ন্যায়ের যোদ্ধা যখন সংকটে…আলী ইমাম মজুমদার

ঢাকার একটি ইংরেজি দৈনিক অতিসম্প্রতি বিশদ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে একজন ন্যায়নিষ্ঠ, সাহসী ও নিরলস কর্মকর্তা সম্পর্কে। মুনীর চৌধুরী তাঁর নাম। তিনি অল্প কিছুদিন থেকে প্রেষণে মিল্ক ভিটায় ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে কাজ করছেন। এটি সরকারের পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের অধীন একটি সংস্থা। মুনীর চৌধুরী অল্প সময়ে মাঝে মাঝে প্রতিষ্ঠানটিতে দুধ সংগ্রহ, যন্ত্রপাতি ক্রয় ও লোকবল নিয়োগে চলমান বেশ কিছু দুর্নীতির ঘটনা শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন। অপরাধের জন্য সাজা দিয়েছেন ২৩ জন কর্মচারীকে। তাঁদের কাছ থেকে জরিমানা হিসেবে আদায় করেছেন প্রায় ১০ লাখ টাকা। দুধ সংগ্রহ ও পাস্তুরীকরণ পর্যায়ে প্রতিষ্ঠানটিতে দুর্নীতি বন্ধের জন্য তিনি ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরার মাধ্যমে তদারকি করে অল্প সময়েই দুই কোটি টাকা অপচয় বন্ধে সক্ষম হন। ফিরিয়ে আনেন প্রতিষ্ঠানটিতে শৃঙ্খলা। এটা ক্রমেই লাভজনক হওয়ার দিকে চলছে। কিন্তু স্বাভাবিকভাবে তাঁর ওপর ক্ষিপ্ত হয়েছেন এখানে যাঁরা দুর্নীতি করে যাচ্ছিলেন, তাঁরা। তাঁদের কেউ কেউ ক্ষমতাসীন দলের প্রভাববলয়ে অবস্থান করছেন। তাঁদের অন্যায় আবদার রাখতে অপারগতা প্রকাশ করায় অভিযোগ করা হয়, তিনি ‘হেফাজতে ইসলাম’-এর সমর্থক এবং একজন বোর্ড সদস্যের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেছেন। এ অভিযোগের ভিত্তিতে নানামুখী তদন্ত শুরু হয়ে গেছে। অভিযোগ এলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্ত হতেই পারে।
এ কর্মকর্তা ইতিপূর্বে ছিলেন পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক। তাঁর পরিচালিত অভিযানে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বহু কায়েমি স্বার্থবাদী। মোটা অঙ্কের জরিমানা গুনতে হয়েছে তাঁদের। কারও চাপ বা আবদারে সাড়া দেননি তিনি। নন্দিত হয়েছেন পরিবেশসচেতন মানুষের কাছে। তবে কায়েমি স্বার্থবাদীরা সব সময় প্রভাবশালী মহলকে কবজা করে রাখেন। এখান থেকে তাঁকে বদলি করা হয়। এর আগে একপর্যায়ে এ কর্মকর্তা চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। তখন অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তির দখল করা বন্দরের কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি উদ্ধারে তিনি সফল নেতৃত্ব দেন। এখানেও বৈরিতার মুখে পড়েছিলেন। তবে হাল ছাড়েননি কোথাও।
এটি একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হলেও কিন্তু প্রতীকী। এ ধরনের ন্যায়নিষ্ঠ ও সাহসী কর্মকর্তা বেশ কিছু আছেন জনপ্রশাসনে। ক্ষেত্রবিশেষে তাঁরা উদ্যোগও নেন। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় এসব উদ্যোগ। সাফল্যের আলো দেখে গুটি কয়েক। মুনীর চৌধুরীর এসব সাফল্য যদি সরকারের সাধুবাদ লাভ করত, তাহলে অনেকেই তাঁর মতো হতে সচেষ্ট থাকতেন। কিন্তু অন্যায়ের বিরুদ্ধে কেউ অবস্থান নিলেই তাঁর বিরুদ্ধে স্বার্থান্বেষী মহল গোষ্ঠীবদ্ধভাবে নেমে পড়ে। যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে, তাদেরই একটি অংশের পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে তারা। প্রভাবশালী মহলের সহায়তায় সে কর্মকর্তাকে হেনস্তা করতেও সক্ষম হয়। এরই মধ্যে মিল্ক ভিটায় রটনা করা হচ্ছে, ব্যবস্থাপনা পরিচালককে শিগগির প্রত্যাহার করা হবে। রটনাটি সত্য হলেও বিস্মিত হব না। এমনটি ঘটেছে পাবনার একজন জেলা প্রশাসকের ক্ষেত্রে। বিএনপির সরকারের সময় ঘটেছে ফেনীর একজন জেলা প্রশাসকের ক্ষেত্রেও।
