তিনটি বিদ্যুৎ করিডর প্রস্তাব

বিদ্যুৎ করিডর পাচ্ছে ভারত

ভারতকে এবার বিদ্যুৎ করিডর দিতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এ করিডরের মাধ্যমে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল থেকে পর্যায়ক্রমে এক লাখ ২৬ হাজার ৫৮৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা হয়ে ভারতের অন্যান্য রাজ্যে যাবে। বিনিময়ে সামান্য কিছু বিদ্যুৎ পাবে বাংলাদেশ। এ করিডরের মাধ্যমে কী পরিমাণ বিদ্যুৎ বাংলাদেশ পাবে, সে ব্যাপারে এখনো কিছু ঠিক হয়নি। তবে এ সম্পর্কিত জয়েন্ট টেকনিক্যাল টিম (জেটিটি) তার চূড়ান্ত খসড়া প্রতিবেদনে করিডর দেওয়ার ব্যাপারে সুপারিশ করেছে।
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে হিমালয় থেকে নেমে আসা বিভিন্ন নদীর ওপর ৪২৯টি বাঁধ দিয়ে এ পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে। কিছু বাঁধ ইতিমধ্যে নির্মিত হয়েছে; আর কিছু নির্মাণাধীন।
প্রসঙ্গত, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান ও চীন হিমালয়ের বিভিন্ন স্থানে জলবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করছে। এসবের জন্য মোট ৫৫৩টি বাঁধ নির্মাণ করা হবে। বাংলাদেশ ও আসামের মানুষ যে টিপাইমুখ বাঁধের এত বিরোধিতা করছে, ১৫০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার সেই বাঁধ এই ৫৫৩ বাঁধের একটি।
সূত্র জানায়, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বিদ্যুৎ খাতে সহযোগিতা বিষয়ে ২০১০ সালের ১১ জানুয়ারি একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়। ওই স্মারকের আওতায় দুই দেশের বিদ্যুৎ খাতে সহযোগিতার বিষয়ে কাজ করার জন্য একটি জয়েন্ট স্টিয়ারিং কমিটি (জেএসসি) এবং একটি জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ (জেডাব্লিউজি) গঠন করা হয়েছে। ইতিমধ্যে জেএসসি ও জেডাব্লিউজির ছয়টি বৈঠক হয়েছে।
ওই সমঝোতা স্মারকের আওতায় ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য থেকে বাংলাদেশে ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির কাজ শেষ পর্যায়ে। এ ছাড়া বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কম্পানির মাধ্যমে সুন্দরবনের পাশে বাগেরহাটের রামপালে এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের বিষয়টিও সমঝোতা স্মারকেরই অংশ।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, জেএসসি ও জেডাব্লিউজির একাধিক বৈঠক হয়েছে বাংলাদেশ ও ভারতে। ওইসব বৈঠকে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ আমদানি ও বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে ভারতকে বিদ্যুৎ করিডর দেওয়ার ব্যাপারে একটি জয়েন্ট টেকনিক্যাল টিম (জেটিটি) গঠন করা হয়। সম্প্রতি জেটিটি তার চূড়ান্ত খসড়া প্রতিবেদনে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল থেকে ৫০০ থেকে এক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির বিষয়ে মত দিয়েছে। একই সঙ্গে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিদ্যুৎ বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারেও সুপারিশ করেছে।
সূত্র জানায়, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় এ মুহূর্তে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করতে আগ্রহী নয়। তবে ভারতকে বিদ্যুৎ করিডর দেওয়ার ব্যাপারে তারা সায় দিয়েছে।
জানা গেছে, ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি না করার ব্যাপারে মন্ত্রণালয়ের যুক্তি হলো- ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না এখন। ভবিষ্যতে ওই অঞ্চলে বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হলে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে।
জানা গেছে, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জলবিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে ভারতের পশ্চিমাঞ্চলে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে গত ২৯ আগস্ট বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ে বৈঠক হয়েছে। ওই বৈঠকে জেটিটির চূড়ান্ত খসড়া প্রতিবেদনে দেওয়া সুপারিশের বিষয়ে আলোচনা হয়।
জেটিটির সুপারিশে বলা হয়েছে, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জলবিদ্যুৎ বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে নিয়ে যাওয়ার জন্য সঞ্চালন লাইন তৈরি করতে হবে। জেটিটির এ সুপারিশে সায় দিয়েছে মন্ত্রণালয়। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ এনামুল হকসহ বিদ্যুৎ বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে গত ৬ আগস্ট বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জেটিটির সুপারিশ অনুযায়ী বিদ্যুৎ করিডরের বিষয়ে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দেন।
জেটিটির সুপারিশ অনুযায়ী সম্ভাব্য করিডরের জন্য তিনটি প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। প্রথম করিডরটি আসামের শিলচর থেকে বাংলাদেশের মেঘনাঘাট অথবা ভুলতা হয়ে ভেড়ামারা দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের বনগাঁও পর্যন্ত। এ সঞ্চালন লাইন হবে ৪০০ কিলোভোল্টের।
দ্বিতীয় করিডরটি আসামের রাঙ্গিয়া অথবা রাওতা উপকেন্দ্র থেকে মাল্টি টার্মিনাল বাইপোল সঞ্চালন লাইনের মাধ্যমে বাংলাদেশের জামালপুর অথবা দিনাজপুর (বড়পুকুরিয়া) দিয়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাঞ্চলের যেকোনো জায়গায়। এ জন্য বাংলাদেশ ও ভারতের সংশ্লিষ্ট স্থানে উচ্চ ক্ষমতার বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র স্থাপন করতে হবে। করিডরের জন্য জামালপুর বা দিনাজপুরে যে উপকেন্দ্র নির্মাণ করা হবে সেখান থেকে কিছু পরিমাণ বিদ্যুৎ বাংলাদেশকে দেওয়ার সুপারিশও করেছে জেটিটি।
তৃতীয় করিডরটি বিহারের পূর্ণিয়া থেকে বাংলাদেশের জামালপুর অথবা দিনাজপুর হয়ে ভারতের অরুণাচলে গিয়ে শেষ হবে। এ করিডর ডাবল সার্কিটের ৭৬৫ কিলোভোল্টের হবে।
সূত্র জানায়, হিমালয়জুড়ে মোট ৪২৯টি জলবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করবে ভারত। এ ছাড়া নেপাল ৫৪টি, পাকিস্তান ৪৮টি, ভুটান ২১টি ও চীন একটি কেন্দ্র নির্মাণ করবে। ইতিমধ্যে বেশ কিছু কেন্দ্র নির্মাণের কাজ শেষ হয়েছে। কিছু রয়েছে মাঝামাঝি পর্যায়ে, আর কিছু রয়েছে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায়।
ভারতের ৪২৯টি জলবিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদিত হবে এক লাখ ২৬ হাজার ৫৮৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। তবে একসঙ্গে নয়, পর্যায়ক্রমে। বর্তমানে ৭৪টি জলবিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদিত হচ্ছে প্রায় ১৫ হাজার ২০৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। ৩৭টি কেন্দ্র নির্মাণের কাজ চলছে। এগুলো থেকে আসবে আরো ১৭ হাজার ৭৬৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। পরিকল্পনাধীন অন্য ৩১৮টি কেন্দ্রের উৎপাদন ক্ষমতা ৯৩ হাজার ৬১৫ মেগাওয়াট। সবচেয়ে বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদিত হবে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য অরুণাচলে। এ রাজ্যে ৫৫ হাজার মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদন হবে। এর পেছনে ব্যয় হবে চল্লিশ হাজার কোটি রুপি। প্রথম পর্বে অরুণাচল থেকে ৪৬ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন সঞ্চালন লাইনের মাধ্যমে বাংলাদেশ হয়ে যাবে পশ্চিমবঙ্গে। ভারতের মধ্যে এই বিদ্যুৎ সঞ্চালনের কাজ করবে সে দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান পাওয়ার গ্রিড করপোরেশন অব ইন্ডিয়া লিমিটেড (পিজিসিআই)। আর বাংলাদেশের ভেতরে বিদ্যুতের খুঁটি পোঁতার কাজ করবে পাওয়ার গ্রিড কম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি)।
সূত্র জানায়, ‘হাই ভোল্টেজ পাওয়ার ট্রান্সমিশন করিডর’ নামের এ সঞ্চালন করিডরের রুট ঠিক করাসহ বিভিন্ন বিষয় চূড়ান্ত করতে যাচ্ছে জেটিটি।
সংশ্লিষ্ট প্রকল্প সম্পর্কে জানতে পিজিসিবির ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) চৌধুরী আলমগীর হোসেন গতকাল মঙ্গলবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ভারতের বিদ্যুৎ বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে সঞ্চালন করা হবে। রিজিওনাল ইন্টারকানেকশনের অংশ। জেটিটির দেওয়া প্রতিবেদন অনুযায়ী সম্ভাব্য বিদ্যুতের সঞ্চালন রুটগুলো নিয়ে ভাবা হচ্ছে। বাংলাদেশের মধ্যে বিদ্যুতের সঞ্চালন লাইনের কাজ আমরাই করব।’ কত পরিমাণ বিদ্যুৎ আমরা সঞ্চালন লাইনের কারণে পাব- জানতে চাইলে চৌধুরী আলমগীর হোসেন বলেন, ‘আমরা সঞ্চালন লাইন থেকে অবশ্যই বিদ্যুৎ পাব। তবে ঠিক কত পরিমাণ বিদ্যুৎ সেখান থেকে পাব এ ব্যাপারে এখনই নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না। কারণ যে পয়েন্ট দিয়ে বিদ্যুৎ আসবে সেখানে কী পরিমাণ বিদ্যুৎ আছে সেটার ওপর নির্ভর করবে আমরা কী পরিমাণ বিদ্যুৎ পাব।’
সূত্র জানায়, হিমালয় থেকে উৎপাদিত জলবিদ্যুৎ প্রথমে শিলিগুড়ি দিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করে ভারত। তবে শিলিগুড়ি দিয়ে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ নিতে দেশটির একাধিক বিশেষজ্ঞ আপত্তি করায় বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়। শিলিগুড়ি দিয়ে বিদ্যুৎ না নেওয়ার বিষয়ে বলা হয়, ওই পথে উলফাসহ নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনগুলোর হামলার আশঙ্কা রয়েছে। অত্যুচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন এমন একটি সঞ্চালন ব্যবস্থায় সন্ত্রাসী হামলা হলে সমগ্র অঞ্চলেই ভয়াবহ বিপর্যয় হবে। এ ছাড়া এত বেশি বিদ্যুৎ শিলিগুড়ির মতো স্বল্পপরিসর (বিশেষজ্ঞদের ভাষায় চিকেন নেক) দিয়ে নিয়ে গেলে বিদ্যুতের তরঙ্গ থেকে ক্যান্সারসহ নানাবিধ মারণব্যাধি ছড়িয়ে পড়তে পারে।
বিশ্বব্যাংক-এডিবি ও জাপান সরকারের অর্থায়নে পরিকল্পনাধীন বাঁধগুলো নির্মিত হবে। প্রাথমিকভাবে এই মহাপরিকল্পনার পেছনে ব্যয় ধরা হয়েছে ৯ হাজার ৬৫০ কোটি ডলার। নেপাল ও ভুটানের বাঁধ নির্মাণে নানা পর্যায়ে কাজ করছে বিশ্বব্যাংক ও এডিবির মতো কয়েকটি আন্তর্জাতিক অর্থায়ন প্রতিষ্ঠান। পাশাপাশি ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার ও টাটা, রিলায়েন্স, জিএমআর, ল্যাঙ্কো, জয়প্রকাশ, গ্রিন ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্টের মতো ভারতীয় কম্পানি এবং নরওয়ে ও দক্ষিণ কোরিয়ার কয়েকটি কম্পানি নির্মাণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রয়েছে।
পাকিস্তানের বাঁধ নির্মাণে অর্থায়ন করছে বিশ্বব্যাংক, এডিবি, আইডিবি, চীন সরকার, জাপান-ভিত্তিক ওভারসিজ ইকোনমিক কো-অপারেশন ফান্ড, ইউরোপিয়ান ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক ও দেশীয় কয়েকটি কম্পানি।
ভারতের এ মেগা প্রকল্পে অর্থায়নের ক্ষেত্রে অন্য তিন দেশের সঙ্গে পার্থক্য হচ্ছে, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে কাজ করতে হচ্ছে দেশীয় কোনো পক্ষের সঙ্গে।
এদিকে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাঁধ দিয়ে এই বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে গেলে হিমালয় ও হিমালয় থেকে উৎসারিত নদীগুলো ভয়াবহ ক্ষতির মুখে পড়বে। বাংলাদেশের প্রায় সব নদীর উৎস হিমালয়। ফলে বাংলাদেশের নদী ও পরিবেশের ওপর তীব্র নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
এই বিশেষজ্ঞদের একজন শ্রীপাদ ধর্মাধীকারী। ‘মাউন্টেইন অব কনক্রিট : ড্যাম বিল্ডিং ইন দ্য হিমালয়াস’ শীর্ষক গবেষণায় তিনি দেখিয়েছেন, এ ধরনের বাঁধ নির্মিত হলে হিমালয় অঞ্চলের পরিবেশে মারাত্মক প্রভাব পড়বে। মাঝেমধ্যে বাঁধ ভেঙে বিশাল অঞ্চল প্লাবিত হবে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে বাংলাদেশ। এমনকি বাঁধের কারণে উষ্ণতা বেড়ে পৃথিবীর মিষ্টি পানির আধার হিসেবে পরিচিত হিমালয়ের বরফ গলে গোটা অঞ্চল প্লাবিত হতে পারে।