বড় সমস্যার একটা ছোট্ট সমাধান…আনিসুল হক

বর্তমানে দেশে অচলাবস্থা বিরাজ করছে। শেখ হাসিনা বলে দিয়েছেন, তিনি সংবিধান থেকে একচুল নড়বেন না। ওদিকে বেগম খালেদা জিয়া বলে দিয়েছেন, আওয়ামী লীগ বিচারপতি হাসানকেই মানেনি, আমি কী করে হাসিনাকে মানি? এই অবস্থায় দেশে কি একটা শান্তিপূর্ণ ও সব দলের অংশগ্রহণের নির্বাচন সুদূরপরাহত নয়?
এ জটিল পরিস্থিতিতে একটা প্রস্তাব পাওয়া গেছে। এক ভদ্রলোক আমার কাছে এসেছেন এই প্রস্তাব নিয়ে। তিনি চান, তাঁর এই প্রস্তাবটা আমি আমার কলামে প্রকাশ করি। তাঁকে বিদায় করতে না পেরে আমি বললাম, আচ্ছা, আপনার প্রস্তাব আমি আমার কলামে লিখে দেব। তিনি বললেন, ‘খুব ভালো হবে। সবাই জানতে পারবে। যদিও এর বাস্তবায়ন করতে হবে সরকারি দলকে, সরকারি দলের প্রধানকে, মানে শেখ হাসিনাকে।’
প্রস্তাবটা হলো, নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হবেন খালেদা জিয়া। মহাজোট তথা আওয়ামী লীগ তাদের সংসদীয় দলের সভা ডাকবে। তাতে শেখ হাসিনা প্রস্তাব করবেন যে তাঁরা সংসদনেত্রী হিসেবে নির্বাচিত করছেন বেগম খালেদা জিয়াকে। শেখ হাসিনা এই প্রস্তাব পাঠাবেন রাষ্ট্রপতিকে। রাষ্ট্রপতি তখন বেগম জিয়াকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার ও মন্ত্রিপরিষদ গঠন করার আহ্বান জানাবেন। এই মন্ত্রিপরিষদে আওয়ামী লীগের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকবে। কে কে মন্ত্রী হবেন না হবেন, কে কোন মন্ত্রণালয় পাবেন—এটাও আগে থেকে ঠিক করে রাখা হবে। বেগম জিয়ার নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নির্বাচন তত্ত্বাবধান করবে। নির্বাচন কমিশন নির্বাচন পরিচালনা করবে।
আমার কাছে আসা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এই দর্শনার্থী বললেন, তাঁর প্রস্তাবের ভালো দিকগুলো হলো:
১. এতে দ্বন্দ্ব-সংঘাতের অবসান ঘটবে। লগি-বইঠাও লাগবে না, দা-কুড়ালেরও দরকার পড়বে না।
২. নির্বাচন নিয়ে কোনো পক্ষেরই কোনো সন্দেহ থাকবে না।
৩. উদারতা প্রদর্শনের জন্য সবাই শেখ হাসিনার নামে ধন্য ধন্য করবে।
৪. এই দেশে যে-ই সরকার গঠন করে, সে-ই জনপ্রিয়তা হারায়। চাই কি বেগম জিয়ার অন্তর্বর্তী সরকার জনপ্রিয়তা হারিয়ে ফেলতে পারে। এর প্রভাব নির্বাচনী ফলের ওপরে পড়তে পারে। আওয়ামী লীগ ভোটে জিতেও যেতে পারে।
ভদ্রলোকের সঙ্গে তাঁর এক ভাগনেও এসেছিলেন। তিনি বললেন, ‘মামা, আপনার এই প্রস্তাবের নেতিবাচক দিকগুলো হলো:
১. শেখ হাসিনা এই প্রস্তাব কানে তুলবেন কি না, সন্দেহ।
২. শেখ হাসিনা এই প্রস্তাব দিলেও বেগম জিয়া এটাকে বিশ্বাস করবেন কি না, সে ব্যাপারেও সন্দেহ আছে। সাপকেও বিশ্বাস করা যায়, আওয়ামী লীগকে তো বিশ্বাস করা যায় না।
৩. বিএনপি তখন তাদের নেত্রী হিসেবে না আবার শেখ হাসিনাকে মনোনয়ন দিয়ে বসে।
৪. আওয়ামী লীগের সমর্থনে বেগম জিয়া প্রধানমন্ত্রী হলে সেটা না আবার ফ্লোর ক্রস বলে গণ্য হয়। বেগম জিয়ার না আবার সংসদ সদস্যপদ চলে যায়।
৫. প্রধানমন্ত্রী পদে খালেদা জিয়া কাজ শুরু করলে শেখ হাসিনাকে না আবার গণভবন ছেড়ে দিতে হয়।
৬. বেগম জিয়া যদি আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বেশি বেশি কথা বলতে থাকেন, তখন না আবার আওয়ামী লীগ তার সমর্থন প্রত্যাহার করে বসে। ফলে বেগম জিয়ার অন্তর্বর্তী সরকারের পতন ঘটে যায়!
