ফাঁসির রায় তো হলো, তারপর?..আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী

ফাঁসির রায় তো ঘোষিত হলো, তারপর? বাঙালি শুধু হুজুগে জাত নয়, সন্দেহপ্রবণ জাতও। এ জন্যই বাঙালির একটি প্রবাদ আছে, ‘না আঁচালে বিশ্বাস নেই।’ ‘৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও দণ্ডাদেশ সম্পর্কেও বাঙালির একই সন্দেহ। ফাঁসির আদেশ হয়েছে বৈকি, ফাঁসি কার্যকর হবে তো? সাংবাদিক সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার একবার ঠাট্টা করে বলেছিলেন, ‘বাঙালিকে খুশি করতে পারে এমন দেবতা এখনও জন্মাননি।’ তার কথার জের টেনে বলি, শেখ হাসিনা তো কোনো দেব-দেবীর পর্যায়েও পড়েন না। একজন সাধারণ মানুষ। তিনি কী করে বাঙালিকে খুশি করবেন?
হাসিনা সরকার যখন ‘৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ঘোষণা দেয়, তখন অনেকেই বাঁকা হাসি হেসে বলেছেন, ‘চলি্লশ বছর কেটে গেছে, যুদ্ধাপরাধীদের কিছু হয়নি, বরং বহাল তবিয়তে আছে, মন্ত্রী-মিনিস্টার হচ্ছে। তাদের বিচার হবে_ এটা কি কোনো বিশ্বাসযোগ্য কথা? এটা আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভাঁওতাবাজি। তারপর যখন একে একে যুদ্ধাপরাধীদের গ্রেফতার শুরু হলো, এমনকি পালের গোদা গোলাম আযমকেও। তখন বলা হলো, এটা আওয়ামী লীগ সরকার আইওয়াশ করছে। জামায়াতকে বিএনপির কাছছাড়া করার জন্য এক ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে। গ্রেফতার করা ও বিচার করা তো এক কথা নয়।
শেষ পর্যন্ত বিচার শুরু হলো। কিন্তু বাঙালির এই বুদ্ধিমান শ্রেণীর মুখের ব্যঙ্গ হাসির আর শেষ নেই। বলা হলো, বিচারে অভিযুক্তরা সবাই খালাস পেয়ে যাবে। মামলায় ড. কামাল হোসেনের মতো জাঁদরেল উকিল কই? সব দুর্বল জুনিয়র উকিল দেওয়া হয়েছে। এরা যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগই খাড়া করতে পারবে না। আর তাদের অপরাধের সাক্ষী-সাবুদই-বা কোথায়? জামায়াত টাকাপয়সা খরচ করে সব লোপাট করে ফেলেছে। ভয় দেখিয়ে যেসব সাক্ষী আছে, তাদেরও মুখ বন্ধ করে দেবে। আওয়ামী লীগ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের যোগ্যতা রাখে না। বরং নিজেদের অযোগ্যতার জন্য বিচারে যুদ্ধাপরাধীদের খালাস হয়ে আসার সুযোগ করে দেবে। সেটাই তাদের আসল উদ্দেশ্য।
বিচারের রায় ঘোষণা শুরু হলো। এক এক করে মৃত্যুদণ্ডাদেশ। মাঝখানে একজনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছিল। গণপ্রতিবাদ এবং আপিলে তারও মৃত্যুদণ্ডাদেশ হয়েছে। বয়সাধিক্যের দরুন গোলাম আযমকে ফাঁসির বদলে ৯০ বছরের কারাদণ্ড। যুদ্ধাপরাধী সাকা চৌধুরীর যে এত দম্ভ, এত ঔদ্ধত্য, তারও ফাঁসির আদেশ হয়েছে। অতঃপর অন্যান্য যুদ্ধাপরাধীর বিচারের রায় কী হবে তা সহজেই অনুমেয়।
