বিধবার জমি কেড়ে ফাইভ স্টার হোটেল ম্যারিয়ট!

সহায়-সম্পত্তি হারানো সুরত বানু প্রায়ই দীর্ঘশ্বাস ফেলেন কুড়িল প্রগতি সরণিতে দাঁড়িয়ে। তিনি যেখানে দাঁড়িয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন, এর সামনের জায়গাটিতেই গড়ে তোলা হচ্ছে আন্তর্জাতিক মানের হোটেল জেডাব্লিউ ম্যারিয়ট। সুরত বানু এবং তাঁর মতো আরো অনেকের শেষ সম্বল বসতভিটা দখল করে সেখানেই হোটেলটি তৈরি করা হচ্ছে। নগরীর অভিজাত হোটেলের তালিকায় আরেকটি পাঁচতারা হোটেলের নাম যুক্ত হতে চললেও বাস্তুহারা হয়ে বিধবা সুরত বানু এক আত্মীয়র বাড়িতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। বাড়িঘর হারিয়ে তিনি অন্যের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করছেন। নিরুপায় হয়ে অনেক সময় ভিক্ষাবৃত্তিও করেন।

শুধু একজন সুরত বানুই নন, তাঁর মতো আরো অনেকের জমি কেড়ে নেওয়া হয়েছে ওই হোটেল বানানোর জন্য। তাঁদেরই আরেকজন বৃদ্ধা জোহরা বানু। তিনি কালের কণ্ঠকে জানান, দুপুরে রান্নাবান্না করে সন্তানদের নিয়ে ভাত খেতে যাওয়ার মুহূর্তে একদল সন্ত্রাসী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হামলা চালিয়ে তাঁকে সপরিবারে উচ্ছেদ করে। ঘরের আসবাবপত্র, টিভি, ফ্রিজসহ প্রয়োজনীয় সব জিনিসপত্র ভেঙে চুরমার করে দেয় তারা। এমনকি ঘরে রাখা টাকাও কেড়ে নেয় সন্ত্রাসীরা। মুহূর্তে সর্বহারা হয়ে যান জোহরা বানু। তিনি ছেলেমেয়ে নিয়ে প্রগতি সরণির ওপর বসে কান্নাকাটি করলেও প্রতিকারের জন্য কেউ এগিয়ে যায়নি। সুরত বানু ও জোহরা বানু কালের কণ্ঠকে জানান, সেদিনের স্মৃতি কোনো দিনই ভুলতে পারবেন না তাঁরা। একদল অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী মুখোশ পরে সেখানে হাজির হয়। সময়টা ছিল এ বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি দুপুর ১টা। চোখের সামনেই পাঁচটি বুলডোজার চালিয়ে দেওয়া হয় বাড়িঘরের ওপর দিয়ে। মুহূর্তের মধ্যে তাঁরা সর্বহারায় পরিণত হন। আর্তচিৎকার আর আল্লাহর দোহাই দিয়ে কাকুতি-মিনতি করার পরও তাদের মন গলেনি। সন্ত্রাসীরা বুক উঁচিয়ে বলতে থাকে- নুরুল ইসলাম বাবুলের চেয়ে বড় গুণ্ডা এ দেশে আর নেই। তাঁর কথা না শুনলে এমনই হয়।

ক্ষতিগ্রস্ত ইসরাফিল ও হাজী আজহার উদ্দিন জানান, শত শত বছর ধরে বংশপরম্পরায় তাঁরা কুড়িল এলাকায় বসবাস করে আসছিলেন। কিন্তু যমুনা ফিউচার পার্ক নির্মাণের অজুহাতে তাঁদের পৈতৃক সম্পত্তি দখল করে নেওয়া হয়। এর আগেই তাঁদের এলাকাছাড়া করা হয় মিথ্যা মামলা দিয়ে। এরপর বাড়ির মেয়েদের ভয়-ভীতি দেখিয়ে বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বুলডোজার দিয়ে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়। লুট করা হয় ঘরের মূল্যবান জিনিসপত্র ও নগদ টাকা। যমুনা গ্রুপের মালিক নুরুল ইসলাম বাবুল নিজে উপস্থিত থেকে এসব সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ঘটান।

