পানির দরে ভাড়া

মতিঝিলে একটি সরকারি ভবনের ভাড়া প্রতি বর্গফুট মাসে ৫৯ পয়সা

পানির দামে বললেও হয় না। বোতলের পানি হোক আর ওয়াসার পানি, তার চেয়ে সস্তা ঢাকার মতিঝিলে একটি সরকারি ভবনের ভাড়া। ভবনটির আট হাজার ৪৯৬ বর্গফুটের একটি ফ্লোর ভাড়া দেওয়া হয়েছে মাসে মাত্র পাঁচ হাজার টাকায়। অর্থাৎ প্রতি বর্গফুটের ভাড়া দাঁড়ায় মাসে ৫৯ পয়সা! তাও আবার দু-এক বছরের জন্য নয়, ১৯৮৩ সাল থেকে ‘শাশ্বতকালের জন্য’ এভাবে ভাড়া দেওয়া হয়েছে ভবনটি।
আর এই ‘অদ্ভুতুড়ে’ ভাড়া ভোগ করছেন মাম অটোমোবাইল ও মাম গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান আব্দুল মালিক। শুধু তাই নয়, এই নস্যিতুল্য ভাড়াটুকুও সরকারের ঘরে
থাকছে না। রেন্ট কন্ট্রোল বোর্ডে জমা দিয়ে আবার ‘ভবন রক্ষণাবেক্ষণের’ নামে সেই টাকা মাসেরটা মাসেই তুলে নিচ্ছেন ভাড়াটিয়া আব্দুল মালিক। ধারণা করা হচ্ছে, তাঁর সঙ্গে যোগসাজশের মাধ্যমেই বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অসাধু কর্মকর্তারা ব্যবস্থা করে দিয়েছেন এই ‘আরামের ভাড়া’।
জানা গেছে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ওই ভাড়াটিয়া নিয়ে বেকায়দায় পড়েছে মেঘনা পেট্রোলিয়াম। ‘অবৈধ’ ওই ভাড়াটিয়াকে উচ্ছেদ করে সম্পত্তি বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য মেঘনা পেট্রোলিয়াম, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন এবং জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে দফায় দফায় চিঠি দিয়ে তাগাদা দেওয়া হচ্ছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যান মো. ইউনুসুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আব্দুল মালিকের সঙ্গে অবৈধ চুক্তি বাতিল করার জন্য আমরা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছি। তারা এখনো কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি। তাদের সিদ্ধান্ত জানার পরই এ ব্যাপারে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা হবে।’
মতিঝিলের মতো জায়গায় আট হাজার ৪৯৬ বর্গফুটের ফ্লোর মাত্র পাঁচ হাজার টাকা ভাড়া হতে পারে কিভাবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে অনেকের পক্ষেই অনেক কিছু সম্ভব। আমি এগুলো নিয়ে আর মন্তব্য করতে চাই না।’
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, “এ ধরনের চুক্তি করা হয়েছে বলে আমাদের বিশ্বাসই হচ্ছে না। বিশেষ করে ‘শাশ্বতকালের জন্য’ ভাড়া দেওয়ার বিষয়টি মোটেই যৌক্তিক মনে হয় না। তাই ১৯৮৩ সালে আব্দুল মালিকের সঙ্গে করা চুক্তির নথি অনুসন্ধান করা হচ্ছে। ওই নথি পাওয়ার পরই তা পর্যালোচনা করে চুক্তি বাতিলের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং মেঘনা পেট্রোলিয়ামের কর্মকর্তারা জানান, দৈনিক বাংলা মোড়সংলগ্ন মেঘনা ভবনসহ ২২ দশমিক ৫ একর সম্পত্তির মালিক ছিল পাকিস্তানি মালিকানাধীন ‘সালাতিন সিন্ডিকেট লিমিটেড’। স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রপতির আদেশ নম্বর ১৬/১৯৭২-এর আওতায় অবাঙালি মালিকানাধীন অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সালাতিন সিন্ডিকেট পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসেবে তার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ সরকার অধিগ্রহণ করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করে। পরে ১৯৭৯ সালে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় প্রকাশিত প্রেস টেন্ডারের মাধ্যমে তা বিক্রির ব্যবস্থা করে। ওই দরপত্রে অংশ নিয়ে সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে সালাতিন সিন্ডিকেটের ৮০ শতাংশ মালিকানা কিনে নেয় মেঘনা পেট্রোলিয়াম। ১৯৮১ সালের ২ নভেম্বর এই সম্পত্তির মালিকানা লাভ করে মেঘনা পেট্রোলিয়াম। ওই দরপত্রে অংশগ্রহণ করেছিলেন ভাড়াটিয়া ইস্টার্ন অটোমোবাইলের আব্দুল মালিকও। তবে তিনি সর্বোচ্চ দরদাতা না হওয়ায় তা কিনতে পারেননি। তার পর থেকেই ওই সম্পত্তি নিজের করে নেওয়ার অপচেষ্টায় লিপ্ত হন তিনি।
ওদিকে ১৯৭৯ সালে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় টেন্ডার দেওয়ার আগেই আবুল হোসেন নামে সালাতিন সিন্ডিকেটের একজন পরিচালক বাকি ২০ শতাংশ শেয়ারের মালিকানা দাবি করে মামলা করেন। মামলায় তিনি হেরে যান। পরে মেঘনা পেট্রোলিয়াম বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে ২০১০ সালের ২০ অক্টোবর বাকি ২০ শতাংশ মালিকানাও চার কোটি ২৮ লাখ ৩৫ হাজার ৫০০ টাকায় কিনে নেয়। অর্থাৎ ওই প্রতিষ্ঠানের শতভাগ স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির মালিকানা অর্জন করে মেঘনা পেট্রোলিয়াম। সেই হিসেবে সালাতিন সিন্ডিকেটের মোট ২২ দশমিক ৫ কাঠা জমি ও তার ওপর আট হাজার ৭৮৪ বর্গফুট আয়তনের দুই তলা ভবন ও সাত হাজার ৪১৬ বর্গফুট পেট্রোল পাম্পের বৈধ মালিক মেঘনা পেট্রোলিয়াম।
এসব তথ্য উল্লেখ করে গত ১ অক্টোবর জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে বাণিজ্যসচিব মাহবুব আহমেদকে একটি ডিও পাঠিয়ে বলা হয়েছে, “ভাড়াটিয়া আব্দুল মালিক ১৯৮৩ সালের ২৩ জুন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষে একটি ভুয়া ‘সুনাম ও দখল হস্তান্তর দলিল’ তৈরি করে সালাতিন সিন্ডিকেটের দুই তলা বিল্ডিংয়ের নিচতলার ৮৪৯৬ বর্গফুট জায়গা মাসিক ৫০০০ টাকা ভাড়া প্রদান সাপেক্ষে দখলদার নিযুক্ত হন এবং ভবনে অদ্যাবধি অবস্থান করছেন। ওই ভাড়াটিয়া ভাড়ার টাকা রেন্ট কন্ট্রোল বোর্ডে জমা দিলেও তা আবার রক্ষণাবেক্ষণের নামে তুলে নিচ্ছেন।”
চিঠিতে আরো বলা হয়েছে, “সরকারি সিদ্ধান্ত ও বিধি অনুযায়ী বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সালাতিন সিন্ডিকেটের শতভাগ মালিকানা মেঘনা পেট্রোলিয়ামের কাছে হস্তান্তর করায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আব্দুল মালিক অ্যান্ড কোং-এর সম্পাদিত তথাকথিত ‘সুনাম ও দখল হস্তান্তর দলিল’ বাতিলযোগ্য এবং ওই দলিলের মাধ্যমে আব্দুল মালিক ভাড়াটিয়া হিসেবে অবস্থান করতে পারে না মর্মে প্রতীয়মান হয়। এ অবস্থায় মেঘনা পেট্রোলিয়াম-এর শতভাগ মালিকানাধীন সালাতিন সিন্ডিকেট অবৈধ ভাড়াটিয়া আব্দুল মালিক অ্যান্ড কোং-এর দখল করা নিচতলার ৮৪৯৬ বর্গফুট জায়গা দখলমুক্ত করে তা মেঘনা পেট্রোলিয়ামকে হস্তান্তর তথা দখল বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করা হলো।”
সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ভাড়াটিয়া আব্দুল মালিকের সঙ্গে সম্পাদিত বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের চুক্তি বাতিলের বিষয়ে গত ১৫ জুলাই বাণিজ্যসচিব মাহবুব আহমেদের সঙ্গে বৈঠক করেন জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারা। আব্দুল মালিকের কাছে থাকা ‘সুনাম ও দখল হস্তান্তর দলিল’-এর সত্যতা নিয়ে ওই বৈঠকে সন্দেহ পোষণ করেন বাণিজ্যসচিব। এমনকি দলিলে উল্লেখ করা ‘শাশ্বতকালের জন্য’ ভাড়া দেওয়ার বিষয়টিও আইনসিদ্ধ নয় বলে উল্লেখ করেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, দৈনিক বাংলা মোড় থেকে মতিঝিলের দিকে যেতে দুই ভবন পরেই একটি পেট্রোল পাম্পসহ মেঘনা ভবন। ওই ভবনের নিচতলায় আব্দুল মালিকের ছবি টানানো। তাঁর নামের সঙ্গে পদবি যোগ করা হয়েছে মাম অটোমোবাইল ও মাম গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান। একটু ভেতরে ঢুকতেই দেখা গেল, তিনজন কর্মকর্তা কাজ করছেন। তাঁদের কাছে জানতে চাইলে বলেন, আব্দুল মালিক অসুস্থ। চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে গেছেন। যোগাযোগ করার জন্য আব্দুল মালিকের পরিবারের কারো ঠিকানা ও মোবাইল ফোন নম্বর চাইলে তাঁরা বলেন, তাঁর ছেলেও সিঙ্গাপুরে আছেন। যোগাযোগ করার মতো এখন দেশে কেউ নেই।
দ্বিতীয় তলায় অফিসে কর্মরত মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের সহকারী মহাব্যবস্থাপক মো. আবদুর রশিদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যে দলিল দেখিয়ে আব্দুল মালিক জায়গাটি দখল করে রেখেছেন, সেই দলিলকে ভুয়া মনে করছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। ১৯৮৩ সালে মাসে মাত্র পাঁচ হাজার টাকায় আট হাজার ৪৯৬ বর্গফুট ভাড়া নেওয়ার পর ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত আব্দুল মালিক মেঘনা পেট্রোলিয়ামকে ভাড়া দিয়েছেন। তার পর থেকে তিনি আর কোনো ভাড়া দেননি মেঘনাকে। রেন্ট কন্ট্রোল বোর্ডে ভাড়া পরিশোধের কিছুদিন পর ভবন রক্ষণাবেক্ষণের নাম করে সেই টাকা আবার তুলে নিচ্ছেন আব্দুল মালিক। অনেকটা বিনা ভাড়ায় আট হাজার ৪৯৬ বর্গফুট ফ্লোর ভোগদখল করছেন তিনি। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় যেহেতু এই সম্পত্তির মালিক নয়, শতভাগ মালিক মেঘনা পেট্রোলিয়াম, তাই আব্দুল মালিকের সঙ্গে করা চুক্তি বাতিল করে তাঁকে উচ্ছেদের পর দখল বুঝিয়ে দিতে আমরা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করেছি।’
মেঘনা পেট্রোলিয়ামের কর্মকর্তারা জানান, ২০১২ সালের ১৭ জুলাই একই বিষয়ে তখনকার বাণিজ্যসচিব গোলাম হোসেনকে চিঠি দেয় জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। ওই বছরের ১৮ অক্টোবর বিপিসির চেয়ারম্যান মো. ইউনুসুর রহমান জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিবের কাছে এক চিঠিতে বলেন, সালাতিন সিন্ডিকেটের ভাড়াটিয়া ইস্টার্ন অটোমোবাইলস লিমিটেডের স্বত্বাধিকারী আব্দুল মালিক বিভিন্ন অপতৎপরতার মাধ্যমে ওই প্রতিষ্ঠানের মালিকানা স্বত্ব ক্রয়ে ব্যর্থ হয়ে ১৯৮৩ সালের ২৩ জুন বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে সুনাম ও দখল হস্তান্তর দলিল করে নিচতলার ৮৪৯৬ বর্গফুট জায়গা শাশ্বতকালের জন্য মাসিক ৫০০০ টাকা ভাড়া প্রদান সাপেক্ষে দখলদার নিযুক্ত হন এবং তখন থেকে অদ্যাবধি অবস্থান করছেন। সরকারি সিদ্ধান্ত ও বিধি অনুযায়ী বাণিজ্য মন্ত্রণালয় শতভাগ মালিকানা হস্তান্তর করেছে, সেহেতু ওই দলিলও বাতিলযোগ্য।
ওই চিঠিতে বলা হয়, ‘সালাতিন সিন্ডিকেট লিমিটেডের অবৈধ ভাড়াটিয়া আব্দুল মালিক অ্যান্ড কোং-কে উচ্ছেদ না করা পর্যন্ত ঢাকার মতিঝিলে মূল্যবান ২২ দশমিক ৫ কাঠা বা ১৬,২০০ বর্গফুট জমি সদ্ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে এমপিএল তথা সরকার ভাড়া বাবদ বিপুল পরিমাণ অর্থ প্রাপ্তি হতে বঞ্চিত হচ্ছে।’
এর আগে ২০১২ সালের ১১ জুন বিপিসির তখনকার চেয়ারম্যান আবুবকর সিদ্দিকও একই বিষয়ে জ্বালানিসচিবকে চিঠি লেখেন বলে জানা যায়।