বিএনপি আন্দোলনে, না নির্বাচনে?..সোহরাব হাসান

প্রধান বিরোধী দল বিএনপি এখন নির্বাচনমুখী, না আন্দোলনমুখী—এই প্রশ্ন এখনো অমীমাংসিত। দলের নেতা-নেত্রীদের বক্তৃতা-বিবৃতি দেখেশুনে কখনো মনে হয়, তাঁরা ক্ষমতার দরজায় পৌঁছে গেছেন। আবার কখনো মনে হয়, দিল্লি হনুজ দুরস্ত। বিএনপির নেতারা কখনো উজ্জীবিত, কখনো তাঁদের কণ্ঠে হতাশার সুর।
নির্বাচন ও আন্দোলন নিয়ে বিএনপি যে দারুণ দোটনায় আছে, সেটি বুঝতে রাজনৈতিক পণ্ডিত হতে হয় না। দলের একাংশ মনে করে, যেহেতু জনসমর্থন তাদের পক্ষে রয়েছে, সেহেতু যেকোনো অবস্থায় নির্বাচনে যাওয়া উচিত। নির্বাচনে না গেলে ২০০৭ সালের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। অন্য অংশের দাবি, সরকারের ফাঁদে কোনোভাবেই পা দেওয়া ঠিক হবে না। এই মুহূর্তে নির্বাচনের কথা না ভেবে কঠোর আন্দোলনে নামতে হবে, যাতে সরকার তত্ত্বাবধায়ক না হলেও নির্দলীয় সরকারের দাবি মানতে বাধ্য হয়।
এখানে উল্লেখ করা অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে বিএনপি ও তার শরিক দলগুলো আন্দোলন করে আসছে তিন বছর ধরে। কিন্তু তাদের সেই আন্দোলন সরকারের টনক নড়াতে পারেনি, বরং যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে জামায়াত-শিবির দেশজুড়ে যে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছে, তার দায় বিএনপির ঘাড়েও পড়েছে।
মেয়াদের শেষ মুহূর্তে এসে সরকারের বিরুদ্ধে কঠোর আন্দোলনে নামলে বিএনপি তা থেকে কতটা ফায়দা উঠিয়ে নিতে পারবে, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। দলের কেউ কেউ মনে করেন, তাতে আম-ছালা দুই-ই খোয়াতে হতে পারে। তবে দলের ভেতরে ভিন্নমতও আছে। এই অংশের মতে, এখন বিএনপি যে অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে, তাতে হারানোর কিছু নেই। ২০০৮ সালে নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত ভুল ছিল বলেও মনে করে তারা। তখন বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব নির্বাচনে যাওয়ার বিরোধী ছিল। কিন্তু জামায়াত ও দলের নরমপন্থী অংশের তাগিদেই শেষ পর্যন্ত বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেয়।
এখন বিএনপির নরম ও গরম—উভয় পন্থী একটি ব্যাপারে নিশ্চিত যে দাবি আদায়ে সরকারকে বাধ্য করতে হলে এত দিন যে পদ্ধতিতে আন্দোলন হয়েছে, সেই পদ্ধতি কাজে লাগবে না। সর্বাত্মক আন্দোলনে নামতে হবে। দলের প্রধান খালেদা জিয়া ও তাঁর ছেলে তারেক রহমান সেই সর্বাত্মক আন্দোলনের প্রস্তুতি নিতে বলেছেন দলীয় নেতা-কর্মীদের। তারেক রহমান লন্ডনে বসে আন্দোলনের যেই কৌশল নির্ধারণ করছেন, সেটাই তামিল করছেন নেতা-কর্মীরা। তাঁর মূলকথা হলো, আগে দাবি আদায়, তারপর নির্বাচন।
খালেদা জিয়া গত ২৯ সেপ্টেম্বর খুলনার জনসভায় বলেছেন, শেখ হাসিনার অধীনে কোনো নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেবে না; করতেও দেবে না। একই সঙ্গে তিনি দেশ বাঁচানোর জন্য আওয়ামী লীগ সরকারকে হটানোর কথা বলেছেন। তাঁর এই বক্তব্য দ্ব্যর্থবাচক। একটি সরকার তা নির্বাচিত হোক বা অনির্বাচিত, গণতান্ত্রিক হোক বা অগণতান্ত্রিক—তাকে হটানোর দুটো উপায় আছে। এক. গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য করা, দুই. নির্বাচনের মাধ্যমে পরাজিত করা। বিএনপি কোন পথ নেবে?