৭. এই গোটা প্রস্তাবটাকেই লোকে না আবার একটা প্রলাপ বলে বিবেচনা করে বসে!’

ভদ্রলোক বললেন, ‘ভাগনে, আপাত-অসম্ভবকেও তো সম্ভব করা যায়। নাহয় আমরা অনন্ত জলিলের সহযোগিতা নেব। এই অসম্ভব প্রস্তাবটা যদি বাস্তবায়িত হয়, কী মধুর ঘটনাই না ঘটবে। আমাদের বহু সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান হয়ে যাবে।’
আমার আশঙ্কা যে ভদ্রলোকের এই সুচিন্তিত প্রস্তাবটা অনেকে হেসেই উড়িয়ে দেবেন। এই দেশে কোনো মৌলিক চিন্তার জায়গা নেই। দেশের কল্যাণে, মানুষের সেবায় টক শোগুলোয় রোজ কত সুপরামর্শই না দেওয়া হয়ে থাকে। সেসবও তো কেউ কোনো দিন কানে তুলল না। এই প্রস্তাবটাও হয়তো কালের গর্ভে পথের ধুলায় হারিয়ে যাবে!
চাঁদের বুকে যদি একটা বন্দুক থেকে গুলি করা হয়, শব্দ হবে কি? হবে না। কারণ, চাঁদে বাতাস নেই। তেমনি ভদ্রলোকের এই প্রস্তাবটাও নিতান্তই একটা ফাঁকা গুলি, যার কোনো শব্দ নেই। তবু আমি আমার কর্তব্য করলাম। সমস্যা সমাধানের জন্য ভদ্রলোকের প্রস্তাবটা প্রকাশ করে দিলাম। এই প্রস্তাবের যদি কোনো সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতা থাকে, তা নিরসনের দায়িত্ব মিজানুর রহমান খান সাহেবদের। কারণ, ডকট্রিন অব নেসেসিটি বলতে একটা কথা আছে। প্রয়োজনের সময় সুবিধামতো পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ সংবিধানের থাকার কথা। আর সে বিষয়ে মত দেওয়ার জন্য বিশেষজ্ঞরাও আছেন। উভয় পক্ষ রাজি হলে সংবিধান কোনো বাধা হয়ে দাঁড়াবে না।
ভদ্রলোক যাওয়ার আগে বললেন, ‘আমাদের নেতাদের বলবেন, যা-ই করুন, আর তা-ই করুন, মারামারি করবেন না। রক্তপাত ঘটাবেন না। কথা বলেই সমস্যার সমাধান করুন। দরকার পড়লে দিন-রাত কথা বলুন। তবু একটা মীমাংসায় আসুন। মনে রাখবেন, পলিটিকস ইজ দি আর্ট অব কম্প্রোমাইজ। কম্প্রোমাইজের বাংলা আপস নয়, মীমাংসা। ফয়সালা। সমঝোতা। সমঝোতাই শেষ কথা! বলপ্রয়োগে এই সমস্যার সমাধান হবে না।’
আমি তাঁকে এগিয়ে দিতে দরজার কপাট খুলে দাঁড়ালাম। তিনি তখনো কথা বলে চলেছেন। ‘যাওয়ার আগে বীরবলের গল্পটা বলে যাই। এক বাচ্চা, দুই মা দাবি করছেন, এটা তাঁদেরই সন্তান। বীরবল বিচারক, বললেন, “তরবারি আনো, বাচ্চাটাকে দুই টুকরা করে দুজনকে দিয়ে দাও।” তখন একজন বলল, “বাচ্চা কাটার দরকার নেই। ওকেই দিয়ে দিন।” বীরবল বললেন, “এই হলো আসল মা। আসল মা সে-ই, যে সন্তানকে অনাহত দেখতে চায়।”’
‘আসি, আসসালামু আলাইকুম,’ বলে তিনি ভাগনেকে নিয়ে চলে গেলেন। ‘ওয়ালাইকুম আসসালাম’ বলে আমি তাঁদের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলাম।
আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।