বদলি আদেশকে বুড়ো আঙুল

চট্টগ্রাম, খুলনা ও বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারদের বদলি করা হলেও তাঁরা বদলি করা জায়গায় যোগদান করেননি। পুরনো জায়গায়ই রয়ে গেছেন তাঁরা। এ ঘটনায় পুলিশ সদর দপ্তর এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে টানাপড়েন চলছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্তারা বলছেন, বদলিকৃত পদে যোগ না দিয়ে কমিশনাররা প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ অমান্য করেছেন। কারণ সরকারপ্রধানের অনুমোদন নিয়েই তাঁদের বদলি করা হয়েছে।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম ও খুলনার মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনাররা কালের কণ্ঠকে জানান, পুলিশপ্রধানের মৌখিক নির্দেশে তাঁরা বদলিকৃত স্থানে যোগদান করেননি। তাঁদের এ দাবির বিষয়ে জানতে চাইলে আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘তাঁদের বদলির বিষয়টি প্রশাসনিক কারণে কার্যকর করা হয়নি। তবে বিধি মোতাবেক প্রশাসনিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, বদলি করা স্থানে যোগদান না করা বা করতে না দেওয়া সরাসরি রুলস অব বিজনেসের লঙ্ঘন। রুলস অব বিজনেস অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনক্রমে এসপি ও তদূর্ধ্ব পুলিশ কর্মকর্তাদের বদলি করা হয়ে থাকে। যে ১৪ জনকে বদলি করা হয়েছে, তাঁদের প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন নিয়েই বদলি করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে তিন কমিশনার বদলির আদেশ মানেননি। তাঁরা প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ অমান্য করেছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট শামসুল হক টুকু কালের কণ্ঠকে বলেন, এগুলো চলমান প্রক্রিয়া। অনেক সময় বদলির আদেশ কার্যকর হতে একটু সময় লাগে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তরের মধ্যে কোনো মতানৈক্য নেই।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত ২৫ আগস্ট স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জারি করা আদেশে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ (বিএমপি) কমিশনার মো. শামসুদ্দিনকে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ (কেএমপি) কমিশনার হিসেবে বদলি করা হয়। একই আদেশে কেএমপি কমিশনার মো. শফিকুর রহমানকে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) কমিশনার, সিএমপি কমিশনার মো. শফিকুল ইসলামকে রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশ (আরএমপি) কমিশনার হিসেবে এবং আরএমপি কমিশনার এস এম মনির-উজ-জামানকে খুলনা রেঞ্জে বদলি করা হয়।
একই আদেশে সিআইডির (ঢাকা) ডিআইজি শৈবাল কান্তি চৌধুরীকে বিএমপি কমিশনার, নড়াইলের পুলিশ সুপার এস এম ফজলুর রহমানকে কেএমপির উপকমিশনার, কমান্ড্যান্ট পিএসটিএস বেতবুনিয়া রাঙামাটি মো. মোরশেদ আলমকে পুলিশ সুপার পিবিআই, পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি মো. ছিবগাত উল্লাহকে পঞ্চম এপিবিএন অধিনায়ক, বান্দরবানের পুলিশ সুপার মো. কামরুল আহসানকে এআইজি পুলিশ সদর দপ্তর, বরিশাল রেঞ্জ অফিসে সংযুক্ত পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামানকে এআইজি পুলিশ সদর দপ্তর, রংপুর রেঞ্জে সংযুক্ত পুলিশ সুপার দেবদাস ভট্টাচার্যকে বান্দরবানের পুলিশ সুপার, রাজশাহী রেঞ্জে সংযুক্ত পুলিশ সুপার এ কে এম নাহিদুল ইসলামকে মেহেরপুরের পুলিশ সুপার, মেহেরপুরের পুলিশ সুপার মো. মোফাজ্জেল হোসেনকে মাদারীপুর অঞ্চলের হাইওয়ে পুলিশে এবং পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি মো. মুশফেকুর রহমানকে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) উপকমিশনার হিসেবে বদলি করা হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিএমপি, কেএমপি, সিএমপি ও আরএমপি কমিশনারদের বদলি করা হলেও শুধু আরএমপি কমিশনার এস এম মনিরুজ্জামান বদলিকৃত স্থানে যোগ দিয়েছেন। কিন্তু অন্য তিন কমিশনার যোগ দেননি। বদলির আদেশ জারির পর ১৫ দিন পার হয়ে গেলেও তাঁরা আগের জায়গায়ই দায়িত্ব পালন করছেন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে জানান, রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে জনস্বার্থে জারিকৃত তাঁদের বদলির আদেশ অবিলম্বে কার্যকরের নির্দেশ দেওয়া হয়। অবিলম্বে কার্যকরের ব্যাখ্যা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অবিলম্বে বলতে যে দিন অর্ডার হবে তার দু-এক দিনের মধ্যে বদলিকৃত স্থানে যোগদান বোঝায়।’
সিএমপি কমিশনার শফিকুল ইসলামকে আরএমপি কমিশনার হিসেবে বদলি করা হয়। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আইজি মহোদয়ের নির্দেশ থাকার জন্য, তাই থাকছি।’
কেএমপি কমিশনার শফিকুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাকে বদলি করা হয়েছে। কিন্তু আইজি স্যার বদলিকৃত স্থানে যোগদান না করতে মৌখিক নির্দেশ দিয়েছেন। এ কারণে যাওয়া হয়নি।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বাহিনীর প্রধান বললে তো আমাদের কিছু করণীয় থাকে না।’
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, আগেও আদেশ লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ সুপার আবদুল্লাহ আরেফ সিআইডিতে ছিলেন। তাঁকে গত ২২ এপ্রিল হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরের অষ্টম এপিবিএনে বদলি করা হয়। তখন থেকে তিনি অষ্টম এপিবিএন প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। গত ১১ জুলাই পুলিশ সদর দপ্তর থেকে তাঁকে সিলেটে মোতায়েন এপিবিএন ইউনিটে বদলি করা হয়। এখতিয়ার না থাকা সত্ত্বেও পুলিশ সদর দপ্তর তাঁকে বদলি করে। গত ১৪ জুলাই স্বরাষ্ট্র সচিবের কাছে আবেদন করেন আবদুল্লাহ আরেফ। এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৮ জুলাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে আইজিপিকে সতর্ক করা হয়। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের কাজ না করার জন্য এ-সংক্রান্ত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অনুশাসন-সংবলিত আদেশ পাঠানো হয় পুলিশ সদর দপ্তরে।
সরকারি আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ সদর দপ্তরের এ ধরনের আচরণে চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা ব্যক্ত করেছেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা।