বিল আনুন, সংসদ ভেঙে দিন, নইলে ভেসে যাবেন

২৫ অক্টোবরের মধ্যে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের দাবি মেনে না নিলে ‘ঢাকা অভিমুখে যাত্রা’ কর্মসূচি দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়ে সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বলেছেন, সংবিধান কোরআন-বাইবেল নয় যে পরিবর্তন করা যাবে না। এখনো সময় আছে, আলোচনা করতে চাই- উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘২৫ অক্টোবরের মধ্যে সংসদ অধিবেশনে সংবিধান সংশোধন করে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের বিল আনুন। সংসদ ভেঙে দিন। এখনো সম্মান পাচ্ছেন। এমন সময় আসবে তখন পালানোর সময় পাবেন না। আন্দোলনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ভেসে যাবে।’
সরকারকে হুঁশিয়ার করে দিয়ে খালেদা বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারকে বিদায় করতে হবে- এই দাবিতে সারা দেশের মানুষ সাড়া দিয়েছে। রংপুরের মানুষও ঢাকার দিকে যাবে। এই সরকারের হাতে তিন মাস সময় আছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কে বড় দলের নেতা আর কে ছোট দলের নেতা, কে ডানের আর কে বামের তা দেখার সময় নেই। তিনি বলেন, ‘আমাদের সঙ্গে ১৮ দলীয় জোট আছে। এর বাইরেও আরো কয়েকটি দল আছে। ওই দলের নেতারাও আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন চান না। সবাই সব দলের অংশগ্রহণের মাধ্যমে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন চান।’ জনগণের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আসুন আওয়ামী লীগকে বিদায় করতে একসঙ্গে কাজ করি। দেশকে রক্ষা করি।’
গতকাল সোমবার রাজশাহীর ঐতিহাসিক মাদ্রাসা মাঠে ১৮ দলীয় জোট আয়োজিত বিশাল জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। জনসভায় সভাপতিত্ব করেন রাজশাহী মহানগর বিএনপির সভাপতি সাবেক মেয়র মিজানুর রহমান মিনু। অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন ১৮ দলীয় জোটভুক্ত লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির সভাপতি অলি আহমদ, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ, খেলাফত মজলিসের চেয়ারম্যান মাওলানা মুহাম্মদ ইসহাক, ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান মাওলানা আবদুল লতিফ নেজামী, জামায়াতে ইসলামীর কর্মপরিষদের সদস্য মাওলানা আ ন ম শামসুল ইসলাম, কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, জাগপা সভাপতি শফিউল আলম প্রধান, এনডিপির চেয়ারম্যান খন্দকার গোলাম মুর্তজা, লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মুস্তাফিজুর রহমান ইরান, এনপিপির মহাসচিব ফরিদুজ্জামান ফরহান, ডিএল সাধারণ সম্পাদক সাইফুদ্দিন মনি, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মাহবুবুর রহমান, জমির উদ্দিন সরকার, আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, সাদেক হোসেন খোকা, ফজলুর রহমান পটল, ব্যারিস্টার আমিনুল হক, আমানউল্লাহ আমান, বরকতউল্লাহ বুলু, ব্যারিস্টার মাহবুবউদ্দিন খোকন, হারুন অর রশীদ, রাজশাহীর মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল, জেলা বিএনপির সভাপতি নাদিম মোস্তফা, সাধারণ সম্পাদক শফিকুল হক মিলন, মহিলা এমপি সৈয়দা আসিফা আশরাফি পাপিয়া প্রমুখ।
রাজশাহীর মাদ্রাসা মাঠে খালেদা জিয়া বিকেল সোয়া ৪টায় উপস্থিত হন। বিকেল ৫টা থেকে শুরু করে ৫০ মিনিট টানা বক্তব্য দেন তিনি। সরকারের উদ্দেশে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘২৫ অক্টোবরের পর আমরা নতুন কর্মসূচি দেব। সারা দেশের মানুষ ঢাকার দিকে যেতে সায় দিয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘রংপুরের জনসভায় বৃষ্টিতে ভিজেছে মানুষ। কেউ নড়েনি। আমরা কর্মসূচি দিলে তারাও সাড়া দিতে রাজি হয়েছে। তাই সেই কর্মসূচিতে আপনারা সবাই আসবেন।’
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ করে খালেদা জিয়া বলেন, ‘২০০৭ সালে আপনি বিচারপতি কে এম হাসানকে মেনে নেননি। আপনি দলীয় ব্যক্তি হিসেবে আপনাকেও আমরা মানব না।’ আওয়ামী লীগ পাতানো নির্বাচনের ষড়যন্ত্র করছে দাবি করে তা রুখে দিতে জনগণের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
