকাশ বলেন, এর আগে তাঁরা বিভিন্ন উৎস থেকে অনুদান হিসেবে যেসব টাকা পেয়েছেন, সেগুলো এখানে ধর্তব্য হবে না। কারণ, অনুদান আর ক্ষতিপূরণ এক জিনিস নয়। যাঁরা এ ঘটনার জন্য দায়ী, তাঁরা শ্রমিকদের এই টাকা দেবেন। রানা প্লাজা ও সেখানে থাকা কারখানাগুলোর মালিকপক্ষ, বিজিএমইএ, বিদেশি পোশাক ক্রেতা প্রতিদষ্ঠান এবং যাঁদের অবহেলায় এ ঘটনা, সেসব সরকারি কর্মকর্তাদের এই দায় নিতে হবে।

সভার সূত্র জানায়, সভায় ক্ষতিপূরণের অঙ্ক নির্ধারণ করা হলেও টাকার উৎস সম্পর্কে কিছু বলা হয়নি। তবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে এ পর্যন্ত যে টাকা দেওয়া হয়েছে, তা ক্ষতিপূরণের মোট অঙ্কের সঙ্গে সমন্বয়ের প্রস্তাব দিয়েছে সভা।

তবে সভায় উপস্থিত বিজিএমইএর প্রতিনিধিরা একাধিকবার ক্ষতিপূরণের এই অঙ্ক কমানোর কথা বলেন। বিজিএমইএর প্রতিনিধিরা ক্ষতিপূরণ নির্ধারণের ক্ষেত্রে তাজরীনের অঙ্ক অনুসরণের কথা বলেন।

বিজিএমইএর সহসভাপতি শহিদুল আজিম বলেন, তাঁরা ইতিমধ্যেই বিভিন্ন মালিকের কাছ থেকে সংগ্রহ করে ১৫ কোটি টাকা দিয়েছেন। প্রস্তাবিত অঙ্কে ক্ষতিপূরণ দিতে অন্তত ৩০০ কোটি টাকা লাগবে। এই টাকা কোত্থেকে সংগ্রহ করা হবে।

আহত ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ মূল্যায়ন উপকমিটির সদস্য অধ্যাপক নকুল কুমার দত্ত সভায় বলেন, ১৫০ জন আহত শ্রমিকের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা প্রয়োজন। আহত ব্যক্তিদের জন্য ছয় লাখ টাকা করে এককালীন এবং তাঁদের পরিবারের একজন সদস্যকে চাকরি দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

গত ২৪ এপ্রিল সাভারের আটতলা রানা প্লাজা ধসে এক হাজার ১৩৩ জন নিহত ও দুই সহস্রাধিক শ্রমিক আহত হন। আটতলা ওই ভবনে পাঁচটি পোশাক কারখানা, বিপণিবিতান ও ব্যাংকের কার্যালয় ছিল।

শনাক্ত না হওয়া ২৯১টি লাশ বেওয়ারিশ হিসেবে জুরাইন কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। তবে সভায় ২৬১ জন নিখোঁজ ব্যক্তির তালিকার কথা বলা হয়েছে।

লাশ মিলেছে এমন নিহত ব্যক্তিদের পরিবার দাফনের জন্য ২০ হাজার ও প্রধানমন্ত্রীর তহবিল থেকে এক থেকে দুই লাখ টাকা করে পেয়েছে।

সভায় উদ্ধারকাজ করতে গিয়ে যাঁরা নিহত হয়েছেন, তাঁদের পরিবারকের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।