প্রশাসনের সহযোগিতায় ইয়াবার অবাধ পাচার

মিয়ানমার সীমান্ত এলাকায় সেখানকার আটটি সংগঠন গড়ে তুলেছে ৩৭ ইয়াবা কারখানা। বাংলাদেশের সীমান্ত থেকে মিয়ানমারের ওই এলাকা খুবই কাছে। সেখান থেকেই প্রতিদিন পাচার হয়ে বাংলাদেশে আসে ৩০ লাখ ইয়াবা ট্যাবলেট। প্রশাসনের সহযোগিতায় চোরাচালানিদের মাধ্যমে এই জীবনঘাতী মাদক পৌঁছে যাচ্ছে বাংলাদেশের আনাচ-কানাচে। ইয়াবার ছোবলে ধ্বংস হচ্ছে দেশের যুবসমাজ। বাড়ছে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা।
বাংলানিউজের দীর্ঘ অনুসন্ধানে পাওয়া গেছে কারা ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত এবং এ-সংক্রান্ত নানা চাঞ্চল্যকর তথ্য। জানা গেছে, ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে প্রশাসনেরই এক শ্রেণীর কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত। তাঁদের সহযোগিতায় পরিচালিত হচ্ছে এই সর্বনাশা ব্যবসা। বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রশাসনের জড়িত থাকার কথা জানা গেছে।
গত ২৭ আগস্ট নকল ইয়াবা তৈরির মেশিনসহ পুলিশের কাছে আটক হন টেকনাফ আওয়ামী লীগের এক মহিলা নেত্রী। পরে পুলিশের সঙ্গে রফা করে ছাড়া পান তিনি। অভিযোগ রয়েছে, এ ক্ষেত্রে বড় ধরনের লেনদেন হয়েছে পুলিশের সঙ্গে। এর দুই দিন পরই ২৯ আগস্ট টেকনাফে তল্লাশি চালিয়ে ৩৬ হাজার পিস ইয়াবা আটক করেন এএসআই হিরন। পরে চার লাখ টাকায় বিষয়টি মিটমাট হওয়ার পর ইয়াবাসহ আটক ব্যক্তিকে ছেড়ে দেওয়া হয়। বিষয়টি জানাজানি হলে অভিযুক্ত হিরনকে স্ট্যান্ড রিলিজ করে কক্সবাজার পুলিশ।
কক্সবাজারে কাজ করতে আসা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, রাজস্ব কর্মকর্তা থেকে ঝাড়ুদার পর্যন্ত ইয়াবা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সখ্য রেখে আয় করছেন লাখ লাখ অবৈধ টাকা। গাড়ি, বাড়ি, সম্পত্তি ও বিপুল অর্থের মালিক বনে গেছেন অনেকে।
জানা গেছে, টেকনাফ থানার ওসি ফরহাদ হোসেন বেশির ভাগ সময় তাঁর গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামে যাতায়াতের সময় ব্যবহার করেন ইয়াবার গডফাদার হাজী সাইফুলের গাড়ি। তখন সেই গাড়িতে করেও ইয়াবা পাচার হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
সরকারের গোয়েন্দা সংস্থার বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, হাজী সাইফুল করিম তাঁর নিজের জাহাজে করে চট্টগ্রাম বন্দরে ইয়াবা নিয়ে যান। সেখান থেকে লাইটার জাহাজে ঢাকা, ভৈরব ও খুলনা হয়ে ভারতেও পাচার করা হয়। খুলনা ও যশোর ইয়াবার রুট না হওয়ায় ওই রুট দিয়ে পরে ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় নিরাপদে ইয়াবা আনা-নেওয়া করে থাকেন তিনি।
গোয়েন্দা রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রশাসন ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তাদের হৃদ্যতা রয়েছে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে। টেকনাফ, কক্সবাজার ও চট্টগ্রামে সাইফুলের বাড়িতে এসব কর্মকর্তার নিয়মিত যাতায়াত রয়েছে। এই কর্মকর্তাদের সাইফুল দামি উপহারও দিয়ে থাকেন।
সাইফুল হাজী টেকনাফ বিজিবির সাবেক এক কর্মকর্তাকে ৩৭ লাখ টাকায় একটি গাড়ি কিনে দিয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। ওই কর্মকর্তা বর্তমানে বিজিবি সদর দপ্তরে কর্মরত আছেন। আরো অভিযোগ রয়েছে, টেকনাফের দমদমিয়া বিজিবি চেকপোস্টে তল্লাশিতে ৫৬ হাজার ইয়াবার চালান ধরা পড়ার পর স্থানীয় সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদি এসে ছয় হাজার পিস রেখে বাকি ৫০ হাজার পিস ইয়াবা নিয়ে যান। পরে বিজিবি পরিত্যক্ত অবস্থায় ছয় হাজার ইয়াবা উদ্ধার হয়েছে বলে দেখায়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে সরাসরি জড়িত আছেন পুলিশের চট্টগ্রাম বিভাগীয় এক কর্মকর্তা। চট্টগ্রাম বিভাগের এক প্রভাবশালী মন্ত্রীর মদদে এ ব্যবসা দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে।
টেকনাফের সুধীসমাজের অভিযোগ, জেলার আইনশৃঙ্খলা রক্ষা কমিটির বৈঠকে এমপি বদির কারণে ইয়াবা ব্যবসা সম্পর্কে কোনো কথাই তুলতে পারেন না সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। ইয়াবা ব্যবসা বন্ধ করতে না পেরে সবাই এখন বদিকে সহযোগিতা করে লাভবান হওয়ার চেষ্টা করছেন। এসব কর্মকর্তার সহায়তায় এখন সরকারি গাড়িও ব্যবহৃত হচ্ছে ইয়াবা পাচারে। বড় বড় চালানগুলো পাচারের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে কক্সবাজার বিমানবন্দর। বিমানে করে ইয়াবা চলে যাচ্ছে ঢাকাসহ বিভিন্ন গন্তব্যে।
জেলা পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, সব কর্মকর্তাই ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত নন। তবে যাঁরা এর সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে চান না, তাঁদের এখানে থাকাটাও কষ্টকর।
অভিযোগ রয়েছে, অনেক ক্ষেত্রেই পুলিশ, বিজিবি ও র‌্যাব বড় ও মাঝারি ধরনের চালান আটক করলেও সংশ্লিষ্ট বাহিনী খুবই সামান্য পরিমাণ আটক দেখিয়ে বাকিটা ইয়াবা ডিলারদের কাছে বিক্রি করে দেয়। কখনো কখনো টাকার বিনিময়ে বাকিটা ফিরিয়ে দেওয়া হয় ইয়াবা মালিকদের। আবার যতটুকু আটক দেখানো হয়, তাতে কম দামি ট্যাবলেট মিশিয়ে আসল ইয়াবা বিক্রি করা হয় খোলাবাজারে- এমন অভিযোগও করেছেন প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা।
টেকনাফ থানার ওসি ফরহাদ হোসেন তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপিত সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘ইয়াবা সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে আমরা যুদ্ধ ঘোষণা করেছি। কিন্তু এখানকার গডফাদাররা সবার কাছে পরিচিত হলেও আইন অনুযায়ী তাঁদের হাতেনাতে ধরতে না পারায় তাঁরা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাচ্ছেন।’ তিনি জানান, গত মাসে টেকনাফ পুলিশ ৩০ হাজার ৮০০ পিস ইয়াবা জব্দ করেছে। মামলা হয়েছে ১৮টি। এতে আসামি করা হয়েছে ২৩ জনকে। অন্যদিকে বিজিবি জব্দ করেছে ১৮ হাজার পিস। আট মামলায় আসামি করা হয়েছে তিনজনকে। র‌্যাবের হাতে জব্দ হয়েছে এক হাজার ইয়াবা। তিনি বলেন, পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবি ছাড়া মাদকদ্রব্য অধিদপ্তর ও কোস্ট গার্ড কোনো ইয়াবা জব্দ করতে পারেনি।
১৭ বিজিবির অধিনায়ক খালিদ হাসান বলেন, ইয়াবা পাচারের সবচেয়ে বড় পয়েন্ট নাফ নদীর ১৪ কিলোমিটার চ্যানেল। এত বড় নদী এবং কিছুটা দুর্গম হলেও বিজিবির এতটা সক্ষমতা নেই। মাত্র দুটি স্পিডবোট ও দুটি হাই স্পিডবোট দিয়ে এদের দমন করা সম্ভব নয়। এ ছাড়া কারা এটা করছে, তাও বোঝা কঠিন।