এখন আমাদের বুদ্ধিজীবী সমাজের বিরূপাক্ষ শ্রেণী কী বলবেন? নাহ, তারা দমেননি। এত সহজে দমবার পাত্র তারা নন। তাদের কয়েকজন আমাকে টেলিফোনে তাদের প্রতিক্রিয়া জানালেন। একজন প্রায় দার্শনিক স্বরে বললেন, আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা একেবারে মাটিতে মিশে গেছে। নির্বাচন হলে তাদের জয়ের কোনো সম্ভাবনা নেই। তাই তাড়াতাড়ি কয়েকজন যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসির আদেশ দিয়ে নির্বাচনে সেই ভরাডুবি ঠেকানোর চেষ্টা হচ্ছে। দেখবেন, ফাঁসির আদেশ দেওয়া পর্যন্তই। ওটা কার্যকর করা ঝুলিয়ে রেখে দেশবাসীকে বলা হবে, ‘এবারও আমাদের ভোট দাও। নইলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায় কার্যকর হবে না। বিএনপি ক্ষমতায় এলে সব অপরাধীকে ছেড়ে দেবে। চাই কি তাদের কাউকে কাউকে আবার মন্ত্রী বানাতেও পারে।’
আমি তাদের বলেছি, বাঙালি জাতির মধ্যে একটি দুষ্টবুদ্ধির সন্দেহবাতিক অংশ আছে। তারা সংখ্যায় কম নয়। আপনারা তাদের প্রতিনিধি। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিচারের সময়ও আপনারা একই কথা বলেছিলেন_ ফারুক-ডালিমদের গায়ে হাত দেওয়ার সাহস আওয়ামী লীগের নেই। জনমত তুষ্ট করার জন্য তাদের বিচার করা হলেও ফাঁসি দেওয়ার সাহস আওয়ামী লীগ সরকারের হবে না। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিচারও বিএনপি ও বিএনপি সরকারের অসহযোগিতার ফলে বিলম্বিত হচ্ছিল। আপনারা তখনও এই বিচার সম্পর্কে জনমনে বিভ্রান্তি ও সন্দেহ সৃষ্টি করে ঘাতকদের বাঁচানোর চেষ্টা করেছেন। তাদের আপনারা বাঁচাতে পারেননি। যুদ্ধাপরাধীদেরও বাঁচাতে পারবেন না।
এই বুদ্ধিভ্রংশ বুদ্ধিজীবীরা ছাড়া দেশের গোটা মানুষ যে এই ঘাতক ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং চরম দণ্ডদানের পক্ষে, তা কি দেশের রাজনৈতিক আবহাওয়াতেও স্পষ্ট নয়? একে একে জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের অধিকাংশের ফাঁসির আদেশ হওয়ার পর জামায়াত দেশব্যাপী অরাজকতা সৃষ্টির তো কম চেষ্টা করেনি। কওমি মাদ্রাসার ছাত্রদের দিয়ে হেফাজতি অভ্যুত্থান ঘটানোরও চেষ্টা করেছিল। এই অভিযান পুলিশের আধঘণ্টার অপারেশনে শেষ। আর জামায়াতিরা একেকটি ফাঁসির রায় হওয়ার পর শহর-বন্দরে চোরাগোপ্তা হামলা এবং দু’একজন পথচারী হত্যা করেই ‘যঃ পলায়তি, সঃ জীবুতি’ নীতি অনুসরণ করেছে। জনগণের তারা সমর্থন পায়নি। হরতাল ডেকে কয়েক ঘণ্টার বেশি রাস্তায় থাকতে পারেনি।
গত মঙ্গলবার কী হলো? এবার তো কোনো জামায়াতি নেতাকে নয়, একেবারে খোদ বিএনপির একজন শীর্ষ নেতা, সংসদ সদস্য এবং বিএনপির স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছিল, সাকা চৌধুরীকে দণ্ড দেওয়া হলে গোটা চট্টলই শুধু গর্জে উঠবে না, দেশের সর্বত্র অরাজকতা ছড়িয়ে পড়বে। বাস্তবে দেখা গেল, চট্টল কেন, সাকা চৌধুরীর নিজের এলাকাতেও তেমন কিছুই হয়নি। বরং সেখানে আনন্দ মিছিল বেরিয়েছে। চট্টগ্রামের বিএনপি ঘোষিত হরতালেও তেমন উত্তাপ ছিল না। ঢাকায় বিএনপি হরতাল ডাকেনি। জামায়াতি কায়দায় কিছু ভাংচুর করেছে। ‘সালাউদ্দিন চৌধুরী সুবিচার পাননি’ বলে যে বিক্ষোভ মিছিলের কর্মসূচি দেওয়া হয়েছে, তাও ছিল দায়সারা গোছের। দেখা গেছে, বিএনপির ভেতরেও সাকা চৌধুরীর প্রতি সহানুভূতিশীল লোক কম। বরং বিরোধীরাই সাইলেন্ট মেজরিটি। এটা স্পষ্ট, সালাউদ্দিন চৌধুরীর মৃত্যুদণ্ডাদেশে খালেদা জিয়া যে রণরঙ্গিনী মূর্তিতে বেরিয়ে এসে জামায়াতিদের দৃশ্য অথবা অদৃশ্য সহযোগিতায় হরতাল ডাকার নামে ভাংচুর, অগি্নসংযোগের খেলায় নামতে পারেননি, তার একটা কারণ দলের হাইকমান্ডেও সাকা চৌধুরীর বিরোধীদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা।
