পোশাকশ্রমিক নেতারা দুষলেন নৌমন্ত্রীকে

তৈরি পোশাকশিল্পে চলমান অস্থিরতা নিরসনের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ন্যূনতম মজুরি আট হাজার টাকা করার দাবিতে গতকাল বুধবার পঞ্চম দিনের মতো বিভিন্ন স্থানে পোশাকশ্রমিকেরা বিক্ষোভ, ভাঙচুর করেছেন। এই অস্থিরতার জন্য পোশাকশ্রমিক-নেতারা নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানকেই দায়ী করেছেন। তাঁরা বলছেন, নৌমন্ত্রীর গত শনিবারের শ্রমিক সমাবেশে কাঙ্ক্ষিত ঘোষণা না আসায় অসন্তোষ শুরু হয়েছে। গতকাল বিকেলে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে সরকারের সঙ্গে বৈঠকে শ্রমিকনেতারা এ কথা বলেন। বৈঠকে শ্রমিকদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ৬০টি সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। শ্রমিকনেতারা বলেন, ভাঙচুরের জন্য শ্রমিকদের কোনোভাবেই দায়ী করা যাবে না। তাঁদের ভাষায়, ‘মালিকেরা অ্যাকশন দেয় আর শ্রমিকেরা রিঅ্যাকশন জানান।’ তাঁরা শ্রমিকদের দাবি অনুযায়ী অবিলম্বে মজুরি বাড়ানোর আহ্বান জানান। জবাবে সরকারের পক্ষ থেকে নভেম্বরের শেষ নাগাদ নতুন মজুরি ঘোষণার আশ্বাস দেওয়া হয়। এ ছাড়া শ্রমিকদের ভাঙচুর বন্ধ করে কাজে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। এদিকে পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ বলেছে, আজ বৃহস্পতিবার পোশাক কারখানাগুলো খুলে দেওয়া হবে।

শ্রম মন্ত্রণালয়ে বৈঠকের শুরুতে বিলম্বে বৈঠক ডাকার কারণ উল্লেখ করে শ্রমসচিব মিকাইল শিপার বলেন, শ্রমমন্ত্রী দেশে নেই, প্রতিমন্ত্রী নির্বাচনী এলাকায় ছিলেন, তাই বৈঠক ডাকতে দেরি হয়েছে। পরে শ্রম প্রতিমন্ত্রী মন্নুজান সুফিয়ান বলেন, ‘আমরা শ্রম আইনের বাইরে যাব না, ভাঙচুর করব না, শ্রম আইন মেনে পদক্ষেপ নেব।’

বৈঠকে গার্মেন্টস শ্রমিক জোটের সাধারণ সম্পাদক জয়নাল আবেদীন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যের অর্থ দাঁড়ায়, শ্রমিকেরা সবাই ভাঙচুরের সঙ্গে জড়িত। তিনি বলেন, মালিকপক্ষ মজুরি বাড়ানোর যে প্রস্তাব দিয়েছে, তা আগুনে ঘি ঢালার মতো। বিজিএমইএকে আরও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, যখন ৪৭০ টাকা মজুরি ছিল, তখনো বিজিএমইএ বলেছে মজুরি বাড়ানো হলে কারখানা বন্ধ হবে, এক হাজার ৬৬২ টাকার সময়ও বলেছে, কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে, এখনো একই কথা বলা হচ্ছে। শ্রমিকদের প্রতি এমন নির্দয় ব্যবহার বন্ধ করতে হবে।

জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক কর্মচারী ফেডারেশনের সভাপতি আমিরুল হক মজুরি নির্ধারণের জন্য অবিলম্বে সব পক্ষের সমন্বয়ে বৈঠক ডাকতে বলেন।

জাগো বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি বাহারানে সুলতান বলেন, নৌমন্ত্রীর সমাবেশের (শনিবার) পর থেকেই শ্রমিক-অসন্তোষ শুরু হয়েছে। শ্রমিকেরা ফুঁসে উঠেছেন। ওই সমাবেশে যোগদানের আগে শ্রমিকেরা ভেবেছিলেন, সমাবেশ থেকে মজুরি বৃদ্ধির ঘোষণা আসবে, শ্রম আইনে শ্রমিকবিরোধী যে ধারাগুলো আছে, তা তুলে নেওয়া হবে। শ্রমিকদের বলা হয়েছিল, ৫০ শতাংশ বেতন বাড়ানো হবে। এসব আশা নিয়ে তাঁরা সমাবেশে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তবে কিছুই হয়নি। এটাই শ্রমিক-অসন্তোষের মূল কারণ।

বৈঠকে শিল্পাঞ্চল পুলিশের উপমহাপরিদর্শক আবদুস সালাম বলেন, কোনাবাড়ী, সফিপুর, হেমায়েতপুর, মৌচাক ও বিকেএসপির পর থেকে চন্দ্রা পর্যন্ত রাস্তা এবং নারায়ণগঞ্জে শ্রম-অসন্তোষ চলছে। বড় বড় কারখানাগুলোতে গতকাল শ্রমিকেরা ঢুকে কার্ড পাঞ্চ করে বেরিয়ে গেছেন। তিনি জানান, ১০০ জন মালিকের সঙ্গে তিনি বসেছিলেন। এই অবস্থা চলতে থাকলে তাঁরা কারখানা বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন।

শ্রম প্রতিমন্ত্রী শ্রমিকনেতাদের উদ্দেশে বলেন, ‘আমরা শ্রম আইন অনুযায়ী চললে সব আদায় করতে পারব। আগে মজুরি বোর্ডে কী হতো, আমি জানতে পারতাম। প্রধানমন্ত্রীর কাছে সব শ্রমিকের মজুরি বাড়ানোর তদবির করতে পারতাম। এখন জানি না, বোর্ডে কী হচ্ছে।’

গার্মেন্টস শ্রমিক কর্মচারী লীগের সভাপতি লিমা ফেরদৌস বলেন, নৌমন্ত্রীর সমাবেশের কারণেই এ পরিস্থিতি। ঈদের আগে এ ধরনের কর্মসূচি দিয়ে এবং এর আগে পোস্টার ছাপিয়ে নৌমন্ত্রী ঠিক করেননি, সময়টা উপযুক্ত ছিল না। শ্রমিকদের বরং উসকে দেওয়া হয়েছে। এ পর্যায়ে বৈঠকে হইচই শুরু হয়।

বৈঠকে অংশ নেওয়া প্রায় সব নেতাই বলেন, নৌমন্ত্রীর সমাবেশের সময়টা ঠিক ছিল না। ঈদের আগে এ ধরনের সমাবেশ করার ফলে অসন্তোষ এ পর্যায়ে পৌঁছেছে। দাবিদাওয়ার জায়গাটা নষ্ট করা হয়েছে। হঠাৎ করে আশুলিয়ার একটি কারখানা থেকে ৮০ জনকে বের করে দেওয়া হয়েছে। হা-মীম গ্রুপ থেকে ১২০ জনকে ছাঁটাই করা হয়েছে। তাঁরা এসব বিষয় তদন্তের দাবি জানিয়ে বলেন, যেনতেন ও তাড়াহুড়ো করে মজুরি ঘোষণা করা ঠিক হবে না।

বৈঠক শেষে প্রতিমন্ত্রী বলেন, নভেম্বরের মধ্যে পোশাকশ্রমিকদের জন্য মজুরি বোর্ডের সুপারিশ জমা দেওয়ার সুপারিশ করবে শ্রম মন্ত্রণালয়। ডিসেম্বর পর্যন্ত না গিয়ে এর আগেই যেন মজুরি ঘোষণা করা যায়, সে চেষ্টাই করা হবে।

বৈঠকে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ইসরাফিল আলম, জাতীয় শ্রমিক লীগের সভাপতি শুকুর মাহমুদ, কার্যকরী সভাপতি ফজলুল হক ও শ্রমসচিব মিকাইল শিপার উপস্থিত ছিলেন।