আওয়ামী লীগ সরকারের মেয়াদ ফুরিয়ে আসছে। এই মুহূর্তে ‘সরকার হটিয়ে দেশ বাঁচানোর স্লোগান’ মানুষের কাছে কতটা গ্রহণযোগ্য হবে? তা ছাড়া সরকার হটানো আন্দোলন করতে বিএনপির নেতারা প্রস্তুত আছেন কি না, সেই প্রশ্নও না উঠে পারে না। বিএনপির নেতাদের ভাষাভঙ্গি ও আচরণে আন্দোলনের কঠিন-কঠোর পথের চেয়ে নির্বাচনী আমেজই বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠছে। নির্বাচন নিয়ে বিএনপি দলীয়ভাবে এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা যেসব জরিপ করেছে, তাতে বিএনপির জয়ের সম্ভাবনার কথাই বলা হয়েছে। এ অবস্থায় বিএনপির নেতারা মুখে যা-ই বলুন, ভেতরে ভেতরে নির্বাচনের প্রস্তুতিই নিচ্ছেন। বিভিন্ন স্থানে অনানুষ্ঠানিক প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ চলছে বলে গণমাধ্যমে খবর এসেছে। এমনকি কেউ কেউ নিজেকে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবেও ঘোষণা করেছেন, রঙিন পোস্টার ছেড়েছেন।
খালেদা জিয়া ইতিমধ্যে নরসিংদী, বগুড়া ও খুলনায় যে জনসভা করেছেন, তাতেও নেতা-কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে নির্বাচনী আমেজ লক্ষ করা গেছে। তিনি যেখানেই যাচ্ছেন, সেখানে শত শত তোরণ নির্মাণ করা হচ্ছে, রংবেরঙের পোস্টার-ফেস্টুন টাঙানো হচ্ছে। এ রকম তোরণ-ফেস্টুন দিয়ে নিশ্চয়ই সরকার পতনের আন্দোলন করা যায় না।
এখন বিএনপি কোন পথে যাবে—নির্বাচন, না আন্দোলন। আন্দোলনেরও দুটি চরিত্র আছে। এক. সরকারকে চাপে রেখে যতটা সম্ভব দাবি আদায় করা। দুই. সর্বাত্মক আন্দোলন করে সরকারকে গদিচ্যুত করা। তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম বিএনপি আন্দোলন করে সরকারকে ফেলে দিল। এরপর দেশটি চালাবে কে, নির্বাচনই বা করবে কে? এ রকম পরিস্থিতি দেশে সাংবিধানিক যে শূন্যতা দেখা দিতে পারে এবং তার সুযোগ যে অন্য কোনো শক্তি নেবে না, তারই বা নিশ্চয়তা কী?
খুলনার জনসভায় খালেদা জিয়া সরকারের বিরুদ্ধে গণ-আন্দোলন গড়ে তুলতে সিভিল প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তথা সশস্ত্র বাহিনীর সহায়তা চেয়েছেন। তিন দশকেরও বেশি রাজনীতিতে অভিজ্ঞ নেত্রী নিশ্চয়ই জানেন, ইতিপূর্বে কোনো আন্দোলনেই সিভিল প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা এগিয়ে আসেননি। বরং তাঁরা সরকারের হয়ে বিরোধী দলের আন্দোলন দমন করতেই সচেষ্ট থেকেছে। এটি বর্তমান সরকারের আমলে যেমন সত্য, তেমনি সত্য বিএনপি আমলের জন্যও। খালেদা জিয়ার মনে থাকার কথা, ১৯৯০ সালের গণ-আন্দোলনের সময়ও সিভিল প্রশাসন কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কেউ সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেননি। তবে এ ক্ষেত্রে বিএনপির নেতারা ১৯৯৬ সালের আওয়ামী লীগের উদ্যোগে তৈরি জনতার মঞ্চের উদাহরণটি টানতে পারেন। কিন্তু তাঁদের মনে থাকার কথা, সেই জনতার মঞ্চ তৈরি হয়েছিল ১৫ ফেব্রুয়ারি ভোটারবিহীন নির্বাচনের পর। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার অনুরূপ একটি প্রহসনমূলক ও একতরফা নির্বাচন করলেই কেবল বিএনপির নেতাদের কথায় সিভিল প্রশাসনের রাস্তায় নেমে আসার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে; তার আগে নয়।
এরপর আসি সেনাবাহিনী প্রসঙ্গে। ২০০৬-০৭ সালে নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো যখন মুখোমুখি অবস্থানে, সারা দেশে সংঘাত-সংঘর্ষে জনজীবন অচলপ্রায়, তখনই সেনাবাহিনী হস্তক্ষেপ করেছিল। এবং সেই পরিস্থিতির জন্য দায়ী প্রধানত বিএনপি মনোনীত ও অনুগত রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ। আমরা মনে করি না বর্তমান রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ইয়াজউদ্দিনের ভূমিকায় অবতীর্ণ হবেন। হলে তিনিও ইতিহাসের কাছে দায়ী থাকবেন। রাজনৈতিক নেতৃত্বকে মনে রাখতে হবে, পাকিস্তান আমল থেকে এ দেশের রাজনীতিতে যতবারই সামরিক হস্তক্ষেপ হয়েছে, তারা নিজেদের স্বার্থে করেছে। গণতন্ত্রের প্রতি মমতাবোধ থেকে তারা ক্ষমতা দখল করেনি। সেনাবাহিনী কখনোই স্বেচ্ছায় বিদায় নেয়নি। প্রতিটি রাজনৈতিক অঘটনের পর ফের আমাদের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নতুন করে শুরু করতে হয়েছে। স্বাধীনতার ৪২ বছর পরও যদি রাজনৈতিক নেতৃত্ব পরিপক্বতার পরিচয় না দিতে পারেন, তার চেয়ে আর দুর্ভাগ্যজনক কী হতে পারে?