এর বড় কারণ সম্ভবত, সাকা চৌধুরীর জন্য সরাসরি আন্দোলনের মাঠে নেমে যুদ্ধাপরাধীদের দল হিসেবে জামায়াতের মতো বিএনপিরও দেশবাসীর কাছে চিহ্নিত হওয়ার ভয়: কিন্তু ‘ঘোমটার নিচে খেমটা’ নাচ দিয়ে যে রাজনীতি করা যায় না, বিএনপির এবারের কার্যকলাপে তা প্রমাণিত হয়েছে। জামায়াতি যুদ্ধাপরাধীদের দণ্ডাদেশ ঘোষিত হওয়ার সময়ও দেখা গেছে, এর বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে মুখ খোলার সাহস না দেখালেও তারা এই বিচারের বৈধতা, বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ইত্যাদি নিয়ে নানা প্রশ্ন তুলে এই বিচার বানচাল করার এবং যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচানোর চেষ্টা করেছে ও এখনও করছে।
এখন মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত সাকা চৌধুরী তো নিজেদের ঘরের লোক। বিএনপির তাই উভয় সংকট। এই দণ্ডাদেশের সরাসরি বিরোধিতা করে হরতাল ডেকে মাঠে নামলে জনসাধারণের কাছে যুদ্ধাপরাধীদের আরেকটি দল অথবা যুদ্ধাপরাধীদের সমর্থক দল হিসেবে চিহ্নিত হতে হবে। আবার বিএনপির ভেতরেও নেতাকর্মী পর্যায়ে যুদ্ধাপরাধীদের শাস্তি চান এমন বিরাটসংখ্যক মানুষ আছে। তারা বিগড়াবে। তাই বিএনপি-নেতৃত্বকে ‘ঘোমটার নিচে খেমটা নাচ’ দেখাতে হচ্ছে। তারা সাকা চৌধুরীর মৃত্যুদণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে হরতাল না ডেকে এই বিচার স্বচ্ছ হয়নি এবং সাকা চৌধুরী সুবিচার পাননি_ এই ধুয়া তুলে একদিনের বিক্ষোভ কর্মসূচি দিয়ে নিজেদের মুখ রক্ষার চেষ্টা করেছেন। তাতে বিএনপির মুখরক্ষা হয়নি।
ঢাকায় বৃহস্পতিবার (৩ অক্টোবর) সোহরাওয়ার্দী উদ্যানমুখী তাদের বিভিন্ন মিছিল যারা প্রত্যক্ষ করেছেন তারা জানেন, এই মিছিলগুলো সম্পূর্ণভাবে দখল করে নিয়েছিল জামায়াত-শিবির। স্লোগানও উঠেছে সরাসরি জামায়াত-শিবিরের যুদ্ধাপরাধীদের সমর্থন সূচক রণধ্বনিসহ। বিএনপি ঘরানার আইনজীবী খন্দকার মাহবুব তো প্রকাশ্যেই বলে ফেলেছেন, ‘৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের যেসব বিচারক বিচার করছেন, অদূর ভবিষ্যতে বাংলার মাটিতেই তাদের বিচার হবে।
একজন সুস্থ মস্তিষ্কের আইনজীবী কি এ কথা বলতে পারেন? এটা কি আদালত অবমাননা নয়? দেশের সর্বোচ্চ আদালতের বিচারকদের হুমকি দেওয়া নয়? কাগজে খবর দেখেছি, এই আইনজীবীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। তাকে বাঁচানোর জন্যই সম্ভবত এখন বলা হচ্ছে, তিনি বিএনপির পক্ষ থেকে নয়, হয়তো আইনজীবী সমিতির একজন নেতা হিসেবে কথাটা বলেছেন। তিনি যে পরিচয়েই কথাটা বলে থাকুন তাতে কি তার অপরাধ খণ্ডায়?
