পোশাকশ্রমিকের ধূসর জীবন

টাঙ্গাইলের গোপালপুরের তাহের আলী একটি পোশাক কারখানায় সহকারীর (হেলপার) কাজ করেন। থাকেন ছোট্ট খুপরিঘরে, তিনজনের সঙ্গে গাদাগাদি করে। বললেন, ‘এ মাসে এখনো মাছ-মাংস খাইনি। এইটুক কষ্ট করছি, কারণ ঈদে ছোট্ট বোনটিকে একটা নতুন জামা দিতে চাই। বছরের অন্য সময় তো থাকা-খাওয়াতেই সব টাকা খরচ করি।’গত সোম ও মঙ্গলবার গাজীপুরের চন্দ্রা, সফিপুর, তেলিরচালা, কোনাবাড়ী, নাওজোড়, ভোগড়া, লক্ষ্মীপুরা এলাকা ঘুরে নানা শ্রেণীর ২০-২২ জন শ্রমিকের সঙ্গে কথা হয়। এই পোশাকশ্রমিকদের অধিকাংশের জীবনের গল্পই এমন ধূসর।নিত্যপণ্যের দাম যখন-তখন বাড়ে, কথায় কথায় বাড়ে বাসাভাড়া। কিন্তু মজুরি বাড়ে না সহজে। এবার সেই কাঙ্ক্ষিত মজুরি বৃদ্ধির সুযোগ যখন এল, তখন সেই চিরচেনা মালিকেরাই বিগড়ে গেলেন, যাঁদের জন্য দিনমান হাড়ভাঙা খাটুনি খাটেন এই শ্রমিকেরা। মাত্র ৬০০ টাকা মজুরি বাড়ানোর প্রস্তাব তাঁদের বিক্ষুব্ধ করে। রাস্তায় নেমে আসেন তাঁরা। গত সপ্তাহে টানা ছয় দিন ঢাকার আশপাশের শত শত কারখানা বন্ধ থাকল। মালিক-শ্রমিক দুই পক্ষেরই ক্ষতি হচ্ছে এতে। টাঙ্গাইলের তাহের আলীর মতো মতিউর রহমান, মোহাম্মদ সোহেল, ফজলুল হক, রুস্তম আলীসহ ২৫-৩০ জনের বেশি শ্রমিক সফিপুরের উত্তরপাড়া এলাকায় একটি মেসে থাকেন। ১০ ফুট বাই ছয় ফুট কক্ষে চারজন। কক্ষভেদে ভাড়া এক হাজার ৭০০ থেকে দুই হাজার ২০০ টাকা। তাতে জনপ্রতি থাকার খরচ ৪২০ থেকে ৫০০ টাকায় রাখা যায়।

গত সোমবার সন্ধ্যায় এই রকমই একটি কক্ষে কথা হয়েছিল তাহের আলীর সঙ্গে। কক্ষে আসবাব বলতে শুধু দুটি চৌকি। ওপরে একটি পাতলা কাঁথা বিছানো। দড়িতে ঝোলানো কাপড়চোপড়। এ চিত্র প্রায় সব শ্রমিক মেসের।

মতিউর রহমান পাশা সোয়েটার কারখানায় কাজ করেন। বললেন, ‘বেতন পাই তিন হাজার ৩২০ টাকা। খাওয়ার খরচ মাসে ২২০০-২৫০০ টাকার মতো। ঘরভাড়া ৪৫০। আছে বুয়ার খরচ। হাতে আর কী থাকে?’

ওই কক্ষে থাকা ইকো টেক্সের রুস্তম আলী যোগ করলেন, ‘খরচ কুলাতে মাছ-মাংস কম খাই। তাতে মাসে ৩০০-৪০০ টাকা কম লাগে।’

শ্রমিকদের অনেকে পরিবার নিয়ে থাকেন। গাজীপুর সদরের ভোগড়া এলাকায় গরীব অ্যান্ড গরীব নামের কারখানার পাশের একটি বস্তিতে থাকেন উম্মে কুলসুম। তাঁর ছেলে সোবাহান আলী ও ছেলের বউ আকলীমা কাজ করেন পোশাক কারখানায়। ছোট একটি কক্ষে নাতিসহ তাঁদের চারজনের বসবাস। 

গত মঙ্গলবার দুপুরে কথা হয় কুলসুমের সঙ্গে। ঘরের মেঝেতে বসে নাতিকে খাওয়াচ্ছিলেন। জানালেন, ছেলে আর বউ মিলে হাজার দশেক টাকা আয় করেন। তাতে কোনোরকমে চারজনের সংসার চলে যায়। তবে কোনো মাসে কারখানায় কাজ কম হলে টানাটানিতে পড়তে হয়।

পোশাকশ্রমিক নুরুন নাহার ভোগড়া পেয়ারাবাগান এলাকায় একটি টিনশেড বাড়িতে স্বামী মিলন মিয়াকে নিয়ে থাকেন। তিনি বলেন, ‘বাড়ির মালিক খালি কয় ভাড়া বাড়াইবে। জানুয়ারিতে বাড়বে ৪০০ টাকা। এত টাকা কই পামু।’

সালেহীন ইসলাম স্ত্রী হাবিবাকে নিয়ে এক কক্ষের ছোট বাসায় থাকেন সফিপুরে। কাজ করেন ইকো টেক্সে। সব মিলিয়ে বেতন পান মাসে চার থেকে সাড়ে চার হাজার টাকা। তিনি বলেন, ‘রুম ভাড়া দিতে হয় দুই হাজার টাকা। বাকি টাকা দিয়ে খাবারসহ অন্যান্য খরচ চালাতে কষ্ট হয়। জানুয়ারিতেই নাকি ঘরভাড়া ২০০ টাকা বাড়াবে। কীভাবে চলব সেই চিন্তায় আছি।’

প্রতিবছরই ভাড়া বাড়ান বাড়িওয়ালারা। গ্যাসের দাম, বিদ্যুতের দাম, জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধির অজুহাত—কোনোটই ছাড়েন না বাড়িওয়ালারা। বেশ কয়েকজন শ্রমিক জানালেন, এবার মজুরি বৃদ্ধির কথা শুনে জানুয়ারিতে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ভাড়া বাড়ানোর জন্য একরকম হুমকিই দিয়ে রেখেছেন তাঁরা।