প্রশাসনে কোণঠাসা যোগ্য কর্মকর্তারা

শরীফুল ইসলাম
রাষ্ট্রপতি কার্যালয়ের সচিব মনজুর হোসেন। প্রশাসনের ১৯৮২ নিয়মিত ব্যাচের একজন কর্মকর্তা। বর্তমান সরকারের আমলে সচিব হয়েছেন। সরকারের এ সময়ে দফতর বদল হয়েছে চার দফা। যেখানেই বদলি করা হয়েছে সেখানেই দেখিয়েছেন মেধার স্বাক্ষর। এর পরও কোথাও ৩ মাস, ৬ মাস ও ১ বছরের বেশি স্থায়ী হতে পারেননি তিনি। আর এর পেছনে রয়েছে প্রশাসনের কথিত প্রভাবশালীদের খুশি করতে না পারা। ফলে তার ভাগ্যে বারবার জুটেছে বদলি। একপ্রকার কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন তিনি।
শুধু তিনিই নন প্রশাসনের এমন শতাধিক মেধাবী কর্মকর্তার ভাগ্যে জুটেছে এমন পরিণতি। কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন এসব যোগ্য কর্মকর্তা। এই কর্মকর্তারা তাদের যোগ্যতা দিয়ে ভালো পদায়ন পেলেও কথিত প্রভাবশালীদের খুশি করে কিছু অযোগ্য কর্মকর্তারা তাদের সরিয়ে বসেছেন ওই পদগুলোতে। অনেক কর্মকর্তা এ ধরনের অপমান সহ্য করতে না পেরে চাকরিও ছেড়েছেন। কয়েক দফা কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দেওয়া হলেও মেধাবী কর্মকর্তাদের কম গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে বদলি করায় তাদের মধ্যে কাজকর্মে এক ধরনের অনীহা সৃষ্টি হয়েছে। ফলে প্রশাসনে অস্থিরতা বাড়ছেই। এ বিষয়ে প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, সারাজীবন দেশের সেবায় কাজ করেও মূল্যায়ন পাইনি। কোনোভাবে চাকরির বয়সটা পার করে অবসরে চলে যাব। কারণ প্রশাসনে যারা লবিং করতে পারে, তাদেরই মূল্যায়ন করা হচ্ছে। তারা বলেন, গুটিকয়েক কর্মকর্তার কারণে প্রশাসনে এমন অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। প্রশাসন গতিশীল করতে সরকারের আন্তরিকতা থাকলেও
কাজে আসছে না। তারা সরকারকে নানাভাবে বুঝিয়ে প্রশাসনকে বিগত ধারায় রাখছে। আর যেসব কর্মকর্তা এগুলো করছেন তারা বিগত সরকারের আমলেও ভালো অবস্থায় ছিলেন।
তবে এ বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব আবদুস সোবহান শিকদার সমকালকে বলেন, কারোর ব্যক্তিগত ইচ্ছা বা অনিচ্ছায় কাউকে পদোন্নতি ও পদায়ন করা হচ্ছে না। সরকারি কাজকর্ম পরিচালনায় যাদের যোগ্য মনে হচ্ছে, তাদেরই পদোন্নতি ও পদায়ন করা হচ্ছে।। এক্ষেত্রে অস্বচ্ছতার কোনো ছাপ নেই বলে তিনি দাবি করেন।
তবে এসব কথা একেবারই মানতে নারাজ প্রশাসনের বিভিন্ন ব্যাচের সরকারের আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত কর্মকর্তারা। তারা বলেন, জনপ্রশাসন গুটিকয়েক কর্মকর্তার হাতে বন্দি হয়ে পড়েছে।
