সিলেটের মদনমোহন কলেজে বিকল্প প্রশাসন!

‘বদমাশ’ ছাত্রনেতারা ছাত্রলীগ-ছাত্রদলের

সিলেটের মদনমোহন কলেজে শিক্ষার্থীদের প্রায় ৭০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া ছাত্রনেতারা হচ্ছেন ছাত্রলীগ ও ছাত্রদলের। প্রায় এক যুগ আগে ছাত্রত্ব শেষ হলেও তাঁরা এখনো ছাত্রনেতা। শিক্ষার্থীদের বেতন ও ডিগ্রি পরীক্ষার ফরম পূরণের টাকা মেরে দিলেও কলেজ কর্তৃপক্ষ বা প্রশাসন তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

গত মঙ্গলবার অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত কলেজ পরিচালনা কমিটির সভাপতি হিসেবে বার্ষিক বাজেট সভায় বিষয়টি অবহিত হন। সন্ধ্যায় এক আলোচনা সভায় তিনি ছাত্রনেতাদের লুটপাটের বিষয়টি প্রকাশ করে দেন। অর্থমন্ত্রী বলেন, ছাত্রনেতারা বদমাশ, তারা ৭০ লাখ টাকা মেরে দিয়েছে। তবে ছাত্রনেতাদের নাম বলেননি তিনি।

গতকাল কলেজে গিয়ে অনুসন্ধান চালিয়ে লুটপাটে অংশ নেওয়া ছাত্রলীগ কলেজ কমিটির সভাপতি অরুণ দেবনাথ ও ছাত্রদলের সভাপতি কাজী মেরাজের নেতৃত্বে ১২ ছাত্রনেতার নাম জানা গেছে। তাঁরা বেশির ভাগই এখন আর এ কলেজের ছাত্র নন। তাঁদের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে গোটা কলেজ প্রশাসন।

কলেজ সূত্রে জানা গেছে, ফরম পূরণ, বেতন ও ভর্তি ফি আদায়ের জন্য কলেজের জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের নিয়ে ১১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি গঠিত হয়েছিল। এর প্রধান ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক জয়ন্ত দাশ। টাকা মেরে দেওয়া প্রসঙ্গে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের কাছে ঠিক কত টাকা পাওনা রয়েছে, তা এ মুহূর্তে বলতে পারছি না। যাঁরা ফি গ্রহণ করে থাকেন তাঁদের কাছে সাত দিনের মধ্যে সব হিসাব চাওয়া হয়েছে। হিসাব পেলেই বকেয়া টাকার পরিমাণ জানা যাবে।’ ছাত্রনেতাদের চাপ এবং শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে জোর করে টাকা আদায় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আড়ালে-আবডালে কিছু ঘটছে কি না, সেটা একজন শিক্ষক হিসেবে তাঁর জানার কথা নয়।

যেভাবে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন নেতারা: অনুসন্ধানে জানা গেছে, শিক্ষার্থীরা বেতন-ফি জমা দিতে অফিস কক্ষে গেলে তাঁদের কাছ থেকে জোর করে টাকা ও কাগজপত্র ছিনিয়ে নেন নেতারা। এসব টাকার অর্ধেক নিজেদের কাছে রেখে বাকিটা অফিসকে দেন তাঁরা।

কলেজের প্রশাসন শাখা জানায়, ডিগ্রির প্রতিটি বর্ষের শিক্ষার্থীদের মাসিক বেতন-ফি ৫০০ টাকা। সে হিসাবে যেসব শিক্ষার্থী সারা বছর বেতন দেননি, তাঁদের ফরম পূরণ ফি, সেশন ফিসহ গড়ে আট হাজার টাকা কলেজ কর্তৃপক্ষকে দেওয়ার কথা। চলতি ফরম পূরণে এক হাজার ১১৮ জন শিক্ষার্থী নিবন্ধনের কাজ সম্পন্ন করেছেন। সে হিসাবে ৮৯ লাখ ৪৪ হাজার টাকা শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায় হওয়ার কথা। তবে সেখানে আদায় হয়েছে মাত্র ৩০ লাখ টাকার মতো।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা বলেন, ছাত্রনেতাদের কথা না শুনলে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়। তাঁরা কলেজে বিকল্প প্রশাসন চালু করেছেন।

সিলেট শহরের কেন্দ্রস্থল লামাবাজার এলাকায় মদনমোহন কলেজের অবস্থান। ১৯৪০ সালে প্রতিষ্ঠিত এ কলেজে এখন মোট শিক্ষার্থী প্রায় সাত হাজার। যোগেন্দ্র মোহন ভবনের সামনে ১০টি বেঞ্চ ফেলে ছাত্রলীগের বসার স্থান তৈরি করা হয়েছে। গতকাল সেখানে ছাত্রলীগের নেতাদের শিক্ষার্থীর ফরম পূরণের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতে দেখা যায়। আর কলেজ শাখা ছাত্রদলের সভাপতি কাজী মেরাজ অফিস কক্ষে বসেই ফরম পূরণের কাজ তদারকি করছিলেন। বেলা সাড়ে ১১টা থেকে সাড়ে ১২টা পর্যন্ত অফিস কক্ষের একটি চেয়ারে বসা ছিলেন মেরাজ। কলেজের জেনারেটর কক্ষের সামনে ছাত্রদলের কর্মীদের শিক্ষার্থীদের নিয়ে ফরম পূরণ করতে দেখা গেছে।

