বিএনপির মনোযোগ শুধুই আন্দোলনে

সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন হবে- সরকারের এ অনড় অবস্থানের মুখে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি আদায়ে আন্দোলনে নামাই অনিবার্য হয়ে উঠেছে প্রধান বিরোধী দল বিএনপির সামনে। ২৫ অক্টোবরের পর এ দাবি আদায়ে কঠোর আন্দোলনে নামার ঘোষণাও দিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন ও ১৮ দলীয় জোটের নেতা খালেদা জিয়া। সার্বিক পরিস্থিতিতে আগামী নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার চেয়ে এ মুহূর্তে নির্দলীয় সরকারের দাবিতে আন্দোলনের প্রস্তুতিকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে বিরোধী দল। যদিও বিরোধীদলীয় নেতা গত রোজার ঈদের পর থেকে দলীয় নেতাদের আন্দোলনের পাশাপাশি নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়ারও নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু এখন নির্বাচনের বিষয়টি বাদ দিয়ে কেবল আন্দোলনের প্রস্তুতির নির্দেশই দিচ্ছেন তিনি। এর জন্য নিয়মিত দলের সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে বৈঠক চলছে। দলের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন গতকাল রবিবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আপাতত নির্বাচন নয়, আন্দোলনই বিএনপির লক্ষ্য। তবে সরকার সমঝোতার মাধ্যমে অচলাবস্থা দূর করতে চাইলে ভিন্ন কথা। তখন আমরা ভেবে দেখব।’
দলের স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘যেখানে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনিশ্চিত, সেখানে আন্দোলন ছাড়া আমরা বিকল্প কিছু ভাবছি না। আন্দোলনের প্রস্তুতি নিয়ে আমরা নিয়মিত বৈঠক করছি। ধাপে ধাপে আমরা আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করব।’
খালেদা জিয়াও নির্বাচনে অংশ নেওয়ার চেয়ে নির্দলীয় সরকারের দাবিতে আন্দোলনে নামার বিষয়েই ক্রমাগত জোর দিয়ে চলেছেন বিভিন্ন বৈঠক ও সভা-সমাবেশে। সর্বশেষ গত শনিবার সিলেটের জনসভায় তিনি দলীয় সরকারের অধীনে একতরফা নির্বাচন ঠেকাতে সারা দেশে দলীয়ভাবে ও জনগণকে নিয়ে কেন্দ্রভিত্তিক সংগ্রাম কমিটি গঠনের কথা বলেছেন। এর আগে গত ২৯ সেপ্টেম্বর খুলনায় ১৮ দলীয় জোটের সমাবেশে খালেদা জিয়া বলেন, ‘আমরা প্রতিশোধ প্রতিহিংসায় বিশ্বাস করি না। সরকার দাবি না মানলে আগামী ২৫ অক্টোবরের পর কর্মসূচি দেব। আমরা দেশের স্বার্থে আন্দোলন করছি। দেশের মানুষের সমর্থন আমরা পেয়েছি।’
দলীয় একটি সূত্র জানায়, খালেদা জিয়া বগুড়া, রাজশাহী, রংপুর, খুলনা ও সর্বশেষ সিলেটের জনসভার আগের দিনই ওই সব এলাকায় চলে যান। সেখানে রাতে দলের দায়িত্বপ্রাপ্ত সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। আন্দোলনের মাধ্যমে সারা দেশ অচল করে দিতে বিএনপি আন্দোলনের যে পরিকল্পনা করেছে, তা বাস্তবায়নে বিভাগ বা অঞ্চল ভাগ করে সিনিয়র নেতাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সফরের মধ্য দিয়ে তিনি দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাসহ ওই এলাকার সিনিয়র নেতাদের বিভিন্ন দিকনির্দেশনা দিয়েছেন, যাতে কেন্দ্র থেকে নির্দেশ আসা মাত্র যে কোনো কর্মসূচি সফল করা যায়।