সূত্র জানায়, বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর গুটিকয়েক কর্মকর্তা সিন্ডিকেট তৈরি করেছে। এ সিন্ডিকেট সরকারের পৌনে পাঁচ বছরে যেভাবে চেয়েছে, প্রশাসন সেভাবেই চলছে। তাদের মন জোগাতে না পারলে ভাগ্যে জুটছে বদলি ও ডাম্পিং পোস্টিং। পদোন্নতির যোগ্যদের বার বার বঞ্চিত করা হয়েছে। তারা জনপ্রশাসনে নতুন মেরুকরণ শুরু করেছে। কর্মকর্তাদের পদোন্নতি ও পদায়নের ক্ষেত্রে বিগত ২০ বছরের সব রীতিনীতি ভেঙে ব্যক্তিগত ‘সখ্য’কেই প্রাধান্য দিয়েছে এ সিন্ডিকেট। এদের সঙ্গে যারা ‘গোপন সখ্য’ গড়ে তুলেছেন, তারা সরকারের মতাদর্শের বাইরে হলেও অবাধে পদোন্নতি ও ভালো পদায়ন পেয়েছেন। বিভিন্ন ব্যাচের সরকারের আস্থাভাজন কয়েক কর্মকর্তার বিরোধিতা সত্ত্বেও প্রভাবশালী কয়েক কর্মকর্তার আশীর্বাদে সচিব পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে বিগত জোট সরকারের সুবিধাভোগীদের। বিশেষ সুবিধায় সচিব বানানো হয়েছে ৮২ বিশেষ ব্যাচের কয়েকজন কর্মকর্তাকে। পরে তাদের যে দফতরে পদায়ন করা হয়েছে বলে সেখানে কর্মরত যোগ্য কর্মকর্তাদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবকে এমন ক্ষোভ নিয়ে চাকরি থেকে বিদায় নিতে হয়েছে। এমনও দেখা গেছে, সিন্ডিকেটের মন জুগিয়ে, ৮০ জন অতিরিক্ত সচিবকে ডিঙিয়ে সচিব হয়েছেন এক কর্মকর্তা। আবার ওএসডি হতে হয়েছে মেধার স্বাক্ষর রাখা ৮২ নিয়মিত ব্যাচের এক কর্মকর্তা। আবার অনেক যোগ্য কর্মকর্তাকে সরকারবিরোধীর তকমা লাগিয়ে বছরের পর বছর ওএসডি রাখা হয়েছে। এমনও নজির রয়েছে সরকারের উচ্চ মহল থেকে ৮২ বিশেষ এক ব্যাচের কর্মকর্তাকে সচিব পদে পদোন্নতি দেওয়ার ব্যাপারে নির্দেশ থাকলেও এ সিন্ডিকেট ভুল বুঝিয়ে তার পদোন্নতিতে বাদ সেধেছেন। পরে তাকে ওএসডি করতে বাধ্য করেছেন।
প্রশাসন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নব্বই দশকের পর বিশেষ করে ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকারের সময় থেকে প্রশাসনে দলীয়করণ শুরু হয়। এর অংশ হিসেবে দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে পদোন্নতি, নিয়োগ, বদলি এমনকি চাকরিচ্যুতিও শুরু হয়। পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও এ ধারা অব্যাহত থাকে। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে এ ধারা ভয়বাহ রূপ ধারণ করে। ওই পাঁচ বছরে মুষ্টিমেয় কিছু কর্মকর্তা প্রশাসনে যা খুশি তাই করেছেন। যাকে পছন্দ হয়েছে তাকে ভালো পদায়ন করেছেন। আর যারা তাদের পছন্দের তালিকায় স্থান পাননি, তাদের ভাগ্যে জুটেছে করুণ পরিণতি। একাধিকবার বদলি করা হয়েছে। বছরের পর বছর পদোন্নতি বঞ্চিত হয়েছেন। বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর প্রশাসন সংশ্লিষ্ট ধারণা করেছিলেন ওই ধারা থেকে বর্তমান সরকার বেরিয়ে আসবে। কিন্তু গুটিকয়েক কর্মকর্তার কারণে সেই আশা আশাই থেকে যায়। প্রশাসন পুরনো চিত্রেই চলতে থাকে।
রেটিং দিন :