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর নাৎসি যুদ্ধাপরাধীদের ন্যুরেমবার্গ ট্রায়ালের সময়ও পরাজিত ফ্যাসিবাদী দলগুলো ইউরোপে এই বিচারবিরোধী উৎপাত সৃষ্টির চেষ্টা করেছিল। ন্যায়বিচারের দোহাইতে নানা বিভ্রান্তি সৃষ্টির চেষ্টা করেছিল। জার্মানির ন্যুরেমবার্গে কড়া নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে এই বিচার অনুষ্ঠান করতে হয়েছিল। বিচারকদের নিরাপত্তা দিতে হয়েছিল। টোকিওতে যুদ্ধকালীন জাপানি প্রধানমন্ত্রী তোজো ও তার যুদ্ধাপরাধী সহকর্মীদের বিচারের সময় তাদের চরম শাস্তিদান সম্পর্কে বিচারকরা সর্বসম্মত রায় দিতে পারেননি। ভারতীয় বিচারপতি রাধাবিনোদ পাল অন্যান্য বিচারকের সঙ্গে সহমত পোষণ করেননি; কিন্তু যুদ্ধাপরাধীদের শাস্তি হয়েছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গঠিত টোকিও এবং ন্যুরেমবার্গের এই দুটি ট্রাইব্যুনালের বিচার সম্পর্কেই ফ্যাসিবাদী দলগুলো ইউরোপ ও আমেরিকায় বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার চেষ্টা করেছিল। তারা সফল হয়নি। বিশ্ববাসী মেনে নিয়েছিল_ এই বিচার ন্যায়সঙ্গত এবং মানবতার শত্রু যুদ্ধাপরাধীদের মৃত্যুদণ্ড হওয়ায় মানবসভ্যতা কলঙ্কমুক্ত হয়েছে। এই শাস্তি যদি না হতো, যুদ্ধাপরাধীরা বিশ্বমানবতার বিরুদ্ধে এত বড় অপরাধ করে যদি পার পেয়ে যেত, তাহলে ইউরোপ কেন, সারাবিশ্বে ফ্যাসিবাদের পুনরুত্থান ঠেকানো যেত না। পৃথিবীতে এখন যে ধ্বংসযজ্ঞ চলছে, তা দশগুণ বৃদ্ধি পেত। বিশ্বশান্তি উপহাসের বিষয়ে পরিণত হতো।
ফ্যাসিবাদের এই নবঅভ্যুত্থান ঠেকানোর জন্যই দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর অধিকাংশ যুদ্ধাপরাধীকে ফাঁসি দিতে হয়েছে। নাৎসি দলসহ বিভিন্ন ফ্যাসিস্ট দলকে ইউরোপ-আমেরিকায় ৬৮ বছর আগে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এখনও সেই নিষেধাজ্ঞা বলবৎ আছে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় জার্মানির নাৎসিরা লাখ লাখ ইহুদি নরনারী-শিশু হত্যা করেনি (হলোকাস্ট)_ এ কথা বলা হলে ইউরোপের কোনো কোনো দেশে এখনও তা দণ্ডলাভের যোগ্য অপরাধ।
আমাদের দুর্ভাগ্য, বাংলাদেশে ‘৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের হাতে লাখ লাখ নরনারীর মৃত্যুর ঘটনা, তাদের গণকবর, নির্যাতনের বীভৎস ইতিহাস জনমানস থেকে মুছে না যেতেই আমাদের বুদ্ধিজীবী শ্রেণীরই একটা অংশ এই অপরাধীদের অপরাধ ঢাকার চেষ্টা করছেন; মুক্তিযুদ্ধে নিহতদের সংখ্যা নিয়ে সংশয় ও বিতর্ক সৃষ্টির চেষ্টা করছেন। সম্প্রতি ডা. জাফরুল্লাহর মতো ব্যক্তিরাও এই বিভ্রান্তি সৃষ্টির অপচেষ্টায় মেতেছেন। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে নাৎসিদের হাতে কত লাখ মানুষ নিহত হয়েছে, কতসংখ্যক ইহুদিকে গ্যাস চেম্বারে পুড়িয়ে মারা হয়েছে, তা নিয়ে ইউরোপে বা আমেরিকায় কেউ সংশয় ও বিতর্ক সৃষ্টির চেষ্টা করলে তাকে বিচারে সোপর্দ করা হয়।
বাংলাদেশে অসম্ভব সম্ভব হয়। এখানে বানরে সঙ্গীত গায়, শিলা জলে ভেসে যায় এবং তা প্রত্যয় না হলেও নিজেদের চোখে দেখতে হয় ও কানে শুনতে হয়। জাতির একটা সংখ্যাল্প অংশ, বিশেষ করে আমাদের এলিটকুলের একটা অংশও যেখানে সত্যের মুখোমুখি হতে ভয় পায় নিজেদের স্বার্থ ও সুবিধা নষ্ট হওয়ার ভয়ে এবং সন্দেহ-বাতিকগ্রস্ততার পরিচয় দেয়, সেখানে বিএনপি-জামায়াত যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে এবং তাদের বিচারের বিরুদ্ধে ছোট-বড় মিছিল-মিটিং করবে, দেশের মানুষকে বিভ্রান্ত করতে চাইবে_ তাতে আর বিস্ময়ের কী আছে?
