বাঘের বনে মানুষের থাবা

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শ্বাসমূলীয় বন (ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট) সুন্দরবনের অদূরে রামপালে সরকারের কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের সিদ্ধান্ত এবং এর প্রতিবাদে তেল-গ্যাস রক্ষা কমিটির লংমার্চ কর্মসূচি নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে টাইম। ম্যাগাজিনটির চলতি সংখ্যায় প্রকাশিত প্রতিবেদনটির শিরোনাম ‘হাউ নট টু লাভ নেচার : শোভ এ কোল প্লান্ট নেঙ্ট টু আর্থ’স বিগেস্ট ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট’।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সুন্দরবনকে বলা হয় রয়েল বেঙ্গল টাইগারের অভয়ারণ্য। মানুষখেকো এই বাঘের থাবায় প্রতি বছর ২০ থেকে ৫০ জন মানুষ প্রাণ হারায়। বেসরকারি হিসেবে সংখ্যাটা হয়তো আরো বেশি। বাঘের ভয়ে এই বনে একা ঢুকতে কেউ সাহস করে না অথচ বাংলাদেশ সরকারের এক সিদ্ধান্তে এই রয়েল বেঙ্গল টাইগারের অস্তিত্বই হয়তো পড়তে যাচ্ছে হুমকির মুখে। জাতিসংঘের বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে স্বীকৃত এই সুন্দরবনে এখন পড়তে যাচ্ছে মানুষের থাবা।
সরকার এই সুন্দরবনের মাত্র ১৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত রামপালে ১৩২০ মেগাওয়াটের কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প হাতে নেওয়ায় ভয়ের এই বন নিয়ে এখন পরিবেশবিদদের উল্টো আশঙ্কা, অচিরেই হয়তো ধ্বংস হয়ে যাবে সুন্দরবনের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য। কারণ এই বিদ্যুৎ প্রকল্পটি বছরে কমপক্ষে ৫২ হাজার টন সালফার ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ করবে।
এতে বলা হয়, দেশের বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে ভারতের সঙ্গে যৌথভাবে এই প্রকল্প নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ। ভারত থেকে নৌপথে আনা কয়লা ব্যবহার করা হবে রামপালের এই বিদ্যুৎকেন্দ্রে। এর ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ তুলনামূলক কম হবে।
কিন্তু পরিবেশবাদীদের আশঙ্কা, সুন্দরবনের খুব কাছে কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হলে এর তাপ ও দূষণের সরাসরি প্রভাব পড়বে বনের ওপর। ওই এলাকার নদীনালা, বন, জীববৈচিত্র্য ও প্রতিবেশের ওপর তা মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করবে। বাংলাদেশের অহংকার হিসেবে চিহ্নিত জাতীয় প্রাণী রয়েল বেঙ্গল টাইগার এবং ওই নোনা প্রাণীর শুশুক ও কুমির নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারে এই উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রের তাপদাহ ও দূষণে। বন্যাপ্রবণ নিচু জমির এই বাংলাদেশের জন্য বরাবর রক্ষাকবচ হয়ে আছে সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বন। কিন্তু রামপালের প্রস্তাবিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের তাপ ও দূষণের প্রভাবে যদি এই শ্বাসমূলীয় বনের ক্ষতি শুরু হয় তবে তা বাংলাদেশের আবহাওয়াকেও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
তেল-গ্যাস বন্দর রক্ষা কমিটির সম্প্রতি গঠিত রামপাল প্রতিহত কমিটির অন্যতম সদস্য কল্লোল মুস্তফা জানান, ‘পৃথিবীর কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ এ ধরনের প্রকল্পকে স্বাগত জানাতে পারে না।’
