প্রধানমন্ত্রীর সংবিধান ব্যাখ্যার ভ্রান্তি…মিজানুর রহমান খান

যখন যেমন তখন তেমন রাজনৈতিক কৌশল গ্রহণ হলো ম্যাকিয়াভেলিয় (ষোড়শ শতাব্দীর ইতালীয় রাজনীতিক ও দার্শনিক) রাজনীতি। কিন্তু তাই বলে প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইনের ম্যাকিয়াভেলিয় ব্যাখ্যা, সেটা সম্ভবত বাংলাদেশেই সম্ভব। জাতির উদ্দেশে দেওয়া প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে কতকটা ম্যাকিয়াভেলিয় স্টাইল ফুটে উঠেছে।
সাংবিধানিক কোনো প্রশ্নের নির্দিষ্ট উত্তর না দিয়েই তিনি সংবিধান ব্যাখ্যা করেছেন। সংসদ রেখে নাকি না রেখে নির্বাচন হবে, তার উত্তর পাওয়া যায়নি। কবে নির্বাচন হবে, তার উত্তরও তিনি দেননি। এবার বরং নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছেন। তিনি জাতিকে বলেকয়ে একটা ম্যান্ডেট নিয়েছেন। সেটা হলো কখন নির্বাচন হবে, তা নির্ধারণের এখতিয়ার প্রধানমন্ত্রীর। অথচ তা সত্য নয়। আওয়ামী লীগের সভানেত্রী অবশ্য জানেন তাঁর প্রতিপক্ষ নির্দিষ্টভাবে এর বিরোধিতা করাকে অপ্রয়োজনীয় মনে করবে। আর খালেদা জিয়া না ছুঁলে মিডিয়া সেভাবে এটা খাবেও না।
একটা গাণিতিক বিভ্রাট ঘটছে। এত দিন ভেবেছি, এটা হয়তো অসাবধানতাবশত ঘটছে। প্রধানমন্ত্রী অনেক আগ থেকেই ২৫ অক্টোবর কথাটি ব্যবহার করছেন। এরপর তা খালেদা জিয়া লুফে নিয়েছেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশে দেওয়া আনুষ্ঠানিক লিখিত ভাষণে বলেছেন, ‘সংবিধান অনুযায়ী ২৫ অক্টোবর থেকে ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।’ কেন ২৭ অক্টোবর থেকে বলা হচ্ছে না? কারণ, সংবিধান বলেছে, সংসদের প্রথম বৈঠক থেকে পাঁচ বছর পর সংসদ আপনাআপনি ভেঙে যাবে। প্রথম বৈঠক বসেছিল ২৫ জানুয়ারি ২০০৯। পাঁচ বছর পূর্ণ হবে ২৪ জানুয়ারি ২০১৪। সে অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী তাঁর লিখিত ভাষণেও অঙ্কে কাঁচার পরিচয় দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘সংবিধানের ১২৩(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ২৫ অক্টোবর থেকে নব্বই দিনের হিসাব শুরু হবে।’ অথচ ২৭ অক্টোবর থেকে গণনা শুরু করলে ৯০ দিন পূর্ণ হবে ২৪ জানুয়ারিতে। ২৫ অক্টোবর থেকে শুরু করলে দুই দিন কম পড়বে। ৯০ দিন শেষ হবে ২২ জানুয়ারি। এ থেকে একটা বিষয় সন্দেহ হয় যে, প্রধানমন্ত্রী যেহেতু সংসদে ২৫ অক্টোবর বলেছেন আর বিরোধী দল সেভাবেই প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে। তাই ভাষণের মুসাবিদাকারীরা হয়তো ভেবেছেন ভুলটাই পোক্ত হোক!
