বাংলাদেশ স্বপ্ন দেখে তবু…নাসির আহমেদ

এমন এক জটিল ক্রান্তিকালে বাংলাদেশ, যেখানে আশা-নিরাশার দোলায় দোদুল্যমান সবকিছু। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ গণরায় পাওয়া একটি সরকারের মেয়াদ শেষ হতে আর মাত্র মাস দেড়েক বাকি। কিন্তু সেই সরকার তার বিদায় বেলায় নানা রকম সমস্যার মুখোমুখি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন নির্বাচনের দাবি একদিকে, অন্যদিকে সাংবিধানিক প্রক্রিয়াতেই নির্বাচন অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্তে অনড় থাকার প্রয়াস। সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে দূরত্ব যোজন যোজন। এ রকম বাস্তবতায় কোনো আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে দুই শীর্ষ নেতা যে একটা গ্রহণযোগ্য সমাধানে আসবেন, সে সম্ভাবনাও আর অবশিষ্ট নেই। দু’দলের নেতাকর্মীদের আচরণে অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত মিল খুঁজে পাওয়া গেলেও একটা জায়গায় যে বড় রকমের ব্যবধান আছে, সেটা মানতেই হবে। সেই ব্যবধান সহজে ঘোচানো সম্ভব নয়। মুক্তিযুদ্ধের যে মূল্যবোধ নিয়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম রক্তাক্ত পথ ধরে, রক্তগঙ্গা সৃষ্টিকারী সেই ঘাতকদের সঙ্গে যতদিন বিএনপির সখ্য থাকবে, ততদিন আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়া অসম্ভব। বিশেষ করে, একাত্তরে মানবতার বিরুদ্ধে জঘন্য অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত জামায়াত এখন যে অবস্থানে, তাতে জামায়াতের সঙ্গে ভোটের স্বার্থে ঐক্য বজায় রাখা বিএনপির সঙ্গে আওয়ামী লীগের কোনো আপসরফার সম্ভাবনা একেবারেই নেই।
অনেকেই মৌলিক দর্শনে দূরে থাকা দুটি দলের সাযুজ্য খোঁজেন। সুশীল সমাজের কোনো কোনো বুদ্ধিজীবী, টিভি টকার, কলামনিষ্টও এক করে দেখাতে চান দুটি দলকে। কিন্তু বাস্তবে দুটি দলের এমন কতগুলো মৌলিক পার্থক্য আছে, যা কখনও মেলাতে পারে না। পাকিস্তানি আমলে মুসলিম লীগের সঙ্গে যে দূরত্ব ছিল আওয়ামী লীগের, এখনও প্রায় ততখানি দূরত্বই রয়ে গেছে অন্তর্গত দৃষ্টিভঙ্গি ও দর্শনে। শুধু বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের ভিত্তিটি বদলে গেছে। বঙ্গবন্ধু আমলে নেতারা ছিলেন শিক্ষক, আইনজীবী, সমাজের গণ্যমান্য মধ্যবিত্ত_ যাদের বিত্ত ছিল না, ছিল জনগণের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক; থাকতেন তারা গ্রামেই। কিন্তু পঁচাত্তর-পরবর্তী সময়ের রাজনৈতিক অবক্ষয়, মূল্যবোধগত পশ্চাদপদতা আর দুর্নীতির বিপুল বিস্তার রাজনীতির গুণগত উৎকর্ষ যেমন নষ্ট করেছে, তেমনি নষ্ট হয়েছে নেতৃত্বের মানও। অবস্থা এতই খারাপ যে, ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শে বিশ্বাসী আওয়ামী লীগও সংবিধানে বিতর্কিত রাষ্ট্রধর্ম রেখে দিতে বাধ্য হয়। দেশকে ধর্মান্ধতার এমন রাজনীতিতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে দুই সামরিক শাসকের সৃষ্ট