বিশেষ সাক্ষাৎকার: মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর

বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের তুলনা ভুল

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মিজানুর রহমান খান

জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে প্রধান বিরোধী দল বিএনপির নির্বাচন ও আন্দোলনগত জোট নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রশ্নে বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও বিতর্ক আছে। প্রথম আলোকে দেওয়া বিশেষ সাক্ষাৎকারে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জামায়াতের রাজনীতি, যুদ্ধাপরাধের বিচারসহ বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকারটির দ্বিতীয় ও শেষ কিস্তি প্রকাশিত হলো আজ

প্রথম আলো  এর আগে আপনারা দুই জামায়াতিকে মন্ত্রী করেছিলেন, এবার কতজনকে করবেন? হেফাজতকেও কি মন্ত্রিত্ব দেবেন?
মির্জা ফখরুল  রাজনীতিকদের পক্ষে আগাম অনুমাননির্ভর উত্তর দেওয়া কঠিন। ২০০১ সালে জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনী জোট ছিল। এখনকার ১৮-দলীয় মোর্চা মূলত আন্দোলনের জোট।
প্রথম আলো  নির্বাচনগত জোট, আন্দোলনগত জোট, ’৯১-এ কি সরকারগত জোট ছিল?
মির্জা ফখরুল  ১৯৯১-এ তাদের নিয়ে সরকার করিনি। আপনি ভুল বলছেন।
প্রথম আলো  জামায়াতের সমর্থনেই আপনারা সরকার করেছিলেন। একে ছাড়া আপনাদের চলে না।
মির্জা ফখরুল  সমর্থন তো আরও অনেকেই পেয়েছে। তাদের সমর্থনে আওয়ামী লীগ আমাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছে। রাজনীতির ক্ষেত্রে বিভিন্ন মেরুকরণ ঘটে। হেফাজত রাজনৈতিক দল নয়। তাদের সঙ্গে জোটের প্রশ্নই নেই। অন্য কিছু ইসলামি দলের সঙ্গে বিভিন্ন সময় জোট হয়েছে। এর আগে আওয়ামী লীগও তা করেছে। তারা চুক্তি পর্যন্ত করেছিল। তবে এ ধরনের জোট ভারতে, পাশ্চাত্য ও ইউরোপে আপনি দেখবেন।
প্রথম আলো  একটি যুদ্ধাপরাধী সংগঠনের সঙ্গে আপনারা কৌশলগত ঐক্য করেই চলবেন, নাকি একে ঠেকাতে একটি নীতিগত অবস্থান নেবেন?
মির্জা ফখরুল  এর সাদামাটা উত্তর দেওয়া সহজ নয়। প্রধানমন্ত্রী নিজেই যুক্তরাষ্ট্রে এক প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, আমি একটি রাজনৈতিক দল হয়ে আরেকটি রাজনৈতিক দলকে কীভাবে নিষিদ্ধ করব? একাত্তরের ভূমিকায় তারা আছে কি না। আজকের জামায়াতে যুদ্ধাপরাধীরাই আছেন, নাকি অন্যরাও আছেন। তাদের সঙ্গে যখন আমাদের ঐক্য হবে, তখন তা শুধুই মতাদর্শগত হবে, সে ধারণা তো ঠিক নয়। হাসিনা-এরশাদ বা দিলীপ বড়ুয়ার সাম্যবাদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের কি আদর্শগত ঐক্য চলে? ভারতেও দেখবেন কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে মুসলিম লিগের জোট হচ্ছে।

প্রথম আলো  জেনারেল এরশাদের সঙ্গে জোট গঠনের সম্ভাবনা কতটুকু?

মির্জা ফখরুল  যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে। আন্দোলনে তাদের শামিল হতে বলছি। এখানে পার্থক্যটা বুঝতে হবে। আমরা কেবল আন্দোলনের কথা বলছি।

প্রথম আলো  খালেদা-এরশাদ বৈঠক আসন্ন?

মির্জা ফখরুল  এটা তো এখন বলা সম্ভব নয়। যখন বাস্তবে রূপ নেবে তখন জানবেন।

প্রথম আলো  দুই দলের মধ্যে শাসনগত তফাত দেখি না।

মির্জা ফখরুল  আমরা যারা উদারনৈতিক সংসদীয় গণতান্ত্রিক দল, তাদের মধ্যে আপনি যথেষ্ট মতাদর্শগত তফাত পাবেন না। যেটা থাকে নীতিনির্ধারণী বিষয়। কংগ্রেস ও বিজেপি তাদের নিজ নিজ ইশতেহার নিয়েই রাজনীতি করছে।

প্রথম আলো  তবে বিএনপি নেতৃত্বের হাল এখন এমনই যে দলটির চেহারা যেন জামায়াতি জঙ্গিত্ব ঢেকে ফেলেছে।

মির্জা ফখরুল  এখানে বোধ হয় আপনার মন্তব্য একটু একপেশে হয়ে যাবে। কারণ, জামায়াত যে জঙ্গিত্ব দেখিয়েছে তা তার কর্মসূচিতে দেখিয়েছে। ১৮ দলের কর্মসূচিতে ওই ধরনের কোনো জঙ্গিত্ব দেখানো হয়নি।

প্রথম আলো  বিএনপি জামায়াতি সহিংসতার নিন্দা করতে ব্যর্থ হয়েছে।

মির্জা ফখরুল  আমরা ইচ্ছা করেই নিন্দা করিনি। দেখতে হবে জামায়াত কখন ওই পথে গেছে। যখন জামায়াতের অধিকারগুলোকে আপনি খর্ব করেছেন, তাকে অফিসে যেতে দেননি, অফিসে তালা দিয়েছেন, সভা-মিছিল করতে দেননি। জামায়াতের কথা বাদ দিন। বিএনপির অফিসের সামনে থেকে প্রতিদিন লোক ধরে নিয়ে যাচ্ছে। বিএনপির মিছিলের ওপর গুলি চলেছে। এটা কোন ধরনের গণতন্ত্র?

প্রথম আলো  এর পরও হয়তো বলা যায় বিএনপি ঠিক জামায়াতের পথে যায়নি।

মির্জা ফখরুল  জামায়াতের সঙ্গে যদি বিএনপিকে সব সময় তুলনা করেন তাহলে কিন্তু ভুল করা হবে। বিএনপির গঠন ও জামায়াতের গঠন এক নয়। জামায়াতের মতাদর্শগত অবস্থানের সঙ্গেও বিএনপির মিল নেই। আমরা একটি উদারনৈতিক রাজনৈতিক দল। আমরা কোনো বিপ্লবী দলও নই।

প্রথম আলো  যুদ্ধাপরাধী সংগঠন হিসেবে জামায়াতের বিচার হওয়া উচিত কি না?

মির্জা ফখরুল  যে জামায়াত একাত্তর সালে যখন স্বাধীনতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে, যারা করেছে আপনি সেটাকে বলতে পারেন। কিন্তু সেই জামায়াত আর এই জামায়াত তো এক নয়। জামায়াতকে আপনি এ দেশে রাজনীতি করতে দিয়েছেন। তাহলে তার রাজনৈতিক অধিকারগুলো সমর্থন করবেন না? তাহলে তো জামায়াতকে নিষিদ্ধ করে দিতে হবে।

প্রথম আলো  জামায়াতকে নিষিদ্ধ করা তাহলে আপনি সমর্থন করেন?

মির্জা ফখরুল  না, এটা সমর্থন করার প্রশ্ন নয়। সরকার যদি মনে করে এখানে জামায়াতের রাজনীতি করার প্রয়োজন নেই, তাহলে নিষিদ্ধ করে দিক, তারা কেন করছে না? কারণ, এটা গণতন্ত্রের মৌলিকত্বের পরিপন্থী।

প্রথম আলো  জামায়াতের অন্যদের বাদ দিয়ে সেই বুদ্ধিজীবী ঘাতক বাহিনীর প্রধানকেই তো মন্ত্রী করেছেন। তাহলে সেই জামায়াত ও এই জামায়াতের যুক্তি দিয়ে লাভ কী? আপনার অবস্থান স্ববিরোধী নয় কি?

মির্জা ফখরুল  আপনি রাজনীতি করলে বাস্তবতা মেনে রাজনীতি করতে হবে। রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় আপনাকে আসতে হবে। তারা একটি নিবন্ধিত দল। জামায়াতের সংসদে ধারাবাহিক প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। আওয়ামী লীগ তাদের নিয়ে রাজনীতি করেছে। সব রাজনীতিকই তাদের পক্ষে বা বিপক্ষ নিয়ে রাজনীতি করেছেন। জামায়াত বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন একটি বাস্তবতা। তাই তাদের সঙ্গে রাজনীতি করাটাকে একেবারেই নেতিবাচক দেখাটাকে আমি যুক্তিসংগত মনি করি না। রাশেদ খান মেনন ও হাসানুল হক ইনু, নিজামী ও মুজাহিদকে নিয়ে রাজনীতি করেছেন। শেখ হাসিনা করেছেন। সেসবের অনেক ছবি আছে। আমরা সবাই সেই বাস্তবতা মেনে নিয়ে রাজনীতি করছি। আমি বিষয়টিকে সেভাবে দেখতে চাই। গণতন্ত্রকে বিভিন্ন ধরনের মতবাদের মধ্য দিয়ে চলতে হবে।

প্রথম আলো  তাহলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এগিয়ে নেওয়াসংক্রান্ত বিএনপির বক্তব্য শুধুই কথার কথা। কোনো আদর্শগত বিষয় বলে কিছু থাকবে না? এটা এমনই একটা ফেলনা বিষয়?