প্রধানমন্ত্রী সংবিধানের ১২৩ ও ৭২ অনুচ্ছেদের উল্লেখ করেছেন। তিনি কেন এর উদ্ধৃতি দিয়েছেন তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেননি। সর্বদলীয় সরকারের রূপরেখা যে অস্পষ্ট, বিরোধী দল তা উল্লেখ করেছে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী কেন নির্দিষ্টভাবে দুটি অনুচ্ছেদ পড়ে শুনিয়েছেন, সে বিষয়ে তাঁর ভাষণে কোনো ব্যাখ্যা নেই। তিনি ৭২(১) অনুচ্ছেদ উদ্ধৃত করেছেন। এর মানে ১২৩ অনুচ্ছেদের ৩ দফার ক-এর আওতায় নির্বাচন অর্থাৎ ২৭ অক্টোবর থেকে ২৪ জানুয়ারির মধ্যে যখন ভোট গ্রহণ করা হবে তখন ৬০ দিনের বিরতিতে সংসদের অধিবেশন ডাকতে হবে না। নির্বাচন করতে গিয়ে একটানা ৯০ দিন সংসদের বৈঠক না বসলেও সংবিধানের বিচ্যুতি ঘটবে না। আবার টানা ৯০ দিন সংসদের বৈঠক অব্যাহতভাবে চললেও সংবিধানের বিচ্যুতি হবে না। প্রধানমন্ত্রী এর আগে বলেছেন, তাঁরা ২৫ অক্টোবরের পরও অধিবেশন চালাবেন। আমার মনে হয়, তাঁর ওই ঘোষণা যে সংবিধানসম্মত, সেটা জানিয়ে দিতেই এই অনুচ্ছেদটি তিনি উদ্ধৃত করেছেন।
এ ছাড়া তিনি ১২৩ অনুচ্ছেদের দুটি উপদফা, যেখানে সংসদ ভেঙে যাওয়ার ৯০ দিন আগে এবং ভেঙে যাওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচনের কথা বলা আছে, সেই বিধান উদ্ধৃত করেন। এখানে দেখি, কেন এই উল্লেখ, তার কোনো নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা নেই। নিজের কোনো বক্তব্য নেই।
আমি যা বুঝি সেটা হলো, তিনি জাতিকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন তিনি চাইলে ৯০ দিন আগে করতে পারেন কিংবা ২৪ জানুয়ারি থেকে পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যেও করতে পারেন। আগেও লিখেছি, নির্বাচন অনুষ্ঠানকে আগামী বছরের দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টাও আছে। এটা যে সুচিন্তিতভাবে করা হচ্ছে, সে বিষয়ে আমি লিখিত ভাষণেই ইঙ্গিত পেয়েছি।
প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে (সিইসি) বলির পাঁঠা বানানোর যে আশঙ্কার কথা আমি বলেছিলাম, তারই প্রস্তুতি দেখলাম ভাষণের পরতে পরতে। এবার সর্বদলীয় সরকারের প্রস্তাব রয়েছে সামনে। সিইসি এর আগে বলেছিলেন, যেকোনো ধরনের সরকারের অধীনে তাঁরা নির্বাচন করার জন্য প্রস্তুত থাকবেন। সুতরাং তাঁরা কি এখন দলীয় না সর্বদলীয় সরকারের জন্য আচরণবিধি করবেন, তা আমাদের জানালে ভালো হয়।
প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের শেষাংশ সবচেয়ে অস্পষ্ট ও অস্বচ্ছ। অবশ্য আমাকে যদি বলা হয়, এই অস্পষ্টতা কেবল সমঝোতার স্বার্থে, এটা কোনো তঞ্চকতাপূর্ণ বিষয় নয়, তাহলে আমি তাকে গ্রহণযোগ্যতা দিতে রাজি থাকব। এটা প্রকৃত রাজনীতির শর্ত যে বিরোধী দলকে নির্বাচনে আনব। কিন্তু তাকে বিজয় মিছিল করতে দেব না। সারা দেশের আওয়ামী লীগারদের মধ্যে ভোটের আগেই পরাজয়ের গ্লানি লাগতে দেব না। বিরোধী দল সব দলের জন্য সমান সুযোগ বা সমতল মাঠ চায়। সেই চাওয়া সরকারি দলেরও থাকবে। সুতরাং ভোটের আগে সর্বদলীয় সরকারের রূপরেখা
অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে প্রধানমন্ত্রী যেভাবে সংবিধানকে দেখছেন, সেভাবে তিনি যদি মনে করেন কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই তিনি কেবল নির্বাচনের তারিখ প্রশ্নে রাষ্ট্রপতিকে পরামর্শ দেবেন, আর সেই পরামর্শ তিনি কবে দেবেন, তার কোনো ইঙ্গিত পর্যন্ত নেই।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণের শেষাংশে বলেন, ‘সংবিধানের ৭২ অনুচ্ছেদের ১ দফা অনুযায়ী মহামান্য রাষ্ট্রপতির নিকট প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া লিখিত পরামর্শ অনুযায়ী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচন কমিশন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করবে।’ এটি সত্য নয়। সংবিধানে এ কথা লেখা নেই। তবে এ রকম বাক্য গঠন অজ্ঞাতসারে ঘটে থাকতে পারে। কিন্তু ব্যাপারটি মোটেই তা নয়। মুসাবিদাকারীরা কি অসতর্ক ছিলেন যে এভাবে বাক্য গড়লে তাতে সত্য চাপা পড়তে পারে। সংবিধানের ৭২(১) অনুচ্ছেদে প্রধানমন্ত্রীর লিখিত পরামর্শে সংসদ ভেঙে দেওয়ার বিধান আছে। এটি বলেছে, ‘সরকারি বিজ্ঞপ্তি দ্বারা রাষ্ট্রপতি সংসদ আহ্বান, স্থগিত ও ভঙ্গ করিবেন..’ অথচ এমনভাবে বাক্যটি তৈরি করা হয়েছে যাতে মনে হতে পারে সংবিধানেই স্পষ্ট করে লেখা আছে যে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী নির্বাচন হবে। আসলে সংবিধানের অন্যত্র বরং এ কথাও লেখা আছে, প্রধানমন্ত্রী লিখিত পরামর্শ দিলেই রাষ্ট্রপতি সে অনুযায়ী সংসদ ভেঙে দেবেন না। রাষ্ট্রপতিকেও সংবিধান বলে দিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে পরামর্শ পেলে তাঁকে কী করতে হবে। যেমন ৫৭(২) অনুচ্ছেদ বলেছে, প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে এ রকম পরামর্শ লাভের পর রাষ্ট্রপতি নিশ্চিত হবেন যে অন্য আর কেউ সংখ্যাগরিষ্ঠের আস্থাভাজন নয়, তাহলে তিনি সংসদ ভেঙে দেবেন।
কিন্তু এখন আমরা সংবিধান অনুযায়ী ২৫ বা ২৭ অক্টোবরের মধ্যে ঢুকতে যাচ্ছি। নির্বাচনী তারিখ নির্ধারণী বল যখন সিইসির কোর্টে ঢুকছে, তখন প্রধানমন্ত্রী বললেন, আমি বল বিরোধী দলের কোর্টে পাঠালাম। তিনি সেটা নিশ্চিত করেছেন এই বলে যে, ‘নব্বই দিনের মধ্যে যাতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, সে জন্য আমি সব দলের সাথে, বিশেষ করে মহাজোটের সাথে পরামর্শ করে মহামান্য রাষ্ট্রপতিকে যথাসময়ে লিখিত পরামর্শ দেব। এ ক্ষেত্রে আমি বিরোধী দলের কাছেও পরামর্শ আশা করি।’
আমি মনে করি, ২৭ অক্টোবর থেকে চালকের আসনে বসবে নির্বাচন কমিশন। নির্বাচন কমিশনই বরং দুই প্রধান দলের কাছে নির্বাচনের তারিখ প্রশ্নে লিখিত পরামর্শ আশা করতে পারে। বিষয়টিকে ২৭ অক্টোবরের পরও প্রধানমন্ত্রীর লিখিত পরামর্শনির্ভর দাবি করা একেবারেই ভ্রান্তি। সুতরাং প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে একটি গুরুতর ভুল ব্যাখ্যার গুরুতর নজির স্থাপিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর তরফে নির্বাচনের সম্ভাব্য তারিখটি সিইসিকে এখনই জানিয়ে দেওয়া উচিত এবং তা না জানালে সিইসিরই উচিত হবে জেনে নেওয়া। আগেও বলেছি, ২৪ জানুয়ারির মধ্যে নির্বাচন করতে না পারলে সংবিধানের লঙ্ঘন ঘটবে। এটা লক্ষণীয় যে, ভাষণে সতর্কতার সঙ্গে ‘৯০ দিনের মধ্যে যাতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়’ উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু কোন ‘৯০ দিনের মধ্যে’ তা পরিষ্কার করা হয়নি। জাতির জীবনে ২০১৩ সালের শেষ ৯০ দিন, না ২০১৪ সালের প্রথম ৯০ দিনে নির্বাচন নেমে আসবে, তা স্পষ্ট নয়। আমরা ভাষণে এমনও ইঙ্গিত পাই, প্রধানমন্ত্রী জানুয়ারিতে সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্বাচনে যেতে পারেন। ৭২(১) অনুচ্ছেদের উল্লেখ মানে সংসদ ভেঙে দেওয়া।
বিরোধী দলের তরফে অস্পষ্টতার অভিযোগ বেশ ঝাঁজাল, কিন্তু তারা লক্ষ করছে না যে এটা বলাই তাদের কাজ নয়। সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন তুলে কর্তব্যকর্ম সমাধার সময় এটা নয়। সমাবেশ বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিশ্চয় সংবিধানের মৌলিক মানবাধিকারের লঙ্ঘন। মির্জা ফখরুলের এ কথাও ঠিক যে মনে হচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর নিজের প্রস্তাবের ওপর নিজেরই ভরসা নেই। সভা বন্ধ করার দিনক্ষণ দেখে এমন সংশয় জন্মাতে পারে। এটা সরকারকেই দূর করতে হবে। কিন্তু মির্জা ফখরুলের এ কথা ঠিক নয় যে সরকার সমঝোতার সব দরজা বন্ধ করে দিচ্ছে। বিরোধী দলকে অবশ্যই অধিকতর স্পষ্ট ফর্মুলা দিতে হবে। আর বিকল্প ফর্মুলাই হবে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক অস্পষ্টতা দূরীকরণের মোক্ষম দাওয়াই।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক।
mrkhanbd@gmail.com