সূত্র জানায়, খুলনার জনসভার আগের রাতে খালেদা জিয়া অবস্থান করেন যশোর সার্কিট হাউসে। সেখানে এক মতবিনিয়ম সভায় ওই জেলাসহ পুরো দক্ষিণাঞ্চলের দায়িত্ব দেওয়া হয় স্থায়ী কমিটির সদস্য তরিকুল ইসলামকে।
আগে তত্ত্বাবধায়ক পরে নির্বাচনের প্রস্তুতি: গত ১ অক্টোবর রাতে খালেদা জিয়া তাঁর গুলশান কার্যালয়ে দলের সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, স্থায়ী কমিটির এক সদস্য ওই বৈঠকে আন্দোলনের পাশাপাশি নির্বাচনেরও প্রস্তুতি নিয়ে কথা বলতে চাইলে খালেদা জিয়া তাঁকে থামিয়ে দিয়ে বলেন, এখন নির্বাচনের প্রস্তুতির চেয়ে তত্ত্বাবধায়কের দাবি প্রতিষ্ঠিত করা জরুরি। এরপর নির্বাচন নিয়ে ভাবা যাবে। নির্ভরযোগ্য সূত্র মতে, সেদিনের বৈঠকে দেশের কোথায় কোথায় বিএনপি যথাযথভাবে আন্দোলন করতে পারছে না, তা খুঁজে বের করতে বলেন খালেদা জিয়া। যেসব নেতা আন্দোলনের কর্মসূচিতে উপস্থিত থাকছেন না, তাঁদেরও তালিকা করতে বলেন তিনি। ভবিষ্যতে নির্বাচনে মনোনয়নের ক্ষেত্রে আন্দোলন-সংগ্রামে অংশ নেওয়া ত্যাগী নেতাদের প্রাধান্য দেওয়া হবে বলেও তিনি জানিয়ে দেন। ওই বৈঠকের পর ১৮ দলীয় জোটের শরিক কয়েকটি দলের নেতারা দেখা করতে গেলে খালেদা জিয়া তাঁদেরও আন্দোলনের ব্যাপারে একই ধরনের নির্দেশনা দেন।
পরের দিন রাতে খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে দলের এক ভাইস চেয়ারম্যান ও একজন উপদেষ্টা নির্বাচনের বিষয়টি তোলেন। তাঁদেরও তিনি কিভাবে আন্দোলন জোরদার করা যায়, তা নিয়ে কাজ করতে বলেন বলে জানা যায়। শীর্ষস্থানীয় নেতাদের তিনি রাজধানীসহ বিভাগীয় শহরগুলোর দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগও রাখতে বলেন।
নির্বাচনের প্রস্তুতি : রোজার সময় বিভিন্ন বৈঠকে দলীয় নেতাদের আন্দোলনের পাশাপাশি নির্বাচনের প্রস্তুতির নির্দেশ দিয়েছিলেন খালেদা জিয়া। ওই সময় তিনি একটি কমিটিও করে দিয়েছিলেন। এর পর থেকে ওই কমিটি প্রথমে বিভাগ ও পরে জেলাওয়ারি প্রতিটি আসনের মনোনয়নপ্রত্যাশীদের তালিকা করেন। ওই তালিকা চেয়ারপারসনের গুলশান কার্যালয়ে জমাও দেওয়া হয়েছে। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, খালেদা জিয়া এখনো সেটি দেখেননি। কোন কোন নেতা আন্দোলনের মাঠে রয়েছেন, কারা এলাকায় জনপ্রিয়, নির্বাচনে কারা জয়ী হয়ে আসতে পারবেন ইত্যাদি ক্যাটাগরিতে ভাগ করে একটি প্রাথমিক জরিপ চালানো হয়েছে। সে অনুযায়ী তালিকায় থাকা নেতাদের সম্পর্কে আরো খোঁজ নেওয়া হবে। তবে আন্দোলনের কারণে ওই প্রক্রিয়া এখন ধীরগতিতে চলছে।
নির্বাচনের প্রস্তুতির বিষয়ে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিএনপি বৃহৎ রাজনৈতিক দল। তাদের আন্দোলনের প্রস্তুতির পাশাপাশি নির্বাচনের প্রস্তুতিও থাকবে। এটাই স্বাভাবিক। নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়নে কাজ চলছে। তবে আমরা এখন আন্দোলনের ওপরই বেশি জোর দিচ্ছি।’