মির্জা ফখরুল  এতটা আবেগপ্রবণ হয়ে কিন্তু বিষয়গুলো বিচার করা যাবে না। রাজনীতি ক্রূর, একটি কঠিন বাস্তবতা। আর আমরা যদি এখন সারাক্ষণই এই ইস্যু নিয়ে থাকি, তাহলে তো কাজের কাজ কিছু করা যাবে না। অতীত-ক্লিষ্টতা থেকে আমরা বেরিয়ে আসতে পারি।

প্রথম আলো  শাহবাগের পরেও এ কথা?

মির্জা ফখরুল  সাধারণ মানুষের মধ্যে শাহবাগ তেমন প্রভাব ফেলেনি, এটাই বাস্তবতা। আপনি আজকের ভিয়েতনামের দিকে তাকান। নয় বছর ধরে ভিয়েতনামে যুদ্ধ করেছে আমেরিকা। কিন্তু আজ সেখানে আমেরিকার বিরুদ্ধে যুদ্ধ চলছে না। বরং আমেরিকাকে সঙ্গে নিয়ে তারা দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। আজ দারিদ্র্য ও অনুন্নয়নকে অগ্রাধিকারের জায়গায় রাখতে হবে। কিন্তু অতীতকাতর থাকলে এই বিষয় অগ্রাধিকার পাবে না। মনোযোগের বাইরে চলে যাবে। শুধু তাত্ত্বিক হলে চলবে না, আপনাকে বাস্তবসম্মত হতে হবে। গান্ধীজিকে যারা হত্যা করেছিল, তাদের দল কিন্তু অনেক সময় ভারতে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেছে। তার মানে কি এই যে তারা কেউ ভারতের পক্ষে নয়, বিপক্ষে?

প্রথম আলো  যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে বিএনপির ওয়াদা তাহলে বাস্তবতা নয়?

মির্জা ফখরুল  আমরা কিন্তু অস্বীকার করি না যে ওই সময় যাঁরা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ করেছেন, তাঁদের বিচার আমরা করব না।

প্রথম আলো  নিজামীরা না হলে তাঁরা কারা?

মির্জা ফখরুল  তাঁরা যাঁরাই হোক, ন্যায়বিচার করা হবে। কারণ, সবারই ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার আছে। আজকে যে তরুণ জামায়াত করছে, তাকে কি আপনি যুদ্ধাপরাধী বলবেন?

প্রথম আলো  নিশ্চয় না। কিন্তু এটা কি বলা সম্ভব এখন যাঁদের ফাঁসির রায় হয়েছে, তাঁরা কি মার্জনা পাবেন? কারণ, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুই দলই ফাঁসির আসামিকে খালাস দিতে সিদ্ধহস্ত।

মির্জা ফখরুল  এ কথা আমাদের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছেন কেন? এ কথা তো আমরা কখনোই বলিনি। আমরা সব সময় বলেছি, যারা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ করেছে, তাদের বিচার আমরা চাই। কোনটা চাই? ন্যায়বিচার চাই। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যমূলক নয়। যে প্রক্রিয়ায় বিচার করা হচ্ছে, যা নিয়ে বিদেশেও প্রশ্ন উঠেছে, আমরা সেই প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছি। অনেক নিম্নমানের বিচার হচ্ছে।

প্রথম আলো  বিএনপি ক্ষমতায় থাকতে বিচ্ছিন্নতায় মদদ বা ১০ ট্রাক অস্ত্রের মতো ঘটনায় ভারতের নিরাপত্তা-উদ্বেগ ছিল। এবার?

মির্জা ফখরুল  ভারতের বিরুদ্ধে কখনোই বিএনপির কোনো বিদ্বেষ ছিল না। উত্তর-পূর্ব ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদ কিংবা ১০ ট্রাক অস্ত্রের যে কথা বললেন, তার সঙ্গে বিএনপির কোনো সম্পর্ক নেই। হতে পারে অন্যের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক আছে। কিন্তু বিএনপির কোনো সম্পর্ক নেই। আমরা সমস্যার কথা বলেছি। তিস্তা নদীর পানি চেয়েছি। টিপাইমুখ বাঁধ হলে ভয়ের কথা বলেছি। ট্রানজিট দিলে কী পাব, সেটা বলেছি। তবে প্রতিদিন সীমান্তে লোক মরবে, আমরা কিছু বলব না, সেটা কিন্তু হতে পারে না। পারস্পরিক সমস্যার সমাধান করা দরকার।

প্রথম আলো আপনাকে ধন্যবাদ।

মির্জা ফখরুল ধন্যবাদ।