প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী ও একটি সতর্কবার্তা…আলী ইমাম মজুমদার

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সময়ে সময়ে নির্বাচন হয়। নির্বাচন পরিচালনার জন্য বিভিন্ন দেশে গৃহীত কার্যক্রম অভিন্ন না হলেও এতে সরকারি কর্মচারীদের সর্বত্রই একটি ভূমিকা থাকার কথা। আর আমাদের উপমহাদেশে জোরালোভাবেই তা আছে। যদিও নির্বাচন পরিচালনার মূল দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের, তবু তাদের আবশ্যক হয় প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের সহযোগিতা। তাই তাদের চাহিদা অনুসারে সরকারি কর্মচারী নিয়োগ দেওয়ার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এটা মোটামুটি প্রতিপালনও করা হয়। আর প্রতিটি জাতীয় নির্বাচনে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করে মূলত মাঠ প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, বিশেষত পুলিশ। তবে ১৯৪৭-এর পর থেকে আজ অবধি সময়ান্তরে এ ধরনের চ্যালেঞ্জ ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে এসেছে। ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারির পর আইয়ুব খান তাঁর ক্ষমতার বৈধতার জন্য গণভোটসহ সব নির্বাচনে প্রশাসনকে খোলামেলাভাবে ব্যবহার করেছেন। এই উপমহাদেশে ব্রিটিশ প্রবর্তিত শাসনব্যবস্থায় সরকারি কর্মচারীদের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির ঊর্ধ্বে রাখার যে সংস্কৃতি চালু হয়েছিল, তাতে বড় ধরনের আঘাত আসে তখন থেকেই। এরপর মাত্রার হেরফের ঘটলেও প্রশাসনকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা থেকে খুব কম ব্যতিক্রমই দেখা গেছে।
দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে ২৪ জানুয়ারি ২০১৪-এর আগের তিন মাসের যেকোনো দিন। সপ্তম, অষ্টম ও নবম সংসদ নির্বাচন হয়েছিল সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর আলোকে গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার আওতায়। সেই নির্বাচনগুলোর গ্রহণযোগ্যতা পরাজিত দল প্রশ্নবিদ্ধ করলেও অন্য দেশি-বিদেশি সব মহলে সমাদৃত হয়েছিল। এসব নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল প্রধান সব দল। তবে ওই তত্ত্বাবধায়ক সরকারগুলোর গঠনের পরও মাঠ প্রশাসন ও পুলিশের অনেক কর্মকর্তাকে অকালীন বদলির মুখোমুখি হতে হয়। হয়তো বা আস্থার সংকট দূর করতেই এমনটা করা রেওয়াজ হয়ে পড়েছিল। আর বদলি হওয়া এসব কর্মকর্তার সবাই না হলেও কেউ কেউ প্রশ্নবিদ্ধ ছিলেন। ব্যাপারটি যা-ই হোক, ঝড় যায় তাঁদের ওপর দিয়েই। আর সব ক্ষেত্রে ন্যায্যতা নিশ্চিত করা গেছে—এমনটিও বলা যাবে না। তবু বৃহত্তর স্বার্থে তা করা হতো বলে ধরে নেওয়া হয়। আর সেই সময়ে গঠিত নির্দলীয় সরকারের অধীনে কিন্তু শঙ্কামুক্ত পরিবেশে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা তাঁদের আইনানুগ দায়িত্ব পালনের সুযোগ পেতেন।
দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরিবেশ কিন্তু হবে সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাই প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের জন্যও চ্যালেঞ্জ হবে বহুমাত্রিক। সেসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য এখন থেকে তাঁদের মানসিকভাবে প্রস্তুত হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। এ ধরনের চ্যালেঞ্জের কিছু নমুনা এখনই দেখা যাচ্ছে। ক্ষমতাসীন দলটির একজন প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী বলেছেন, আগামী ২৪ জানুয়ারি পর্যন্ত সরকারি কর্মচারীদের বর্তমান সরকারের নির্দেশনা অনুসারে কাজ করতে হবে। যাঁরা নির্দেশ মানবেন না, তাঁদের কপালে দুঃখ আছে। তাঁদের বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। এই বক্তব্য একটি সতর্কবার্তাই বলা চলে। এ সময়ে একজন শীর্ষ নেতার কাছ থেকে এ ধরনের বক্তব্য কেন