ওই প্রতিবেদনে প্রাসঙ্গিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে নির্মিত এ ধরনের একটি প্রকল্পের অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়, টেক্সাসের ফায়েতে ১৯৭৯ সালে পরিবেশবিদদের আশঙ্কা অগ্রাহ্য করে একইভাবে একটি কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি করা হয়। তখন সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল, প্রকল্পটি স্থানীয় কৃষি উৎপাদনের ওপর কোনো প্রভাব ফেলবে না। কিন্তু ২০১০ সালে বিজ্ঞানীদের একটি গবেষণা প্রতিবেদনে জানা গেছে, টেক্সাসের বিদ্যুৎকেন্দ্রটি থেকে প্রতি বছর নিঃসৃত ৩০ হাজার টন সালফার ডাই-অক্সাইডের কারণে ওই এলাকার গাছপালা মরে সাবাড় হয়ে যাচ্ছে। এ কারণে স্থানীয় অধিবাসীরা প্রকল্পটি বন্ধের জন্য এখন প্রকাশ্যে প্রতিবাদ জানাচ্ছে। আর টেক্সাসের বিদ্যুৎকেন্দ্রের তুলনায় বছরে আরো ২২ হাজার টন বেশি সালফার ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ করবে প্রস্তাবিত রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রটি।
প্রতিবেদনটিতে আরো বলা হয়, পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের আপত্তি সত্ত্বেও ওই জায়গায় বিদ্যুৎ প্রকল্পটি স্থাপনে উদ্যোগ নেয় সরকার। এলাকাটি বনাঞ্চলের কাছে হওয়ায় জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ ধ্বংস হওয়ার সমূহ আশঙ্কা থাকলেও কৌশলে সরকারি জরিপে রামপালকে কেবলই গ্রামীণ জনপদ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনটিতে আরো বলা হয়, ভারত নিজ দেশের গুজরাট ও মধ্য প্রদেশে এ ধরনের দুটি কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণে ব্যর্থ হয়ে এখন বাংলাদেশে সেটা তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছে। স্থানীয় জনগণের তীব্র প্রতিবাদের মুখে দেশটির আদালত ওই প্রকল্প দুটি বাতিল করেছে। কারণ এতে ব্যবহার করা হবে বিষাক্ত কয়লা।
এ বিষয়ে টাইমসের ঢাকা প্রতিবেদক জেসন মটলাগ জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ মোশাহিদা সুলতানা রিতু বলেন, ‘এটা ভারতের ভণ্ডামি। নিজের দেশে ব্যর্থ হয়ে তারা এখন আমাদের দেশের আইন লঙ্ঘনের চেষ্টা চালাচ্ছে।’
তবে এর বিরোধিতা করে রামপাল প্রকল্পের প্রথম পরিচালক আজিজুর রহমান জানান, ‘রাজনৈতিক কারণেই আইনের অজুহাত দাঁড় করে এই প্রকল্পের বিরোধিতা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, তেল ও গ্যাস থেকে বিদ্যুৎ তৈরির খরচ অনেক বেশি। এ কারণেই ভবিষ্যতের চাহিদা মেটাতে কম খরচে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প বেছে নিয়েছে সরকার। বর্তমানে এর কোনো বিকল্প নেই। আর এই প্রকল্প নির্মাণে বাইরের কোনো চাপ নেই। ভারত সরকার তার দেশের নিয়মনীতি অনুসরণ করছে, আমরা অনুসরণ করছি আমাদের নীতিমালা।’ বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানেই এ প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে এবং এই চুক্তির বিষয়ে চাইলে যে কেউ খোঁজখবর নিতে পারে। প্রসঙ্গত বর্তমানে তিনি এই প্রকল্পে সরকারের একজন পরামর্শক হিসেবে কর্মরত। প্রকল্পে দূষণ হবে স্বীকার করে নিয়ে তিনি জানান, ‘বাংলাদেশের মানদণ্ড অনুযায়ী আমরা অবশ্যই সব ধরনের দূষণ নিয়ন্ত্রণ করব।’
তবে বাংলাদেশে অব্যাহত পরিবেশ দূষণের বিভিন্ন উদাহরণ তুলে ধরে এই প্রকল্পের ক্ষেত্রে আদৌ কতটা প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা হবে সে বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের প্রতিবাদে তেল-গ্যাস রক্ষা কমিটির ঢাকা থেকে রামপাল পর্যন্ত ৪০০ কিলোমিটার লংমার্চ আয়োজনের উল্লেখ করে এই কর্মসূচির সঙ্গে সম্পৃক্তদের দৃষ্টিভঙ্গিও তুলে ধরা হয়েছে।