প্রশাসনের পদে পদে ব্যক্তি বড়

ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের উপসচিব সৈয়দা শাহানা বারী গত বুধবার পদোন্নতি পেয়ে যুগ্ম সচিব হয়েছেন। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই জানিয়ে দেওয়া হয়েছে তাঁকে আগের দায়িত্বই পালন করতে হবে। অর্থাৎ যুগ্ম সচিব হলেও উপসচিবই থাকবেন তিনি। একইভাবে গত মঙ্গলবার উপসচিব থেকে যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি পাওয়া ৭০ জনের সবাইকে আগের দায়িত্বেই বহাল রাখা হয়েছে। শুধু মঙ্গলবারের পদোন্নতিই নয়, গত বছরও যাঁদের পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে তাঁদেরও আগের পদে বহাল রাখা হয়েছিল। অর্থাৎ প্রজাতন্ত্রের কোনো প্রয়োজনে তাঁদের পদোন্নতি দেওয়া হয়নি। কর্মকর্তাদের ব্যক্তিস্বার্থে ও তাঁদের সামাজিক মর্যাদার খাতিরে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে।
এভাবে পদের মান না বাড়িয়ে ব্যক্তির মান বাড়াচ্ছে সরকার। জনপ্রশাসনের উচ্চ পর্যায়ের প্রতিটি পদোন্নতিই হচ্ছে এ দৃষ্টিকোণ থেকে। অথচ জনপ্রশাসনে ব্যক্তির ভূমিকা নয়, পদের ভূমিকাই মুখ্য। ব্যক্তির মর্যাদা বাড়াতে গিয়ে সরকার লাগামহীনভাবে নির্ধারিত পদের অতিরিক্ত পদোন্নতি দিচ্ছে। এটি চরম অনিয়ম হলেও অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম সচিব ও উপসচিবের পদোন্নতির ক্ষেত্রে এটাই নিয়মে পরিণত হয়েছে। ফলে প্রশাসনের স্বাভাবিক কাঠামো তছনছ হচ্ছে। একই সঙ্গে ভেঙে পড়েছে চেইন অব কমান্ড।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব আবদুস সোবহান সিকদার এ বিষয়ে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এটা কোনো গোপন বিষয় নয়। আমরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে পদোন্নতির যে প্রস্তাব পাঠিয়েছি, তাতে স্পষ্ট করে বলেছি, পদোন্নতি দেওয়া হলেও কর্মকর্তাদের আগের পদেই বহাল রাখা হবে। প্রশাসনিক ভাষায় যাকে ইনসিটো বলা হয়।’
গত ১৮ জুলাই ৩২৬ জন উপসচিবকে যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। এর ৫৪ দিন পর গত বুধবার আরো ৭০ জনকে পদোন্নতি দেওয়া হলো। এই দুই দফার পদোন্নতিতেই প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ যুগ্ম সচিব পদটি ভারসাম্যহীন অবস্থায় চলে গেছে। কারণ এ পদোন্নতির পর যুগ্ম সচিবের মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে এক হাজার ১৩ । অথচ যুগ্ম সচিবের অনুমোদিত পদ হচ্ছে মাত্র ৪৩০টি। পদোন্নতি পাওয়ার ৫৪ দিন পর কাদের চাপে নতুন করে আরো ৭০ জনকে পদোন্নতি দিতে হলো সে বিষয়ে জানতে চাইলে জনপ্রশাসনের সিনিয়র সচিব বলেন, ‘কারো চাপে নয়, যাঁরা যোগ্য তাঁদেরই পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে।’ ৫৪ দিন আগে কি তাঁরা অযোগ্য ছিলেন বা এই অল্প সময়ে কিভাবে তাঁরা যোগ্য হলেন জানতে চাইলে সচিব বলেন, ‘অনেকের বেঞ্চ মার্ক (পদোন্নতির যোগ্যতা অর্জনের নম্বর) ছিল না। গত কয়েক দিনে তাঁদের বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন জমা হওয়ায় তাঁরা পদোন্নতি পেয়েছেন।’
নির্ধারিত পদের বাইরে গিয়ে শুধু যুগ্ম সচিব পদেই নয়, প্রায় প্রতিটি পদের বিপরীতেই দ্বিগুণেরও বেশি সংখ্যক কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। উপসচিব পদ ৮৩০টি হলেও কর্মরত উপসচিবের সংখ্যা ১৩৮৬ জন। ১০৭টি অতিরিক্ত সচিব পদের বিপরীতে বর্তমানে কাজ করছেন ২৪০ জন। এখানেই শেষ নয়। যুগ্ম সচিব থেকে অতিরিক্ত সচিব পদে আরেক দফা পদোন্নতি হতে যাচ্ছে। এর মধ্যেই এ-সংক্রান্ত প্রস্তুতি শেষ করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ডের (এসএসবি) সভা শেষে তালিকা চূড়ান্ত হবে। এই পদোন্নতিতে জায়গা করে নিতে দৌড়ঝাঁপও শুরু হয়ে গেছে।
