পুলিশের কাঠামোগত পরিবর্তন…এ এম এম শওকত আলী

নতুন পুলিশ আইনের খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে। এ খসড়া নতুন নয়। কারণ ২০০৭ সালে যে খসড়া তৈরি করা হয়েছিল সেটাই আবার কিছু সংশোধন করে পুলিশ সদর দপ্তর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে বলে জানা গেছে। মন্ত্রণালয় এপ্রিল মাসে খসড়া পাওয়ার পর এক যুগ্ম সচিবের নেতৃত্বে এটি পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য একটি কমিটি গঠন করেছে। কমিটির প্রতিবেদন দুই মাসের মধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে দাখিল হওয়ার কথা। এ কাজটা সময়মতো করা হয়েছে কি না সে বিষয়ে ২ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত সংবাদে কিছু জানা যায়নি। ওই দিন প্রকাশিত সংবাদে যে বিষয়টিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে তা হলো, সংশোধিত খসড়া চূড়ান্ত হলেও পুলিশ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হবে না। এর কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, ২০০৭-এর খসড়া পুলিশ আইনে আইজিপিসহ কিছু ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তার পদায়ন ও পদোন্নতির বিষয়টি সম্পর্কে পুলিশ কমিশন গঠন করা হবে। ২০০৭ সালেও এ নিয়ে প্রচুর বিতর্ক হয়েছে। শেষ পর্যন্ত একপর্যায়ে এ বিষয়টি খসড়া থেকে রহিত করার বিষয়ও আলোচিত হয়। পরবর্তী পর্যায়ে ওই সময়ে প্রণীত খসড়া পুলিশ সদর দপ্তরে চূড়ান্ত খসড়া করার জন্য আবার পাঠানো হয়। ওই সময়ও এ বিষয়ে প্রাথমিক খসড়াটি মন্ত্রণালয় পর্যায়ে পরীক্ষার জন্য কমিটি করা হয়েছিল। অবস্থা দেখে মনে হয়, এ খসড়া এখনো পরীক্ষার বৃত্তমুক্ত হয়নি। ইতিমধ্যে জানা গেছে, আগামী জাতীয় নির্বাচন সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যেই হবে। সংবিধান এ কথাই স্পষ্ট করে বলে দিয়েছে। যেকোনো আইনের খসড়া প্রাথমিক পর্যায়ে আইন মন্ত্রণালয়ের নীতিগত সম্মতির পর আবার মন্ত্রণালয় পর্যায়ে চূড়ান্ত করা হয়। এরপর মন্ত্রিসভা খসড়ার অনুমোদন দিলে তা বিল আকারে সংসদে বিবেচনা ও অনুমোদনের জন্য পাঠাতে হয়। এ পর্যায়ে সংসদে বিবেচিত হওয়ার আগে সংসদীয় বা বিশেষ কমিটি খসড়াটি পরীক্ষা করে মতামত দেয়। সব শেষে সংসদ এবং পরে রাষ্ট্রপতির আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের পর আইনটি গেজেটে প্রকাশ করা হয়। এ প্রক্রিয়া নিঃসন্দেহে দীর্ঘ। তবে এর কোনো বিকল্পও নেই। এ থেকে মনে হয়, বর্তমান সরকারের সময়কালে প্রণীত খসড়াটি আইনে রূপান্তরিত হবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। দীর্ঘ প্রক্রিয়া অতিক্রম করা ছাড়াও বর্তমানে সরকার রাজনৈতিক প্রচারণায় ব্যস্ত।
পুলিশ জনপ্রশাসনেরই একটি অংশ। সার্বিকভাবে জনপ্রশাসন রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত যে নয় সে কথা সবাই জানে। পুলিশসহ অন্য সবাই যেমন প্রশাসন, স্বাস্থ্য, কৃষি ইত্যাদি খাতের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা প্রজাতন্ত্রের সেবক নামে অভিহিত। এসব খাতের জন্য বিসিএস পুলিশ ক্যাডারের মতো পৃথক প্রায় ২৯টি ক্যাডার রয়েছে। এসব ক্যাডারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়োগ-পদোন্নতির জন্য পৃথক কোনো কাঠামো নেই। পুলিশসহ অন্য সব ক্যাডারের নিয়ন্ত্রণ সরকারের আওতাধীন। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করতে হলে সবার জন্য একই নিয়ম বা কাঠামো করা সম্ভব নয়।
