বেসরকারি টেলিভিশনের রাজনৈতিক লাইসেন্স

শেষ সময়ে আরেকটি বেসরকারি টেলিভিশন (টিভি) চ্যানেলের লাইসেন্স দিল সরকার। রাজনৈতিক বিবেচনায় দেওয়া সর্বশেষ এই চ্যানেলের নাম চ্যানেল ৫২ (বায়ান্ন)। আওয়ামী লীগের প্রয়াত নেতা আবদুল মালেক উকিলের ছেলে বাহারউদ্দিন খেলনের স্ত্রীর নামে দেওয়া হলো এই লাইসেন্স। তাঁর সঙ্গে রয়েছে বেঙ্গল গ্রুপ। ইতিমধ্যেই আরটিভিতে এই বেঙ্গল গ্রুপের মালিকানা রয়েছে।
বাহারউদ্দিন বর্তমানে বিটিভির উপপরিচালক (বার্তা)। টিভি চ্যানেল স্থাপন ও পরিচালনার আর্থিক সংগতি নেই তাঁর। আবার সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে লাইসেন্স পেতেও পারেন না তিনি। তাই বেঙ্গল গ্রুপকে অর্থায়নকারী হিসেবে জোগাড় করেন বাহারউদ্দিন। গঠন করেন ‘বেঙ্গল টেলিভিশন চ্যানেল লিমিটেড’ নামের একটি কোম্পানি। এই কোম্পানির নামেই ১ অক্টোবর চ্যানেল বায়ান্নর লাইসেন্স দেয় তথ্য মন্ত্রণালয়। বাহারউদ্দিনের ইংল্যান্ডপ্রবাসী স্ত্রী চ্যানেলটির চেয়ারম্যান, আর বেঙ্গল গ্রুপের মোর্শেদ আলম ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি)। যোগাযোগ করলে মোর্শেদ আলম ও বাহারউদ্দিন উভয়ই প্রথম আলোর কাছে এসব তথ্য স্বীকার করেন।
চ্যানেল বায়ান্নসহ বর্তমান মেয়াদে মোট ১৬টি টিভি চ্যানেলের লাইসেন্স দিয়েছে সরকার। লাইসেন্স মালিকদের বেশির ভাগেরই চ্যানেল স্থাপন ও পরিচালনার সক্ষমতা নেই। এমনকি কোনো অভিজ্ঞতাও ছিল না। অনেকেরই লাইসেন্স পাওয়ার একমাত্র যোগ্যতা ছিল রাজনৈতিক যোগাযোগ। লাইসেন্স নিয়ে অনেকেই পরে উচ্চ মূল্যে মালিকানা বিক্রি করেছেন। আর এই পথে বিনা মূলধনে লাভবান হয়েছেন রাজনৈতিক বিবেচনায় পাওয়া অনেক টেলিভিশন চ্যানেল মালিক। অথচ বিক্রির আগে এমনকি সরকারের অনুমতিও নেননি তাঁরা। অনেকে আবার চেষ্টা করেও দরদামে বনিবনা না হওয়ায় বিক্রি করতে পারছেন না।
তথ্য মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) এবং যৌথ মূলধনি কোম্পানি ও ফার্মসমূহের নিবন্ধকের পরিদপ্তর (রেজেসকো) সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল, বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান গতকাল শনিবার প্রথম আলোকে বলেন, টেলিভিশন চ্যানেলের লাইসেন্স পাওয়া ব্যক্তিদের রাজনৈতিক অবস্থানটি এখন মুনাফার অবস্থানে পরিণত হয়েছে। রাজনৈতিক প্রভাবে লাইসেন্স নিয়ে তা বিক্রি করে দেওয়া একধরনের জালিয়াতি। তাঁর মতে, টেলিভিশন চ্যানেলের লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে দুটি দিক পাওয়া যায়। যাঁরা রাষ্ট্রীয় বা জাতীয় সিদ্ধান্ত প্রভাবিত করতে পারেন, এমন প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ক্ষমতাবানেরাই টেলিভিশন চ্যানেলের লাইসেন্স পাচ্ছেন। আবার গণমাধ্যম খাতে এখন বিনিয়োগ হচ্ছে। কিন্তু এই প্রক্রিয়ার কারণে সুস্থ প্রতিযোগিতার পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে। ফলে এ ধরনের গণমাধ্যম মৌলিক ভূমিকা পালন করতে পারছে না।
দুর্নীতি নিয়ে কাজ করা টিআইবির এই কর্মকর্তা মনে করেন, টেলিভিশন চ্যানেলের লাইসেন্স দেওয়ার নীতিমালায় পেশাদারি বৈশিষ্ট্যকে গুরুত্ব দিতে হবে। লাইসেন্স হস্তান্তরের প্রক্রিয়া নিয়েও কার্যকর নীতিমালা থাকা উচিত। তা না হলে গণমাধ্যম রাষ্ট্রীয় স্বার্থবিরোধীদের নিয়ন্ত্রণে চলে যেতে পারে।
তথ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, ২০০৯ সালের অক্টোবরে একই দিনে ১০টি অর্থাৎ ৭১ টিভি, মোহনা টিভি, চ্যানেল ৯ (নাইন), সময় টিভি, গাজী টিভি (জিটিভি), ইনডিপেনডেন্ট টিভি, মাছরাঙা টিভি, এটিএন নিউজ, মাইটিভি ও বিজয় টিভির লাইসেন্স দেয় সরকার। পরের বছর ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারিতে চ্যানেল টোয়েন্টিফোর, এপ্রিলে এসএ টিভি, ২০১১ সালের জুনে এশিয়ান টিভি, অক্টোবরে গানবাংলা টিভি, ডিসেম্বরে দীপ্তবাংলা টিভি এবং সর্বশেষ ১ অক্টোবর চ্যানেল বায়ান্নর লাইসেন্স দেওয়া হয়। এর বাইরে আরও ২০০ আবেদন জমা রয়েছে তথ্য মন্ত্রণালয়ে।
