বিএনপির ঘরেই ষড়যন্ত্র!

দলীয় সরকারের অধীনে বিএনপিকে নির্বাচনে নিয়ে যেতে দলের ভেতরই ষড়যন্ত্র হচ্ছে বলে মনে করেন দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কয়েকজন নেতা। তবে কে বা কারা এই ষড়যন্ত্রে লিপ্ত, সে বিষয়ে তাঁরা প্রকাশ্যে কিছু বলছেন না। তাঁদের অভিযোগের আঙুল এক সময় ‘সংস্কারপন্থী’ হিসেবে পরিচিতি পাওয়া গুটিকয়েক নেতার দিকে। দলের শীর্ষ পর্যায়ের এক নেতা এবং একজন প্রভাবশালী ভাইস চেয়ারম্যান এ প্রক্রিয়ার নেতৃত্বে রয়েছেন বলে তাঁরা মনে করেন।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস ও গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ইতিমধ্যেই একাধিক সভায় এদিকে ইঙ্গিত করে বক্তব্য দিয়েছেন। এর বাইরে স্থায়ী কমিটির আরও দুজন সদস্য প্রথম আলো ডটকমের কাছে এ ধরনের আশঙ্কার কথা বলেছেন। তাঁদের একজন প্রথম আলো ডটকমকে বলেন, তিনি এটি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, তাঁদের মধ্যে ডিজিএফআইয়ের (সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা) এজেন্ট আছে, যাঁরা দলীয় অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আগেভাগে পাচার করে দেন। এ কারণে বিএনপি একাধিকবার হোঁচট খেয়েছে। একসময় বিএনপির চেয়ারপারসনের গুলশানের কার্যালয় থেকে রেকর্ডার উদ্ধারের যে কথা শোনা গিয়েছিল তা সত্যি বলেও তিনি বিশ্বাস করেন।

আদালতের এক রায়ের উল্লেখ করে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে বর্তমান সরকার। ওই ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার দাবিতে আন্দোলন করছে বিএনপি। কিন্তু সরকার বলছে, সংবিধান অনুযায়ী তাদের অধীনেই নির্বাচন হবে।

বিএনপির একটি অংশ মনে করে, তাঁদের দলেরই অন্য একটি অংশ ‘২০০৮ সালের মতো ষড়যন্ত্র’ করছে। দলে প্রভাবশালী ওই অংশটি আওয়ামী লীগের অধীনে বিএনপিকে নির্বাচনে নিতে চায়। বিএনপিকে ভাঙার চেষ্টাও তারা করতে পারে। তবে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে না যাওয়ার বিষয়ে অনড় আছেন।

গত ২ সেপ্টেম্বর জাতীয় প্রেসক্লাবে এক অনুষ্ঠানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস প্রথম প্রকাশ্যে এ ধরনের অভিযোগ আনেন। তিনি বলেছিলেন, ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপির অংশ নেওয়ার কথা ছিল না। হঠাত্ করে খালেদা জিয়া নির্বাচনে যাওয়ার ঘোষণা দেন। যাঁরা তাঁকে নির্বাচনে যাওয়ার তাগিদ দিয়েছিলেন, ওই সব ষড়যন্ত্রকারীর ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। কোনো ষড়যন্ত্রকারী যাতে শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে দলকে নিয়ে যেতে না পারে, সেদিকে নজর রাখতে হবে।

গত ১১ সেপ্টেম্বর খালেদা জিয়ার কারামুক্তি দিবস উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায়ও মির্জা আব্বাস একই অভিযোগ করেন। তিনি বলেছিলেন, বিএনপিকে বেকায়দায় ফেলে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে নিয়ে যেতে দলের একটি প্রতিক্রিয়াশীল চক্র সক্রিয়। তিনি বলেন, ‘অতীতে তাদের আমরা ক্ষমা করেছি, ভুলে গেছি, আবার তাদের প্রতিষ্ঠিত করেছি। তারা যে আবার আঘাত হানবে না, তার নিশ্চয়তা নেই।’

একই অনুষ্ঠানে দলের স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য আ স ম হান্নান শাহও সংস্কারপন্থী হিসেবে পরিচিতি পাওয়া নেতাদের সমালোচনা করেন। দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেনসহ দলের শীর্ষ নেতারা এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

