বিএনপির পাল্টা প্রস্তাব

নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া প্রস্তাবকে অস্পষ্ট উল্লেখ করে বিএনপির চেয়ারপারসন ও বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া নতুন একটি প্রস্তাব দিয়েছেন।
গতকাল সোমবার বিকেলে পূর্ব-নির্ধারিত সংবাদ সম্মেলনে খালেদা জিয়া তাঁর প্রস্তাবটি তুলে ধরেন। খালেদা জিয়ার প্রস্তাবে বলা হয়, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দায়িত্বে থাকা ২০ উপদেষ্টার মধ্য থেকে আওয়ামী লীগ পাঁচজন এবং বিএনপি পাঁচজনের নাম প্রস্তাব করবে। তাঁরাই হবেন নির্বাচনকালীন সরকারের উপদেষ্টা।
এই প্রস্তাবে প্রধান উপদেষ্টার বিষয়ে বলা হয়, সরকার ও বিরোধী দল মতৈক্যের ভিত্তিতে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একজন সম্মানিত নাগরিককে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে খুঁজে বের করবেন। প্রয়োজনে রাষ্ট্রপতি, স্পিকার ও সংরক্ষিত মহিলা আসনে যেভাবে নির্বাচন করা হয়, এই ১১ জনকেও বর্তমান সংসদ ভেঙে যাওয়ার আগে নির্বাচিত করিয়ে আনা যেতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলো থেকে নির্বাচিত ব্যক্তিদের দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের প্রস্তাব করেছেন। বিরোধীদলীয় নেতার প্রস্তাবে নির্দলীয় ব্যক্তিদের দিয়ে সরকার গঠনের কথা বলা হয়েছে।
১৮ অক্টোবর জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী সর্বদলীয় সরকার গঠনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘আমি বিরোধী দলের কাছে প্রস্তাব করছি, বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকেও আপনারা নাম দিতে পারেন, যাঁদের আমরা অন্তর্বর্তীকালীন মন্ত্রিসভায় সদস্য করে সর্বদলীয় সরকার গঠন করতে পারি।’ এই প্রস্তাব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি বিরোধী দলের নেতাকে অনুরোধ করছি, তিনি আমার এই ডাকে সাড়া দেবেন। আমার অনুরোধ রক্ষা করবেন এবং আমাদের যে সদিচ্ছা, তার মূল্য দেবেন।’
প্রধানমন্ত্রীর ওই প্রস্তাবের প্রতিক্রিয়া জানাতেই খালেদা জিয়া গতকালের সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন। নিজে আরেকটি প্রস্তাব দিয়ে খালেদা জিয়া বলেন, ‘আমি আশা করি, শান্তি, স্থিতিশীলতা ও গণতন্ত্রের স্বার্থে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমার প্রস্তাব গ্রহণ করবেন।’ তিনি এ ব্যাপারে দুই পক্ষের মধ্যে দ্রুত আলোচনার
কার্যকর উদ্যোগ নিতে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানান। সাংবিধানিকভাবে নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা প্রবর্তনে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের জন্যও প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
গুলশানের একটি হোটেলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনস্থলে বিএনপির চেয়ারপারসন বিকেল চারটা ১৩ মিনিটে এসে পৌঁছান। এর পরই তিনি একটি লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন। তাঁর বক্তব্য শুরুর আগেই সাংবাদিকদের জানিয়ে দেওয়া হয়, খালেদা জিয়া কোনো প্রশ্নের উত্তর দেবেন না।
খালেদা জিয়া তাঁর বক্তব্যে ভবিষ্যতে ক্ষমতায় গেলে কী করবেন, তাঁদের সরকার কেমন হবে, সে সম্পর্কেও ধারণা দেন। তিনি নতুন ধারার রাজনীতি করা, সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া ও আঞ্চলিক সহযোগিতার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেন। ‘অতীতের ভুল’ সামনে আর না করার অঙ্গীকার করেন। ‘তিনি ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে অন্যায়-অবিচারকারীদের’ ক্ষমা করে দেওয়ারও ঘোষণা দেন খালেদা জিয়া।
প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবে দলগুলো হতাশ: খালেদা জিয়া বলেন, প্রধানমন্ত্রী তাঁর প্রস্তাবে নির্বাচনকালীন সরকারের যে অস্পষ্ট ধারণা তুলে ধরেছেন
তাতে সেই অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান কে হবেন তা খোলাসা করেননি। এতে নাগরিকদের মধ্যে এই সংশয় রয়ে গেছে যে তিনি সংসদ বহাল রেখে, নিজের হাতে ক্ষমতা ও প্রশাসনকে কুক্ষিগত রেখে বিরোধী দলকে এক অসম প্রতিযোগিতায় আহ্বান জানাচ্ছেন।
খালেদা জিয়া বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনকালীন নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের গণদাবি সম্পর্কে কোনো আলোচনার অবকাশ না রেখে একতরফাভাবে শুধু নিজের সুবিধা অনুযায়ী একটি প্রস্তাব তুলেছেন। তিনি কেবল নির্বাচনের তারিখ নিয়ে বিরোধী দলের পরামর্শ চেয়েছেন। তাঁর এ বক্তব্যে জাতি হতাশ হয়েছে। আমি এখনো মনে করি, আলোচনার মাধ্যমেই বিষয়টির সুরাহা করা দরকার এবং সেটা যত দ্রুত হয় ততই মঙ্গল।’
খালেদা জিয়া বলেন, গণতান্ত্রিক ধারা অক্ষুণ্ন রেখে শান্তিপূর্ণ পথে ক্ষমতা হস্তান্তর নিশ্চিত করতে হলে সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ এবং সব দলের অংশগ্রহণে একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই। এ জন্যই তাঁরা জাতীয় নির্বাচনকালীন নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকারের দাবি তুলেছেন। এ দাবি এখন জাতীয় দাবিতে পরিণত হয়েছে। তিনি বলেন, সরকার জনগণের দাবির প্রতি সম্মান দেখাবে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রত্যাশার অনুকূলে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেবে বলে তাঁরা আশা করেছিলেন। কিন্তু সরকারের অনড় অবস্থান এবং জনসাধারণ ও বিরোধী দলের প্রতি যুদ্ধংদেহী আচরণ সবাইকে হতাশ করেছে।
ভুলের পুনরাবৃত্তি নয়: অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে সামনে আর একই ভুল না করার অঙ্গীকার করেন বিরোধীদলীয় নেতা। তিনি বলেন, ‘মানুষ ভুল-ত্রুটির ঊর্ধ্বে নয়। এ কথা স্বীকার করতে আমার কোনো দ্বিধা নেই যে, অতীতে আমাদেরও ভুল-ভ্রান্তি হয়েছে। তবে একই সঙ্গে আমি বলতে চাই, আমরা ওই সব ভুল থেকে শিক্ষা নিয়েছি। আগামীতে একটি উজ্জ্বল, অধিক স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের পথে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে আমরা ভালোভাবে প্রস্তুতি নিয়েছি। তাই আমরা অতীতের ভুলগুলোর পুনরাবৃত্তি করব না।’
ক্ষমা ঘোষণা: খালেদা জিয়া বলেন, ‘পরিবর্তনের কথা কেবল মুখে বলাই যথেষ্ট নয়। কেননা এ দেশের জনগণ অতীতেও পরিবর্তনের অঙ্গীকার রাজনীতিকদের কণ্ঠে শুনেছে। সে জন্য আজ আমি আপনাদের মাধ্যমে স্পষ্ট করে একটি কথা বলে এই পরিবর্তনের সূত্রপাত করতে চাই।’
খালেদা জিয়া বলেন, ‘আমি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করছি যে, যারা আমার এবং আমার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে অতীতে নানা রকম অন্যায়-অবিচার করেছেন, ব্যক্তিগত আক্রমণ করেছেন এবং এখনো করে চলেছেন, আমি তাঁদের প্রতি ক্ষমা ঘোষণা করছি। আমি তাঁদের ক্ষমা করে দিলাম। সরকারে গেলেও আমরা তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিশোধ নেব না। আমি কথা দিচ্ছি, আমার দৃষ্টি নিবদ্ধ থাকবে বাংলাদেশের জন্য একটি উজ্জ্বল ও অধিক নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার কাজে; প্রতিশোধ নেওয়ার, প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার মতো কোনো ইচ্ছা ও সময় আমার নেই। আমি প্রতিশোধ-প্রতিহিংসা মেটানোর জন্য কোনো সময় ব্যয় করব না।’