জেলার ৯টি উপজেলা ছাড়াও রাজশাহী বিভাগের আট জেলা থেকে হাজার হাজার নেতা-কর্মীর উপস্থিতিতে জনসভাটি জনসমুদ্রে রূপ নেয়। মাঠের পশ্চিমে সিএনবি মোড়, পূর্বে হোসনীগঞ্জ মোড়, জাদুঘর সড়ক, দক্ষিণে ঘোষপাড়া মোড় ও উত্তরে পদ্মা নদীর ভেড়িবাঁধের তিন কিলোমিটার এলাকাজুড়ে মানুষের ঢল নামে। পুরো মহানগরীর প্রধান সড়কগুলোয় সকাল ১১টার পর থেকে স্ব্বাভাবিক যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
দীর্ঘ ৫০ মিনিটের বক্তব্যে বিরোধীদলীয় নেতা দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, ভবিষ্যৎ নির্বাচন, সরকারের ব্যর্থতা, দুর্নীতি, অপশাসনসহ নানা বিষয়ে তুলে ধরেন সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর সমালোচনা করে বলেন, ‘বর্তমান বিধানে সংসদ বহাল থাকবে। এমপিরা থাকবেন। আবার নির্বাচনে নতুন এমপি মনোনয়ন দেওয়া হবে। এ রকম বিধান কোথাও নেই। এটা কখনো গ্রহণযোগ্য নয়। সরকারকে বলব, সংসদ ভেঙে দেওয়ার বিধান সংবিধানে সংযোজন করুন। নির্দলীয় সরকারের বিল আনুন। অন্যথায় সরকারের পরিণতি ভালো হবে না।’ তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ একা নির্বাচন করতে চায়। কোনো দল তাদের সঙ্গে নেই। এখন নতুন নতুন দল সৃষ্টি করছে তারা। খালেদা জিয়া বলেন, ‘একসময় বড় বড় নেতা ছিলেন। তাঁদের বলছি, দেশ রক্ষার জন্য আসুন একসঙ্গে আমরা বসব। দেখব সরকার আমাদের ওপর কত গুলি চালাতে পারে।’
নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষ নয় উল্লেখ করে খালেদা জিয়া বলেন, ‘এই কমিশন অপদার্থ ও মেরুদণ্ডহীন। তাদের কথা বলার সুযোগ নেই। তারা নৌকা মার্কায় ভোট চেয়ে বেড়াচ্ছে। নৌকা ফুটো হয়ে গেছে। ডুবন্ত নৌকা তলিয়ে যাবে। কেউ নৌকায় উঠবে না। জীবন বাঁচাতে তাদের নিজেদেরই অনেকে নৌকা থেকে লাফিয়ে পড়ছে। বিএনএফকে ভুয়া নিবন্ধন দিয়ে গমের শীর্ষ মার্কা দেওয়ার ষড়যন্ত্র করছে নির্বাচন কমিশন। বিএনএফকে নিবন্ধন দেওয়া হলে ঘর থেকে বের হতে পারবেন না। নির্বাচন কমিশনকে এসব ভুয়ামি বাদ দিতে হবে।’
ভবিষ্যতে সরকার গঠন করলে দেশে সুশাসন, নির্দলীয় প্রশাসন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা, জঙ্গিদের নির্মূল, প্রতিহিংসার পরিবর্তে ঐক্যের রাজনীতির ধারা চালু, কর্ম কমিশনে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ এবং বিদ্যমান কোটা প্রথার সংস্কার, বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধিসহ দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে নতুন ধারার শাসনব্যবস্থা চালু করবেন বলে জানান খালেদা জিয়া।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘দেশের সুনাম অর্জনকারী অধ্যাপক ইউনূসের বিরুদ্ধে সরকার মিথ্যা অপপ্রচার চালাচ্ছে। উদ্দেশ্য তাঁকে হেনস্তা করা। আমি সরকারকে বলব, অবিলম্বে এই হয়রানি বন্ধ করুন। নইলে এর পরিণতি ভালো হবে না।’
সিলেটে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সমাবেশে ছাত্রলীগের হামলার ঘটনা উল্লেখ করে খালেদা জিয়া বলেন, ‘আওয়ামী লীগে চমক গতকাল দেখা গেছে। একটা ছোট রাজনৈতিক দলের সমাবেশে হামলা চালিয়ে ওই দলের ২৫ জনকে আহত করা হয়েছে। সরকারকে বলব, এখনো সময় আছে, এই গুণ্ডাদের সামাল দেন। নইলে কেউ রেহাই পাবে না।’
রাজশাহীর এই জনসভায় ব্যাপক নারী সমাগম দেখে তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে খালেদা জিয়া বলেন, ‘তরুণ সমাজকে ধ্বংস করতে অবাধে মাদক আনা হচ্ছে। তাদের মাদক দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হচ্ছে। বিএনপি ক্ষমতায় গেলে মাদক নির্মূলে কঠোর ব্যবস্থা নেবে। নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে বিজয় আমাদের হবেই হবে।’
বক্তব্য শেষে খালেদা জিয়া রাজশাহী সার্কিট হাউস থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় বেরিয়ে হযরত শাহ্ মখদুম (র.)-এর মাজার জিয়ারত করেন। এরপর তিনি ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন।