স্বল্পোন্নত দেশগুলোর এমডিজি অর্জনের অগ্রগতি

বাংলাদেশ সবচেয়ে এগিয়ে আছে

সহস্রাব্দের উন্নয়ন লক্ষ্য (এমডিজি) অর্জনের সূচকে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। শীর্ষস্থানে থাকা অপর দেশটি হলো কম্বোডিয়া। পর্যালোচনা করা ১৪টি লক্ষ্যের মধ্যে বাংলাদেশ আটটি লক্ষ্য অর্জন করবে। এ ছাড়া চারটি সূচকে অগ্রগতি বেশ ভালো। তবে বনায়ন এবং জনসংখ্যা ও কর্মসংস্থান অনুপাত সূচকে এখনো সঠিক পথে এগোচ্ছে না বাংলাদেশ।
গতকাল শনিবার বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত এক সংলাপে উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধে এসব তথ্য প্রকাশ করা হয়। ব্র্যাক সেন্টারে অনুষ্ঠিত এই সংলাপে সিপিডির বিশেষ ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য ‘এটেইনিং দ্য এমডিজি’স: হাউ সাকসেসফুল আর দ্য এলডিসি?’ শীর্ষক শিরোনামের প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। সিপিডির চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেহমান সোবহান এতে সভাপতিত্ব করেন।
মূল প্রবন্ধ
মূল প্রবন্ধে বলা হয়েছে, এমডিজির লক্ষ্য অর্জনে শীর্ষ পাঁচটি স্থানে এশিয়ার দেশগুলোর প্রাধান্য রয়েছে। দ্বিতীয় ও পঞ্চম স্থানে রয়েছে যথাক্রমে ভুটান ও নেপাল। আর সবচেয় কম অগ্রগতি, ৪৯তম স্থানে রয়েছে সোমালিয়া। প্রসঙ্গত বর্তমানে ৪৯টি স্বল্পোন্নত দেশ রয়েছে।
মূল প্রবন্ধ অনুযায়ী ৪৬টি দেশ কমপক্ষে একটি লক্ষ্য অর্জন করবে। আর মোজাম্বিক, সিয়েরালিওন ও সোমালিয়ার একটি লক্ষ্যও অর্জন না হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আর ইকোইটেরিয়াল গিনি মধ্য আয়ের দেশ হলেও মানবিক উন্নয়নে কোনো অগ্রগতি নেই। তাই এ দেশটি ৪৭তম স্থানে রয়েছে।
বাংলাদেশসহ ১৬টি দেশের লক্ষ্য অর্জনে যথেষ্ট গতি না থাকলেও সঠিক পথেই রয়েছে বলে মন্তব্য করা হয়েছে।
২০১৫ সালের পরে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর উন্নয়ন কাঠামোতে সাতটি বিষয়কে প্রাধান্য দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে প্রবন্ধে। এগুলো হলো—উৎপাদন সক্ষমতা ও কার্যকর কর্মসংস্থান, উৎপাদিত পণ্যের গুণগত মান, সংশ্লিষ্ট দেশের বিশেষ প্রয়োজনীয়তা, বহুমাত্রিক বৈষম্য, বৈশ্বিক নীতিমালার সংস্থা, এমডিজি পরবর্তী অর্থায়ন ও বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জসমূহ।
আলোচনা
সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেন, এমডিজি-পরবর্তী উন্নয়ন পরিকল্পনায় সম্পদ বণ্টনে ন্যায়বিচার থাকতে হবে। সামাজিক বৈষম্য কমাতে হবে। তাহলেই শিক্ষা, স্বাস্থ্যের মতো মৌলিক চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে। এ ছাড়া প্রতিটি পরিবারের ঋণ পাওয়া ও বাজার সুবিধা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা নিতে হবে। মূল কথা, জীবনযাত্রায় গুণগতমানে পরিবর্তন আনতে হবে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, কোন দেশ কতটা কার্যকরভাবে লক্ষ্য অর্জন করেছে তা পরিষ্কার করা হলে দেশ ও জনগণের মধ্যে সচেতনতা বাড়বে। এ জন্য লক্ষ্য অর্জনের মানসম্পন্ন মূল্যায়ন করতে হবে।
এ ছাড়া জাতিসংঘের মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময় অন্তর নতুন লক্ষ্যগুলোর বিষয়ে ‘সামাজিক নিরীক্ষা’ বা সোশ্যাল অডিট করার সুপারিশ করেন এই অর্থনীতিবিদ।
বাংলাদেশের অগ্রগতি তুলে ধরে ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, স্বাস্থ্যসেবা ও স্বল্পমূল্যে ওষুধ সরবরাহ, মেয়েদের স্কুলে নিবন্ধনসহ বিভিন্ন সুবিধা প্রাপ্তিতে খরচ নেই বললেই চলে। স্বল্পমূল্যে এসব সমস্যা উত্তরণের জন্য বাংলাদেশ হলো একটি ‘উন্নয়ন আশ্চর্য’। প্রতিটি দেশের সমস্যার সমাধান সম্পূর্ণ নিজস্ব উপায়ে করা হয়েছে।
পররাষ্ট্রসচিব শহীদুল হক মনে করেন, ২০১৫ সালের পর এমডিজি-পরবর্তী উন্নয়নে সরকারের পাশাপাশি এনজিও, সুশীল সমাজের অংশগ্রহণ আরও বাড়বে। আর ২০৩০ সালে ভার্চুয়াল পৃথিবীতেই বেশি কার্যকর থাকবে।
ইউএনডিপির আবাসিক প্রতিনিধি নিয়েল ওয়াকার বলেন, এমডিজি অর্জনে বাংলাদেশ অভাবনীয় উন্নতি করেছে। মাতৃমৃত্যু, মেয়েদের স্কুলে নিবন্ধন সূচকে ইতিমধ্যে লক্ষ্য অর্জন করেছে বাংলাদেশ। তিনি আরও বলেন, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড থেকে মুক্ত রাখা ২০১৫-পরবর্তী উন্নয়ন সূচিতে প্রাধান্য দেওয়া উচিত। আর সেই উন্নয়নসূচি বাস্তবায়নে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি থাকতে হবে।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, সামরিক ব্যয় বৃদ্ধিই উন্নয়ন ব্যয়কে খেয়ে ফেলছে। এখানে নজর দেওয়া উচিত। এ ছাড়া গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সুশাসনের ঘাটতি রয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য শামসুল আলম বলেন, ২০১৫ সাল নাগাদ এমডিজির ১৩টি অর্জন করবে বাংলাদেশ।
এ ছাড়া অনুষ্ঠানে অন্য আলোচকদের মধ্যে ছিলেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান, বেসরকারি সংস্থা গণস্বাস্থ্যকেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা জাফরুল্লাহ চৌধুরী, সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার, বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউটের (বিএফটিআই) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মজিবুর রহমান প্রমুখ।