পর্যটন নিয়ে দু-চার কথা…মনজুরুল হক

টোকিওতে মাত্র শেষ হলো জাপানের ট্রাভেল এজেন্টসমূহের সমিতি জাটার ভ্রমণ মেলা ও পর্যটন ফোরাম। জাপানের রাজধানীর বার্ষিক এই আয়োজন হচ্ছে এশিয়ার বৃহত্তম এবং সারা বিশ্বের প্রধান একটি পর্যটন উৎসব ও মেলা। পর্যটন যেহেতু বিশ্বজুড়ে ক্রমেই অর্থনীতিকে সতেজ রাখার প্রধান একটি খাত হয়ে উঠছে, ফলে টোকিওর বার্ষিক ভ্রমণ মেলার দিকে সারা বিশ্বের পর্যটন সম্পর্কিত শিল্প খাতের আছে ঘনিষ্ঠ নজর, প্রতিবছর জাটার এই মেলায় বিভিন্ন দেশের অংশগ্রহণে যে বাস্তবতার প্রতিফলন সহজেই লক্ষ করা যায়। এবার যেমন ১৫০টি দেশ ও ভূখণ্ডের সহস্রাধিক প্রতিষ্ঠান মেলায় অংশ নিয়েছে, যে তালিকায় বাংলাদেশের পর্যটন করপোরেশনের বাইরে ভ্রমণসংশ্লিষ্ট নয়টি কোম্পানিও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
এশিয়ার অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও পর্যটন খাত এখন ক্রম প্রসারমাণ। ফলে জাপানের পর্যটন উৎসবে বাংলাদেশের পর্যটনশিল্প খাতের যোগদানকে অবশ্যই সময়োচিত বলে আখ্যায়িত করা যেতে পারে। সন্দেহ নেই, বাংলাদেশের এবারের অংশগ্রহণ ছিল আগের চেয়ে অনেক বেশি দৃষ্টিনন্দন, যদিও স্টলের আকার ও সাজসজ্জার দিক থেকে বাংলাদেশ এমনকি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায়ও কিছুটা পিছিয়ে ছিল। ভারত, শ্রীলঙ্কা ও নেপালের উপস্থিতি ছিল আরও কিছুটা বিস্তৃত এবং সহজে চোখে পড়ার মতো। সেই তুলনায় বাংলাদেশের স্টলের আকার ছিল ছোট এবং বাড়তি কোনো রকম আলংকারিক সংযোজন সেখানে ছিল না। তবে তারপরও বলতে হয়, লাল-সবুজ শাড়ি আর সবুজ রঙের পাঞ্জাবি/ফতুয়া গায়ে চাপানো জাপানি স্বেচ্ছাসেবী তরুণ-তরুণীদের উপস্থিতি এবং দেয়ালজুড়ে টাঙিয়ে রাখা বেঙ্গল টাইগারের বড় আকারের ছবি স্টলজুড়ে প্রাণোচ্ছল ভাব নিয়ে আসে, যা কিনা দর্শকদের দৃষ্টি এড়িয়ে যায়নি।
পর্যটনশিল্প খাত ক্রমেই অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক একটি খাত হয়ে উঠছে, শুধু পর্যটকের আগমনের অপেক্ষায় বসে থেকে সাফল্যের দেখা যেখানে পাওয়া এখন আর সম্ভব নয়। পর্যটন ব্যবসায় নিয়োজিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং সমিতি আজকাল বিভিন্ন দেশের পর্যটকদের গতিবিধির ওপর ঘনিষ্ঠ নজর রেখে তাঁদের চাহিদার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ ভ্রমণের ব্যবস্থা করে দেওয়ায় নিয়োজিত। বাংলাদেশের ভ্রমণসংক্রান্ত খাতেরও তাই সেদিকে নজর দেওয়া দরকার। জাপান যেহেতু হচ্ছে বিশ্বের প্রধান একটি ‘আউটবাউন্ড’ বা বহির্মুখী পর্যটকের দেশ, ফলে জাপানের দিকে লক্ষ রেখেই সেই কাজটি তারা শুরু করতে পারে।
জাপানের এই বহির্মুখী পর্যটনের ধারার সূচনা ১৯৭০-এর দশকে দেশটির অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে স্বীকৃতি লাভের পর থেকে। সূচনাপর্বে যেমন পর্যটনের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল নেহাত বিনোদন, যে সেবা প্রদান করার মধ্য দিয়ে থাইল্যান্ড ও ফিলিপাইনের মতো কয়েকটি দেশের পর্যটন খাত অভূতপূর্ব সাফল্য লাভ করতে পেরেছে। বলা বাহুল্য, প্রথম পর্যায়ের সেই পর্যটকদের প্রায় সবাই ছিলেন মধ্যবয়সী পুরুষ, ব্যবসা কিংবা চাকরিতে সাফল্য যাঁদের হাতে খরচ করার মতো প্রচুর অর্থ নিয়ে এসেছিল। তবে সময়ের বিবর্তনে জাপানি পর্যটকদের চাহিদা এবং বয়সভিত্তিক অবস্থান, উভয় দিকেই বেশ কিছু পরিবর্তন লক্ষ করা গেছে।
আগে যেখানে জাপানি পর্যটক মানেই ধরে নেওয়া হতো পাঁচতারা হোটেলে বিলাসী অবস্থান আর ব্র্যান্ড সামগ্রী কেনাকাটায় ব্যস্ত নারী-পুরুষ, তাঁদের জায়গায় ক্রমেই ব্যয় সাশ্রয়ে আগ্রহী নতুন প্রজন্মের পর্যটকের আবির্ভাব লক্ষণীয় হয়ে ওঠে। এই পর্যটকদের বড় এক অংশ হচ্ছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ-তরুণী, লেখাপড়া করে যাওয়ার পাশাপাশি পার্টটাইম চাকরি থেকে পাওয়া অর্থের অনেকটাই যাঁরা ভ্রমণে ব্যয় করতে চান, কেবল উদ্দেশ্যবিহীন ভ্রমণ এঁদের লক্ষ্য নয়। দেশ ও সমাজকে জানতে পারার বাসনাও এঁদের বিদেশ ভ্রমণে যাওয়ায় অনুপ্রাণিত করছে এবং এই দলের বড় এক অংশ গন্তব্য হিসেবে এশিয়ার বিভিন্ন দেশকে বেছে নিচ্ছে। তবে বিলাসী পর্যটকের প্রজাতি যে একেবারে বিলুপ্ত হয়ে গেছে, তা মোটেও নয়। বরং আগের সেই দলে নতুন যে বিত্তবান গোষ্ঠী এখন যোগ দিয়েছে, তারা হলো জাপানের তথাকথিত বেবি বুম প্রজন্মের নারী-পুরুষ, প্রায় পাঁচ দশক ধরে কঠোর পরিশ্রমের শেষে এখন যাঁরা অবসরজীবন যাপন করছেন। তাঁদের অনেকেই বিদেশ ভ্রমণে খরচ করছেন। তবে তাঁদের বিদেশ ভ্রমণের উদ্দেশ্য নিছক বিনোদন নয়। বরং তাঁরা নতুন অভিজ্ঞতা লাভ করার মধ্য দিয়ে জীবনকে আরও সমৃদ্ধ করে নিতে চাইছেন।
বাংলাদেশের পর্যটন খাত যে জাপানি পর্যটকের বিশেষ সেই দুটি গ্রুপ—এখনো পেশাগত জীবনে প্রবেশ না করা তরুণ-তরুণী এবং অবসরগ্রহণকারী স্বামী-স্ত্রী—এঁদের আকৃষ্ট করতে পারলে জাপানে ব্যবসায়িক সাফল্য পাবে, সেই আশা মনে হয় আমরা করতে পারি। তবে যেহেতু জাপানি পর্যটকেরা আগে থেকে সবকিছু যাচাই-বাছাই করে নিয়ে ভ্রমণে বের হতে অভ্যস্ত, আর তাই তাঁদের আকৃষ্ট করতে হলে গতানুগতিক ভ্রমণসূচির মধ্য দিয়ে নয়, বরং