মুনীর চৌধুরীর বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে আগে উল্লেখ করা হয়েছে। এ বিষয়াদি যাঁরা তদন্ত করছেন, তাঁদের ন্যায় ও আইনের আলোকে তা করা সংগত। কাউকে খুশি করার জন্য তা করা হলে একজন কর্মকর্তার প্রতি অবিচার করা হবে। পাশাপাশি অবিচারের শিকার হবে দুর্নীতিতে নিমজ্জমান একটি প্রতিষ্ঠান।
উল্লেখ্য, প্রভাবশালী মহলের ইঙ্গিতে ক্ষেত্রবিশেষে এ ধরনের তদন্ত প্রতিবেদনও দেওয়া হয়। এ রকম করা হলে সবুজ বার্তা পাবে অপরাধীর দল। জনপ্রশাসনের সজ্জন, সাহসী ও ন্যায়নিষ্ঠ কর্মকর্তারা উদ্যম হারিয়ে ফেলবেন। কিছুকাল আগে অবসর নেওয়া পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের সচিব মিহির কান্তি মজুমদারের সময়কালে মুনীর চৌধুরী মিল্ক ভিটায় নিয়োগ পান। তিনি সংবাদপত্রকে বলেছেন, এ কর্মকর্তা সৎ ও জনস্বার্থে নিবেদিত। কোনো রাজনৈতিক চাপের কাছে নতিস্বীকার করেন না। তিনি আরও বলেছেন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে এ কর্মকর্তাকে প্রতিটি কর্মক্ষেত্রে অসাধু ব্যক্তিরা ঝামেলায় ফেলেছেন।
তাঁর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সম্পর্কে বলতে হয়, কোনো কর্মকর্তা কারও সঙ্গে অশোভন আচরণ করতে পারেন না। তবে তিনি কোন অবস্থায় কী করেছেন, তা বিশদভাবে খতিয়ে দেখা আবশ্যক। অন্যায় আবদার নিয়ে একজন কর্মকর্তাকে বারবার চাপ দিতে থাকলে তিনি ঈষৎ উষ্মা প্রকাশ করলেও তেমন দোষ দেওয়া যায় না। আর ‘হেফাজতে ইসলাম’-এর সমর্থক কি নাম এ অভিযোগটিও স্বচ্ছতার সঙ্গে তদন্তের দাবি রাখে। কেননা, কোনো কর্মকর্তাকে বেআইনি চাপে কাবু করতে সক্ষম না হলে ‘জামায়াত-শিবির’ আর অধুনা হেফাজতের সমর্থক বলা একটি সাধারণ সংস্কৃতিতে দাঁড়িয়েছে। যেমনটা বিগত সরকারের আমলে বলা হতো ‘আওয়ামী বাকশালী’। উভয় সময়কালেই এ ধরনের কর্মকর্তারা সংকটে দিন কাটান।
অবশ্য এভাবে কর্মকর্তাদের চাপ দিয়ে কাবু করার ছাপ আজ গোটা রাষ্ট্রযন্ত্রে দৃশ্যমান। যারাই ক্ষমতায় থাকে, দক্ষতানির্বিশেষে চাটুকার আর মোসাহেবরাই থাকেন প্রথম সারিতে। ব্যক্তি বা দলের বদল হয়। কিন্তু বদল হয় না সংস্কৃতির। আর যাঁরা আইন ও বিধিবিধান অনুসরণ করতে চান, তাঁরা বৈরীই থাকেন। পরিণতিতে গোটা রাষ্ট্রযন্ত্রে আজ মেরুদণ্ডহীন ব্যক্তিদের সরব উপস্থিতি। তাঁদের পক্ষে দেশ ও জাতির জন্য তেমন অবদান রাখতে পারার কথা নয়। যাঁরা রাখতে পারেন, তাঁরা মূল মঞ্চে থাকেন না। কেউ বা সাজঘরে আর অনেকেই দর্শকের সারিতে। এভাবে একটি দেশের শাসনব্যবস্থা দীর্ঘকাল চলতে থাকলে তার কার্যকারিতা কমতে বাধ্য।
বেসামরিক প্রশাসনযন্ত্রে প্রতিটি পর্যায়ে অযোগ্যতা ও অদক্ষতার ছাপ সুস্পষ্ট। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় আজ র‌্যাব গঠন করে স্থায়ীভাবে সামরিক বাহিনীর সহায়তা নিতে হচ্ছে পুলিশকে। সড়ক ও জনপথ বিভাগেরও অনেক কাজে আবশ্যক হচ্ছে তাদের সহযোগিতা। হাতিরঝিল প্রকল্পটি রাজউকের টাকায় বাস্তবায়ন করল সেনাবাহিনী। রক্ষণাবেক্ষণ করার দায়িত্ব নিল রাজউক। কয়েক মাসেই ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি’ অবস্থা। আবার গেছে সামরিক বাহিনীর কাছে রক্ষণাবেক্ষণের জন্য। এসব প্রাতিষ্ঠানিক অদক্ষতার অন্যতম কারণ দক্ষ, সৎ ও ন্যায়নিষ্ঠ কর্মকর্তাদের পেছনের কাতারে ঠেলে দেওয়া। তাঁদের সময়ে সময়ে হতে হয় হেনস্তার শিকার।