জনপ্রশাসন সচিব জানিয়েছেন, পদের চেয়ে কর্মকর্তার সংখ্যা বেশি হওয়ার কারণ হচ্ছে আশির দশকে একসঙ্গে অনেককে চাকরিতে নেওয়া হয়েছিল। সেই সময় যে প্রয়োজনে তাঁদের নেওয়া হয়েছিল সে বাস্তবতা আজ আর নেই। কিন্তু তাঁরা প্রশাসনে রয়ে গেছেন। দীর্ঘদিন চাকরি করে তাঁরা পদোন্নতির যোগ্য হয়েছেন। এ কারণে পদোন্নতি দেওয়া হচ্ছে। প্রশাসনের কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলেও এটা দীর্ঘমেয়াদি কোনো সমস্যা নয়। কয়েক বছরের মধ্যে এ সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। একসময় দেখা যাবে এসব পদে পদোন্নতি দেওয়ার লোক খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।’
প্রশাসনের উপসচিব, যুগ্মসচিব ও অতিরিক্ত সচিব পদে মোট এক হাজার ২৭২ জন কর্মকর্তা অতিরিক্ত কাজ করছেন। অন্যদিকে নিচের দুই স্তর সিনিয়র সহকারী সচিব ও সহকারী সচিব পদে কাজ করার যোগ্য লোক খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সিনিয়র সহকারী সচিব পদ এক হাজার ৭৭৪টি হলেও এ পদে কর্মরত আছেন এক হাজার ৪৪৭ জন। অর্থাৎ সিনিয়র সহকারী সচিবের ৩২৭টি পদ শূন্য। একই অবস্থা সহকারী সচিব বা কমিশনার পদের ক্ষেত্রেও। এখানেও শূন্য রয়েছে এক হাজার ১৩২টি পদ। জুনিয়র পর্যায়ের এসব পদ নিয়ে কোনো ঝামেলা না থাকলেও ওপরের দিকের পদেই যত ঝামেলা। কারণ ওইসব পদে প্রভাব বিস্তার করার সুযোগ রয়েছে। আর যুগ্ম সচিব পদকে তো বলাই হয় সরকারের নীতিনির্ধারণী পদ। এখান থেকেই সরকারের পলিসি বা কৌশল তৈরি করা হয়।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও সাবেক মহাহিসাব নিয়ন্ত্রক হাফিজউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘শূন্য পদ না থাকলে কেউ পদোন্নতি পেতে পারেন না। পদের চেয়ে ব্যক্তিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ জন্য পদ না থাকলেও পদোন্নতি হচ্ছে। পদের চেয়ে ব্যক্তিকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত নয়।’
শুধু পদোন্নতি নয় নতুন পদ সৃষ্টিতেও ব্যক্তিকে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। প্রশাসনে সিনিয়র সচিব নামে একটি পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। এসব পদও সৃষ্টি করা হয়েছে ব্যক্তি দেখে। সি কিউ কে মোশতাক আহমদ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব। তাঁকে যদি আজ ধর্ম মন্ত্রণালয়ে বদলি করা হয় তা হলে তিনি হবেন ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন সচিব জানিয়েছেন, প্রশাসনে কাজ করার ক্ষেত্রে ব্যক্তি বিবেচ্য বিষয় হতে পারে না। পদটাই মুখ্য হওয়া উচিত। ব্যক্তিকে সিনিয়র সচিব না করে কয়েকটি বড় বাজেটের এবং গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়কে চিহ্নিত করা দরকার ছিল। সেই মন্ত্রণালয়ে সিনিয়র সচিবদের পদায়ন করা হলে সমস্যা হতো না। এখন সিনিয়র সচিব যেখানে যাবেন পদটাও সেখানে যাবে।
পদোন্নতির মূল কথা হচ্ছে মেধা, দক্ষতা ও যোগ্যতা। কিন্তু সে বিষয়টি বিবেচনায় না নিয়েই গণহারে পদোন্নতি দেওয়া হচ্ছে। এতে মেধার অবমূল্যায়ন হচ্ছে। ব্যক্তিকে আমলে নেওয়া হচ্ছে, যা পদোন্নতির মূলনীতির পরিপন্থী। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে সুপারনিউমারি পদ সৃষ্টি করা হচ্ছে। এই সুপারনিউমারি পদ নিয়েও মতভেদ রয়েছে।