প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতি দিয়ে, যেখানে রাষ্ট্রধর্ম সংবিধান থেকে তুলে দিয়ে কারও পক্ষেই এ মুহূর্তে ভোটের রাজনীতি সম্ভব নয়। সম্ভব করতে হলে চাই জনসাধারণকে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানে আর ইহজাগতিক শিক্ষায় মূল্যবোধে এমন শক্তিশালী করে তোলা, যেখানে মানুষ ধর্মানুরাগ আর ধর্মান্ধতার পার্থক্য বুঝতে পারবে। ইসলামের মানবিক আদর্শে যে সহিংসতার স্থান নেই, সশস্ত্র জঙ্গিবাদের প্রশ্রয় নেই_ এসব সত্য তৃণমূলের সাধারণ মানুষের মধ্যে এখনও পেঁৗছানো যায়নি। এ ব্যর্থতার জন্য নিরক্ষর-দরিদ্র মানুষ দায়ী নয়; দায়ী আমরা, যারা আধুনিক শিক্ষা গ্রহণ করেও সংকীর্ণতামুক্ত হতে পারিনি। দায়ী রাজনৈতিক দলগুলোও_ তারা প্রগতি আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারক-প্রবক্তা হয়েও প্রয়োজনবোধ করেননি দরিদ্র-নিরক্ষর সাধারণের কাছে জ্ঞান-বিজ্ঞানের তথ্য পেঁৗছাতে। রাজনৈতিক কর্মী বাহিনীও যায়নি তাদের কাছে। গেছে জামায়াত-শিবির, হেফাজত আর জঙ্গিবাদের পক্ষের শক্তি। তারা বিপুল অর্থও ব্যয় করছে নিরক্ষর সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করতে। তারই বিষফল ভোগ করছে দেশ।
শুরুতেই বলেছি জটিল ক্রান্তিকালের কথা। একদিকে মৌলবাদ-জঙ্গিবাদ আর ধর্মান্ধতাকে ধর্মানুরাগের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল প্রযুক্তিনির্ভর একটি উন্নত দেশ তথা ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার চেষ্টা। একদিকে সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফিরিয়ে আনা অথবা নির্বাচন পরিচালনার জন্য একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের দাবি, অন্যদিকে বিদ্যমান সংবিধানের আওতায় মেয়াদ শেষে নির্বাচিত সরকারই অন্তর্বর্তী সরকার হিসেবে নির্বাচন পরিচালনার দাবি। এমন বিপরীত অবস্থানেও কোনো দুশ্চিন্তা ছিল না। কিন্তু দুশ্চিন্তা জেদ নিয়ে। ‘কেয়ামত হলেও নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে’ আর ‘কোনো কিছুতেই শেখ হাসিনার নেতৃত্বের সরকার দিয়ে নির্বাচন করতে দেওয়া হবে না’_ এমন কঠোর মনোভাব সহিংসতার আশঙ্কাই প্রকট করে তোলে। জামায়াত-শিবির-হেফাজতসহ জঙ্গিবাদের পক্ষে সোচ্চার সংঘশক্তি যেভাবে প্রধান বিরোধী দলের আশ্রয়-প্রশ্রয় পেয়ে সহিংসতার পথে চলেছে, তাতে বড় ধরনের বিপর্যয়ও ঘটতে পারে, যা দেশের শান্তিপ্রিয় মানুষের কাছে কাম্য হতে পারে না।
বহু বছর আগে লেখা কবি শামসুর রাহমানের ‘বাংলাদেশ স্বপ্ন দ্যাখে’ শিরোনামের কবিতাটি মনে পড়ল এ নিবন্ধ লেখার মুহূর্তে। কিন্তু সে কবিতার উদৃব্দতি স্মরণ করতে গিয়ে মনে হলো, এর চেয়ে এ মুহূর্তে বেশি লাগসই আশির দশকে লেখা ‘উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ’। প্রকৃত কবি বহু দূরের ভবিষ্যৎও দেখতে পান। ধর্মান্ধতা দিয়ে যখন সামরিক শাসনামলে রাজনীতিকে কলুষিত করা হচ্ছিল, তখন শামসুর রাহমান লিখেছিলেন তার সেই বিখ্যাত কবিতা, যেন এ মুহূর্তের মৌলবাদী-জঙ্গিবাদীদের তাণ্ডবেরই চিত্র।
