পোশাকশিল্পে ছয় দিন ধরে শ্রমিক বিক্ষোভ

বল প্রয়োগে অসন্তোষ মিটছে না

পোশাকশ্রমিকদের অসন্তোষ ঠেকাতে বল প্রয়োগ করা হচ্ছে। তাতেও শিল্পের নিরাপত্তা দেওয়া যাচ্ছে না। উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বড় লোকসানের আশঙ্কা করছেন মালিকেরা। কিন্তু শ্রমিকদের মজুরি দ্রুত বৃদ্ধি করে সমঝোতার পথে আগাতে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেই।

পোশাকমালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ পাঁচ দিনে আনুমানিক ৭০০ কোটি টাকার সার্বিক ক্ষতির কথা বলছে। প্রশ্ন উঠছে, শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি করা হলে যে ব্যয় হতো, বিশৃঙ্খলাজনিত ক্ষতি কি তার চেয়ে কম?

সরকার গঠিত ন্যূনতম মজুরি বোর্ডে মালিক প্রতিনিধি মাত্র ৬০০ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়ায় শ্রমিকেরা বিক্ষুব্ধ হয়েছেন। গত শনিবার থেকে তা স্ফুলিঙ্গের মতো ছড়িয়ে পড়ে। টানা ছয় দিন ধরে অসন্তোষ-নৈরাজ্য চললেও শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধির বিষয়ে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে মালিকেরা নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করছে না। এমনকি পরিস্থিতি শান্ত করতে শ্রমিকনেতাদের সঙ্গেও এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক বৈঠক করেননি তাঁরা।

বরং সংবাদ সম্মেলন করে হুমকি দিয়ে বলা হয়েছে, বিশৃঙ্খলা বন্ধ না হলে আসছে ঈদে বেতন-বোনাস দিতে পারবেন না কারখানার মালিকেরা। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে পোশাকমালিকেরা বিশৃঙ্খলা বন্ধ না হলে অনির্দিষ্টকালের জন্য কারখানা বন্ধ করে দেওয়ারও হুমকি দিয়েছেন।

সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জসহ দেশের শত শত পোশাক কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে ছয় দিন ধরে। বিজিএমইএর হিসাবে, গত শনিবার থেকে বুধবার পর্যন্ত পাঁচ দিনে এসব এলাকায় প্রায় ৫০০ কোটি টাকার উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। এ ছাড়া সময়মতো জাহাজীকরণ করতে না পারায় বিমানে মালামাল বিদেশে পাঠাতে (এয়ার শিপমেন্ট) ২০০-২৫০ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হবে। সব মিলিয়ে লোকসান ৭০০ থেকে ৭৫০ কোটি টাকা হবে বলে দাবি করছেন মালিক সংগঠনটির সহসভাপতি শহিদুল্লাহ আজিম।

তবে বিজিএমইএ কার্যকরী পদক্ষেপ নিচ্ছে না এমনটি মানতে রাজি নন মালিকদের এই প্রতিনিধি। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘অসন্তোষের পর শ্রমিকনেতাদের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করা হয়নি, এ কথা সত্য নয়। মন্ত্রণালয়ে শ্রমিকনেতাদের সঙ্গে আমরা একাধিক বৈঠক করেছি।’

অন্যদিকে শ্রমিকনেতারা বলছেন, সঠিক পথে সমঝোতার বিষয়ে বিজিএমইএ, বিকেএমইএ ঠিক আন্তরিক মনে হচ্ছে না। মজুরি বিষয়ে তাঁদের মনোভাবও পরিষ্কার নয়, বরং শ্রমিক ও শ্রমিকনেতাদের একধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ দেওয়ার কৌশল ও ষড়যন্ত্রের পুরোনো তত্ত্বের মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছেন মালিক নেতৃবৃন্দ। তার সঙ্গে আছে কারখানা বন্ধের হুমকি।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ সেন্টার ফর ওয়ার্কার্স সলিডারিটির (বিসিডব্লিউএস) নির্বাহী পরিচালক কল্পনা আক্তার বলেন, গত বুধবার বিজিএমইএর কয়েকজন শ্রমিকনেতাকে নিয়ে বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু, শেষ পর্যন্ত তা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে স্থানান্তর করা হয়। এর মাধ্যমে শ্রমিকনেতাদের স্নায়বিক চাপে রাখা হয়।

কল্পনা আক্তার আরও বলেন, ‘পরিস্থিতি শান্ত করতে বিজিএমইএ সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে কথাবার্তা বলছে। কিন্তু আসল যে ইস্যু—মজুরি, তার ধারেকাছেও তারা যাচ্ছে না।’ তিনি মনে করেন, মজুরি বৃদ্ধি নিয়ে বিজিএমইএ যদি নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করত, তাহলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সহজ হতো।

একই ধরনের মতামত দেন জাতীয় গামেন্ট শ্রমিক কর্মচারী লীগের সভাপতি ও মজুরি বোর্ডে শ্রমিক প্রতিনিধি সিরাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, মজুরি বোর্ডে দেওয়া বিজিএমইএর অমানবিক ও অযৌক্তিক প্রস্তাবই সমস্যা সৃষ্টির পেছনে মূল কারণ। সাভারে রানা প্লাজা ধসের পর বিশ্বব্যাপী তীব্র নিন্দা, সমালোচনা ও অসন্তোষ হলে পরিস্থিতি সামাল দিতে শ্রমিকনেতাদের সহায়তা চান তাঁরা। একাধিক বৈঠকও হয়েছে। আর মজুরি বাড়ানোর অসন্তোষকে দমিয়ে দিতে বল প্রয়োগ করার পথে হাঁটছেন তাঁরা। অবশ্য এটা তাঁদের নিজস্ব ব্যাপার, তা-ও বলেন শ্রমিকদের এই প্রতিনিধি।

