বিএনপি নেতাদের মামলা চাঙ্গা করছে দুদক

সাবেক স্পিকার জমির উদ্দিন সরকার ও সাবেক ডেপুটি স্পিকার আখতার হামিদ সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের ৫৮ লাখ ৭১ হাজার ৬৪০ টাকা ক্ষতিসাধনের অভিযোগে অচিরেই আদালতে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দিতে যাচ্ছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গত সোমবার কমিশনের নিয়মিত বৈঠকে দুটি মামলার চার্জশিট দাখিলের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে বলে দুদক সূত্রে জানা গেছে।
সূত্র মতে, বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমান ও তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু কারাবন্দি ব্যবসায়ী গিয়াসউদ্দিন আল মামুনের পাচার করা টাকা ফেরত আনার প্রক্রিয়াও জোরালোভাবে শুরু করেছে দুদক। বর্তমান সরকারের মেয়াদেই এ অর্থ ফেরত আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর পাচার করা প্রায় ২১ কোটি টাকা তিন দফায় দুদকের অ্যাকাউন্টে জমা করা হয়েছে।
জানা যায়, বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় বিএনপির প্রভাবশালী নেতা ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন এবং তাঁর স্ত্রী ও ছেলের নামে লন্ডনে বিপুল পরিমাণ অর্থের সন্ধান পায় দুদক। সেখানে তাঁদের একাধিক ব্যাংক হিসাবে ১০ লাখ পাউন্ড থাকার তথ্য পায় দুদক। লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশের এক তদন্তে লয়েডস টিএসবি ব্যাংকে যৌথ অ্যাকাউন্টে অর্থ থাকার তথ্য পাওয়া যায়। এসব অর্থ ফিরিয়ে আনার পদক্ষেপ নিয়েছে দুদক।
বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ এমপির বিরুদ্ধে অভিযোগ, যুক্তরাজ্যের লন্ডনে ১৫ হান্টিংটন এলাকার কেন্ট ডিএফাইভ-এর টুএফডি অ্যাপার্টমেন্টটি কেনেন তিনি ২০১০ সালে। দুদক সূত্রে জানা যায়, ওই বছরের ৫ মার্চ তিনি এইচএসবিসি ব্যাংকের মাধ্যমে অ্যাপার্টমেন্টটির ফান্ড প্রেরণ করেন। অ্যাপার্টমেন্টের মূল্য হচ্ছে তিন লাখ ৬০ হাজার পাউন্ড (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় সাড়ে চার কোটি টাকা)। এ বিষয়টি নিশ্চিত হতে দেশ-বিদেশের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সঙ্গে দুদকের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরে চিঠি চালাচালির পর এখন পারস্পরিক আইনি সহায়তার অনুরোধ (এমএলএআর) পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে।
একইভাবে বিএনপির শীর্ষস্থানীয় ১০ জনের বেশি নেতার পাচার করা অর্থ ফেরত আনার চেষ্টা দ্রুতগতিতে চলছে বলে জানা গেছে। এ ছাড়া উচ্চ আদালতের আদেশে স্থগিত হওয়া মামলাগুলো সচল করারও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। জাতীয় নির্বাচনের আগ মুহূর্তে দুদকের এসব উদ্যোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যমূলক হিসেবে দেখছেন বিএনপি নেতারা। তাঁদের অভিযোগ, সরকারের অনুগত হয়ে তাদের নীলনকশা বাস্তবায়ন করতেই দুদক নির্বাচনের আগে বিরোধী দলের নেতাদের বিরুদ্ধে করা মামলাগুলো চাঙ্গা করে বেকায়দায় ফেলতে চাইছে বিএনপিকে। বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতাদের জেলে পাঠিয়ে সরকার খালি মাঠে গোল দিতে চায় বলেও বিএনপি নেতারা মনে করেন। তাঁদের অভিযোগ, বিরোধীদলীয় নেতাদের মামলা চাঙ্গা হলেও সরকারদলীয় নেতাদের বিষয়ে দুদক নীরব। এমনকি বর্তমান সরকারের আমলে পদ্মা সেতু, হলমার্ক, রেল কেলেঙ্কারির মতো অনেক ঘটনায় সরকারদলীয় নেতাদের নাম আলোচনায় এলেও কৌশলে দুদকের মামলা থেকে রেহাই পেয়ে গেছেন তাঁরা।
এ প্রসঙ্গে দুদক চেয়ারম্যান মো. বদিউজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, দুদক যাঁদের বিরুদ্ধে মামলা করেছিল, সেটা আওয়ামী লীগ আর বিএনপি দেখে করেনি। দুর্নীতিবাজ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেই মামলা করেছে। বিএনপি নেতারা এখন যে অভিযোগ করছেন তা ঠিক নয়। দুদকের নিজস্ব গতিতেই মামলার কার্যক্রম চলছে। কবে নির্বাচন হবে, সেটা নিয়ে দুদকের মাথাব্যথা নেই।