বিসিএস ইনফরমেশন অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব স ম গোলাম কিবরিয়া বলেন, সরকারের বর্তমান প্রশাসনিক কাঠামোটি মূলত ১৯৮৩ সালের পর সেভাবে সংস্কার করা হয়নি। সরকারের কাজের পরিধি আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। প্রশাসনিক ব্যবস্থায়ও পরিবর্তন এসেছে। তাই বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রশাসনিক কাঠামো সংস্কার করার প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। এ দৃষ্টিকোণ থেকে কাঠামো সংস্কার না করে সুপারনিউমারি পদ সৃষ্টি করে মূলত কাঠামোটিরই ক্ষতি করা হচ্ছে। এ দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে অনেক ক্যাডারের কর্মকর্তাই সুপারনিউমারি পদ সৃষ্টির চিন্তা করছে, যা সঠিক নয় বরং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সরকারের কাজের বর্ধিত পরিধির বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে দ্রুততার সঙ্গে ক্যাডারগুলো সংস্কারের উদ্যোগ নিতে পারে। সে অনুযায়ী পদের মানোন্নয়ন বা পদ সৃষ্টি করা যেতে পারে। সেটি বরং দীর্ঘমেয়াদি সুফল বলে আনবে এবং সরকারের কাজেও গতিশীলতা আসবে।’
পদোন্নতির ক্ষেত্রে বড় ব্যাচ বলে একটা ব্যাখ্যা দাঁড় করানো হচ্ছে। আসলে বড় ব্যাচ অন্যান্য ক্যাডারেও রয়েছে। সেসব ক্যাডারে গণহারে পদোন্নতি দেওয়া হচ্ছে না। এই সুবিধা পাচ্ছেন শুধু প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা। কৃষি ক্যাডারের অনেক কর্মকর্তা পদোন্নতি না পেয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা থেকেই অবসরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। স্বাস্থ্য ক্যাডারেও উপজেলা মেডিক্যাল অফিসার পদে বছরের পর বছর চাকরি করতে হচ্ছে বিসিএস কর্মকর্তাদের। বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস কৃষি অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব এস তাসাদ্দেক আহমদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পদের অতিরিক্ত পদোন্নতি শুধু প্রশাসন ক্যাডারের সদস্যরাই কেন পাবেন। আমরা যারা বিসিএস দিয়ে চাকরিতে ঢুকেছি তারা কেন পাব না। ১৯৮৫ ব্যাচের প্রশাসন ক্যাডারের সদস্যরা যুগ্মসচিব হয়ে গেছেন। অথচ কৃষি ক্যাডারের লোকজন এখনো দুই স্কেল নিচের উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা পদেই রয়ে গেছেন। আর প্রশাসন ক্যাডারের লোকজনকে পদ না থাকার পরও ইনসিটো করে পদোন্নতি দেওয়া হচ্ছে। এটা বৈষম্যমূলক আচরণ, যা দূর করা দরকার।’
গত সাড়ে চার বছরে সরকার উপসচিব থেকে তার ওপরের পদে ২৫১৮ জন কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দিয়েছে। প্রায় সব পদ পূর্ণ থাকার পরও এসব পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। আর এই কাজ করতে গিয়ে সমানসংখ্যক কর্মকর্তাকে বঞ্চিত করার অভিযোগ উঠেছে। এসব বিতর্কিত পদোন্নতির জন্য সচিবরা প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। গত সপ্তাহে সচিব সভায় সচিবরা এর জন্য সরকারপ্রধানকে অভিনন্দন জানান।
একজন ওএসডি কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, একসময় বাজেটে শিক্ষা খাতে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ ছিল। এখন জনপ্রশাসন খাতে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ দিতে হয়। এই খাতে সরকারকে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা খরচ করতে হয়। অহেতুক পদোন্নতি মানে অতিরিক্ত সুযোগ-সুবিধা। পদোন্নতিপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা প্রাধিকারবলে কিছু সুযোগ-সুবিধা পান। এসব ব্যয়ের বোঝা জনগণকেই টানতে হয়।