নির্বাচন ঠেকানোর পরিকল্পনা : চলতি মাসে দলের সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন বিএনপি চেয়ারপারসন। ওই বৈঠক থেকে আন্দোলন কর্মসূচির খসড়া চূড়ান্ত করা হবে। ১৮ দলীয় জোটের বৈঠকে আলোচনার পর সেটি চূড়ান্ত করা হবে। স্থায়ী কমিটির এক সদস্যের মতে, বৈঠকের মূল এজেন্ডাই থাকবে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে সরকারকে কিভাবে বাধ্য করা যায় এবং একতরফা নির্বাচন করতে চাইলে তা প্রতিহত করার বিষয়টি। ওই সদস্যের মতে, ২৪ অক্টোবরের পর সরকারকে কোনোভাবেই স্বস্তিতে থাকতে দেওয়া হবে না।
সূত্র মতে, বরিশাল ও চট্টগ্রামে জনসভার (এখনো তারিখ নির্ধারণ করা হয়নি) পর ঢাকায় মহাসমাবেশ করা হবে। সেখান থেকেই শুরু হবে সরকারবিরোধী আন্দোলনে বিএনপির নেতৃত্বে ১৮ দলীয় জোটের সাত দিনের প্যাকেজ কর্মসূচি। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র কৌশলগত কারণে এখনই এ কর্মসূচি সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেছে। তবে ওই সূত্র জানিয়েছে, ঈদের পর ঢাকার মহাসমাবেশে ব্যাপক জনসমাগমের মধ্য দিয়ে গণ-অভ্যুত্থানের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা করবে বিএনপি। সারা দেশের বিভাগীয় শহর অচল করে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। পাশাপাশি রাজধানীসহ জেলার গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলো দখলে নেবে ১৮ দলীয় জোটের নেতা-কর্মীরা। সম্ভাব্য এসব পরিকল্পনার কথা জানা যাচ্ছে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে আলাপের মাধ্যমে। সরকারবিরোধী এসব কর্মসূচিতে কাজ না হলে অবস্থা বুঝে নতুন কর্মসূচি দেবে বিএনপি। এ ক্ষেত্রে প্রথমেই থাকবে টানা হরতাল, রেলপথ-রাজপথ অবরোধ। পরবর্তী সময়ে থাকবে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর নির্বাচন কমিশন ঘেরাও, মনোনয়নপত্র দাখিলের দিন সারা দেশে রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয় ঘেরাও, চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা ঘোষিত হওয়ার পর সারা দেশে অসহযোগের কর্মসূচি।
আন্দোলনের সম্ভাব্য এসব পরিকল্পনার বিষয়ে ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘ঈদের পর ঢাকাসহ সারা দেশে সর্বাত্মক আন্দোলন শুরু হবে। শান্তিপূর্ণ সেই আন্দোলনে সরকারের আচরণ কী হয়, তার ওপর ভিত্তি করে কর্মসূচির গতি পাল্টাবে। তীব্র আন্দোলনের স্বার্থে একবিন্দুও ছাড় দেওয়া হবে না।’
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান বলেন, বিএনপির ইতিবাচক অবস্থানকে সরকার দুর্বলতা মনে করছে। এখন সময় এসেছে সরকারকে জবাব দেওয়ার। দলের নীতিনির্ধারকরা শিগগিরই কর্মসূচি চূড়ান্ত করবেন। আর তা পালন করতে সারা দেশের নেতা-কর্মীকে নির্দেশনা এরই মধ্যে দেওয়া হয়েছে।