কলেজের ভর্তি শাখা সূত্র জানায়, ডিগ্রি পাস কোর্সের ফরম পূরণ গত ২০ আগস্ট থেকে শুরু হয়ে ২৫ আগস্ট শেষ হয়। এরপর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ২৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়সীমা বাড়িয়ে দেয়। এ প্রক্রিয়ায় মদনমোহন কলেজের ডিগ্রি পাস কোর্সে অধ্যয়নরত প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় বর্ষের বার্ষিক বেতন-ফি গ্রহণ এবং ফরম পূরণ শুরু হয়। এই তিন বর্ষের এক হাজার ১১৮ জন শিক্ষার্থী বেতন-ফি দেওয়ার পাশাপাশি ফরম পূরণের নির্ধারিত টাকা দেওয়ার কথা। তবে মাত্র ৪০০ শিক্ষার্থী পুরো ফি জমা দিলেও অন্যরা দেননি।

অর্থমন্ত্রী মঙ্গলবার কলেজের বাজেট সভায় বিষয়টি জেনে ক্ষুব্ধ হন। তিনি এক মাসের মধ্যে ওই শিক্ষার্থীদের বকেয়া বেতন পরিশোধের সময়সীমা বেঁধে দিয়ে বলেন, নইলে তাদের ছাত্রত্ব বাতিল করা হবে। পাশাপাশি কলেজের ভর্তি, ফরম পূরণসহ যাবতীয় টাকাপয়সা অনলাইন ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে লেনদেনের নির্দেশ দেন।

ছাত্রনেতারা যা বলেন: টাকা লুটপাটের এই চক্রের নেতৃত্বে রয়েছেন কলেজ শাখা ছাত্রলীগের অরুণ দেবনাথ ও ছাত্রদলের সভাপতি কাজী মেরাজ। অরুনের নেতৃত্বে রুমেল আহমদ, বিপ্লব পুরকায়স্থসহ সাতজন এবং মেরাজের নেতৃত্বে হেলাল আহমদ ও শিহাব উদ্দিনসহ পাঁচজন রয়েছেন। তাঁদের অধিকাংশেরই ছাত্রত্ব নেই।

যোগাযোগ করা হলে অরুন দেবনাথ স্বীকার করেন, ২০০২ সালে তাঁর ছাত্রত্ব শেষ হয়েছে। তবে তিনি অনিয়মিতভাবে একটি কোর্স করছেন বলে জানান।

ছাত্রদলের কাজী মেরাজও মদনমোহন কলেজের ছাত্র নন বলে স্বীকার করেন। তাঁর দাবি, বেসরকারি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে পড়াশোনা করছেন তিনি।

অরুন অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যকে বিভ্রান্তিকর দাবি করে বলেন, ‘ছাত্রনেতারা টাকা মেরে দিয়েছেন বলায় স্বাভাবিকভাবে আমাদের ওপর দায় পড়ে। কিন্তু আমরা টাকা লুটপাটে জড়িত নই। আমরা যে কাজটি করি, সেটি হচ্ছে শিক্ষার্থীদের সহায়তা করি। টাকা মেরে থাকলে কলেজ কর্তৃপক্ষ মেরেছে।’

মেরাজও বলেন, ‘অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য টোটালি মিসগাইড ধরনের। আমরা শিক্ষার্থীদের সহায়তা করি, ছাত্রলীগও করে। কিন্তু টাকা মেরে দেওয়ার কথা শুধু মুখে মুখে বললেও কেউ প্রমাণ দিতে পারবে না।’

একই সুরে কথা বলার কারণ জানতে চাইলে মেরাজ বলেন, ‘আমরা পলিটিক্স করলেও ছাত্রছাত্রীদের স্বার্থে এক থাকি। তাই হয়তো কথা বলাটা একরকম হয়ে যাচ্ছে।’

জরুরি বৈঠক: গতকাল দুপুর ১২টায় শিক্ষক মিলনায়তনে অধ্যক্ষের উপস্থিতিতে জরুরি বৈঠক হয়েছে। এতে সিদ্ধান্ত হয়, যেসব শিক্ষার্থীর কাছে বকেয়া টাকা রয়েছে, তাদের চিঠি দেওয়া হবে। সাত দিনের মধ্যে কলেজের ফি গ্রহণকারী কর্মকর্তার কাছে আদায়কৃত টাকার পরিমাণ ও বিবরণ চাওয়া হবে। যেসব শিক্ষার্থী বকেয়া টাকা দেবে না, তাদের প্রবেশপত্র দেওয়া হবে।

ছাত্রনেতাদের টাকা মেরে দেওয়ার বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত হলো, জানতে চাইলে সরাসরি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি অধ্যক্ষ আবুল ফতেহ ফাত্তাহ। প্রথমআলোকে তিনি বলেন, বছরের শুরু এবং বছর শেষে এককালীন বেতন প্রদানের রেওয়াজ দীর্ঘদিন থেকে এ কলেজে চালু থাকায় অনেক শিক্ষার্থীর বেতন বকেয়া থেকে যায়। এ সুযোগে এ রকম কিছু ঘটতে পারে। বিষয়টি পরিচালনা কমিটি দেখবে।

একজন শিক্ষার্থী ছাত্রনেতাদের হাতে টাকা দিয়ে বিপাকে পড়ার কথা জানিয়ে বলেন, ‘আমাকে কম টাকায় ডিগ্রির ফরম পূরণ করে দেওয়া হবে বলে ছাত্রলীগের অরুন দেবনাথ টাকা নিয়েছিলেন।’ লামাবাজার এলাকার একজন অভিভাবক জানান, তাঁর ছেলে প্রায়ই বেতন রসিদ দেখাতে পারত না। জানতে চাইলেই সে বলত, ‘লিডারের কাছে আছে।’ এই অভিভাবকের প্রশ্ন, এসব ছাত্রনেতার বিরুদ্ধে কলেজ কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিচ্ছে না কেন?