এখানেই শেখ হাসিনা এবং তার সরকার বিস্ময়কর সাহসের পরিচয় দেখিয়েছেন। বিশ্বব্যাপী এই যুদ্ধাপরাধীদের বিশাল প্রচার-প্রোপাগান্ডা এবং বিরোধিতা ও হুমকির মুখেও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও দণ্ডদানের কাজে হাত দিয়ে একটি ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমান হাসিনা সরকারের আর কোনো সাফল্য-অসাফল্য ইতিহাসে কতটা স্থান পাবে আমি জানি না; কিন্তু ‘৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও চরম শাস্তি ঘোষণা মুক্তিযুদ্ধের পর বাঙালির ইতিহাসে একটি মাইলফলক হিসেবে স্থায়ী হবে।
ইউরোপের ন্যুরেমবার্গ বিচারের মতো এই ঢাকা ট্র্রায়ালও শুধু বাংলাদেশে নয়, গোটা উপমহাদেশে হিংস্র ও ফ্যাসিবাদী মৌলবাদের বর্তমানের জোয়ার ঠেকাবে। মৌলবাদ নিশ্চিহ্ন হবে, এ কথা বলি না। কিন্তু তার অভ্যুত্থান প্রতিহত হবে। ওবামার ড্রোন হামলা আফগানিস্তানে বা পাকিস্তানে জঙ্গি মৌলবাদীদের দমন করতে পারেনি। বাংলাদেশে এই ট্রায়াল সেই জঙ্গিবাদ ঠেকাবে। আজ এই ট্রায়াল নিয়ে যতই তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করার চেষ্টা হোক, একে বিতর্কিত ও ব্যর্থ করার চেষ্টা হোক, অদূর ভবিষ্যতেই প্রমাণিত হবে আমাদের জাতীয় জীবনে এই বিচর ও দণ্ডদান কতটা গুরুত্ব পাবে, প্রভাব বিস্তার করবে। হয়তো আমাদের নতুন প্রজন্মকে এই ট্রায়াল শিক্ষা-সভ্যতা-আধুনিকতা ও নারী স্বাধীনতা বর্জিত এক অদ্ভুত মধ্যযুগীয় আঁধার থেকে পরিণামে রক্ষা করবে। আমার এ কথা আজ অত্যুক্তি মনে হতে পারে। কিন্তু সন্দেহবাতিকদের জন্য ইতিহাসে এই মহাসম্ভাবনার দ্বারটি খুলে যেতে খুব দেরি হবে তা মনে করি না।
‘৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির রায় তো হলো, তারপর? সন্দেহবাদীদের বলি, রায় কার্যকর করা বড় কথা নয়, মানবতার শত্রুদের যে বিচার হলো (যে বিচার হবে না বলে ধরে নেওয়া হয়েছিল) এবং মৃত্যুদণ্ডাদেশ হলো, এটাই সবচেয়ে বড় কথা। দণ্ড ঘোষিত হয়েছে, এটা যথাসময়ে কার্যকর হবে কিনা সেটাও নির্ভর করে জাতির দৃঢ়সংকল্প ও ইচ্ছাশক্তির ওপর। জনগণের এই সংকল্প ও ইচ্ছাশক্তি জাগ্রত থাকলে হাসিনা সরকার এই রায় কার্যকর করে যাওয়ার সুযোগ পাবে এবং দণ্ড কার্যকর হবেই। বিএনপি-জামায়াত বঙ্গবন্ধুর ঘাতকদের বাঁচাতে পারেনি, ‘৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদেরও বাঁচাতে পারবে না। সন্দেহবাতিকগ্রস্তদের বলি_ তিষ্ঠ ক্ষণকাল।

লন্ডন, ৪ অক্টোবর শুক্রবার, ২০১৩