‘…কোথায় পাগলাঘণ্টি বাজে/ক্রমাগত, এলোমেলো পদধ্বনি সবখানে। হামলাকারীরা/ট্রাম্পেট বাজিয়ে ঘোরে শহরে ও গ্রামে/এবং ক্রন্দনরত পুলিশের গলায় শুকায় বেল ফুল।/দশদিকে কত একাডেমীতে নিশীথে/গোর-খোদকেরা গর্ত খোঁড়ে অবিরত, মানুষের মুখগুলি/ অতি দ্রুত হয়ে যাচ্ছে শিম্পাঞ্জীর মুখ।’
প্রায় তিন দশকের অধিককাল আগের সেই ভয়ালচিত্রই কি আজ সারাদেশে দৃশ্যমান নয়? বিশেষ করে, একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার নস্যাৎ করে দিতে যে সহিংসতা চালাচ্ছে জামায়াত-শিবির, তা দেশের অরাজক অবস্থা সৃষ্টিরই চেষ্টা। বিচারাধীন আসামিদের অধিকাংশই একাত্তরের জামায়াত আর তাদের ছাত্র সংগঠনের তৎকালীন নেতাকর্মী, যারা প্রত্যক্ষভাবে গণহত্যাসহ পাকিস্তানি হানাদারদের সশস্ত্র দোসর হয়ে মানবতাবিরোধী জঘন্য সব অপরাধে সম্পৃক্ত ছিল। দেশে অরাজক অবস্থা সৃষ্টি হলে বর্তমান সরকার বিচার ও রায় বাস্তবায়ন করতে পারবে না, বিশৃঙ্খল অবস্থা সৃষ্টি হলে সাময়িকভাবে হলেও বিঘি্নত হবে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া। এমন আশাই করছে মৌলবাদী জঙ্গিগোষ্ঠী। গত পাঁচ বছরে জঙ্গি তৎপরতা ব্যাপকভাবে যে হ্রাস পেয়েছে, তার পেছনেও ছিল সরকারের কঠোর মনোভাব।
সঙ্গত কারণেই জামায়াত-শিবিরসহ জঙ্গিবাদীরা দেশে একটা বিশৃঙ্খল অবস্থা সৃষ্টি করতে চায়। যারা আজ একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধীদের রক্ষার চেষ্টা করছে, তারা কি জনমতের বিরুদ্ধেই অবস্থান নিচ্ছে না? কী করে এত দ্রুত বিস্মৃত হই যে, ২০০৭ সালের প্রেক্ষাপট আর বর্তমান প্রেক্ষাপট এক নয়। ২০০৭ সালের অক্টোবরে ক্ষমতার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও বিএনপি ক্ষমতা ছাড়েনি। রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিনের মাধ্যমে ক্ষমতার প্রভাব ধরে রেখে পছন্দের সাবেক প্রধান বিচারপতি কে এম হাসানকে চার বছর আগে টার্গেট করে (অবসরে পাঠিয়ে হিসাব কষে বিচারপতিদের চাকরির বয়স বাড়ানো হয়েছে) তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা করতে চেয়েছিল তারা। তা সম্ভব না হওয়ায় স্বয়ং রাষ্ট্রপতিই দায়িত্ব নিয়ে বঙ্গভবনে তত্ত্বাবধায়ক নামের যে হাস্যকর নাটক দিনের পর দিন মঞ্চায়ন করেছিলেন, তাতে ১১ জানুয়ারি জরুরি অবস্থা ছিল অনিবার্য।
আমরা অনেক কিছু সহজে ভুলে যাই। ভুলে যাই সময়ের বিবর্তনের বাস্তবতাও। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে মহাজোট সরকার যে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছিল, সেখানে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছিলেন তরুণ ভোটাররা। মহাজোট তার নির্বাচনী মেনিফেস্টোতে সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছিল, নির্বাচিত হলে তারা একাত্তরের মানবতাবিরোধীদের বিচার করবে, ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তুলবে। শিক্ষিত ও তরুণ প্রজন্ম বিপুলভাবে এ দুটি বিষয় গ্রহণ করেছিল বলেই বাংলাদেশের গত ২০ বছরের ইতিহাসে অতুলনীয় নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে মহাজোট। বাংলাদেশ যে প্রগতিরই স্বপ্ন দেখে, সে সত্য আরেকবার প্রমাণিত হয়েছে বিগত নির্বাচনে। ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন না দেখলে উন্নয়ন ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে দেশ আজকের এ অবস্থানে পেঁৗছাতে পারত না আগামী এক দশকেও। অথচ রাজনৈতিক বিরোধিতার জন্যই অনেকে ডিজিটাল বাংলাদেশ নিয়ে টিপ্পনী কাটে, ঠাট্টা-মশকরা করে।
বাংলাদেশের বাস্তবতার দিকে যদি কেউ নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে তাকান, তাহলে অবাক হবেন। অবাক হবেন এ জন্য, মহাজোট সরকারের অনেক ত্রুটি-বিচ্যুতি, সরকার পরিচালনায় সব অঙ্গীকার পূরণ করতে না পারা; কোনো কোনো ক্ষেত্রে ছাত্রলীগের আত্মঘাতী তৎপরতা সরকারকে বিব্রত, সমালোচিত করেছে বটে, কিন্তু নির্মোহ দৃষ্টিতে যদি অর্জনগুলো দেখা হয়, তাহলে কি প্রাপ্য প্রশংসা থেকে বঞ্চিত করা যাবে সরকারকে? পদ্মা সেতু প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে না পারাও জাতীয়-আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রেরই ফল বলে বিদেশি আদালতের তদন্তে আজ দৃশ্যমান। দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার ক্ষেত্রে বর্তমান সরকার বিশাল সাফল্য অর্জন করেছে। তিন দফা সারের দাম কমানো হয়েছে, কাঙ্ক্ষিত সময়ের আগেই এমডিজির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করে বিশ্বের প্রশংসা অর্জন করেছে বাংলাদেশ। মা ও শিশুমৃত্যুর হার কমানোয় অসাধারণ সাফল্য অর্জিত হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন রেকর্ড করেছে। তৈরি পোশাক ও জনশক্তি রফতানি এবং সেই খাত থেকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন অতীতের রেকর্ড ভেঙেছে। শুধু তা নয়, কৃষিক্ষেত্রে ধান ও পাট গবেষণায় বিশ্বের কাছে মডেল এখন আমরা। অবাধ তথ্যপ্রবাহের ক্ষেত্রে অনলাইন প্রযুক্তির আজকের যে অবস্থা, তা ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রকল্পেরই সোনালি ফসল। দারিদ্র্য বিমোচন এ সরকারের একটি বড় সাফল্য। দারিদ্র্য মোচনের বিশেষ স্বীকৃতি হিসেবে ২৩ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিউইয়র্কের ম্যানহাটনে গ্রহণ করেছেন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ‘সাউথ সাউথ পুরস্কার’। এ পুরস্কার শুধু সরকার বা প্রধানমন্ত্রীর নয়, সমগ্র জাতির। বিশ্বে এখন জঙ্গিবাদ দমনেও বাংলাদেশ এক রোল মডেল কান্ট্রি হিসেবে পরিচিত। ‘দরিদ্র’ দেশটির মাথাপিছু গড় আয় এখন ১ হাজার ৪৪ ডলার।
