বিএনপির বিকল্প ও মির্জার সঙ্গে এক ঘণ্টা

নির্বাচনকালীন সংবিধানসম্মত সরকার গঠনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যকার দূরত্ব যথেষ্ট কমে এসেছে বলেই ধারণা হলো। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে তাঁর ঠাকুরগাঁওয়ের বাসায় এক ঘণ্টার বেশি সময় ধরে আলোচনার পর আমার ব্যক্তিগত মত হলো, উভয় পক্ষের কাছে আসতে না পারার জন্য আর যাকেই হোক, সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীকে দোষারোপ করা যাবে না। কারণ, সরকার ‘নির্দলীয়’ মানলেও ষোড়শ সংশোধনী অনিবার্য নয়। সংসদ রেখে নির্বাচন করলে বরং সমঝোতার আইনি পথ আরও প্রশস্ত থাকবে।
গত ৩০ আগস্ট মওদুদ আহমদ যদিও প্রথমবারের মতো নির্দিষ্টভাবে ক্ষমতায় গেলে পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিলের ঘোষণা দিলেন। কিন্তু তিনি বলেননি, তাঁরা এটা বাতিল করে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়কব্যবস্থা বহাল করবেন। আর আমরা এবারে সংবিধান থেকে ছিটকে পড়লে তার জন্য কেবলই সংবিধানকে দুষলে চলবে না। কারণ, এখনো সময় আছে যেকোনো ধরনের সরকার বিদ্যমান সংবিধানের আওতায় সৃিষ্ট করা সম্ভব। ‘তলে তলে বিএনপি নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে’, এর মাধ্যমে মন্ত্রীদের সম্ভবত এই মনোভাব গোপন থাকে না যে, তাঁরা বিএনপিকে নির্বাচনের বাইরে রাখতে চাইছেন। বিএনপির সন্দেহ এমনই। এমনকি তাদের ধারণা, দলীয় সরকারের অধীনেও বিএনপি যাতে নির্বাচনে না আসতে পারে, সেই ফন্দিও সরকারি দলের আছে।
আমরা অবশ্য দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছি যে সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান বিলোপ না করলেও চলমান রাজনৈতিক সংকট সৃিষ্ট হতো। পঞ্চদশ সংশোধনী কেবল বাড়তি ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করছে। এর কারণ, প্রধান দুই দল এখনো পর্যন্ত পারস্পরিক ন্যূনতম শ্রদ্ধা দেখানোর জায়গা থেকে দূরে আছে। প্রধানমন্ত্রীর মতে, যারা দুর্নীতি, সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ দেয়, তারাই দেশের প্রধান বিরোধী দল; তথ্যমন্ত্রীর বর্ণনামতে, ‘জঙ্গিবাদের কারখানার মালিক খালেদা জিয়া।’ তিনি এ দেশের দুবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী, তাই সরকারি দলই প্রকারান্তরে সাক্ষ্য দিচ্ছে যে এ দেশ সংসদীয় গণতন্ত্রের অনুপযোগী। সুতরাং সরকারি দলের নেতাদের উচিত একটি অকার্যকর রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে পরিচয় করে দেওয়ার আত্মঘাতী প্রবণতা থেকে মুক্ত হওয়া। কথাটা আরও পরিষ্কার হওয়া উচিত যে, যখন দেশের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নাগরিকের সমর্থিত বিরোধী দলকে পাইকারিভাবে অভিযুক্ত করা হবে, তখন জাতি হিসেবে আমরা খাটো হব। এটা দেশকে নয়, একটি দলকেই সাময়িক ফায়দা দিতে পারে। বিএনপি সরকারি দলে থাকতেও এ ধরনের মনোভাব দেখিয়েছে। বিশেষ করে, ভারতের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সম্পর্কে কুৎসা ছড়িয়ে একই ধরনের দুষ্কর্ম তারা করেছে। ‘এই বিচারও শেষ হবে’ যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রশ্নে বিএনপির অবস্থান দুর্ভাগ্যজনক হলেও নির্বাচনী প্রচারণায় প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক চড়া সুরে এই বিচারকে এভাবে ব্যবহার করা উদ্বেগজনক। সংবিধানমতে নির্বাচন কমিশন দিল না, জানুয়ারির তৃতীয় সপ্তাহে নির্বাচনের আভাস দিলেন সচিব। প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনী প্রচারণায় জোরেশোরে পাল তুলে দিয়েছেন। তবে তিনি ‘২০২১ সাল পর্যন্ত সময়ের জন্য’ আরেকটি বার মানে ২০১৯ পর্যন্ত ম্যান্ডেট চাইছেন। ক্ষমতাসীনদের কারও কারও আচরণে মনে হয় দেশ দৃশ্যত একতরফা নির্বাচনের দিকে যাচ্ছে। যদিও উভয় দলের তরফেই নাটকীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ খোলা থাকবে।