স্থগিত থাকা যমুনা টিভির লাইসেন্সও গত ২৯ জুলাই ফিরিয়ে দেয় সরকার। এর বাইরে ‘চ্যানেল সিক্সটিন’ নামে একটি চ্যানেল অবৈধভাবে চালিয়ে আসছেন আওয়ামী লীগের সাভার অঞ্চলের নেত্রী হাসিনা দৌলা। সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী নাজমুল হুদা যেভাবে চালাতেন ‘ফাল্গুন মিউজিক’ নামের একই ধরনের চ্যানেল।
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ আইন, ২০০১-এর ৩৭(২)(ঝ) ধারায় বলা হয়েছে, ‘চ্যানেলের লাইসেন্সের মালিকানা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সরকারের পূর্বানুমতি গ্রহণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কারণ, এমন পরিবর্তনের ফলে উক্ত লাইসেন্স দ্বারা অনুমোদিত কাজকর্মেও নিয়ন্ত্রণ হস্তান্তরিত হয়। তাই অনুমতি দেওয়ার ক্ষেত্রে বিটিআরসির সুপারিশ সরকার এমন শর্তে বিবেচনা করবে যে, যার কাছে শেয়ার বিক্রি করা হচ্ছে, তিনি তা পাওয়ার যোগ্য কি না এবং অনুমতি দেওয়ার পর লাইসেন্সকৃত কাজকর্ম ব্যাহত হবে কি না।’
একই আইনের ৩৭(৩) ধারায় বলা হয়েছে, ‘সরকারের পূর্বানুমতি ছাড়া কোনো লাইসেন্স বা তার অধীনে অর্জিত স্বত্ব সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে হস্তান্তরযোগ্য হবে না এবং এরূপ হস্তান্তর অকার্যকর হবে।’
তথ্য মন্ত্রণালয় প্রণীত ‘বেসরকারি মালিকানায় টেলিভিশন চ্যানেল স্থাপন ও পরিচালনা নীতি, ১৯৯৮’-এর ২(৮) ধারায়ও বলা হয়েছে, ‘বেসরকারি টিভি চ্যানেলের মালিকানা বা অংশীদারিত্ব হস্তান্তরের আগে সরকারের অনুমোদন নিতে হবে।’
টেলিযোগাযোগ আইনের পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্রডকাস্টিং আইন, ২০০৩; টেলিগ্রাফ অ্যাক্ট, ১৮৮৫ এবং ওয়্যারলেস টেলিগ্রাফি অ্যাক্ট, ১৯৩৩ অনুসরণের কথাও বলা হয়। লাইসেন্স দেওয়া হয় ‘বিনোদনমূলক ভিডিও অনুষ্ঠান, ছায়াছবি তৈরি ও রপ্তানির অনাপত্তি’ এবং ‘সংবাদ প্রচার ও স্থানীয়ভাবে সম্প্রচার করার অনাপত্তি’—এই দুই ধাপের শর্ত সাপেক্ষে। শর্ত পূরণ না হলেই লাইসেন্স বাতিল।
কিন্তু বাস্তবে কিছুই মানছে না কেউ। নিয়ম লঙ্ঘন করে চ্যানেলের মালিকানা বদল, যথাসময়ে সম্প্রচারে আসতে না পারলেও লাইসেন্স বহাল থাকা এবং অর্থ উপার্জনের জন্য যার-তার কাছে শেয়ার বিক্রির কথা প্রথম আলোর কাছে স্বীকার করেন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু।
আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, জানতে চাইলে হাসানুল হক ইনু বলেন, ‘তাঁরা মাফ চেয়েছেন। অনেককে সতর্ক করা হয়েছে।’ এর বাইরে তাঁর পক্ষ থেকে কিছু করার নেই উল্লেখ করে তথ্যমন্ত্রী বলেন, ‘প্রশাসনিক কিছু গৎবাঁধা শর্তে এসব লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। আমরা একটা নীতিমালা তৈরি করছি।’
এদিকে মালিকানা পরিবর্তন নিয়ে উদ্বিগ্ন টিভি চ্যানেলের তরঙ্গ ও বেতারযন্ত্র পরিচালনার লাইসেন্স বরাদ্দদানকারী সংস্থা বিটিআরসি। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত কমিশনের বৈঠকে বিটিআরসির কমিশনার এ টি এম মনিরুল আলম একটি কার্যপত্র উপস্থাপন করেন। এতে বলা হয়, ‘সম্প্রচারের বিষয়টি যেহেতু জাতীয় নিরাপত্তা ও জনস্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত, শেয়ার মালিকানা পরিবর্তনে তাই জঙ্গি বা সন্ত্রাসী তৎপরতার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিবর্গের হাতে মালিকানা চলে যেতে পারে।’
ওই কার্যপত্রে বলা হয়, বিজয় টিভি, মাইটিভি, ৭১ টিভি, মোহনা টিভি, গানবাংলা ও দীপ্ত বাংলাকে এখনো তরঙ্গ ও বেতারযন্ত্র পরিচালনার লাইসেন্স দেওয়া হয়নি। এ লাইসেন্স পাওয়ার আগেই মালিকানার বড় অংশ বিক্রি করেছে এটিএন বাংলা, এটিএন নিউজ, ৭১ টিভি, চ্যানেল ৯, আরটিভি ও সময় টিভি।

বিক্রি হয়ে যাচ্ছে টিভি চ্যানেলের মালিকানা

বিএনপির আমলের ১০টি চ্যানেল