পুলিশের কী দোষ!

তথাকথিত মার্কেট ঘিরে প্রগতি সরণি নিয়ে যমুনার খেলা

রাজধানীর প্রগতি সরণির কুড়িল বিশ্বরোডে ‘তথাকথিত’ একটি শপিং মলকে ঘিরে তৈরি হওয়া যানজট নিয়ে চালানো হচ্ছে নানামুখী অপপ্রচার। এই অপপ্রচারের টার্গেট হচ্ছে পুলিশ ও সিটি করপোরেশন। প্রতিনিয়ত সুপরিকল্পিতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এ দুটি সংস্থার বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, মার্কেটের সামনে সার্ভিস রোড না থাকা এবং অবৈধ পার্কিংয়ের কারণে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। অথচ নিজেদের দুর্বলতা ঢাকতে মার্কেট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে পুলিশ ও ডিসিসির বিরুদ্ধে। যারা যানজট নিরসনে আন্তরিকভাবে কাজ করছে, নানাভাবে তাদেরকেই বিপাকে ফেলা হচ্ছে।
প্রগতি সরণিতে অবৈধ পার্কিংসহ এলোমেলোভাবে যানবাহন রেখে মার্কেট কর্তৃপক্ষই ‘কৃত্রিম যানজট’ সৃষ্টি করছে বলে অভিযোগ পুলিশের। ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের মতে, প্রকৃতপক্ষে রাজধানীর অন্য এলাকার তুলনায় প্রগতি সরণিতে যানজট বর্তমানে কমেছে এবং যেটুকু যানজট হচ্ছে, তা যমুনা গ্রুপের ‘রহস্যজনক’ আচরণের কারণে। মূলত যমুনা ফিউচার পার্কে আগত যানবাহনের অবৈধ পার্কিং বন্ধের উদ্যোগ নেওয়ায় তাদের মালিকানাধীন পত্রিকায় পুলিশের ট্রাফিক বিভাগকে আক্রমণ করে নানা সংবাদ পরিবেশন করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন ওই কর্মকর্তারা।
ট্রাফিকের উপকমিশনার (উত্তর) রুহুল আমিন বলেন, প্রগতি সরণির যানজট নিরসনে অনুষ্ঠিত সমন্বয় সভা থেকে এ বিষয়ে বুয়েটের পরামর্শ চাওয়া হয়েছে। তাদের সুপারিশসহ পরিকল্পনা পাওয়ার পর সিটি করপোরেশন প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেবে। সে অনুযায়ী ট্রাফিক পুলিশও তাদের করণীয় নির্ধারণ করবে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (গণমাধ্যম) মাসুদুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ট্রাফিক পুলিশের কাজ যানবাহন নিয়ন্ত্রণ। কোথায় সিগন্যাল পয়েন্ট হবে, আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকার প্রবেশপথ হবে- তা নির্ধারণ করে পৃথক কর্তৃপক্ষ। রাজউক, সিটি করপোরেশনসহ অন্য সংস্থাগুলোর সমন্বয় সভার মাধ্যমে সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হয়। কোনো আবাসিক এলাকার প্রবেশপথ বন্ধ করে দেওয়া বা খুলে দেওয়ার দায়িত্ব পুলিশের নয়। পৃথকভাবে ট্রাফিক পুলিশের কিছুই করণীয় নেই। এ ক্ষেত্রে একটি দৈনিক লাগাতার পুলিশ বিভাগের প্রতি বিষোদ্গার করে প্রচারণা চালাচ্ছে, যা দুঃখজনক।
ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রের বিশ্লেষকদের মতে, শপিং মলের নামে অপরিকল্পিত নির্মাণ ও বিনোদনকেন্দ্র তৈরিসহ নানামুখী কার্যক্রমের কারণেই যানজট তৈরি হয়েছে। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত পার্কিংয়ের ব্যবস্থা এবং মূল সড়কের সঙ্গে সম্পৃক্ততা রেখে সার্ভিস রোড নির্মাণ করা হয়। সিটি করপোরেশন ও পুলিশ প্রশাসনের এ ধরনের প্রস্তাব না শুনে আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে স্বেচ্ছাচারিতায় লিপ্ত হয়েছে মার্কেট কর্তৃপক্ষ। তারা অপপ্রচার চালাচ্ছে পুলিশ প্রশাসন ও সিটি করপোরেশনের বিরুদ্ধে। শুধু নিজেদের মার্কেট চালাতে তারা পুরো এলাকার বাসিন্দাদের জিম্মি করে রাখারও অপচেষ্টা করছে। পুলিশ প্রশাসন তাদের অন্যায় কর্মকাণ্ডকে সমর্থন না করায় অনেক দিন ধরেই তাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।