তবে বল প্রয়োগের কৌশল নেওয়ার কথাটি অস্বীকার করেছেন বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি আব্দুস সালাম মুর্শেদী। তিনি বলেন, ‘আমরা কেউ সম্পদ বিনষ্ট হোক, সেটি চাই না। তাই যাঁরা এমন কাজ করছেন, তাঁদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু শান্তিপ্রিয় শ্রমিকদের মারধর করার কোনো ঘটনা ঘটছে না।’ নিম্নতম মজুরি বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা বলেছি, যৌক্তিক মজুরি নির্ধারণ করা হলে আমরা তা মাথা পেতে নেব।’

লোকসান বাড়ছে: গাজীপুরের কোনাবাড়ী এলাকার মিতালী ফ্যাশন নামের নিট পোশাক কারখানা ছয় দিন ধরে বন্ধ। প্রতিদিনই কারখানার চার হাজার শ্রমিক হাজিরা দিয়ে চলে যান।

কারখানাটিতে প্রতিদিন প্রায় ৫০ হাজার পিস টি-শার্ট তৈরি হয়, যার মূল্য গড়ে দেড় লাখ ডলার। সেই হিসাবে ছয় দিনে মোট নয় লাখ ডলারের উৎপাদন হয়নি।

আর এই উৎপাদন না হওয়ায় কারখানাটির চার-পাঁচটি শিপমেন্ট বা পণ্য জাহাজীকরণ হুমকির মুখে পড়েছে। গত রোববার জামার্নিতে দুই লাখ মার্কিন ডলার মূল্যের ৪১ হাজার পিস পোলো ব্র্যান্ডের টি-শার্ট জাহাজীকরণের তারিখ থাকলেও শ্রমিক-অসন্তোষের জন্য সেটি পাঠানো যায়নি। এ ছাড়া ব্রাজিলে উচ্চমানসম্পন্ন আড়াই লাখ ডলারের ৩৬ হাজার পিস টি-শার্টের শিপমেন্টও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

শিল্পটির মালিক সৈয়দ আবু ইউসুফ আবদুল্লাহর সঙ্গে যখন এই প্রতিবেদকের কথা হয়, তখন তিনি একটি বায়িং হাউসে অবস্থান করছিলেন। তিনি জানান, সময়মতো শিপমেন্ট করতে না পারায় অসুস্থ শরীরে তিনি সেখানে গেছেন ক্রেতাদের কাছে সময় বাড়ানোর অনুরোধ নিয়ে।

সময় না বাড়ালে কী হবে জানতে চাইলে আবু ইউসুফ বলেন, তখন বিমানে পাঠাতে হবে। সে ক্ষেত্রে ৭০০ শতাংশ খরচ বেড়ে যাবে। বিষয়টি ব্যাখ্যা এমন, জাহাজে একটি ২০ ফুট লম্বা কনটেইনারে ১৫ হাজার পিস টি-শার্ট পাঠাতে খরচ হয় এক হাজার ৪০০ ডলার। আর বিমানে পাঠাতে লাগবে আট থেকে নয় হাজার ডলার। বিমানে পণ্যটি পাঠাতে হলে, টি-শার্টের কাপড়টি কেনার মূল্যই কেবল তাঁর থাকবে।

আবু ইউসুফ আরও বলেন, ‘আমি শেষ হয়ে গেছি। এই ক্ষতি তিন মাস ধরে বয়ে বেড়াতে হবে। রপ্তানি না হলে টাকা পাব কোথায়?’

গাজীপুর সদর উপজেলার নাওজোড় এলাকার একটি সোয়েটার কারখানা শনিবার থেকে মঙ্গলবার পর্যন্ত বন্ধ ছিল। গত বুধবার থেকে উৎপাদন শুরু হলেও ২০ শতাংশ শ্রমিক উপস্থিত ছিলেন না। কারখানাটিতে প্রায় ১৬ হাজার পোশাকশ্রমিক কাজ করেন।

এই সোয়েটার কারখানায় প্রতিদিন ৬০ হাজার পিস সোয়েটার উৎপাদিত হয়। তাতে চার দিনে দুই লাখ ৪০ হাজার পিস সোয়েটার উৎপাদন হয়নি। কয়েকবার সময়মতো শিপমেন্ট করা যায়নি। এখন বিমানে পাঠাতে প্রায় দুই কোটি টাকা লোকসান হবে দাবি করে মালিকপক্ষ।

গাজীপুরের কোনাবাড়ী এলাকার রিপন নিটওয়্যার শনিবার থেকে সোমবার পর্যন্ত তিন দিন বন্ধ ছিল। প্রতিষ্ঠানটির মালিক ফারুক হোসেন বলেন, ‘আমার কারখানাটিতে এক হাজারের বেশি শ্রমিক কাজ করে। ছোট হলেও প্রতিদিন সাড়ে চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা করে লোকসান গুনতে হয়েছে।’

শ্রমিকেরা সংঘাত চান না: গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় গত সোম ও মঙ্গলবার বেশ কয়েকজন শ্রমিকের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। মৌচাক এলাকার এ টি এস অ্যাপারেলসের শ্রমিক ফিরোজ বলেন, ‘আমরা কাজ করতে চাই। কিন্তু মজুরি নিয়ে কোনো আশার আলো দেখছি না। আমাদের আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানোও হচ্ছে না।’

আরেক শ্রমিক শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘তিন হাজার টাকা বেতন পাই। বাসা ভাড়াই দিতে হয় সাড়ে এক হাজার ২০০ টাকা। কোনোরকমে খেয়ে-পরে দিন কাটাই। তার পরও আমরা মারামারি চাই না। ন্যায্য মজুরি দিলে কেউ রাস্তায় নামবে না।’