মির্জা ফখরুলের সঙ্গে আলোচনা করে মনে হয়েছে, অন্তত তিনি ব্যক্তিগতভাবে হলেও কয়েকটি সংবিধানসম্মত বিকল্প ফর্মুলার বিষয়ে সচেতন ও সক্রিয় রয়েছেন। আমার বুঝতে ভুল হতে পারে। আবার ঠিক হলেও তা তাঁর দলের অবস্থান না-ও হতে পারে। প্রথমত, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি পাঁচজন করে নির্দলীয় ব্যক্তি মনোনয়ন দেবে। এই ১০ জনকে উপনির্বাচনে জয়ী করে আনা হবে এবং তাঁরাই সেই ১০ জনের মধ্য থেকে একজনকে না হয় তৃতীয় একজনকে অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বাছাই করবে। দ্বিতীয় বিকল্প হচ্ছে, উভয় দলের মনোনয়নে সাবেক প্রধান বিচারপতিদের সমন্বয়ে পাঁচজনের একটি সার্চ কমিটি গঠন করা হবে। তাঁরা একজন প্রধান উপদেষ্টা বা উপদেষ্টাদের খুঁজে বের করবেন। এবং উপনির্বাচনে তাঁদের জয়ী করে আনা হবে। তৃতীয় বিকল্প তুর্কি মডেল। ‘নির্বাচনকালে স্বরাষ্ট্র, জনপ্রশাসন, পররাষ্ট্রের মতো মুখ্য মন্ত্রিত্ব নির্বাচনকালে নির্দলীয় ব্যক্তিদের দেওয়া হবে।’
তুরস্কের ১৯৬১ সালের সংবিধানেই সুষ্ঠু নির্বাচনে এক আশ্চর্য বিধান যুক্ত করা হয়েছিল। অবাধে গোপন ব্যালটে ও উন্মুক্ত গণনার ভিত্তিতে সাধারণ নির্বাচন হবে। নির্বাচন নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি করবে বিচার বিভাগ। গত অর্ধশতাব্দীতে কামাল আতাতুর্কের দেশটি বহুবার সংবিধান বদলেছে। কিন্তু ১১ সদস্যের সুপ্রিম ইলেকশন বোর্ড টিকে আছে। এটা তাদের ইসি বা নির্বাচন কমিশন। বাংলাদেশের একটি লোক দেখানো বাছাই কমিটির বিপরীতে এই বোর্ডের গঠন দেখার মতো। ১১ জনের মধ্যে সাতজন নিয়মিত ও চারজন বিকল্প সদস্য। সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্ট অব আপিল এবং ১৫৬ সদস্যের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক আদালত কাউন্সিল অব স্টেটের পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে যথাক্রমে ছয়জন এবং পাঁচজন নির্বাচিত হন। এই ১১ জনই গোপন ব্যালটে ও নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে নির্বাচিত হন। আবার এঁরাই গোপন ব্যালটে বোর্ডের চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এত শক্তপোক্ত বোর্ড করে তুর্কিরা দারুণ ফল পেয়েছে। কারণ, যাবতীয় নির্বাচনী বিরোধ ও মামলার রায় এই বোর্ড দিয়ে থাকে। কাউকে অন্য আদালতে যেতে হয় না। তুরস্কের বর্তমান মধ্যপন্থী ক্ষমতাসীন দল একাদিক্রমে তিন মেয়াদে আছে। কারচুপির অভিযোগ নেই। বিরোধী দলের ‘ধাক্কাধাক্কি’ নেই।
কোনো সন্দেহ নেই, ক্ষমতাসীনেরা ও বিএনপি উভয়ে প্রকৃত করণীয় থেকে দূরে আছে। এই দেশকে তারা নির্বাচনী কাজিয়া মুক্ত করতে এখনো পর্যন্ত ন্যায্য ফর্মুলা দেয়নি। সবচেয়ে বড় ধাপ্পাটি এখন দিচ্ছে আওয়ামী লীগ। একে জনগণের সামনে উন্মোচিত করতে হলে বিএনপি নিশ্চয়ই তুর্কি মডেল আমদানি করতে পারে। আমরা জয়তু মির্জা বলব যদি বিএনপি সংসদে তুর্কি মডেলে একটি বিল আনে। তাহলে তুর্কি নাচ দেখবে ক্ষমতাসীনেরা। তুর্কি সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা আছে। চার বছর মেয়াদে সংসদের বিধান আছে। আনুন তো এসব।
গত ২৫ আগস্ট মির্জা ফখরুল ইসলাম আমাকে বলেন, বিএনপি প্রধানমন্ত্রীর মুখে কেবল একবারই, তা-ও লন্ডনে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রূপরেখার কথা শুনেছিল। বুঝলাম, বিএনপি এর লিখিত রূপ দেখতে চায়। ৩০ আগস্ট মোহাম্মদ নাসিম ইঙ্গিত দিয়েছেন, ১২ সেপ্টেম্বরে ডাকা অধিবেশনে আইনমন্ত্রী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রূপরেখা পেশ করবেন। এটা আদৌ সত্য হলে খুবই ভালো খবর। সরকারি দল যদি লিখিতভাবে এটা পেশ করে, তাহলে এটা হবে একটি মাইলফলক রাজনৈতিক অগ্রগতি।
আমি যদি ঠিক বুঝতে পারি, তাহলে দেখি, প্রধানমন্ত্রী সরে দাঁড়িয়ে তাদের কথিত অন্তর্বর্তী সরকারে দলেরই অন্য কাউকে আনলে বিএনপি হয়তো তুড়ি মেরে না-ও উড়িয়ে দিতে পারে। আর সংবিধানের মধ্যে নির্দলীয় সরকার পেলেও তাদের চলে। কিন্তু এটা সোনার হরিণ। অন্তর্বর্তী সরকারে খোদ শেখ হাসিনাই থাকবেন, অথচ বিএনপিকে আসতে দেওয়া হবে না, এমনই বাতিকগ্রস্ত হয়ে পড়ছে বিএনপি।
আমি কখনো মনে করিনি যে, চলতি সংকটের সুরাহা সংবিধান বা আইনে লেখা আছে, ছিল বা থাকবে। তদুপরি আমি সংবিধানসম্মত ফর্মুলা মানা প্রশ্নে বিএনপির এই জ্যেষ্ঠ নেতাকে সবিনয়ে প্রশ্ন করি যে, বর্তমান সংবিধানের মধ্যেই তো সুরাহা সম্ভব, সেটা আপনারা বলছেন না কেন? তাহলে তো সরকারি দলের সংবিধানের গান থামে। জবাবে মির্জা ফখরুল স্পষ্ট ইঙ্গিত দেন যে, ‘এই আলোচনা হতে পারে, যদি তাঁরা আগে মেনে নেন যে তাঁরা নির্দলীয় প্রধানমন্ত্রী মানেন। এটাই মৌলিক প্রশ্ন।’
রাজনীতি ও কূটনীতিতে ব্যাক চ্যানেলের গুরুত্ব বরাবরই অপরিসীম। আমি কেবল একটা সত্য জানতে উদগ্রীব। দায়িত্বশীল সূত্রেই জেনেছি, তাই যাচাই না করেই উল্লেখ করার ঝুঁকি নিচ্ছি। কারণ, সময় গড়াচ্ছে দ্রুত। প্রশ্নটি হলো, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী ও বিএনপির শমসের মবিন চৌধুরীর মধ্যকার উদ্যোগ থমকে গেল কেন? ঘরের নাকি বাইরের ইঙ্গিতে? আমি একটি গল্প শুনেছি এ রকম। নেপথ্যের আলোচনা এতটাই বা এটুকু অগ্রসর হয় যে ড. রিজভীর বাসভবনে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ও বিএনপি নেতাদের একটি বৈঠকও স্থির হয়। নির্ধারিত দিনে ও সময়ে সেই বৈঠকে যোগ দিতে বিএনপির নেতারা হাজির হন, সৈয়দ আশরাফের গাড়িও সেই গন্তব্যে রওনা দেয়। কিন্তু পথে সেই গাড়ির গতিপথ পাল্টে যায়। কারণ, সৈয়দ আশরাফকে যেতে বারণ করা হয়। বিএনপির নেতারা ফিরে আসেন। সময়টা গত মে মাসের মাঝামাঝি। এ কথা সত্য হলে আমরা আশা করব, ওই গাড়ির চাকা সচল হলেই কেবল শান্তি ও সমঝোতার নির্বাচন হতে পারে।
বিএনপির উচিত হবে শেখ হাসিনার অধীনেও নির্বাচনে যাওয়ার বিকল্প খুলে রাখা ও প্রস্তুতি নেওয়া। সেনাশাসন থেকে উত্তরণে ভোটাস্ত্রের প্রয়োগ কার্যকর হলে নির্বাচিত স্বৈরশাসনের উত্তরণ কিংবা হাতবদলে ভোটাস্ত্র ব্রহ্মাস্ত্র হবে না কেন?
একদলীয় নির্বাচন ও গোয়েন্দা লাগিয়ে দল ভাঙাভাঙির কসরত যেমন, তেমনি নির্বাচন বর্জন, কিংবা বিদেশিদের কাছে ধরনা দেওয়াও গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত। এক-এগারো ভালো কিছু দিয়েছিল বলে আরেকটিও যে ততটুকু দেবে, তার কোনো গ্যারান্টি নেই। সংবিধান থেকে বিচ্যুতির জন্য দায় চাপানোর রাজনীতি নেত্রীদের ব্যক্তিগত মুখ রক্ষা করে। কে দায়ী তা চিহ্নিত হলেও দেশ বা নাগরিকের কোনো স্বার্থ রক্ষা হয় না।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক।
mrkhanbd@gmail.com