রাজনৈতিক প্রভাবের বিষয়টি অনেকটা তাত্তি্বক। যুক্তি দেখানো হয়, যেকোনো গণতান্ত্রিক দেশে নির্বাচিত ব্যক্তিরাই রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন। বাংলাদেশেও একই নিয়ম। এ যুক্তিটিই বর্তমানের রাজনৈতিক বিতর্কের প্রধান বিষয়। আলোচ্য বিষয়ে এ যুক্তির চরম ব্যাখ্যা হলো, নির্বাচিত ব্যক্তিদের অভিপ্রায় অনুযায়ী সব ধরনের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। এ কথা ভুলে যাওয়া হয় যে রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য প্রতিষ্ঠিত আইন, বিধি ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক নিয়মাবলি অনুসরণ করা মানেই সুশাসন প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করা। এ বিষয়টিই সার্বিকভাবে জনপ্রশাসনে নিয়োজিত কর্মীদের জন্য প্রযোজ্য। কিন্তু বাস্তবে তা হয় না। এ জন্যই ১৯৯১-পরবর্তী শাসনকালে দুই প্রধান দলের বিরুদ্ধেই প্রশাসনে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের ধারা শুরু হয়, যা কখনো দূর করা সম্ভব হয়নি। এর চরম রূপ প্রশাসনকে দলীয়করণ। দলীয় আনুগত্যই হয় পদোন্নতি ও পদায়নের প্রধান মাপকাঠি। মিডিয়ায় এ বিষয় নিয়ে প্রায় সব সময়ই সমালোচনা করা হয়েছে। কোনো ফল হয়নি। এ পরিস্থিতিতে একমাত্র পুলিশকেই দলীয় প্রভাবমুক্ত করলেই যে সুশাসন অর্জন করা সম্ভব হবে, এমন ধারণার কোনো ভিত্তি নেই। প্রয়োজন হলো সার্বিকভাবে জনপ্রশাসনকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা। বিষয়টি রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে জড়িত। যেসব রাজনীতিবিদ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করবেন, সুস্থ দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়টি তাদের জন্য প্রযোজ্য। অতীতের কিছু গবেষণায় জানা যায়, ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত নেহরু এমনই উপদেশ জনপ্রশাসনসহ রাজনীতিবিদদের দিয়েছিলেন। তাঁর মতে, প্রশাসনে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের উচিত জনপ্রতিনিধি যে মানুষের কল্যাণে নিবেদিত হয়ে কাজ করেন, সে আদর্শে অনুপ্রাণিত হওয়া। একই সঙ্গে নেহরু এটাও বলেছিলেন, জনপ্রতিনিধিদেরও উচিত সরকারি কর্মকর্তাদের মতো শৃঙ্খলার সঙ্গে জনকল্যাণমুখী কাজ করা। অর্থাৎ প্রশাসনের দুই ধরনের কর্মীদের মূল্যবোধের এক সংমিশ্রণ হওয়া সুশাসনের জন্য বাঞ্ছনীয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এ মূল্যবোধের সংমিশ্রণের যথেষ্ট অভাব রয়েছে। আলোচ্য বিষয়টি এ কারণে একমাত্র পুলিশের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য নয়।
স্মরণ করা যেতে পারে, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক/জাতিসংঘ উন্নয়ন সংস্থার সাহায্যে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস আইনের খসড়া ২০০৯-১০ সালে প্রণীত হয়েছিল। এ আইনের উদ্দেশ্য ছিল প্রধানত দুটি। এক. সংবিধানে এ বিষয়ে যে শূন্যতা বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকেই ছিল তা পূরণ করা। অতীতে কোনো সরকারই এ বিষয়টি আমলে নেয়নি। দুই. সিভিল সার্ভিস ক্যাডারগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে একটি দক্ষ ও নিরপেক্ষ সিভিল সার্ভিস প্রতিষ্ঠা। সুশীল সমাজ, মিডিয়াসহ প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তাদের বিভিন্ন সংগঠন এ ধরনের আইনের জন্য সোচ্চার ছিল। খসড়াটি প্রণীত হওয়ার সময় এ বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় প্রণীত খসড়ার ওপর সবারই মতামতও আহ্বান করেছিল। শোনা গিয়েছিল, ২০১০ সালের মার্চেই খসড়াটি সংসদে বিবেচনা ও অনুমোদনের জন্য পেশ করা হবে। এ প্রক্রিয়ায় আগে খসড়াটি মন্ত্রিপরিষদে পেশ করা হলেও তা অনুমোদন করা হয়নি। ফলে খসড়াটির অপমৃত্যু ঘটেছে। এখন পুলিশ আইনের খসড়া মন্ত্রণালয় পর্যায়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে। ২ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত সংবাদে এ খসড়ার কিছু বৈশিষ্ট্যের কথা জানা গেছে। এগুলোর মধ্যে কিছু রয়েছে নেহাত মামুলি ধরনের। আর কিছু রয়েছে যা আপাতদৃষ্টিতে অবাস্তব বা মাথাভারী পুলিশ প্রশাসনের প্রতি ইঙ্গিত দেয়। উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করা যায়, পুলিশ মহাপরিদর্শকের (আইজি) পদবি পরিবর্তন করে চিফ অব পুলিশ বা পুলিশপ্রধান