পর্যটন শিল্পের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ…সৈয়দ আখতারুজ্জামান

পর্যটন আর পানির কথা ভাবতেই আমাদের গ্রামবাংলার অতি পুরনো এক রেওয়াজের বিষয় মনে পড়ে গেল। জানি না ঘটনাটা আপনারা জানেন কি না। গ্রামের বাড়িতে ভোঁদড় যাতে পুকুরের মাছ খেয়ে না ফেলে সে জন্য এক অতি উচ্চমানের প্রতিরোধ কৌশল আছে। অসাধারণ এ কৌশল কে আবিষ্কার করেছিলেন, আজ আর তার কোনো হদিস পাওয়া যায় না। তবে তিনি যে অতি উচ্চমার্গের জ্ঞানসম্পন্ন ছিলেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আপনারা জানেন, দিনের আলোয় ভোঁদড়ের মাছ শিকারের খুব একটা উৎসাহ নেই। তার যত কর্মকাণ্ড রাতে। চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে এলে ভোঁদড় আস্তে আস্তে পুকুরপাড় বেয়ে জলে নেমে পড়ে। তারপর সারা রাত ধরে চলে মৎস্য শিকারযজ্ঞ। অতি প্রাচীনকালে বিপদাপন্ন গৃহস্থ কোনো রকমের রক্তারক্তি কিংবা ধরপাকড়ের হাঙ্গামায় না গিয়ে অতি নিরিবিলিতে এই মহাধুরন্ধরকে প্রতিরোধ করার এক দার্শনিক ও মনস্তাত্তি্বক কৌশল আবিষ্কার করেন। আর তা হলো, পুকুরের ভেতর ‘চালতা’ ফেলা। ডাসা ডাসা আস্ত চালতা পুকুরে ফেলে দেওয়া হয়। পানিতে ডুবে থাকায় কয়েক দিনের মধ্যে এই চালতাগুলো খুব পিচ্ছিল হয়ে যায়। ভোঁদড় রাতে যখন মাছ শিকারের জন্য পুকুরের তলা চষে ফেলতে থাকে, তখন হঠাৎ দেখা মেলে এই চালতার। ভোঁদড় থমকে দাঁড়ায়। কাছে যায়। আস্তে করে টোকা দেয়। তারপর ধরতে যায়। আর তখনই শুরু হয় ঝামেলা। পিচ্ছিল চালতা সহজে বাগে আনা যায় না। বড় পিছলায়। যতই পিছলায়, ততই ভোঁদড়ের জেদ বাড়ে। ততই সে তাকে আরো বাগে আনতে চায়। একসময় সকালের আলো ফোটে। ভোঁদড়ের আর মাছ শিকার হয় না। তার নিজেরও পাল্টা কৌশল আছে। কিন্তু আজকে আর সে গল্প না হয় না-ই বললাম। যেটুকু বললাম, সেটুকু অকারণে বলিনি নিশ্চয়ই। আমাদের দেশের পর্যটন যেন এই পিচ্ছিল চালতার শিকার। ৪২ বছর ধরে কোনো কিছুতেই এই চালতা বাগে আনা যাচ্ছে না। পুরনো চালতাগুলো নরম হলেই গৃহস্থ আরো কিছু নতুন চালতা পুকুরে ফেলে দেন। রাত শেষ হয়ে আলো ফুটে যাচ্ছে- আমাদের মাছ শিকারের কী হবে?
কাণ্ডারি হুঁশিয়ার! কাণ্ডারি কাটায় নির্ঘুম। কাণ্ডারি ঘুমালে সব শেষ! আমাদের দেশের পর্যটনের কি কোনো কাণ্ডারি আছে? কে সে? কারা তারা? কেমন তাদের চেহারা? তারা কেন কাণ্ডারি? কে দেবে এ রকম আরো হাজার হাজার লাখ লাখ প্রশ্নের উত্তর। পর্যটন পৃথিবীর সবচেয়ে বৃহৎ কর্মসংস্থানস্থল। এই বাক্যটির মানে কী দাঁড়ায়, আজকে তা বোঝার সময় এসেছে। ভাবনার সময় এসেছে। ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম কাউন্সিলের রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০১৩ সালে প্রত্যক্ষভাবে বাংলাদেশের ট্রাভেল ও ট্যুরিজম খাত মোট ১২ লাখ ৮১ হাজার ৫০০ জনের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেছে। পরোক্ষ প্রভাবে সৃষ্ট কর্মসংস্থান যোগ করলে তা দাঁড়ায় ২৭ লাখ ১৪ হাজার ৫০০ জনে। ধারণা করা হচ্ছে, ২০২৩ সালে এ সংখ্যা গিয়ে দাঁড়াবে প্রায় ৪০ লাখে, যা তখনকার মোট কর্মসংস্থানের ৪.২ শতাংশ হবে। সুতরাং কাণ্ডারি হুঁশিয়ার!
বছর দুয়েক আগ পর্যন্ত তো একটি ট্যুরিজম বোর্ডও আমাদের ছিল না। এই বোর্ড দিয়ে এখন আমরা কী করব সেটা ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না। যা হলো তা কেন হলো, কী করে হলো? অনেকেই এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাচ্ছেন না। উত্তর পাবে কী করে! হাতে ছাতা থাকতেও যে বৃষ্টিতে ভেজে, সে সম্ভ্রমও হারায়, করুণাও হারায়।
নিরাশায় ডোবে সব, আশায় ভাসে বিশ্ব। ১৬ কোটি মানুষে ঠাসা ছোট্ট আমার দেশ। এত আঘাতের পরও এখনো বাঁচার স্বপ্নে বিভোর এক জাতি আমরা। হয়তো সে কারণেই অভ্যাসবশত দেশের পর্যটন খাতের এই হাস্যকর অবস্থায়ও একে ‘অমিত সম্ভাবনাময় এক শক্তির আধার’ বলে আস্ফালন করে চলেছি। আমাদের দেশে সুন্দরবন ধ্বংস করে চলছে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প তৈরির বিস্ময়কর পরিকল্পনা। এই যদি হয় পর্যটন খাতের প্রতি সরকারের গুরুত্বের নমুনা, তাহলে আজ সুন্দরবন বাঁচাতে আমাদের আন্দোলন করতে হবে, বুড়িগঙ্গা বাঁচাতে কাল আমাদের রাস্তায় নামতে হবে, এ আর আশ্চর্যের কী!
আমার দেশের পরিবেশদূষণের জন্য পশ্চিম থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ের আগে বুড়িগঙ্গার পানি দূষণের জন্য তার তীরবর্তী বটবৃক্ষের ছায়ায় যেসব বিষাক্ত ধুতরা গাছ জন্মেছে, তা ছেঁটে ফেলার কাজটি কে করবেন? মেঘনা-গোমতী-শীতলক্ষ্যার তলা যাঁরা চুরি করে নিয়ে গেলেন, বাঁধ দিয়ে যাঁরা নদী গিলে ফেললেন, তাঁদের কী হবে? আর তার ফলে সৃষ্ট খরা-বন্যা আর দুফোঁটা বৃষ্টিতে শহর তলিয়ে গেলে কোটি কোটি মানুষের অশেষ ভোগান্তির ক্ষতিপূরণ কে আদায় করবে?
হাল ছেড়ে দেওয়া কোনো কাজের কথা নয়। ৫ সেপ্টেম্বরের পর ২২ সেপ্টেম্বর পর্যটনকর্মী, ব্যবসায়ীরা আবার জড়ো হলেন। বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের সভাকক্ষে ৫২টি প্রতিষ্ঠানের শতাধিক পর্যটনকর্মী। উপস্থিত ট্যুরিজম বোর্ড, পর্যটন করপোরেশনের চেয়ারম্যান, দেশের বরেণ্য সব পর্যটন ব্যক্তিত্ব। সারা দিন ধরে কর্মশালায় ১০টি সমস্যা নিয়ে তুমুল আলোচনা চলল। আবাসন সমস্যা, নিরাপত্তা, ট্যুরিস্ট গাইড, যাতায়াত ব্যবস্থা ও পরিবহন, স্পর্শকাতর স্থানগুলোর ব্যবস্থাপনা, আন্তর্জাতিক মেলায় অংশগ্রহণ, মার্কেটিং প্রমোশন, স্যুভেনির ও গিফট, দৃশ্যমান ও অদৃশ্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং ট্যুরিস্ট স্পটের ব্যবস্থাপনা ও তদারকি বিষয়ে দিনব্যাপী সমস্যা ও সমাধান নিয়ে আলোচনা হলো। সমাধান বলতে আকাশচুম্বী স্বপ্নবিলাসী প্রকল্প নয়, কার্যত সহজেই বাস্তবায়ন সম্ভব, এমন সমাধান তুলে আনা হয়েছে।
বিপরীত চিত্র দেখুন। নিঃসন্দেহে এ চিত্র বেদনার। পর্যটন ব্যবসা চাঁদাবাজি বা টেন্ডারবাজি করে হয় না। গাঁটের পয়সা খরচ করে বিদেশে ধরনা দিয়ে বিদেশি পর্যটকদের দেশে এনে দুটো বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের যে মহাকঠিন কাজটি ট্যুর অপারেটররা করে থাকেন, তার মর্ম বোঝার লোক রাজনীতিবিদদের মধ্যে বোধ করি কেউ নেই। দেশের এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে বেশ কিছু ইনবাউন্ড ট্যুর অপারেটর প্রতিষ্ঠানের বিদেশি পর্যটকরা তাঁদের বাংলাদেশ ভ্রমণ বাতিল করেছেন। এই ক্ষতি কার? প্রত্যক্ষভাবে অবশ্যই ট্যুর অপারেটরের একার। কিন্তু পরোক্ষভাবে এই লাভ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন হোটেল-রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ী, পরিবহন মালিক ও পর্যটনের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেক মানুষ। সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় বাংলাদেশের পর্যটনের নাম কোনো দিন ছিল না, আজও নেই।
তবু হতাশ নই। নিরাশায় ডুবে, আবার আশা নিয়ে মিলিত হচ্ছে সবাই। মঞ্চের নাম ‘উই লাভ ট্যুরিজম’। চিহ্নিত করা হয়েছে শতাধিক পর্যটন স্থান। ছাত্রছাত্রী, তরুণ-তরুণীর মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া হবে পর্যটন সম্ভাবনার বার্তা। বলা হবে, চিনে নাও তোমার এলাকার পর্যটন পণ্য। বলা হবে, একে রক্ষা করো, এই সৌন্দর্য আমাদের অর্থ দেয়, আমাদের বাঁচিয়ে রাখে। একে রক্ষা করো। তোমার এলাকার পর্যটন পণ্য পরিচ্ছন্ন ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বও তোমার। একে রক্ষা করো। লালবাগ কেল্লা দিয়ে যাত্রা শুরু হয়েছে গতকাল। রহমতুল্লাহ স্কুলের ছাত্রছাত্রীসহ শতাধিক পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি সমবেত হয়েছিলেন লালবাগ কেল্লায়। পরিচর্যা ও পরিচ্ছন্ন করছেন ঐতিহাসিক এই লালবাগ কেল্লাকে। এভাবে চলবে কর্মসূচি শহর থেকে বন্দরে, বন্দর থেকে গ্রামে, সর্বত্র। ছাত্রছাত্রীদের পাঠ্যপুস্তকে পর্যটন বিষয়ে নেই কোনো অধ্যায়। তাই লেখা হচ্ছে ছাত্রছাত্রীদের পাঠ উপযোগী সহজবোধ্য পর্যটনবিষয়ক বই। এই বইগুলো সহজলভ্য করা হবে। তৈরি করা হবে পর্যটনবিষয়ক তথ্যচিত্র। দেশজুড়ে নানা স্থানে চলবে এর প্রদর্শনী। বেসরকারি খাত ‘ভালো সমাধান’ খুঁজে বের করতে আর কী কী করতে পারে?
লেখক : প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, বিয়ন্ড অ্যাডভেঞ্চার অ্যান্ড ট্যুরিজম
akhter.bst@gmail.com