ব্যাংক ঋণে নির্ভরতা নেই সরকারের

সঞ্চয়পত্র বিক্রি ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় ও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে ধীরগতির ফলে ব্যাংক ঋণ তেমন প্রয়োজন হচ্ছে না। ব্যাংক থেকে এখন সরকার যে পরিমাণ ঋণ নিচ্ছে, পরিশোধ করছে সেই তুলনায় বেশি। এতে করে ব্যাংক ব্যবস্থায় সরকারের নিট ঋণ ধনাত্মক হয়ে গেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ হিসেব অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত আগের একই সময়ের তুলনায় ব্যাংক ব্যবস্থায় সরকারের নিট ঋণ ছয় হাজার ৬০ কোটি টাকা ঋণাত্মক হয়েছে। আর আগের বছরের একই সময়ে সরকার ঋণ নিয়েছিল তিন হাজার ১৩৬ কোটি টাকা। reports the daily Samakal.

বর্তমান প্রেক্ষাপটে ব্যাংক ব্যবস্থায় সরকারের ঋণ কমার এই প্রবণতাকে যৌক্তিক মনে করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ। সমকালকে তিনি বলেন, এবারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নে আগে থেকেই ধীরগতি ছিল। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে এটি আরও ধীর হয়ে পড়েছে। এখন বড় কোনো প্রকল্পের কাজে তেমন অগ্রগতি নেই। এ ছাড়া ব্যাংকগুলোর আমানতে সুদহার কমার প্রেক্ষাপটে সঞ্চয়পত্রসহ অন্যান্য খাত থেকে ভালো টাকা আসছে। তিনি মনে করেন, অস্থিরতার কারণে এবারে সরকারের রাজস্ব আয় কমতে পারে_ এমন প্রেক্ষাপটে ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নিলে পরবর্তী সময়ে সমস্যা দেখা দিতে পারে। চাপ পড়তে পারে মূল্যস্ফীতির ওপর। সব মিলিয়ে সরকার হয়তোবা সচেতনভাবে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ নেওয়া কমিয়ে দিয়েছে যা যৌক্তিক।
চলতি অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে নিট ৩১ হাজার ২২১ কোটি টাকা ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছে সরকার। নির্দিষ্ট একটি সময় থেকে নির্ধারিত সময় পর্যন্ত যে পরিমাণ ঋণ নেওয়া হয়, তাকে নিট ঋণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। নতুন ঋণ নেওয়ার তুলনায় ছয় হাজার ৬০ কোটি টাকা বেশি পরিশোধের ফলে ব্যাংক ব্যবস্থায় সরকারের ঋণ স্থিতি কমে এক লাখ আট হাজার ১৮৪ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে যা এক লাখ ১৪ হাজার ২৪৪ কোটি টাকা ছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে সরকার বিভিন্ন মেয়াদে ঋণ নিয়ে থাকে। ব্যাংক খাতে সরকারের নিট ঋণ কমলেও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে এ সময়ে সরকার তিন হাজার ৪১৪ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে।
এর বিপরীতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে আগে নেওয়া ঋণের ৯ হাজার ৪৭৩ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। ফলে নিট ঋণ ঋণাত্মক ধারায় নেমে এসেছে।
সঞ্চয় পরিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে সঞ্চয়পত্রে নিট বিনিয়োগ হয়েছে ১৩ হাজার ১৩৫ কোটি টাকা। যা পুরো অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় চার হাজার ৭৯ কোটি বা ৩১ শতাংশ বেশি। এবারে সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে সরকারের ৯ হাজার ৫৬ কোটি টাকা ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল। গত অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রির পরিমাণ ছিল তিন হাজার ৮৫৮ কোটি টাকা। সে তুলনায় এবারে বিক্রি তিন গুণেরও বেশি বেড়েছে।
এর আগে বেশ কয়েক অর্থবছর ধরে সরকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে আশানুরূপ অর্থ পাচ্ছিল না। ফলে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ নিয়ে খরচ মেটাতে হচ্ছিল সরকারকে। এতে করে প্রায় প্রতি বছরই তার আগের তুলনায় ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারকে বেশি ঋণ নিতে দেখা গেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে গত অর্থবছর ব্যাংক খাত থেকে সরকার সব চেয়ে কম ঋণ নিয়েছিল। এর পরও গত অর্থবছর শেষে নিট ঋণ দাঁড়িয়েছিল সাত হাজার ৯৫১ কোটি টাকা। এর আগে ২০১২-১৩ অর্থবছর ব্যাংক থেকে সরকার ২৪ হাজার ৭৭৬ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিল। তার আগের অর্থবছরে নিয়েছিল ২১ হাজার ৯৮৪ কোটি টাকা। আর ২০১০-১১ অর্থবছর নিট ঋণের পরিমাণ ছিল ২০ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ব্যাংকগুলোর কাছে এখন প্রচুর অলস অর্থ পড়ে থাকায় ধারাবাহিকভাবে তারা ঋণ ও আমানতের সুদ কমাচ্ছেন। বর্তমানে ব্যাংকগুলো গড়ে ৭ দশমিক ২৫ শতাংশ সুদে আমানত নিচ্ছে। ঋণ বিতরণ করছে ১২ দশমিক ৪৬ শতাংশ সুদে। অথচ বেশিরভাগ সঞ্চয়পত্রে এখনও সুদহার আগের মতো ১৩ শতাংশের ওপরে রয়েছে।