নির্বাচনের আগে সাবেক স্পিকার ও সাবেক ডেপুটি স্পিকারের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়া প্রসঙ্গে দুদক চেয়ারম্যান বলেন, ‘জমির উদ্দিন সরকার একজন বয়স্ক রাজনীতিবিদ। তিনি বছরখানেক আগে আমাদের বললেন, এই বৃদ্ধ বয়সে তাঁকে যেন জাতির সামনে অপমানিত করা না হয়, আত্মসাৎকৃত টাকা তিনি ফেরত দিয়ে দেবেন। উনার কথা অনুযায়ী উনাকে টাকা ফেরত দেওয়ার সময় দিই। কিন্তু উনি অঙ্গীকার ভঙ্গ করে টাকা ফেরত দেননি। অবশেষে নিরুপায় হয়েই চার্জশিটের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।’
বিএনপির অর্ধশত নেতার বিরুদ্ধে যেসব দুর্নীতির মামলা উচ্চ আদালতের আদেশে স্থগিত রয়েছে সেগুলোর বিষয়ে জানতে চাইলে এম বদিউজ্জামান বলেন, দুদকের সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা ওইসব মামলা নিয়ে কাজ করছেন। এর বেশি কিছু তিনি বলতে চাননি। তারেকের পাচার করা টাকা ফেরত আনার উদ্যোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, মানি লন্ডারিং আইন অনুযায়ী বিচারিক কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত কারো পাচারকৃত টাকা দুদকের অ্যাকাউন্টে নেওয়া যায় না। তারেক-মামুনের ক্ষেত্রে বিচারিক কাজ দ্রুত শেষ করতে দুদকের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু আসামি পক্ষ নানা কৌশলে কালক্ষেপণ করছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘উচ্চ আদালতের নির্দেশে স্থগিত হওয়া বিএনপি নেতাদের সব মামলা সচল করার উদ্যোগ নিয়েছে দুদক। একতরফা নির্বাচন করার লক্ষ্যেই এমনভাবে এগোচ্ছে সরকার। আওয়ামী লীগের নেতাদের সব মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে আর আমাদের মামলা প্রত্যাহার দূরের কথা নির্বাচন থেকে দূরে রাখার জন্য একের পর এক নতুন মামলা চাপিয়ে দিচ্ছে।’
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, ‘দুদক যদি সরকারের অনুগত হয়ে তাদের নীলনকশা বাস্তবায়ন করতে চায়, আমাদের জেলে পাঠাতে চায় তাহলে দুদকেরও দোজখে যেতে হবে। দুদকের অতিউৎসাহী কর্মকর্তাদের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে।’ তিনি আরো বলেন, আওয়ামী লীগ নেতাদের মামলা নিয়ে দুদক কথা বলে না।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দুর্নীতির অভিযোগে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টিসহ বিভিন্ন দলের নেতাদের বিরুদ্ধে শতাধিক মামলা হয়। এসব মামলার মধ্যে ৭৫টিতে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয় সংশ্লিষ্টদের। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের পর তাঁরা উচ্চ আদালত থেকে অব্যাহতি বা স্থগিতাদেশ পেয়েছেন। রাজনীতিবিদদের অনেক দুর্নীতি মামলার কার্যক্রম উচ্চ আদালতের নির্দেশে স্থগিত আছে। দীর্ঘদিন এসব মামলার ব্যাপারে উদাসীন ছিল দুদক। সম্প্রতি ওইসব মামলা সচল করতে আইনজীবী নিয়োগ করা হয়েছে বলে দুদক সূত্র জানায়।
জানতে চাইলে দুদকের এক শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা বলেন, ‘ওয়ান-ইলেভেনের সময় অনেক রাজনীতিবিদের বিরুদ্ধে দুদকের দায়ের করা মামলা উচ্চ আদালতে টেকেনি। তাই দুদক মামলার মেরিট যাচাই করে আপিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘দুদকের প্যানেল আইনজীবী থেকে প্রতিটি মামলার জন্য একজন করে আইনজীবী নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, যাঁরা মামলাগুলোর সর্বশেষ পরিস্থিতি দেখবেন। আমরা দুর্নীতিবাজদের আওয়ামী লীগ, বিএনপি কিংবা জাতীয় পার্টির নেতা হিসেবে আলাদা করে দেখছি না। ওই সময়ে যাঁদের সাজা হয়েছিল, তাঁদের সবার মামলাই দেখা হবে।’
জানা যায়, ২০০৭ ও ২০০৮ সালে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর মধ্যে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের মামলা পরে প্রত্যাহার করে নেওয়া হলেও বিএনপি নেতাদের মামলা উচ্চ আদালতে স্থগিতাদেশ আছে। সেই মামলাগুলোই সচল করার উদ্যোগ নিয়েছে দুদক। এ ছাড়া বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া, তাঁর ছেলে তারেক রহমান, বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, সাদেক হোসেন খোকা, জমির উদ্দিন সরকার, এ কে এম মোশাররফ হোসেন, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর স্ত্রী রোমানা মাহমুদ ও তাঁর ছেলে, হাওয়া ভবনের মালিক আলী আসগার লবী ও তাঁর স্ত্রী-সন্তান, ব্যারিস্টার নাজমুল হুদার স্ত্রী সিগমা হুদা ও তাঁদের মেয়ে অন্তরা হুদা, মোসাদ্দেক আলী ফালু, এহছানুল হক মিলনসহ আরো বেশ কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান, তদন্ত ও আইনি লড়াই চালাচ্ছে দুদক।