স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, যমুনা ফিউচার পার্কের জায়গায় কয়েকটি পারিবারিক কবরস্থান এবং কুড়িল জামে মসজিদ ছিল। পাঁচতারা হোটেল নির্মাণের জন্য কবরস্থান ও মসজিদ পর্যন্ত মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। এখন কেউ ইচ্ছা করলেও তাঁদের মা-বাবার কবর জিয়ারত করতে পারছেন না। কুড়িলের একাধিক বাসিন্দা বলেন, মসজিদটি ছিল ওয়াকফ করা। ওয়াকফ করা মসজিদ যে ব্যক্তি জোরপূর্বক দখল করে নিয়ে ভেঙে ফেলতে পারেন, তাঁকে মুসলমান বলা ঠিক নয়। ক্ষতিগ্রস্ত ইউনুস আলী বলেন, ‘বর্তমানে আমাদের পারিবারিক কবরস্থানের কোনো চিহ্নও নেই। কবরস্থানের ওপর পাঁচতারা হোটেল নির্মাণ করা হচ্ছে।’

যমুনা ফিউচার পার্ক এবং হোটেল ম্যারিয়টের জায়গায় কুড়িলের আদি বাসিন্দাদের প্রায় ১০ বিঘা জমি রয়েছে, যা জোরপূর্বক দখল করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হাজী আজহার উদ্দিন জানান, ১০ বিঘা বা ২০০ কাঠা জমির বর্তমান বাজারদর ৬০০ কোটি টাকা। এসব সম্পত্তি ছিল স্থানীয় গরিব মানুষের। তাঁরা এ জমির ওপর ঘরবাড়ি নির্মাণ করে বসবাস করছিলেন। তিনি বলেন, অনেকে যমুনার মালিকের হুমকিতে বাড়ি ছেড়ে চলে যান। আর যাঁরা বাড়ি ছাড়েননি তাঁদের সহায়-সম্পত্তি সন্ত্রাসী কায়দায় দখল করে নেওয়া হয়।

শুধু আহজার উদ্দিনেরই ৫০ কোটি টাকার পারিবারিক সম্পত্তি জোরপূর্বক দখল করা হয়েছে। সিএস ১২৭৭ ও ১২৭৮ দাগে সেসব সম্পত্তি ছিল। আহজার উদ্দিন জানান, এ জমি দখল করার আগে তাঁর দুই ভাই ও চার বোনের নামে একাধিক মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়। তাঁকে মাদকসম্রাট আখ্যা দিয়ে বাবুল তাঁর পত্রিকায় একাধিক মিথ্যা রিপোর্ট প্রকাশ করেন। কিন্তু এলাকাবাসী তো জানে যে তিনি একজন ব্যবসায়ী। হয়রানি ও ভয়-ভীতিতে কাজ না হওয়ায় পরে সন্ত্রাসী কায়দায় জমি দখল করা হয়।

ক্ষতিগ্রস্ত জমির মালিকরা জানান, প্রগতি সরণি নির্মাণের সময় তাঁরা সিটি করপোরেশনের জন্য নিজস্ব ১২ ফুট জমি ছেড়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু যমুনা ফিউচার পার্ক নির্মাণের সময় সে জমিও দখল করে নেওয়া হয়। ফিউচার পার্কে প্রবেশপথের পুরো জায়গা রাস্তার মধ্যে পড়েছে। ওই জমি উদ্ধার করার জন্য সিটি করপোরেশনকে অনুরোধ জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা আবু তালেব।

দখল করা জমি ফেরত পাওয়ার জন্য অনেকেই মামলা করেছেন। কিন্তু যমুনার মালিক প্রভাবশালী হওয়ায় সেসব মামলার বিচারকাজ আটকে আছে। তবে তাঁরা আশাবাদী যে তাঁদের দলিল ও রেকর্ড-পর্চা রয়েছে। যমুনার মালিক ইচ্ছা করলেই দখল করা সম্পত্তির মালিকানা পাবেন না।

সুরত বানু ও জোহরা বানু জানান, তাঁরা একদিন না একদিন সুবিচার পাবেন। আর কোথাও না পেলেও আল্লাহর দরবারে বাবুলের বিচার চাইবেন। সুরত বানু কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, একদিন তাঁর বাড়িতে কালার টিভি ছিল, ফ্রিজ ছিল। এখন ইচ্ছা করলেও এক গ্লাস ঠাণ্ডা পানি খেতে পারেন না। এর জন্য দায়ী নুরুল ইসলাম বাবুল।