করা হবে। এ উদ্যোগ অনেকটা সামরিক বাহিনীর আদলে পুলিশে নামকরণ। সামরিক বাহিনীর প্রধানকে চিফ অব আর্মি বলা হয়। দুই. খসড়ায় বলা হয়েছে, পুলিশ চিফের অধীনে একাধিক পুলিশ মহাপরিদর্শক কাজ করবেন। এর প্রয়োজনীয়তা কী এর কোনো ব্যাখ্যা প্রকাশিত সংবাদে পাওয়া যায়নি। এদের মধ্য থেকেই চিফ অব পুলিশ হিসেবে একজনকে নিয়োগ দেওয়া হবে। তিন. পুলিশ সুপার ও তদূর্ধ্ব সব পুলিশ কর্মকর্তাকে সরকার বা চিফ অব পুলিশ পদোন্নতিসহ পদায়ন করতে ক্ষমতাবান হবে। এ ক্ষেত্রে বলা প্রয়োজন, বিদ্যমান বিধিতে এ ক্ষমতা সম্পূর্ণভাবে সরকারের ছিল বটে তবে নিয়োগ চূড়ান্ত করার আগে আইজি পুলিশের মতামতও গ্রহণ করার কথা নিয়ম ছিল। কাজেই বিদ্যমান প্রক্রিয়ায় এর কোনো ব্যত্যয় হবে না। এ ধারণা সত্য হলে আইনে চিফ অব পুলিশ শব্দটি যোগ করার কোনো যুক্তি নেই। এ বিষয়ে সরকারি কার্যবিধিমালা বা রুলস অব বিজনেসে স্পষ্ট বিধান রয়েছে, যা বলা প্রয়োজন।
পুলিশসহ অন্যান্য ক্যাডারের গ্রেড-৫ ও তদূর্ধ্ব কর্মকর্তাদের নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি রুলস অব বিজনেস দ্বারা পরিচালিত হয়। এ ছাড়া বহু যুগ ধরে প্রশাসনিক নিয়ম অনুযায়ী নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষই এ বিষয়ে ক্ষমতাবান। পুলিশসহ গ্রেড-৫ ও তদূর্ধ্ব কর্মকর্তাদের নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ হলো সরকার। এ বিধান অনুযায়ী উল্লিখিত কর্মকর্তাদের নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলি সরকারই করে আসছে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে গ্রেড-৩ ও তদূর্ধ্ব কর্মকর্তাদের পদোন্নতির বিষয়টিও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এককভাবে করতে পারে না। এদের পদোন্নতির বিষয়ে সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ড সুপারিশ করার পর প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন সাপেক্ষে চূড়ান্ত পদোন্নতি নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ হিসেবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় আদেশ জারি করে। ডিসি ও এসপিদের জন্য বদলির বিষয়ে রুল অব বিজনেস অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতাবান। এ বিধানের উদ্দেশ্য মাঠ প্রশাসনে নিযুক্ত এই দুই কর্মকর্তা সরকারের জন্য যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। আইনশৃঙ্খলা ছাড়াও ডিসিরা উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের প্রধান সমন্বয়ক। এ দৃষ্টিকোণে বিচার করলে বলা যায় যে এসপিদের ক্ষেত্রে বিদ্যমান রুলস অব বিজনেসের বিধান অনুসৃত হবে।
খসড়া আইনে পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের জন্য চাঁদা গ্রহণ করার বিধান রাখা হয়েছে। এর সপক্ষে কোনো জোরালো যুক্তি আছে বলে মনে হয় না। পুলিশের কিছু সদস্য এমনিতেই চাঁদাবাজ হিসেবে দুর্নাম অর্জন করেছে। এর জন্য মূলত যানবাহনের মালিক ও কর্মীরাই আক্রান্ত হয়। মিডিয়ায় মাঝেমধ্যে আক্রান্ত ব্যক্তিরা প্রতিবাদও করে থাকে। ৫ সেপ্টেম্বর কালের কণ্ঠে পুলিশের চাঁদাবাজির সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ‘ধর’ ‘খাও’ ‘ছাড়ো’ শিরোনামে আখাউড়া থানার চাঁদাবাজির বিষয়ও প্রকাশিত হয়েছে। অনুরূপ অন্য একটি সংবাদ ছিল, জোর করে থানায় নিয়ে গিয়ে ৬০ শতাংশ জমি লিখিয়ে নেওয়ার বিষয়। এসব সংবাদ পুলিশের জবাবদিহিতা কঠোরভাবে নিশ্চিত করার প্রতি গুরুত্বারোপ করে। আলোচ্য খসড়া আইনে এটা না হলে জনগণের জন্য আইনটি সুফল বয়ে আনবে না। পুলিশবাহিনীর সদস্যদের মঙ্গলের জন্য পলওয়েল বহু বছর ধরেই রয়েছে। এর সঙ্গে যোগ হচ্ছে গুলশানের রাইফেল ক্লাবের সনি্নকটে একটি বহুতল সুপার মার্কেট। এসব প্রতিষ্ঠানের আয় কি যথেষ্ট নয়। আইন দিয়ে চাঁদা তোলার অধিকার বিদ্যমান প্রবণতাকে বাড়াতে পারে।
লেখক : সাবেক সচিব ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা