পদ্মা সেতু প্রকল্প নিয়ে দুশ্চিন্তা

পদ্মা-যমুনার মিলনস্থল বদল

দেশের প্রধান দুটি নদী পদ্মা ও যমুনার মিলনস্থল পরিবর্তিত হয়েছে। এটি নগরবাড়ী-সংলগ্ন কাজিরহাট থেকে প্রায় ১৭ কিলোমিটার নিচে (দক্ষিণে) নেমে অবকাঠামোগত দিক দিয়ে স্পর্শকাতর দৌলতদিয়া ফেরিঘাটের কাছাকাছি চলে এসেছে। এতে নদীর পানি প্রবাহে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটেছে। এর সঙ্গে উজান থেকে আসা বন্যার পানি মিলে নদীর বুকে প্রবল আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।

এই আলোড়নে নদীতীরে ভাঙন বেড়েছে। এতে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া এবং প্রায় ২২ কিলোমিটার দূরের মাওয়ায় নৌ ও ফেরি যোগাযোগ ব্যাহত হচ্ছে। মাওয়ায় জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ পদ্মা সেতু প্রকল্প নিয়েও শঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে। প্রস্তাবিত ওই সেতু এলাকায় ব্যাপক ভাঙনের ফলে সেতুর নকশা পরিবর্তনের মতো বিষয়ও খতিয়ে দেখতে হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সরকারি সূত্র ও বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, দুই নদীর সংযোগস্থল আরও নিচে নামলে এবং ভাঙন অব্যাহত থাকলে পদ্মা সেতুর পূর্বপরিকল্পিত গাইডবাঁধ আরও সম্প্রসারিত করতে হবে। মাওয়া ও দৌলতদিয়া ফেরিঘাট স্থানান্তর করতে হবে। পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে পদ্মা সেতুর নকশা পরিবর্তনের মতো ঘটনাও ঘটতে পারে।

পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় ও এর অধীন কয়েকটি গবেষণা সংস্থার সূত্রগুলো জানায়, পদ্মা-যমুনার মিলনস্থল কয়েক দশক ধরে পরিবর্তন হতে হতে বর্তমান অবস্থায় এসেছে। ইতিমধ্যে পদ্মার ডান তীরে দেখা দেওয়া তীব্র ভাঙনে তীরভূমি ছাড়াও ১১টি গ্রামের প্রায় তিন হাজার বাড়িঘর নদীতে বিলীন হয়ে গেছে।

পাশাপাশি মৌসুমি বন্যার প্রবল স্রোতে (ঘণ্টায় প্রায় সাড়ে পাঁচ নটিক্যাল মাইল বা ১১ কিলোমিটার) ভেসে আসা বিপুল পরিমাণ পলি, বালু এবং বিলীন হওয়া বাড়িঘর ও গাছপালা নৌ ফেরি চলাচল ব্যাহত করছে। এই অবস্থা আরও সপ্তাহ খানেক অব্যাহত থাকতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

জানতে চাইলে সেন্টার ফর জিওগ্রাফিক্যাল ইনফরমেশন সিস্টেমের (সিইজিআইএস) উপনির্বাহী পরিচালক মমিনুল হক সরকার বলেন, উজান থেকে বন্যার পানি আসা কমলে স্রোত কমবে। কিন্তু দুটি নদীর মিলনস্থল কাছে চলে আসায় দৌলতদিয়া ভাঙবে। দুটি নদীর মিলনস্থল পরিবর্তন একটি স্বাভাবিক প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। এটা হবেই।

বিশিষ্ট পানিবিশেষজ্ঞ, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আইনুন নিশাত প্রথম আলোকে বলেন, পদ্মা ও যমুনার মিলনস্থল সব সময় খুব অস্থিতিশীল একটি জায়গা। এই দুটি নদীর প্রবাহ সমান শক্তির না হওয়াই এই অস্থিতিশীলতার প্রধান কারণ। এ কারণে মিলনস্থল পরিবর্তন হয়ে কখনো নিচের দিকে নামে, আবার কখনো কিছুটা ওপরে ওঠে। এবার যেখানে নেমেছে, সেখান থেকে যদি ওপরে না গিয়ে আরেকটু নিচে নামে, তাহলে দৌলতদিয়ায় ফেরিঘাট রাখা যাবে না।

সরকারি সূত্রগুলো জানায়, আরও একটি বড় দুশ্চিন্তার কারণ হিসেবে দেখা দিয়েছে মাওয়ায় পদ্মার ভাঙন। বর্তমানে ভাঙন হচ্ছে দক্ষিণ মেদিনী মন্ডল গ্রাম ও এর সংলগ্ন এলাকায়। এটি মূল পদ্মা সেতু এলাকা থেকে মাত্র এক কিলোমিটার দূরে। মমিনুল হক সরকার বলেন, সেতুর দিকে ভাঙন অব্যাহত থাকলে সেতুর নকশা পরিবর্তন এবং গাইডবাঁধ সম্প্রসারণ করতে হতে পারে।

জানতে চাইলে পদ্মা সেতু প্রকল্পের বিশেষজ্ঞ প্যানেলের সদস্য আইনুন নিশাত বলেন, পদ্মা সেতুর নির্মাণস্থলের ভাঙন সম্পর্কে সরকার, সেতু কর্তৃপক্ষ ও বিশেষজ্ঞরা অবহিত আছেন। এই ভাঙনের কারণে সেতুর নকশা পরিবর্তন করতে হবে কি না, তা পরীক্ষা করে দেখার জন্য ইতিমধ্যেই সেতু প্রকল্পের কানাডীয় পরামর্শক প্রতিষ্ঠানকে বলার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

ইতিমধ্যে প্রকল্প এলাকার কাছাকাছি সৃষ্ট ভাঙন রোধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সেতু কর্তৃপক্ষ পানি উন্নয়ন বোর্ডকে অনুরোধ করেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড এ ব্যাপারে একটি কার্যক্রম হাতে নিচ্ছে বলে জানান আইনুন নিশাত।

একাধিক সরকারি সূত্র বলেছে, মাওয়ায় পদ্মার ভাঙন দেখা দেয় ২৫-৩০ বছর পর পর। একবার ভাঙন দেখা দিলে তা চার-পাঁচ বছর অব্যাহত থাকে। মাওয়ায় নদী প্রায় ৫০ মিটার গভীর হওয়ায় ভাঙন মারাত্মক রূপ নেয়।