ডিসিসির এক কর্মকর্তা জানান, মার্কেটটির সামনের কিছু জায়গা ছেড়ে রাস্তায় দেওয়া হলে যানজট আর থাকবে না। তিনি বলেন, ঢাকা মেট্রোপলিটন ডেভেলপমেন্ট প্ল্যানে নতুনবাজার থেকে কুড়িল পর্যন্ত সড়কের দুই পাশে ২৫ ফুট করে সার্ভিস রোড থাকার কথা ছিল। কিছু অংশে সার্ভিস রোডও আছে। এ রাস্তাটির দুই পাশে সার্ভিস রোড করে প্রশস্ত করলে যানজট সমস্যার সমাধান সহজ হয়ে যাবে।
গুলশান জোনে কর্মরত ট্রাফিক পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, প্রগতি সরণিতে যমুনা ফিউচার পার্ক নামের মার্কেটটির সামনে রাস্তার ওপর অবৈধ পার্কিংয়ের কারণে যানজট সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে শুক্রবার ছুটির দিনে যানজট তীব্র হয়ে ওঠে। চরম ভোগান্তিতে পড়ে ওই এলাকা দিয়ে চলাচলকারীরা। মার্কেটের ভেতরে গাড়ি রাখার সুযোগ থাকলেও উদ্দেশ্যমূলকভাবে গাড়িগুলো পার্ক করা হয় মূল সড়কে। এতে যানজট দীর্ঘ হতে থাকে। এ সংকট নিরসনে পুলিশ আন্তরিকতার সঙ্গে তৎপরতা চালালেও বাধে বিপত্তি। কয়েক দিন আগে পুলিশ রেকার নিয়ে এলেও তাদের কারণে কোনো কাজ করা যায়নি। ট্রাফিক পুলিশকে বিব্রত করতে একটি মহল পরিকল্পিতভাবে এই যানজট তৈরি করছে বলেও অভিযোগ করেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা।
প্রগতি সরণি ঘেঁষেই যমুনার মার্কেটের প্রধান গেট নির্মাণের কারণেই এ আশঙ্কা করছেন নগর বিশেষজ্ঞরা। আরবান ট্রান্সপোর্ট সংক্রান্ত একাধিক গবেষণা ও জরিপকাজে সম্পৃক্ত ড. আজিজুর রহমান ও ড. লুৎফুন্নাহার জানান, প্রগতি সরণি ঘেঁষে বেশ কয়েকটি ব্যস্ততম মার্কেট গড়ে ওঠার কারণেই মূলত রোডটির স্থানে স্থানে যানজটের সৃষ্টি হয়। তাঁরা বলেন, যমুনা ফিউচার পার্কের মতো বড় মার্কেটের প্রধান গেটটিও প্রগতি সরণি ঘেঁষেই করা হয়েছে।
এদিকে এখন পর্যন্ত কেবল মার্কেটটির ফুডকোর্ট উদ্বোধন হয়েছে। তাতেই যানজটের যে চিত্র, পুরো মার্কেটটি চালু হলে পরিস্থিতি মারাত্মক হয়ে উঠবে। নগর বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রধান সড়ক থেকে মার্কেটের দিকে ঢুকতে গেলেই ভয়ংকর যানজটের সৃষ্টি হবে। রাজধানীর যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিয়ে জানান, যানজট নিরসনে যমুনা ফিউচার পার্কের প্রধান গেট উত্তর দিকে লিংক রোডের মাধ্যমে গড়ে তোলা উচিত। এতে প্রধান সড়কটির ওপর চাপ পড়বে না, যানজটের আশঙ্কাও থাকবে না।
প্রগতি সরণিতে যাতায়াতকারী যাত্রীসাধারণ অভিযোগ করেন, কুড়িল ফ্লাইওভার থেকে নেমে প্রগতি সরণিতে ঢুকতেই বেশ প্রশস্ত সড়ক পাওয়া যায়। কিন্তু কুড়িল চৌরাস্তা মোড় পার হওয়ার পর থেকে যমুনা ফিউচার পার্কের পূর্ব-দক্ষিণ কোণ পর্যন্ত রাস্তাটি অপ্রশস্ত হয়ে পড়েছে। দুই পাশেই ফুটপাত যোগ করা ছাড়াও নানা কারণে রাস্তাটি প্রায় অর্ধেক হয়ে পড়ায় গাড়ির ধকল সামাল দিতে পারছে না। এ ক্ষেত্রে কুড়িল থেকে বসুন্ধরা গেট পর্যন্ত প্রগতি সরণিটি আরো প্রশস্ত করারও দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
এদিকে গুলশান, বাড্ডা এলাকায় কর্তব্যরত ট্রাফিক কর্মকর্তারা বলছেন, কুড়িল ফ্লাইওভার খুলে দেওয়ার পর প্রগতি সরণির যানজট নিরসনের ক্ষেত্রে যে রকম সুফল পাওয়ার কথা ছিল, তা মিলছে না ভিন্ন কারণে। এর দায় অনেকটাই যমুনা ফিউচার পার্ক কর্তৃপক্ষের। বর্তমানে এখানে আগতদের যানবাহন ঢোকাতে কর্তৃপক্ষের নিজস্ব নিরাপত্তাকর্মীরা যে প্রক্রিয়া অবলম্বন করেন, তাতে পার্কের প্রবেশপথেই যানজট লেগে যায়। এর প্রভাব গিয়ে পড়ে মূল সড়কে। ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা তা নিরসনের জন্য কথা বলতে গেলেই দুর্ব্যবহারের শিকার হন। হঠাৎ দেখা যায় কিছু যানবাহন বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার প্রবেশপথ-সংলগ্ন স্থানে এলোমেলোভাবে পার্ক করে রেখে ‘যানজট’ সৃষ্টি করা হচ্ছে। ওই সব যানবাহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গেলেও বাধা দেয় মার্কেটের লোকজন।