বিএনপির চেয়ারপারসন দাবি করেন, তাঁর কাছে প্রধানমন্ত্রী, তাঁর পরিবারের সদস্যরা ও আত্মীয়স্বজন সম্পর্কে বিস্তর অভিযোগ ও তথ্য থাকা সত্ত্বেও এ নিয়ে তিনি কোনো কথা বলতে চান না। খালেদা জিয়া বলেন, ‘আমি মনে করি, অনেক হয়েছে। বাংলাদেশের সুরুচিমান মানুষ আর এসব শুনতে চান না।’
সরকার হবে জাতীয় ঐক্যের: খালেদা জিয়া বলেন, ভবিষ্যতে তাঁর দল যে সরকার গঠন করবে তা হবে সব নাগরিকের প্রতিনিধিত্বকারী সরকার। মেধা ও মননশীলতার সরকার। জাতীয় ঐক্যের সরকার। তিনি বলেন, ‘যাঁরা সমাজের জন্য অবদান রাখতে পারেন, যাঁরা দেশের জন্য সুনাম বয়ে আনেন, যাঁরা সৎ-যোগ্য-দক্ষ, যাঁরা সুষ্ঠু পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে পারেন, যাঁরা নেতৃত্ব দিতে পারেন, রাজনৈতিক মত-ধর্ম-নৃতাত্ত্বিক পরিচয় নির্বিশেষে সেসব মেধাবী ও যোগ্য নাগরিকদের আগামী দিনের জাতীয় ঐক্যের সরকারের সঙ্গে কাজ করার আগাম আমন্ত্রণ জানিয়ে রাখছি।’
বাংলাদেশের মাটি সন্ত্রাসীদের জন্য নয়: আওয়ামী লীগের আমলে বিভিন্ন বোমা হামলার ঘটনার উল্লেখ করে খালেদা জিয়া দাবি করেন, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিস্তার আওয়ামী লীগের বিগত সরকারের আমলেই ঘটেছিল। আওয়ামী লীগ কোনো বিচার করেনি। বিএনপি ক্ষমতায় এসে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে।
খালেদা জিয়া বলেন, আওয়ামী লীগের আমলে সৃষ্ট এই জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস বিএনপি সরকারের আমলেও অব্যাহত ছিল। তবে বিএনপি জঙ্গিদের শনাক্ত করতে সক্ষম হয়। তাদের সংগঠন ও তৎপরতা নিষিদ্ধ করে। শীর্ষ জঙ্গি নেতাদের গ্রেপ্তার ও তাদের বিচারের ব্যবস্থা করে। বিএনপির আমলেই শীর্ষ জঙ্গিদের বিচারে মৃত্যুদণ্ড হয়, পরে তা কার্যকর করা হয়। জঙ্গিবাদের নেটওয়ার্ক সম্পূর্ণ ভেঙে দেওয়া সম্ভব হয়।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ভবিষ্যতে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদবিরোধী লড়াই শুধু অব্যাহতই থাকবে না, সন্ত্রাসবিরোধী আন্তর্জাতিক কোয়ালিশনের সক্রিয় সদস্য হিসেবে অন্যান্য দেশ ও সংস্থার সঙ্গে মিলে এই সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের মাটিকে দেশীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অথবা অন্য কোনো ধরনের সন্ত্রাসী তৎপরতায় কখনো ব্যবহার করতে না দেওয়ার ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণে বিএনপি দৃঢ় অঙ্গীকারবদ্ধ।
আঞ্চলিক সহযোগিতা: ভবিষ্যতে আঞ্চলিক সহযোগিতা আরও জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন খালেদা জিয়া। তিনি বলেন, জনগণের সমর্থনে ভবিষ্যতে সরকারে গেলে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে মিলে আমরা একযোগে কাজ করব। বর্তমান সম্পর্ক বহাল রাখার পাশাপাশি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, নিরাপত্তা, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর নতুন পথের সন্ধান আমরা করব।
সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্যরা, কেন্দ্রীয় নেতা এবং ১৮-দলীয় জোটের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।