আমাদের দুর্ভাগ্য এই যে, আমরা বড় বেশি হুজুগে, একপেশে অন্ধতায় আক্রান্ত। সর্বত্র বিভাজন হয়ে গেছে দেশটা। সে কারণে ভালো কোনো কিছুই চোখে পড়ে না। শুধু খারাপটা দেখি, ব্যর্থতা দেখি। একটি গ্গ্নাসের অর্ধেক পানি কিংবা অর্ধেক খালি_ দুই-ই দেখা যায়। প্রশ্নটা দৃষ্টিভঙ্গির। ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি না এলে দেশ অগ্রসর হবে না। তত্ত্বাবধায়ক সরকারও কি নিরপেক্ষ সবসময়? কখনোই বিতর্কের ঊধর্ে্বর্ ছিল না। সুতরাং গণতন্ত্রে থাকতে হলে সরকারকেও আন্তরিক হতে হবে। নির্বাচন কমিশনকে নির্মোহ স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করতে দিতে হবে। তা হলে অন্তর্বর্তী সরকার দিয়েও চমৎকার জাতীয় নির্বাচন সম্ভব।
গণরায়ে যে দলই ক্ষমতায় আসুক, প্রতিশোধ-প্রতিহিংসা বন্ধের গ্যারান্টি থাকতে হবে। ২০১১ সালের জানুয়ারির শুরুতেই বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া বলেছিলেন, ‘ক্ষমতা থেকে বিদায় নেওয়ার পর মহাজোট সরকারের সব কর্মকাণ্ড অবৈধ ঘোষণা করা হবে।’ প্রশ্ন জাগে, তাহলে কি যুদ্ধাপরাধের বিচার বাতিল করে দেবেন? এই যে সারাদেশ কম্পিউটার প্রযুক্তির নেটওয়ার্কে এসেছে, থাকবে তো? ভোলা জেলার বিচ্ছিন্নপ্রায় দুর্গম দ্বীপের ইউনিয়ন চরকুকরি-মুকরি থেকে শুরু করে সারাদেশে ইউনিয়নে বসেই মানুষ এখন চাকরির আবেদন করতে পারে; পাসপোর্ট, ভিসার ফরম পূরণ করতে পারে; প্রয়োজনীয় সব কাজ করতে পারে শুধু ডিজিটাল বাংলাদেশ হয়েছিল বলেই। গ্রামবাংলার সাধারণ দরিদ্র মানুষ ৫০ রকম সরকারি ফরম, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চাকরি, অনলাইনে ভর্তি পরীক্ষা, রেজিস্ট্রেশন, মোবাইল ফোনে ব্যাংকিং বা টাকা-পয়সার সহজ লেনদেনসহ যে গতিশীল জীবনের সন্ধান পেয়েছে, তা ছিল অকল্পনীয়। নগরজীবনেও ফ্লাইওভারের পর ফ্লাইওভার যে নতুন গতি এনেছে, যে নতুন যুগের সূচনা করেছে_ তাও কি মুছে যাবে?
২০২১ সালে আমরা স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি উৎসব করব। আমরা না থাকলে আমাদের সন্তানরা করবে। সেই দেশ যে আরও অনেক সমৃদ্ধি অর্জন করে ফেলবে ততদিনে, তাতে সন্দেহ নেই। সেই উৎসবে যেন স্বাধীনতাবিরোধী মৌলবাদী জঙ্গিগোষ্ঠীকে আমরা আমন্ত্রণ না করি। তাহলে ৩০ লাখ শহীদের আত্মা অভিশাপ দেবে। দেশে এখন আন্দোলনের নামে যে তাণ্ডব চলছে, জীবিত বাসচালকের গায়ে পেট্রোল ঢেলে আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে মারা হচ্ছে, তা কোনো গণতান্ত্রিক বা রাজনৈতিক আন্দোলন বিবেচিত হতে পারে না। জামায়াত-শিবির তিন বাসচালককে পেট্রোলে পুড়িয়ে হত্যা করেছে দলের দণ্ডিত যুদ্ধাপরাধী নেতাদের মুক্তির দাবিতে করা হরতালেই। আদালতে আপিল করবেন আবার রাস্তায় পুলিশ খুন করবেন, বাসচালক আর যাত্রী পুড়িয়ে মারবেন_ তা একসঙ্গে চলতে পারে না। ক্ষমতার পালাবদল ঘটবে জনগণের রায়ে। নৃশংসতা আর সন্ত্রাসবাদীরা গণতন্ত্রে যেতে পারে না। এমনকি মিসরে আমরা দেখেছি, গণরায় পাওয়া সত্ত্বেও মৌলবাদীদের সেনাবাহিনী ক্ষমতায় মেনে নিতে পারেনি। সেই মিসরে পর্যন্ত এখন প্রবাসী আওয়ামী লীগ নেতাকে অপহরণ করে রাজনীতি করছে এ দেশীয় মৌলবাদীরা, এ মেনে নেওয়া যায় না। অথচ এত কিছুর পরও প্রধান বিরোধী দল নীরব। এমন নীরবতা বিস্ময়ের সীমা ছাড়িয়ে যায়।

কবি ও সাংবাদিক
nasirahmed1971@gmail.com