গত ২৬ সেপ্টেম্বর এক অনুষ্ঠানে স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় অভিযোগ করেন, বিএনপির শীর্ষ নেতাদের অনেকেই সরকারের সঙ্গে অদৃশ্যভাবে আছেন।

এই ‘ষড়যন্ত্রে’র বিষয়ে জানতে চাইলে গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, দলের ভেতর কেউ ষড়যন্ত্র করছে কি না, তার চেয়ে বড় কথা সরকার বিএনপি নিয়ে ষড়যন্ত্রের সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে। এক ধরনের একটি বিএনপি করবে। এ ফাঁদে কে পা দেবে, কে দেবে না—সেটা পরে দেখা যাবে।

সরকার বিএনপির কারও সঙ্গে যোগাযোগ করছে কি না বা বিএনপির কেউ সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করছে কি না, জানতে চাইলে গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, ‘আমাদের অনেকের অনেক ধরনের সমস্যা আছে। সেই সমস্যা মোকাবিলা করতে কেউ কেউ কৌশল নিতেই পারে।’

প্রকাশ্যে সংস্কারপন্থীদের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিয়েছেন স্থায়ী কমিটির এমন একজন সদস্য বলেন, দলের কেউ কেউ সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে এবং সরকারের হয়ে কাজ করছে। এ কারণে বিএনপি রাজপথের আন্দোলনের চেয়ে কূটনীতিক তত্পরতা, তত্ত্বাবধায়কের রূপরেখা এসব নিয়ে বেশি সরব। তাঁরা বিএনপির প্রধান দাবি তত্ত্বাবধায়ক বা নির্দলীয় সরকারের ওপর জোর দেওয়ার চেয়ে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের’ ওপর জোর দিয়ে বক্তব্য দিচ্ছেন। তবে খালেদা জিয়া শেষ পর্যন্ত দৃঢ় থাকলে তাঁরা কিছু করতে পারবে না।

তিনি বা তাঁরা ব্যক্তিগত স্বার্থে এ ধরনের কথা বলছেন কি না বা খালেদা জিয়া কি এসব বিষয়ে একেবারে অন্ধকারে কি না—জানতে চাইলে তিনি বলেন, নিশ্চয় খালেদা জিয়া এসব বিষয়ে অবগত। এ ধরনের বক্তব্য প্রকাশ্যে দেওয়ার পর খালেদা জিয়া তো কারও বিরুদ্ধে শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ আনেননি। তাঁকেও খালেদা জিয়া এ বিষয়ে কথা না বলার বিষয়ে কিছু বলেননি বলে তিনি দাবি করেন।

মির্জা আব্বাসের বক্তব্যের কয়েক দিন পর এক সময় সংস্কারপন্থী হিসেবে পরিচয় পাওয়া বিএনপির এক শীর্ষ পর্যায়ের নেতার সঙ্গে এ বিষয়ে এই প্রতিবেদকের কথা হয়। তিনি এ বিষয়ে নিজের পরিচয় দিয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে তিনি বলেন, মির্জা আব্বাস যে কথা বলেছেন তা তাঁর ব্যক্তিগত মতামত। দলে এ ধরনের অবস্থা নেই, দলীয় ফোরামেও এ ধরনের কোনো বক্তব্য কেউ রাখেননি। ঢাকা মহানগরের একজন প্রভাবশালী নেতার সঙ্গে ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব থেকে দলের কেউ কেউ এ ধরনের বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন।

২০০৭ সালে জরুরি অবস্থা জারির পর বিএনপিতে সংস্কারের দাবি তোলেন শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন নেতা। একপর্যায়ে দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া গ্রেপ্তার হওয়ার সময় তিনি সেই সময়ের মহাসচিবসহ কয়েকজন নেতাকে বহিষ্কার করেন। ওই সময় বিএনপি ও আওয়ামী লীগে যাঁরা দলে সংস্কারের প্রস্তাব করেছিলেন তাঁরা ‘সংস্কারপন্থী’ হিসেবে পরিচিতি পান। তাঁদের অনেকে পরে বিএনপির কমিটিতে স্থান পেয়েছেন।