সু শা স ন: সরকারের ৫ বছর

ব্যর্থতার পাল্লাই ভারী

বর্তমান মহাজোট সরকারের প্রধান শরিক আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রধান নির্বাচনী অঙ্গীকার ছিল সুশাসন প্রতিষ্ঠা। এই অঙ্গীকার বাস্তবায়নে দলটির নির্বাচনী ইশতেহারের ৫ নম্বর অনুচ্ছেদে সাতটি প্রতিশ্রুতি ছিল। তার একটি প্রতিশ্রুতিও সরকার পরিপূর্ণরূপে বাস্তবায়ন করতে পারেনি।
তবে কয়েকটি প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন চলমান আছে। কিন্তু কোনো কোনোটি বাস্তবায়নের উদ্যোগও নেওয়া হয়নি। বিশেষ করে যেসব প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন সমাজে স্বস্তি আনতে পারে, সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সরকারের আন্তরিকতা সম্পর্কে জনমনে তৈরি করতে পারে আস্থা, সেসব রয়ে গেছে প্রতিশ্রুতি হিসেবেই। ফলে সামগ্রিকভাবে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সরকারের ব্যর্থতার পাল্লাই ভারী হয়েছে।
সুশাসন প্রতিষ্ঠার অপরিহার্য উপাদান হচ্ছে দলীয়করণমুক্ত অরাজনৈতিক গণমুখী প্রশাসন। ইশতেহারের ৫.৬ উপ-অনুচ্ছেদে এমনই একটি প্রশাসন প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল আওয়ামী লীগ। বলা হয়েছিল—যোগ্যতা, জ্যেষ্ঠতা ও মেধার ভিত্তিতে প্রশাসনে সব নিয়োগ ও পদোন্নতি নিশ্চিত করা হবে। কিন্তু বর্তমান সরকারের শাসনামলে যতগুলো নিয়োগ-পদোন্নতি হয়েছে, বিশেষ করে পদোন্নতিগুলো সম্পর্কে অতীতের মতোই দলীয়করণের অভিযোগ রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার বলেন, প্রশাসনের ক্ষেত্রে যা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তা তো করা হয়ইনি, বরং বিপরীত করা হয়েছে।
ওই উপ-অনুচ্ছেদে প্রশাসনিক সংস্কার, তথ্য অধিকার প্রতিষ্ঠা, ই-গভর্নেন্স চালু করা ও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য স্থায়ী বেতন কমিশন গঠনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে তথ্য অধিকার ও আংশিকভাবে ই-গভর্নেন্স চালু করা হয়েছে। এ ছাড়া সরকারের মেয়াদের একেবারে শেষ দিকে এসে স্থায়ী বেতন কমিশন গঠনের কথা ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এখনো কমিশন গঠন করা হয়নি।
সুশাসন প্রতিষ্ঠার আরেকটি অপরিহার্য উপাদান রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, আধুনিক ও যুগোপযোগী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ইশতেহারের
৫.৭ উপ-অনুচ্ছেদে জনজীবনের নিরাপত্তা বিধানে এমন একটি বাহিনী গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। তাদের বেতন-ভাতা, আবাসন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো এবং তাদের কল্যাণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও বলা হয়েছিল।
কিন্তু বাস্তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আগের মতোই সরকারের দলীয় প্রভাবের মধ্যে থেকে কাজ করতে হচ্ছে। তবে তাদের বেতন-ভাতা, পদমর্যাদা ও অন্যান্য সুবিধা বাড়ানো হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য আধুনিক সরঞ্জামাদিও কেনা হয়েছে।
আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে সুশাসন প্রতিষ্ঠা প্রসঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি ছিল সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ শক্ত হাতে দমন ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ব্যবস্থা করার (ধারা ৫.১)। এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সরকারের যথেষ্ট সাফল্য আছে। গত পাঁচ বছরে দেশে বাংলা ভাই, শায়খ আবদুর রহমান ও জেএমবির মতো কোনো জঙ্গিগোষ্ঠী তৎপর হতে পারেনি। কোনো জঙ্গিগোষ্ঠী নাশকতা সৃষ্টিতেও সফল হয়নি। সরকার তার মেয়াদের প্রথম দুই বছরেই দেশি-বিদেশি বিভিন্ন জঙ্গিগোষ্ঠীর বেশ কয়েকজন নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করে ফেলে।
এ ছাড়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সরকারের একটি বড় সাফল্য একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো। এই বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে দেশে-বিদেশে কোনো কোনো মহলের সমালোচনা থাকলেও ইতিমধ্যে জাতীয় পর্যায়ের আটজন চিহ্নিত অপরাধীকে শাস্তির আওতায় আনা, একই পর্যায়ের আরও সাতজনের বিচারকাজ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চলমান আছে।
ইশতেহারে আরেকটি প্রতিশ্রুতি ছিল বিচার বিভাগের প্রকৃত স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা; বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ করা; বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের রায় কার্যকর ও জেলখানায় চার নেতার হত্যাকাণ্ডের পুনর্বিচার সম্পন্ন করা (উপ-অনুচ্ছেদ ৫.২)।
এর মধ্যে বিচার বিভাগের প্রকৃত স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা সম্পর্কে জনমনে প্রশ্ন আছে। যথেষ্ট আলোড়ন সৃষ্টিকারী বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড তথা ক্রসফায়ার এখন অনেকটাই বন্ধ আছে। তবে এ ক্ষেত্রে নতুন প্রবণতা হিসেবে যুক্ত হওয়া ‘গুম’ সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সরকারের সদিচ্ছাকে ব্যাপকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের রায় আংশিক কার্যকর হয়েছে। এই মামলার বিদেশে পলাতক আসামিদের দেশে ফিরিয়ে আনতে পারেনি সরকার। এমনকি অনেকবার ফিরিয়ে আনার নানা প্রক্রিয়ার কথা বলা হলেও এ ক্ষেত্রে কার্যকর কোনো উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয়নি। জেলহত্যার পুনর্বিচারও সম্পন্ন হয়নি।
ইশতেহারের ওই একই উপ-অনুচ্ছেদে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের ব্যবস্থা করা; আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা; স্বাধীন মানবাধিকার কমিশন গঠন ও ন্যায়পাল নিয়োগ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন কঠোরভাবে বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি ছিল। এর মধ্যে একমাত্র মানবাধিকার কমিশন গঠনই দৃশ্যমান। তা-ও আবার এই কমিশনের প্রায়োগিক ক্ষমতা প্রশ্নাতীত নয়।
এ ছাড়া ন্যায়পাল নিয়োগের উদ্যোগই নেওয়া হয়নি। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার বিচার প্রক্রিয়ায় সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে। সমগ্রিকভাবে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এখনো অনেক দূরের বিষয়ই রয়ে গেছে।
ইশতেহারের ৫.৩ উপ-অনুচ্ছেদে নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচন পদ্ধতির সংস্কার অব্যাহত রাখা, জাতীয় সংসদকে কার্যকর করা ও সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে বিরোধী দলকে নিয়ে সংসদ কার্যকর করার আন্তরিক উদ্যোগ সরকারের মধ্যে দেখা যায়নি। ফলে সংসদে সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত হওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন আছে।
এ ছাড়া জনগণের কাছে জবাবদিহি করা ও বিশ্বাসযোগ্যতা অব্যাহত রাখার জন্য প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভার সদস্য, সংসদ সদস্য ও তাঁদের পরিবারের সম্পদের হিসাব ও আয়ের উৎস প্রতিবছর জনসমক্ষে প্রকাশের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তা কখনোই প্রকাশ করা হয়নি। ফলে সামগ্রিকভাবে সরকারের সততা ও বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
রাষ্ট্রের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত কিছু সুনির্দিষ্ট বিষয় ছাড়া সাংসদদের ভিন্নমত প্রকাশের অধিকার দেওয়ার কথাও ইশতেহারে বলা হয়েছিল। কিন্তু সংসদীয় কার্যক্রমে এমন কোনো উদাহরণ সৃষ্টি হয়নি।
রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ নিষিদ্ধ করা, ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি ছিল ইশতেহারের ৫.৪ ধারায়। ওই ধারায় রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে শিষ্টাচার ও সহিষ্ণুতা গড়ে তোলা এবং সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি নিষিদ্ধ করা, একটি সর্বসম্মত আচরণ বিধিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়ারও প্রতিশ্রুতি ছিল। কিন্তু কার্যত এর কোনোটিই করা হয়নি।
ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা-নির্যাতন চলছে প্রতিকারহীনভাবে। রাজনৈতিক সংস্কৃতি আগের মতোই শিষ্টাচারবর্জিত ও অসহিষ্ণু। প্রযোজ্য প্রতিটি ক্ষেত্রে চাঁদাবাজি অব্যাহত রয়েছে। কোনো আচরণ বিধিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ কখনোই নেওয়া হয়নি।
ইশতেহারের ৫.৫ অনুচ্ছেদের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী জাতি গঠনে প্রবাসী বাংলাদেশিদের অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি কিংবা তাঁদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা হয়নি। প্রবাসী কর্মীদের পাঠানো অর্থের বিনিয়োগ ও প্রবাসী মূলধনকে আকৃষ্ট করার জন্য বিশেষ উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হলেও এ ব্যাপারে এখনো কার্যকর কিছু হয়নি। প্রবাসীদের মেধার সদ্ব্যবহারের জন্য পরামর্শক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার কথাও প্রতিশ্রুতিতেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।
সরকারের সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন সম্পর্কে জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা আকবর আলি খান বলেন, সুশাসনের বড় নিয়ামক হচ্ছে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা। সেটা হয়েছে বলে কেউই মনে করেন না। প্রশাসন যে দলীকরণমুক্ত নয়, তা সরকার ছাড়া সবাই প্রকাশ্যে বলে থাকেন। পদোন্নতি নিয়ে প্রশ্ন আছে। সরকারি কর্মকমিশনের নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে ক্ষোভ আছে। জঙ্গিবাদ মাথাচাড়া দিতে পারেনি সত্য। কিন্তু তারা সক্রিয় আছে এবং বিভিন্ন শিক্ষামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে তারা আরও জটিল অবস্থা সৃষ্টি করছে। তবে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ক্ষেত্রে সরকার প্রতিশ্রুতি রেখেছে। এটা বর্তমান সরকারের একটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য।