ফাঁস হওয়া ‘রায়ে’ ফাঁসি নেই

ঘোষণার আগেই রায় ফাঁস হয়ে যায় বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে এ অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই বলে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে।
একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরীর পরিবার অভিযোগ করেছে, গতকাল মঙ্গলবার রায়ের আগেই রায়ের কপি ইন্টারনেটে পাওয়া গেছে। সামাজিক প্রচারমাধ্যম ফেসবুক, ব্লগ এবং কয়েকটি অনলাইন পত্রিকায় এটি প্রকাশ করা হয়েছে।
আইন প্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলাম, অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম ও আইনসচিব আবু সালেহ শেখ মো. জহিরুল হক বলেছেন, মন্ত্রণালয় থেকে রায় ফাঁস হওয়ার কোনো সুযোগ নেই, ফাঁস হওয়ার প্রশ্নই আসে না। তার পরও মন্ত্রণালয় বিষয়টি অনুসন্ধান করতে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনকে (বিটিআরসি) নির্দেশ দিয়েছে।
গতকাল রায় ঘোষণার আগের রাতে বেশ কয়েকটি ব্লগ এবং কয়েকটি অনলাইনের সংবাদে বলা হয়, আইনসচিবের অফিসের একটি কম্পিউটার থেকে তৈরি করা একটি রায় পাওয়া গেছে। সেখানে রায়ের কপিটিও দেওয়া হয়েছে।
আইনসচিব প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রথমত, মামলার রায় হয় সংশ্লিষ্ট আদালত থেকে। মন্ত্রণালয় থেকে রায় লেখা হয় না। কাজেই এখানে রায় আসার কোনো সুযোগ নেই। ইন্টারনেটে যেটা দেখা যাচ্ছে, সেটি বেলজিয়ামভিত্তিক একটি ব্লগ প্রকাশ করেছে।’
অনলাইন সংবাদে বলা হয়েছে, আইন মন্ত্রণালয়ের ষষ্ঠতলার একটি কম্পিউটারের ডি-ড্রাইভে আলমের ফোল্ডার থেকে রায়ের কপিটি পাওয়া গেছে। আইনসচিব বলেছেন, এই নামে কার্যালয়ে কোনো কম্পিউটার অপারেটর বা কর্মচারী নেই।
বেলজিয়ামভিত্তিক ট্রাইব্যুনাল-লিকস নামের ওয়েবসাইটে যে কথিত রায়ের কপি দেওয়া হয়েছে, সেটি ১৬৫ পৃষ্ঠার। আর গতকাল ট্রাইব্যুনালের দেওয়া পূর্ণাঙ্গ রায়টি ১৭২ পৃষ্ঠার। দুটো রায় মিলিয়ে দেখা গেছে, ওয়েবসাইটে পাওয়া রায়ে দোষী সাব্যস্তকরণ ও সাজার বিষয়ে কোনো কথাই নেই। কিন্তু মূল রায়ে অভিযোগ ধরে ধরে প্রমাণ, দোষী সাব্যস্তকরণ ও সাজার উল্লেখ রয়েছে।
মূল রায়ের প্রথম অংশে রয়েছে বিচারকের নাম, প্রসিকিউটরদের নাম, আসামিপক্ষের আইনজীবীদের নাম, ভূমিকা, কার্যবিবরণী, ঐতিহাসিক পটভূমি, ১৯৭৩ সালের ট্রাইব্যুনাল আইনের নানা বিষয়ের সংজ্ঞা, বিভিন্ন বিদেশি আইনের প্রসঙ্গ, ত্রিপক্ষীয় চুক্তি এবং ১৯৫ জন পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীর ক্ষমা, যে কারণে এই বিচার হতে দেরি ইত্যাদি। ওয়েবসাইটে প্রকাশিত কথিত রায়ে এসব থাকলেও হুবহু মিল নেই, অনুচ্ছেদগুলো এলোমেলো।
সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে মোট ২৩টি অভিযোগ আনা হয়েছিল। নয়টি প্রমাণিত হয়েছে। আটটি থেকে তিনি খালাস পেয়েছেন। ছয়টিতে রাষ্ট্রপক্ষ সাক্ষী হাজির করেনি। ফাঁস হওয়া রায়ের সংবাদে নয়টি অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার কথা রয়েছে। মূল রায়ে আদালতে সাকার ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের কথা উঠে এসেছে। ফাঁস হওয়া রায়ে আংশিকভাবে এ বিষয়টি এসেছে।
মূল রায়ের সঙ্গে কথিত রায়ের অধিকাংশ অনুচ্ছেদের মিল কীভাবে হলো, জানতে চাইলে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার সমন্বয়ক আবদুল হান্নান খান প্রথম আলোকে বলেন, এর আগে ট্রাইব্যুনাল আরও ছয়টি রায় দিয়েছেন। প্রতিটি রায়ের মৌলিক কাঠামো এক। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ, ২৫ মার্চ, ১৪ ডিসেম্বর, গণহত্যা, ট্রাইব্যুনালের সংজ্ঞা—এগুলো সব রায়েই এসেছে। এসব ঘটনা তো আর বদলাবে না। কাজেই অতীতের ছয়টি রায় পড়ে যে কারও পক্ষে এই জিনিসগুলো লেখা সম্ভব। আর সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে যে ২৩টি অভিযোগ সেগুলোও সবাই জানেন। কিন্তু মূল বিষয় হলো কোন কোন অভিযোগের ক্ষেত্রে কী দণ্ড দেওয়া হয়েছে, কেন দেওয়া হয়েছে, সেগুলো কথিত রায়ে নেই। কাজেই রায় ফাঁস হওয়ার অভিযোগের কোনোই ভিত্তি নেই। এই রায়কে প্রশ্নবিদ্ধ করতে এ ধরনের অপপ্রচার চালানো হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
রায় পড়ার সময় আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, এগুলো পড়ার দরকার নেই, এগুলো তো দুই দিন ধরে অনলাইনে পাওয়া যাচ্ছে।
রায় ঘোষণার পর সাংবাদিকদের কাছে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে সাকা চৌধুরীর স্ত্রী ফারহাত কাদের চৌধুরী বলেন, ‘আমরা আদালতের রায়ের কপি এক দিন আগেই কয়েকটি ওয়েবসাইটে পেয়েছি। আমরা জানতে পেরেছি এই কপি আইন মন্ত্রণালয় তৈরি করেছে। আমরা হতবাক হয়েছি, আইন মন্ত্রণালয়ের রায়ের কপি কীভাবে বিচারকেরা পড়তে পারেন।’ সাকা চৌধুরীর বোন হাসিনা জাবিল সিনহাও একই কথা বলেন।
রায় ঘোষণার পর অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, ‘রায় আগে প্রকাশের প্রশ্নই উঠে না। এটা অনুমাননির্ভর কথা।’
ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর জেয়াদ আল মালুম বলেন, রায় আগেই পাওয়ার যে দাবি করা হয়েছে, তা বিচারকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য নতুন নাটক। নতুন ষড়যন্ত্র। এ বিষয়ে দ্রুত অনুসন্ধান চালাতে তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি আহ্বান জানান।