এ ধরনের কর্মকর্তারা যখন ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নিতে গিয়ে সংকটে পড়েন, তখন উপরস্থ কর্মকর্তাদের ন্যায়ত ও আইনানুগ দায়িত্ব থাকে সে ঝামেলা সামাল দেওয়া। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সে সংস্কৃতি বিলুপ্তপ্রায়। বরং তাঁরা কেউ কেউ বিভিন্ন কারণে সৎ ও সাহসী অধস্তন কর্মকর্তাদের অপছন্দ করেন। এ কারণগুলোর একটি তাঁরা নিজেরা সেসব গুণের অধিকারী নন। আর কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা না হলেও নিজের পদ-পদবি টিকিয়ে রাখার জন্য ‘ঝামেলা’ এড়িয়ে চলতে চান। কেউ কেউ অধস্তনের আর কোনো দোষ না পেলেও তাঁকে ‘ট্যাক্টলেস’ বলে মতামত দেন। ক্ষেত্রবিশেষে সক্রিয় সহযোগিতা করেন তাঁদের শায়েস্তা করতে। অবশ্য ব্যতিক্রমও আছে বেশ কিছু ক্ষেত্রে। তাঁরা প্রচেষ্টা নেন কিন্তু সহযোগী হিসেবে পান না অনেককেই। এ সংস্কৃতির অবসান ঘটিয়ে উপরস্থ কর্মকর্তাদের জোরালো অবস্থান নেওয়া দরকার সৎ ও সাহসী অধস্তন কর্মকর্তাদের আইনানুগ কাজের সমর্থনে। এ আইনসম্মত ও ন্যায়ানুগ ভূমিকা পালনে তাঁরা এগিয়ে না এলে উঁচু পদে বসে থাকার যৌক্তিকতাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়। সূচনায় হয়তো বা সাফল্যের পরিমাণ খুব কমই হবে। তবে সম্মিলিত ও অব্যাহত প্রয়াস থাকলে সাফল্য আসতে থাকবে। সমৃদ্ধ হবে জনপ্রশাসন।
এসব বিষয়ে দেশের সুশীল সমাজের একটি ভূমিকা থাকার কথা। তারা সুশাসনের কথা বলে। সোচ্চার হয় প্রশাসন দলীয়করণের বিরুদ্ধে। কিন্তু কোনো সৎ ও নিষ্ঠাবান কর্মকর্তা ন্যায়ের পক্ষাবলম্বন করতে গিয়ে সংকটে পড়লে সুশীল সমাজকে খুব একটা জোরালো ভূমিকায় দেখা যায় না। অবশ্য গণমাধ্যমকর্মীরা সুশীল সমাজেরই একটি অংশ। তাঁরা খবরগুলো ঠিকই দেন। কিন্তু প্রয়োজন এসব খবর অনুসরণ করে জোরালো প্রতিবাদ করা। বিশেষ করে, সুশাসনের পক্ষে যাঁরা কথা বলেন, তাঁদেরই অগ্রণী ভূমিকা নেওয়ার কথা। ভারতে এর ব্যাপক চর্চা রয়েছে।
অবশ্য এটা উল্লেখ করতে হয় যে আমাদের সুশীল সমাজের বড় অংশের ওপর রাজনীতির প্রভাব খুবই প্রকট। তাদের অনেকের বক্তব্যই রাজনীতিকদের বক্তব্যের প্রতিধ্বনিমাত্র। তা সত্ত্বেও ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার মতো ব্যক্তি এ সমাজে বেশ কিছু আছেন। আইনজীবীদের মধ্যে তাঁদের পেশার বাইরেও সমাজের কাজে ভূমিকা রাখার ভালো দৃষ্টান্ত অনেক রয়েছে। তাঁরা এ ধরনের অবিচারের মুখে উচ্চ আদালতে জনস্বার্থের মামলা লড়তে পারেন।
জনপ্রশাসনে মেধাবী, সৎ, দক্ষ ও সাহসী কর্মকর্তার প্রয়োজনীয়তা খুবই বেশি। কিন্তু তাঁদের অনুপাত বেশ কম বলেই অনেকে বলে থাকেন। এটা শুধু বললেই চলবে না। আপাতত যাঁরা আছেন, তাঁদের অন্তত ঝড়-ঝাপটা থেকে রক্ষা করলে অন্যরা অনুপ্রাণিত হবেন। পরিস্থিতির ইতিবাচক পরিবর্তন ধীরে ধীরে ঘটতে থাকবে। জনপ্রশাসনে সুশাসন প্রতিষ্ঠার দাবি যাঁরা করেন, তাঁরা ন্যায়ের সংগ্রামীদের সংকটে পাশে না দাঁড়ালে সে দাবি প্রাসঙ্গিকতা হারিয়ে ফেলে।
আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
majumder234@yahoo.com