মিকাইল শিপার বলেন, ‘কাল (বৃহস্পতিবার) পোশাক কারখানাগুলো খুলে দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছি। শ্রমিকনেতারা এ বিষয়ে একমত পোষণ করেছেন। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমরা মজুরি বোর্ড ঘোষণার চেষ্টা করব।’

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বৈঠক: গতকাল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জরুরি বৈঠকেও গত কয়েক দিনে পোশাকশিল্পে অস্থিরতার বিষয়টি উঠে আসে। বৈঠকে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, নভেম্বর মাসের শেষে মজুরি বোর্ডের নতুন রোদেয়াদ পাওয়া যাবে। সে পর্যন্ত কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বা প্রতিবাদ করা ঠিক হবে না। একই সঙ্গে বিশৃঙ্খলাকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। র‌্যাব-পুলিশের পাশাপাশি আজ থেকে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশকেও (বিজিবি) মোতায়েন করা হতে পারে। বৈঠকে আজ থেকে বন্ধ কারখানা খোলারও সিদ্ধান্ত হয়।

বৈঠকে শ্রমিকনেতারা বলেন, মজুরির বিষয়ে সুনির্দিষ্ট ঘোষণা না আসা পর্যন্ত সমস্যা সহজে শেষ হবে না। এ জন্য তাঁরা দ্রুত নতুন মজুরি কাঠামোর ঘোষণা চান। নৌমন্ত্রী শাজাহান খান এবং বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন ও আবদুস সালাম মুর্শেদী, এস এম মান্নান এবং বিকেএমইএর নেতা সেলিম ওসমানও এই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠকে উপস্থিত বাংলাদেশ টেক্সটাইল-গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সভাপতি মাহবুবুর রহমান ইসমাইল প্রথম আলোকে বলেন, এখানে যত কথাই বলা হোক না কেন, মূল সমস্যা মজুরি। কারণ, মজুরি বোর্ড গঠনের সাড়ে চার মাস হয়ে গেছে। কিন্তু এখনো কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারেনি। এখন মালিকেরা মাত্র ৬০০ টাকা বাড়ানোর কথা বলছেন।

গত কয়েক দিনের বৈঠকে মালিক-শ্রমিকদের কেউ কেউ নৌমন্ত্রীর নেতৃত্বে গঠিত গার্মেন্টস শ্রমিক সমন্বয় পরিষদের মহাসমাবেশের বিষয়টিও ভালোভাবে নেননি। সরাসরি না বললেও মালিকদের কেউ কেউ মনে করছেন, পোশাকশিল্প নিয়ে এখন রাজনীতি শুরু হয়েছে। যেটা এখন ভয়ংকর রূপ নিচ্ছে।

ওই মহাসমাবেশের পর থেকেই পোশাকশিল্পে ভাঙচুরের কারণ কী, বৈঠক শেষে জানতে চাইলে সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন বলেন, ‘পোশাকশিল্প নিয়ে যাতে রাজনীতি না হয়, সে জন্য সবার প্রতি অনুরোধ জানাব।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর গতকাল দুপুরে সাংবাদিকদের বলেন, পোশাকশিল্পে কোনো অস্থিরতা নেই। তবে বিকেলের সভা শেষে তিনি বলেন, এটি এখন জাতীয় সমস্যা। যদি বহিরাগত কোনো পক্ষ দাঁড়ায়, তাহলে সর্বাত্মক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইতিমধ্যে নিরাপত্তা বাহিনীকে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সালাম মুর্শেদী সাংবাদিকদের বলেন, ‘সামনে ঈদ ও পূজার ছুটি। আমরা চাই, শ্রমিক ভাই-বোনেরা যেন বেতন-ভাতা নিয়ে হাসিমুখে বাড়ি যেতে পারেন। এ জন্য আমরা বৃহস্পতিবার থেকে বন্ধ কারখানা খুলে দেব। এ জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তা চেয়েছি।’