বিশ্বে খাদ্য উৎপাদনে উদাহরণ বাংলাদেশ

স্বাধীনতার ঠিক পরে ১৯৭২ সালে দেশে খাদ্যশস্য উৎপাদন হয়েছিল এক কোটি ১০ লাখ মেট্রিক টন। সাড়ে সাত কোটি মানুষের জন্য ওই খাদ্য পর্যাপ্ত ছিল না। এর পরের ৪২ বছরে এখানে মানুষ বেড়েছে দ্বিগুণ, আর আবাদি জমি কমেছে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ। অথচ দেশে এখন খাদ্যশস্য উৎপাদন হচ্ছে তিন গুণ বেশি; ভুট্টাসহ এর পরিমাণ প্রায় চার কোটি মেট্রিক টন।

আর এভাবেই প্রধান খাদ্য-শস্যের উৎপাদন বাড়ানোর ক্ষেত্রে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দেশের তালিকায় উঠে এসেছে বাংলাদেশ। কেবল উৎপাদন বৃদ্ধিই নয়, হেক্টরপ্রতি ধান উৎপাদনের দিক থেকেও অধিকাংশ দেশকে ছাড়িয়ে গেছে বাংলাদেশ। বাংলার কৃষকেরা এখানেই থেমে যাননি। একই জমিতে বছরে একাধিক ফসল চাষের দিক থেকেও বাংলাদেশ এখন বিশ্বের জন্য পথিকৃৎ।

জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো কৃষি উৎপাদন বাড়িয়ে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করায় বাংলাদেশের সাফল্যকে বিশ্বের জন্য উদাহরণ হিসেবে প্রচার করছে। গত তিন বছরে বাংলাদেশ দেশের মানুষকে খাওয়ানোর জন্য একটি চালও আমদানি করেনি।

অক্টোবরে বিশ্বের খাদ্যনিরাপত্তা বিষয়ে সবচেয়ে প্রভাবশালী গবেষণা সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (ইফপ্রি) বিশ্বের ক্ষুধা সূচক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। ক্ষুধা সূচকে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে আছে বাংলাদেশ। মাত্র এক বছরেই এই সূচকে ১১ ধাপ এগিয়েছে বাংলাদেশ।

বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) একই সময়ে খাদ্য-নিরাপত্তার বৈশ্বিক অবস্থা নিয়ে আরেকটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে জাতিসংঘের সংস্থাটি দীর্ঘ মেয়াদে খাদ্যনিরাপত্তা অর্জনে বাংলাদেশের অগ্রগতিকে তাৎপর্যপূর্ণ উল্লেখ করে বিশ্বের জন্য উদাহরণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন-সংক্রান্ত প্যানেলের (আইপিসিসি) চতুর্থ মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, চলতি শতকের মধ্যে বাংলাদেশের ধান ও গমের উৎপাদন যথাক্রমে ২০ ও ৩০ শতাংশ কমবে। কিন্তু গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশের ধান ও গমের উৎপাদন গড়ে ২ দশমিক ৫ থেকে ৩ শতাংশ হারে বেড়েছে। এফএওর জলবায়ু পরিবর্তন ও কৃষির অভিযোজনবিষয়ক প্রতিবেদন বলছে, আগামী দিনগুলোতে বিশ্বের যে দেশগুলোতে খাদ্য উৎপাদন বাড়তে পারে, তার মধ্যে বাংলাদেশ একটি।

বিশ্বব্যাংকসহ জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে কাজ করা একাধিক আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের মৌসুমি বায়ুর আগে ও পরে বৃষ্টিপাত বাড়ছে। এতে আমন ও আউশের হেক্টরপ্রতি উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে। আবার শীত দীর্ঘায়িত হওয়ায় গম ও ভুট্টার ফলনও বাড়ছে। ফলে জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে।

এ তো গেল আন্তর্জাতিক পরিপ্রেক্ষিত। কৃষির এই সাফল্য সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। চাল, ভুট্টা ও সবজি উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন স্বয়ংসম্পূর্ণ। চাল আমদানি নয়, বরং চলতি বছর বাংলাদেশ সুগন্ধি চাল ও ভুট্টা রপ্তানি শুরু করেছে।

২০১০ সালের আগেও প্রায় প্রতিবছর বাংলাদেশকে ১০০ কোটি ডলার বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করে চাল আমদানি করতে হতো। এখন চাল আমদানি করতে হচ্ছে না বলে কষ্টার্জিত আয়ের বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হচ্ছে। একই সঙ্গে গত পাঁচ বছরে দেশে দারিদ্র্যের পরিমাণ প্রায় ১০ শতাংশ কমানোর ক্ষেত্রেও কৃষি উৎপাদন ভূমিকা রাখছে বলে বিশ্বব্যাংক, এফএও এবং ইফপ্রির বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

অর্থনীতিবিদ ও ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক মাহবুব হোসেন দেশের কৃষি খাতের এই সাফল্যকে বিশ্বের জন্য অনুকরণীয় উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, বিশ্বব্যাংক এবং এফএওর তথ্য বিশ্লেষণ এবং ব্র্যাকের নিজস্ব গবেষণা পর্যালোচনা করলে এটা স্পষ্ট যে বাংলাদেশ এখন খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির সব দিক থেকেই বিশ্বের জন্য পথিকৃত।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) হিসেবে স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশের কৃষিজমি কমেছে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ। তা সত্ত্বেও এই ৪২ বছরে ধান, গম, ভুট্টা, পাট, আলু, পেঁয়াজসহ বেশির ভাগ ফসলের উৎপাদন দুই থেকে চার গুণ বেড়েছে। ধান, আলু, ভুট্টা ও সবজি উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন স্বয়ংসম্পূর্ণ একটি দেশ।