এল, তা বোধগম্য নয়। সংবিধান বা আইন প্রণয়ন বা সংশোধন প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা করেন না। তাঁদের এগুলো মেনে চলতেই হয়। আর সেটা সব সময়, সব সরকারের অধীনেই; তাঁদের তামিল করতে হবে সব আইনানুগ নির্দেশ। তা না করলে সরকার বিধি অনুসারে তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে। আর অকালীন অবসর দেওয়ার একটি কালো আইন তো আছেই। বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া বলতে তিনি তা-ই বোঝাতে চেয়েছেন কি না, বিষয়টি অস্পষ্ট। সুতরাং, শীর্ষস্থানীয় দায়িত্বশীল একজন নেতার এ ধরনের বক্তব্যে শঙ্কা ও উদ্বেগ দেখা দিতে পারে। কেননা, গত দুই যুগে প্রজাতন্ত্রের অনেক কর্মচারীর কপালে দুঃখ নেমে এসেছে। অকালীন অবসরের কারণে তছনছ হয়ে গেছে অনেক কর্মকর্তার স্বপ্ন। তা ছাড়া বছরের পর বছর ওএসডি রেখে কার্যত বাড়িতে বসিয়ে রাখার একটি মন্দ রেওয়াজও চালু রয়েছে। জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে এ পরিপ্রেক্ষিতে উপরিউক্ত বক্তব্য প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের মধ্যে বিদ্যমান শঙ্কাকে গভীরতর করবে। বক্তব্যটি আরও একটি গুরুতর প্রশ্নের সূচনা করেছে। এ সময়ে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের একটি বিশাল অংশ নির্বাচন কমিশনের অধীনে কাজ করবে। কমিশনের নির্দেশেই তাঁদের নির্বাচনসংক্রান্ত কাজ করার কথা। তাঁদের উদ্দেশ্যে আলোচিত বক্তব্যটি নয়—এমন কথাও বলা হয়নি।
এখানে উল্লেখ করা আবশ্যক, বর্তমান সাংবিধানিক ব্যবস্থায় সরকারকে ক্ষমতায় রেখেই আসন্ন নির্বাচন হতে যাচ্ছে। বহাল থাকছে জাতীয় সংসদ। এখনতক দেওয়া ঘোষণায় অবিচল থাকলে প্রধান বিরোধী দলসহ বেশ কিছু দল নির্বাচনে অংশ নেবে না। তাই প্রতিদ্বন্দ্বিতা তেমন হবে না। তবে বর্জনকারীরা প্রতিরোধ করতে চাইলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে। সে ক্ষেত্রে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের দায়িত্ব হবে দৃঢ়তার সঙ্গে আইন ও ন্যায়ের প্রতি নিষ্ঠাবান থেকে এবং কোনো ধরনের অনুরাগ ও বিরাগের বশবর্তী না হয়ে দায়িত্ব পালন করা। তাঁরা আইনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেবেন, কোনো ব্যক্তি বা দলকে নয়। শক্তি প্রয়োগে তাঁরা নিষ্ক্রিয়তা কিংবা অতি সক্রিয়তা—কোনোটাই দেখানো ঠিক নয়। শান্তিপূর্ণ ও আইনসম্মত প্রতিবাদে কোনো প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টিও অযৌক্তিক হবে। গ্রেপ্তার কিংবা শক্তি প্রয়োগের প্রশ্নে তাঁরা কারও ইন্ধনে প্ররোচিত হওয়াও যথোচিত হবে না। উল্লেখ করা যেতে পারে, এ ধরনের পরিবেশে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ভোটার সংখ্যা কম হওয়ারই কথা। আর তা বাড়িয়ে দেখানোর জন্য অংশগ্রহণকারীদের কারও কারও একটি অশুভ চেষ্টাও থাকতে পারে। অতীতে তা-ই দেখা গেছে। এজাতীয় ক্ষেত্রে ভুয়া ভোট ও কেন্দ্র দখলের মতো ঘটনা ঘটতে থাকলে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে। সুতরাং, দৃঢ়তার সঙ্গে আইনি পদ্ধতিতে তাঁদের এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় সচেষ্ট হতে হবে। তবে বিষয়টি যত সহজে লেখা হলো, এর বাস্তবায়ন তত সহজ নয়। তা সত্ত্বেও সময়ের তাগিদে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা কঠিন চ্যালেঞ্জেও নিজেদের অবস্থানকে অম্লান রাখবেন—এ প্রত্যাশা রইল।
আর যদি ধরে নেওয়া হয়, সব আশঙ্কার অবসান ঘটিয়ে প্রধান সব দল নির্বাচনে অংশ নিল, তখনো আসবে ভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জ। কেননা, বর্তমান সরকার ও সংসদ উভয়টিই বহাল থাকারই কথা। এ ক্ষেত্রে বর্তমান সাংসদদের কারও কারও মাঠপর্যায়ে নির্বাচনে হস্তক্ষেপের আশঙ্কা থাকছেই। এমনকি বিরোধী দলের প্রার্থীরাও সুযোগ পেলে তা-ই করবেন। এ ধরনের পরিস্থিতিতে জাতি, সংবিধান ও গণতন্ত্রের স্বার্থে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের আইনানুগ কঠোর প্রক্রিয়া গ্রহণ করা আবশ্যক হবে। নির্বাচনের ফলাফল প্রভাবিত করতে পারে—এমন যেকোনো বেআইনি কার্যক্রম করতে হবে প্রতিহত। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা যদি আইনের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেন, তবে চাপ আর হুমকি যতই থাকুক, কোনো কাজে আসবে না। এ ক্ষেত্রে সুশীল সমাজ, বিশেষ করে গণমাধ্যমকে তাঁদের সমর্থনে জোরালোভাবে এগিয়ে আসা উচিত। আর দায়িত্বের অংশ হিসেবে জ্যেষ্ঠ সব কর্মকর্তাকে কনিষ্ঠদের ন্যায়সংগত ভূমিকার সরব সমর্থন দিতে হবে।
দীর্ঘদিন ধরে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের রাজনৈতিক বিবেচনায় পদায়ন, পদোন্নতি এবং ক্ষেত্রবিশেষে নিয়োগ প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা হ্রাস করে ফেলেছে। এগুলো নিজস্ব বলয়ে কাজ করতে পারলে নির্বাচনকালে ‘নির্দলীয়’ সরকারের দাবি নিয়ে কারও আসার প্রয়োজন হতো না। দুঃখজনক হলেও এটা সত্য, এসব কর্মচারীর একটি অংশ বেশ কিছুদিন যাবৎ দলীয় বিবেচনাতেই তাঁদের কার্যক্রম পরিচালনা করেন। এমনকি পরোক্ষভাবে দলীয় কার্যক্রমে যোগ দেন। ক্ষেত্রবিশেষে তো সরাসরি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মেই তাঁদের গুটি কয়েককে দেখা গিয়েছিল। হতে পারে সেটা একটি বিশেষ অবস্থা। তবে তাঁরা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীর মৌলিক বৈশিষ্ট্য থেকে বিচ্যুত হয়েছিলেন—এটা বলার অপেক্ষা রাখে না। ব্যক্তিগতভাবে তাঁরা হয়তো কেউ কেউ লাভবান হয়েছেন। কিন্তু পরিণতিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বেসামরিক প্রশাসন। এ ক্ষতির দাগ এখনো শুকায়নি। এর পরও অনুরূপ চেষ্টা হয়েছে। তবে সফল হয়নি। আশা করব, কোনো দিনও যেন এ ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি না হয়।
তবে আজ কঠোর বাস্তবতার মোকাবিলা করতে যাচ্ছে মাঠ প্রশাসন ও পুলিশ। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে তাদের অনেকের পদায়নে ভূমিকা রয়েছে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের। এভাবে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তারা বর্ণিত পরিস্থিতিতে কতটা মাথা তুলে দাঁড়াতে চাইবেন, এটা নিয়ে সংশয় রয়েছে। আবার ওপরে আলোচিত হুমকিটিও সবার মনোবলের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বিরোধী রাজনৈতিক দল এ বক্তব্যের বিরোধিতা করেছে তাদের ভাষায়। দুুই যুগ ধরে দুটি প্রধান দলই যখন সুযোগ পেয়েছে বা পায়, তখনই প্রশাসনকে নিজেদের স্বার্থে বিবেচনাহীনভাবে ব্যবহার করেছে। তাই কোনো রাজনৈতিক দলের বক্তব্য পুঁজি করার আবশ্যকতা নেই। দেশ ও জনগণের স্বার্থে এবং প্রতিষ্ঠানের গ্রহণযোগ্যতা ধরে রাখতে আইন ও ন্যায়ের পক্ষে থাকার সব প্রচেষ্টা চালানো উচিত প্রশাসনের।
মাঠ প্রশাসনে যাঁরা কাজ করছেন, তাঁদের কর্মজীবনের অনেকটাই সামনে পড়ে রয়েছে। জেলা পুলিশের ক্ষেত্রেও
তা-ই। বিবেচনায় রাখা দরকার, চাকরিজীবনের অবশিষ্ট দীর্ঘ পথ তাঁদের পাড়ি দিতে হবে। আসবে বিভিন্ন সরকার। সব সরকারের সময়ে একই রূপ আনুগত্য নিয়ে কাজ করতে হবে তাঁদের। রাজনৈতিক নেতৃত্ব দিকনির্দেশনা দেবে। তা বাস্তবায়ন করবে প্রশাসন। আর তা করতে গিয়ে অবশ্যই দেখতে হবে নির্দেশনাটি আইনসম্মত ও ন্যায়নিষ্ঠ কি না। এ কথা সব সময়ের জন্য প্রযোজ্য। আর জাতীয় নির্বাচনের সময় তো অবশ্যপালনীয়। এ সময় তাঁরা নির্বাচন কমিশনের অধীনে কাজ করবেন। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা যাতে শঙ্কা ও চাপমুক্তভাবে নির্বাচনে আইনানুগ দায়িত্ব পালন করতে পারেন, তার উপযুক্ত নিরাপত্তাবেষ্টনী তৈরি করার কথা নির্বাচন কমিশনের। আর বর্তমান পরিপ্রেক্ষিত ও আলোচিত সতর্কবার্তা দাবি করছে সেই বেষ্টনী অনেক জোরদারভাবে তৈরি করার।
আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
majumder234@yahoo.com