বিএনপির চেয়ারপারসন প্রতিটি জনসভায় জনগণকে আন্দোলনে অংশগ্রহণের আহ্বানের পাশাপাশি নির্বাচনে বিজয়ী হলে কী করবেন, তারও বিস্তারিত বয়ান দিচ্ছেন। তিনি যদি নির্বাচনেই না যাবেন, তাহলে নির্বাচনের পর সরকারের ধরন-কাঠামোর গল্প জনগণকে শুনিয়ে লাভ কী? আর নির্বাচন যদি না-ই হবে, তাহলে মার্কিন কূটনীতিকই বা কেন লন্ডনে ছুটে যাবেন বিএনপির দ্বিতীয় প্রধান নেতা তারেক রহমানের কাছে। যুক্তরাষ্ট্র তাঁর কাছে আশ্বস্ত হতে চায় যে বিএনপি আগামী দিনে ক্ষমতায় গেলে আগেরবারের মতো জঙ্গিবাদকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেবে না। আইনানুগ সরকারের সমান্তরালে বিকল্প সরকার হিসেবে হাওয়া ভবন তৈরি করবে না। ওই মার্কিন কূটনীতিক নিশ্চয়ই তারেক রহমানকে দেশ অচল করা আন্দোলনের ‘সবক’ দিতে যাননি। বাংলাদেশে কোন দল ক্ষমতায় এল বা গেল, তা নিয়েও তাঁদের তেমন মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয় না। যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন, যুক্তরাষ্ট্রকে তোয়াজ করেই চলবে। তাদের উদ্বেগ হলো, জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস। আর তারা এটাও জানে যে বিএনপিতে ভূরি ভূরি নেতা থাকলেও সিদ্ধান্ত নেওয়ার মালিক নির্বাসিত তারেক রহমানই।
খালেদা জিয়া ভবিষ্যতে প্রতিহিংসার রাজনীতি করবেন না বলে প্রায়ই দেশবাসীকে আশ্বাসবাণী শোনান; বর্তমান সরকারের সন্ত্রাস ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলেন। কিন্তু তাঁর পূর্ববর্তী সরকারের আমলে যে প্রতিহিংসার রাজনীতি হয়েছে, যার শিকার বহু নিরীহ সাধারণ মানুষ, সেই ব্যাপারে কিছুই বলছেন না। এমনকি গত সাত বছরে দলের পক্ষ থেকে সামান্য দুঃখ প্রকাশও করা হয়নি। তাহলে দেশবাসী কী করে আশ্বস্ত হবে, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে প্রতিহিংসার রাজনীতি করবে না?
বিএনপির নেতৃত্ব যদি মনে করেন, এই মুহূর্তে নির্বাচন হলে তাঁরা জয়ী হবেন, তাহলে কেন তাঁরা নির্বাচন বর্জন করবেন? আর নির্বাচন বর্জন করলেই যে নির্বাচন আটকানো যাবে, সে কথাও জোর দিয়ে বলা যাবে না। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ জাতীয় পার্টি ও জামায়াতকে নিয়েও ঠেকাতে পারেনি। এবার বিএনপি কেবল জামায়াতকে নিয়ে সেই কাজটি সম্পন্ন করতে পারবে বলে বিশ্বাস হয় না।
খালেদা জিয়া বক্তৃতা-বিবৃতিতে এখন দুটি বিষয়ের ওপর জোর দিচ্ছেন—নির্বাচনের আগে জাতীয় সংসদ ভেঙে দেওয়া ও শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে না যাওয়া। আর ক্ষমতাসীনেরা নির্বাচনকালীন সরকারের যে প্রস্তাব দিচ্ছে, তা ১৯৯৫-৯৬ সালে বিএনপির দেওয়া প্রস্তাবেরই অনুরূপ। প্রশ্ন হলো, বর্তমান বিরোধী দল সেটি মানবে কি না, নাকি তারা একদফা অর্থাৎ শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচন নয়—এ সিদ্ধান্তে অনড় থাকবে?
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrab03@dhaka.net