ইফপ্রি, বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আখতার আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের যতগুলো অর্জন আছে, তার মধ্যে ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি সবচেয়ে উল্লেখ করার মতো। এটা বিশ্বের যেকোনো উন্নয়নশীল দেশের জন্য উদাহরণও বটে।

ফলনে অগ্রগতি: স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের ধানের উৎপাদন তিন গুণেরও বেশি, গম দ্বিগুণ, সবজি চার গুন এবং ভুট্টার উৎপাদন বেড়েছে ১০ গুণ। দুই যুগ আগেও দেশের অর্ধেক এলাকায় একটি ও বাকি এলাকায় দুটি ফসল হতো। বর্তমানে দেশে বছরে গড়ে দুটি ফসল হচ্ছে।

পরিশ্রমী কৃষক ও মেধাবী বিজ্ঞানীদের যৌথ প্রয়াসেই এ সাফল্য। স্বাধীনতার পরে দেশে প্রতি হেক্টর জমিতে দুই টন চাল উৎপাদিত হতো। আর এখন হেক্টরপ্রতি উৎপাদন হচ্ছে চার টনেরও বেশি। আর ধান ধরে হিসাব করলে তা ছয় টন।

অথচ এফএও এবং বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, বর্তমান বিশ্বে প্রতি হেক্টর জমিতে ধানের মতো দানাদার ফসলের গড় উৎপাদন প্রায় তিন টন। বিশ্বের প্রধান খাদ্য উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে ভারতের হেক্টরপ্রতি উৎপাদন আড়াই টনের কিছু বেশি। এ ছাড়া ব্রাজিলে চার, থাইল্যান্ডে প্রায় তিন, কানাডায় প্রায় সাড়ে তিন টন দানাদার ফসল হয়।

বিশ্বের প্রধান খাদ্য উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, ফ্রান্স, ভিয়েতনাম, ক্রোয়েশিয়া, বেলজিয়াম ও মিসর বাংলাদেশের ওপরে রয়েছে। এই দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভিয়েতনাম দানাদারজাতীয় শস্য উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ দেশ। ধানের হেক্টরপ্রতি ফলন হিসাব করলে বাংলাদেশের ওপরে একমাত্র ভিয়েতনাম ও চীন অবস্থান করছে।

গত চার বছরে ভুট্টা উৎপাদনে বাংলাদেশের অগ্রগতি অসামান্য। এই সময়ে ভুট্টার উৎপাদন ৪০ শতাংশ বেড়েছে। হেক্টরপ্রতি ভুট্টা উৎপাদনে যুক্তরাষ্ট্রের পরের অবস্থানেই বাংলাদেশ উঠে এসেছে। বাংলাদেশের পরে রয়েছে আর্জেন্টিনা, চীন ও ব্রাজিল। বিশ্বে বর্তমানে হেক্টরপ্রতি ভুট্টার গড় উৎপাদন ৫ দশমিক ১২ টন। পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, বাংলাদেশে চলতি বছর প্রতি হেক্টরে প্রায় সাত টন ভুট্টা উৎপাদিত হয়েছে। ভারতে প্রতি হেক্টরে ভুট্টার উৎপাদন মাত্র আড়াই টন।

জাত উদ্ভাবনেও এগিয়ে: ধানের নতুন নতুন জাত উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বিজ্ঞানীদের সফলতাও ক্রমশ বাড়ছে। ১৯৭০ সাল থেকে দেশি জাতকে উন্নত করে বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরা উচ্চফলনশীল (উফশী) জাত উদ্ভাবনের পথে যাত্রা করেন। এ পর্যন্ত তাঁরা মোট ৬৪টি জাত উদ্ভাবন করেছেন। এর মধ্যে ১৯৭০ থেকে ৮০ সালের মধ্যে ১০টি জাত, ১৯৮০ থেকে ১৯৯০-এর মধ্যে ১৩টি, ১৯৯০ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে ১৬টি, ২০০০ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে ১৩টি এবং গত তিন বছরে নয়টি ধানের নতুন জাত উদ্ভাবন করেছেন বাংলাদেশ ধান গবেষণা সংস্থার (ব্রি) বিজ্ঞানীরা।

এ পর্যন্ত ব্রি ও বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা সংস্থা-বিনার বিজ্ঞানীরা মোট ১৩টি প্রতিকূল পরিবেশে সহিষ্ণু ধানের জাত উদ্ভাবন করেছেন। এর মধ্যে লবণসহিষ্ণু নয়টি, খরাসহিষ্ণু দুটি ও বন্যাসহিষ্ণু দুটি ধানের জাত উদ্ভাবন করেছেন তাঁরা। চলতি বছর বিশ্বে প্রথমবারের মতো জিঙ্ক-সমৃদ্ধ ধানের জাত উদ্ভাবিত হয়েছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে এতগুলো প্রতিকূল পরিবেশসহিষ্ণু ধানের জাত উদ্ভাবনের দিক থেকেও বাংলাদেশ বিশ্বে এগিয়ে আছে।