ব্যতিক্রমী নানা রকম বিষয় অন্তর্ভুক্ত রেখে তৈরি ভ্রমণ কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে তা করা দরকার। পরিবেশ ভ্রমণ, বাংলাদেশের মানুষের সামাজিক জীবন ও দেশের লোকজ সংস্কৃতিকে কাছে থেকে দেখা ও জানার সুযোগ করে দেওয়া ভ্রমণ, পয়লা বৈশাখের মতো লোকজ উৎসবের সঙ্গে সম্পর্কিত ভ্রমণ, শহর থেকে দূরে নির্জন প্রকৃতিকে উপভোগ করতে পারার ভ্রমণের মতো গতানুগতিক ধারার বাইরের ভ্রমণ জাপানের সেই দলভুক্ত পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে সক্ষম হবে বলে ধারণা করা যায়।
তবে এর বাইরে আরও যে কয়েকটি পূর্বশর্ত আবশ্যকীয় হয়ে দেখা দিতে পারে, তার মধ্যে শুরুতেই আছে জাপানের সঙ্গে সরাসরি বিমান চলাচল আবারও চালু করা। বিমানের সরাসরি যোগাযোগ না থাকা অনেক ক্ষেত্রে এমনকি আগ্রহী পর্যটকদের উৎসাহেও বাধা হয়ে দেখা দেয়। টোকিওতে বিমানের নিয়মিত ফ্লাইট এর আগে দুবার ব্যবসায়িক সাফল্য লাভে ব্যর্থতার কারণ দেখিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তবে সেই লোকসানের পেছনে মূল কারণ কী ছিল, তা কিন্তু কখনোই খতিয়ে দেখা হয়নি।
আমাদের জানামতে, বিমানের ফ্লাইট শুরু হওয়ার সূচনার দিনগুলোতে বিমানের অফিস রাখার পাশাপাশি প্রবাসী এক বাংলাদেশিকে স্থানীয় এজেন্ট হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, যিনি কিনা বিমানের কয়েক কোটি টাকা হস্তগত করে গায়েব হয়ে যান। ফলে লোকসানের পেছনে যে বিমানের ব্যবস্থাপনার ত্রুটি এবং সরকারের অযাচিত হস্তক্ষেপ অনেকাংশে দায়ী ছিল, তা ধরে নেওয়া যায়। এ ছাড়া নতুন কোনো রুটে বিমান চলাচল চালু হলে সেটার লাভবান হয়ে ওঠার জন্য যে সময়ের দরকার, সেই সময় মনে হয় আমরা দুবারের একবারও দিতে পারিনি।
আগেই উল্লেখ করেছি যে জাপান হচ্ছে পর্যটনের এক সোনার খনি। ২০১২ সালে প্রায় এক কোটি ৮০ লাখ জাপানি বিদেশ ভ্রমণ করেছেন, যার ৯০ শতাংশের বেশি ছিল পর্যটনের উদ্দেশ্যে ভ্রমণ। অন্যদিকে আমাদের বাংলাদেশের হিসাবে দেখা যায়, সেই একই বছর মোট ২৩ হাজার জাপানি নাগরিক বাংলাদেশে প্রবেশ করেন, যার মধ্যে মাত্র ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যটক ছিলেন বলে আমরা ধরে নিতে পারি। অর্থাৎ, এক কোটি ৮০ লাখ জাপানি পর্যটকের মধ্য থেকে আমরা আকৃষ্ট করতে পেরেছি মাত্র হাজার তিনেককে। ফলে সেই সোনার খনির ধারেকাছে যাওয়া আমাদের পক্ষে এখনো সম্ভব হচ্ছে না। কেন সেটা হচ্ছে না, সেই প্রশ্ন আরও ভালোভাবে খতিয়ে দেখে নতুন উদ্যোগ গ্রহণের এখনই মনে হয় সঠিক সময়।
টোকিও
মনজুরুল হক: শিক্ষক ও সাংবাদিক।